06/10/2026
মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক ও আলেমদের কাছে জাতির প্রত্যাশা কি দেখুন।
-----------------------------------------------------------------------------
মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতীব। তিনি একজন নিভৃতচারী গবেষক ও কিতাবী আলেম। ৩৬ জুলাইয়ের পর পূর্বতন ফ্যাসিবাদী খতীব পালিয়ে গেলে তাকে বায়তুল মোকাররমের খতীব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তার নিযুক্তির পেছনে জুলাইয়ের পক্ষের অপরাপর শক্তির সাথে জামায়াতে ইসলামীরও একটা ভূমিকা ছিলো।
সম্প্রতি তার নামে একটা বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছে। তাতে তিনি বলেছেন, যাদের নসীব খারাপ তারাই নাকি জামায়াতে ইসলামীতে যায়। তিনি আরো বলেছেন, কওমীর সবাই যদি জামায়াতে যোগ দেয় তবুও জামায়াত গোমরাহই থাকবে। স্বাভাবিক ভাবেই এতে অনেকেই বিশেষত জামায়াতপন্থী ফেসবুক এক্টিভিস্টদের কেউ কেউ তার সমালোচনা করছেন। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন কথা লিখছেন তার সমর্থকরা। তারা বলছেন জামায়াতের সকল আলেমের ইলম একত্রিত করলেও নাকি তার ইলমের ধারেকাছেও যাবে না। জামায়াতের সকল আলেমের নাকি তার জুতা বহনের যোগ্যতা ও নেই।
মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক সম্মানিত ব্যক্তি। তার ইলমী যোগ্যতা সর্বজন স্বীকৃত। আলেমরা সকলেই আমার কাছে সম্মানিত। আমরা শুনেছি, মাওলানা আব্দুল লতীফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ) বলেছিলেন: এক মন ইলমের সাথে নয় মন আকল লাগে। উনার ও উনার সমর্থকদের সেই আকল আছে কি না তা আমার জানা নেই। তাই কারো বিরুদ্ধে আমি কোনো বক্তব্য দেবো না। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তাদের বিবেচনার জন্যে আমি কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই। আমার প্রশ্নগুলো নিম্নরূপ:
১. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম সার্বজনীন মসজিদ। এখানকার মুসল্লীদের মাঝে অন্যদের সাথে জামায়াত ও আছে। বিশেষ কোনো মাসআলায় জামায়াতের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পুরো দলকে গোমরাহ বলে দেয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?
২. কওমীদের কাছে সুন্নীরা গোমরাহ। সুন্নীদের কাছে কওমীরা ওয়াহাবী, খারেজী। সালাফী বা আহলে হাদীসরা এ উভয় গ্ৰুপের কাছে গোমরাহ। সালাফী বা আসলে হাদীসদের কাছে কওমী ও সুন্নীরা বিদআতী।
এখন সমাধান কী? কামড়াকামড়ি না অন্য কিছু?
৩. যে পয়েন্টগুলোতে কওমী বা দেওবন্দীদের একাংশ জামায়াতকে গোমরাহ বলছেন এই পয়েন্টগুলোতে দেওবন্দী আকাবিরদের বক্তব্য কী? তা কি মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কম্পেয়ার করে দেখেছেন?
৪. মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক নি: সন্দেহে বড় আলেম। বড় আলেম হওয়ার কারণে তিনি বললেই যদি অন্য কেউ গোমরাহ হয়ে যায়, তাহলে যে সকল বড় আলেম জামায়াতের সাথে যুক্ত ছিলেন বা আছেন তাদের কী হবে?
৫. আল্লামা আমির উসমানী দেওবন্দী, মাওলানা মাসউদ আলম নদভী, আল্লামা ইউসুফ আল কারজাবী, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম, মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী, মুফতি মুহাম্মদ ইউসুফ দেওবন্দী, মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক বুলবুল দেওবন্দী, আল্লামা আব্দুর রব কাসেমী দেওবন্দী, আল্লামা আব্দুর রহীম চরিপাড়ী দেওবন্দী সহ যে অসংখ্য দেওবন্দী, নন দেওবন্দী আলেম--উলামা জামায়াতের পক্ষে বই লিখেছেন তাদের কথার কি কোনো মূল্য নেই? তারাও সবাই গোমরাহ?
৬. ইসলামে কাউকে গোমরাহ বা মুহতাদ বলার মূলনীতি কী? নিজের মতের সাথে না মিললেই কাউকে গোমরাহ বলে দিতে হবে?
৭. ঐতিহাসিক ঘটনার পর্যালোচনার উপর লেখালেখির কারণে যদি মাওলানা মওদূদীকে গোমরাহ ও সাহাবা বিদ্বেষী বলতে হয়, তাহলে একই কাজের জন্য দেওবন্দ ঘরানার আল্লামা জয়নুল আবেদীন মিরাঠী ও মুফতি মুহাম্মদ শফির ব্যাপারে আপনারা কী বলবেন? উনারা তাদের লিখিত বই যথাক্রমে তারিখে মিল্লাত ও শহীদে কারবালা বইয়ে মাওলানা মওদূদীর চেয়ে আরো শক্ত কথা বলেছেন।
৯. ইলমী ইখতিলাফকে আহলে ইলমের কাছে সীমাবদ্ধ রেখে ইলমী জবাব না দিয়ে তা আওয়ামুন্নাস বা সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করে দেয়া কতটুকু যৌক্তিক? ইলমী জবাবই তো উত্তম সমাধান।
১০. একটা দলের সকল আলেম- উলামাকে মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক বা অন্য কোনো আলেমের জুতা বহনের উপযুক্ত নন মর্মে মন্তব্য করা ভদ্রতা ও শালীনতার কোন সীমারেখায় পড়ে? উনার জুতার ওজন কত?
১১. ফ্যাসিষ্ট হাসিনার আমলে মজলুম হওয়ার কারণে বিভিন্ন দল-মতের আলেম--উলামারা পরষ্পরের কাছাকাছি এসেছিলেন। এখন সুদিন আসায় পরষ্পর কামড়াকামড়ি বেড়ে গেছে। তাহলে কি দারুল আমানের চেয়ে হাসিনা তথা ফ্যাসিস্ট রেজিমই অধিকতর উপযুক্ত?
১২. কওমী অঙ্গনের রাজনৈতিক নেতা শায়খুল হাদীস মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে অপরাপর কওমী আলেমরা যে ভাষায় কথা বলেন তা কি ভদ্রতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করছে না?
১৩. কোনো অসঙ্গতি বা ত্রুটির সংশোধনের জন্য মুফতি সাহেব কি ইখলাসের সাথে জামায়াত নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন?
১৪. আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদেরকে দ্বীনের পথে আনা, তাদেরকে নামাজী বানানো, কুরআন-হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য পড়তে উদ্ভুদ্ধ করা, নাগরিকদের মধ্যে ইসলামী চরিত্র সৃষ্টি, ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনমত গঠন, জাতীয় সংসদে ইসলাম বিরুধী আইন তৈরির অপচেষ্টার প্রতিবাদ সহ বিভিন্ন ইতিবাচক ও দ্বীনি কাজ সমূহের জন্য কি জামায়াত ধন্যবাদ পেতে পারে না? কেবল বিরোধীতাই করে যেতে হবে?
১৫. কমন জাতীয় ও ইসলামিক ইস্যুতে অতীতে কওমী দেওবন্দী আলেম-উলামারা কি জামায়াতের সাথে কাজ করেন নি? তাহলে এখন এত রিজার্ভেশন কেন?
১৬. কার নসীব ভালো, কার খারাপ তা উনি জানেন কী করে? এ সংক্রান্ত উনার বক্তব্য কি ঠিক হলো?
১৭. কওমীর সবাই জামায়াতে গেলেও জামায়াত গোমরাহ, তাহলে কওমীরা বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা সেক্যুলার দলে গেলে গোমরাহ হবে না কেন? আর সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে এই আলেমদের ফতোয়া কোথায়?
দেশে হাজারো সমস্যা। এখন অনৈক্য ও বিভেদের সময় নয়। আশা করি আলেম- উলামারা পরিস্থিতি অনুধাবন করে কাঁদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করবেন।
লেখক:
সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার
উপাধ্যক্ষ
শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা পাঠানটুলা সিলেট।
#আলেমদের_কাছে_জাতির_প্রত্যাশা
#ইসলামী_ঐক্য
#জাতীয়_মসজিদ_বায়তুল_মোকাররম
#আলেম_উলামা_ঐক্য
#কওমী_ও_জামায়াত
#মুফতি_আব্দুল_মালেক
#ঐক্যবদ্ধ_উম্মাহ
#অনৈক্য_নয়_ঐক্য
#ইলমি_ইখতিলাফ
#আখলাক_ও_শিষ্টাচার