25/05/2026
💥 নারীদের ঋতুস্রাবকালীন সময়ে কি তারা অপবিত্র হয়ে যায়? — বৈদিক ও শাস্ত্রীয় পর্যালোচনা 💥
ঋতুস্রাব (মাসিক ধর্ম) নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এটি কোনো রোগ নয়, কোনো অভিশাপ নয় এবং কোনো অশুচিতার চিহ্নও নয়। তবুও বিভিন্ন সমাজ ও ধর্মীয় প্রথায় দীর্ঘকাল ধরে ঋতুকালীন নারীদের নানা ধরনের বিধিনিষেধের মধ্যে রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উপাসনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে রাখা হয়েছে।
কিন্তু বৈদিক সনাতন ধর্মে নারীর মর্যাদা, পবিত্রতা ও অধিকার সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? নারীরা কি ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র হয়ে পড়েন? এই বিষয়ে বেদ, ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রের আলোকে একটি নিরপেক্ষ আলোচনা প্রয়োজন। বেদে নারী সর্বদা শুদ্ধ ও পূজনীয়া অথর্ববেদে বলা হয়েছে—
শুদ্ধাঃ পুতা যোষিতো যজ্ঞিয়া ইমা আপশ্চরুমব সর্পন্তু শুভ্রাঃ । অদুঃ প্রজাং বহুলান্পশুন্নঃ পক্তৌদনস্য সুকৃতামেতু লোকম্ ॥ [অথর্ববেদ ১১.১.১৭]
অনুবাদ— শুদ্ধ, পবিত্র ও পূজনীয় রমণীগণ ও তাঁদের পবিত্র কর্ম জলের ধারার মতো পবিত্র পাত্রে প্রবেশ করুক ও যজ্ঞের জন্য পবিত্র ভোগ্যবস্তু তৈরি হোক। তাহারা আমাদের উত্তম বংশধর ও প্রভূত ধনসম্পদ দান করুন। যারা অমৃতসত্তার জন্য উৎকৃষ্ট খাদ্য তৈরি করে, তারা যেন জীবনের সর্বোচ্চ অর্জনের শিখরে পৌঁছান।
এই মন্ত্রে নারীদের “শুদ্ধাঃ”, “পুতা” এবং “যজ্ঞিয়া”—অর্থাৎ শুদ্ধ, পবিত্র ও পূজনীয়া বলে অভিহিত করা হয়েছে। বেদে কোথাও নারীকে জন্মগতভাবে বা স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার কারণে অপবিত্র বলা হয়নি। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির বক্তব্য : নারী সর্বদা শুদ্ধ
Soma gave them purification; the Gandharva, sweet speech; Agni, perfect purity; therefore verily women are always pure. (Yajnavalkya Smriti 71)
অনুবাদঃ— নারীজাতি সোম থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত, গন্ধর্বদের থেকে সুমিষ্ট বাক্য প্রাপ্ত, অগ্নির কাছ থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত; তাই নারীরা সর্বদা শুদ্ধ। (যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি ৭১)
এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে নারী সর্বদা শুদ্ধ। অর্থাৎ তাদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় অবস্থার কারণে স্থায়ী বা প্রকৃত অশুদ্ধতা আরোপ করা শাস্ত্রসম্মত নয়। বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে নারীর পবিত্রতা
বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে নারীদের সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বক্তব্য পাওয়া যায়।
Women (possess) an unequalled means of purification; they never become (entirely) foul. For month by month their temporary uncleanness removes their sins.
(Vashistha Dharmasutra 28.4)
অনুবাদঃ— নারীদের একটা অন্য ধরনের পবিত্রতা আছে। তারা কখনোই পুরোপুরি অপবিত্র হন না। মাসে মাসে কিছুদিনের অস্থায়ী অশৌচাবস্থা তাদের মনের পাপ ধুয়েমুছে দেয়। (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ২৮.৪)
আবার বলা হয়েছে—
Women belong first to three gods, Soma (the moon), the Gandharva, and Fire, and come afterwards into the possession of men; according to the law they cannot be contaminated.
(Vashistha Dharmasutra 28.5)
অনুবাদঃ— নারীরা তিন ধরনের দেবসত্তার অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে সোম (চন্দ্রের ন্যায় মাধুর্যময় ঈশ্বরের রূপ), গন্ধর্ব ও অগ্নি। এরপরে তারা পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী। তাই আইন শাস্ত্রমতে তারা কখনোই অশুদ্ধ হতে পারে না। (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ২৮.৫)
পুনরায় বলা হয়েছে—
Soma gave them cleanliness, the Gandharva their melodious voice, and Fire purity of all (limbs); therefore women are free from stains.
(Vashistha Dharmasutra 28.6)
অনুবাদঃ— নারীজাতি সোম থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত, গন্ধর্বদের থেকে সুমিষ্ট বাক্য প্রাপ্ত, অগ্নির কাছ থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত (সর্বাঙ্গে)। তাই নারীরা সবসময় কলুষতা থেকে মুক্ত। (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ২৮.৬)
আরও বলা হয়েছে—
Pure is the mouth of a goat and of a horse, pure is the back of a cow, pure are the feet of a Brâhmana, but women are pure in all (limbs).
(Vashistha Dharmasutra 28.9)
অর্থঃ— ছাগলের এবং ঘোড়ার মুখ শুদ্ধ, গরুর পিঠ শুদ্ধ, ব্রাহ্মণের পা শুদ্ধ, কিন্তু মহিলাদের সব অঙ্গই বিশুদ্ধ হয়।
অনুবাদঃ— ছাগ ও অশ্বের মুখাবয়ব শুদ্ধ, গো জাতির পৃষ্ঠদেশ শুদ্ধ, ব্রাহ্মণের পাদদেশ শুদ্ধ, কিন্তু নারী জাতির সবই শুদ্ধ (সকল অঙ্গ)। (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ২৮.৯)
এই শাস্ত্রবচনগুলো থেকে স্পষ্ট যে নারীদের শারীরিক বা ধর্মীয়ভাবে স্থায়ী অশুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা বৈদিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনেক সময় ঋতুকালীন কিছু বিধিনিষেধকে ভুলভাবে নারীর অপবিত্রতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ শাস্ত্রে মূলত নারীর শারীরিক সুরক্ষা ও বিশ্রামের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ঋতুকালে যৌনমিলন নিষিদ্ধ, মনুসংহিতায় বলা হয়েছে—
সমানশয়নে চৈব ন শ্যীত তয়া সহ।
রজসাভিপ্লু তেজো বলঃ চক্ষুরায়ুশ্চৈব প্রহীয়তে।।
(মনুসংহিতা ৪।৪০)
অনুবাদঃ— কামে একান্ত উন্মত্ত হইলেও রাজোদর্শনে নিষিদ্ধ দিনত্রয়ে স্ত্রীগমন করিবে না, এবং তাহার সহিত সহবাস করিবে না।
এখানে নারীর অপবিত্রতার কথা বলা হয়নি; বরং ঋতুকালে যৌনমিলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
🌸 বেদ অধ্যয়ন কি ঋতুকালে নিষিদ্ধ?
কিছু ব্যক্তি দাবি করেন যে ঋতুস্রাবকালীন সময়ে নারীদের বেদপাঠ, স্বাধ্যায় বা উপাসনা করা নিষিদ্ধ। কিন্তু বেদ নিজেই জ্ঞান ও পবিত্রতার উৎস হিসেবে বেদাধ্যয়নের মাহাত্ম্য ঘোষণা করেছে।
পাবমানীয়ো অধ্যেত্যূষিভিঃ সম্ভূতং রসম্।
তস্মৈ সরস্বতী দুহে ক্ষীরং সর্পিঃ মধূদকম্ ॥
[ঋগ্বেদ ৯/৬৭/৩২]
অর্থ— বেদবিদ্যা অধ্যয়নকারীকে পবিত্র করে, তাঁর মধ্যে সত্য বিদ্যার সার পরিপূর্ণ থাকে, সেই বেদবিদ্যা অধ্যয়নকারীর জন্য দুধ, ঘী, মধু এবং জল বর্ষণকারী অর্থাৎ আত্মসন্তুষ্টি, বল, মধুরতা এবং শান্তি প্রদান করে।
যদি বেদপাঠ মানুষকে পবিত্র করে, তাহলে কেবল ঋতুস্রাবের কারণে কোনো নারীকে বেদপাঠ বা ঈশ্বরচিন্তা থেকে বিরত রাখার যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বরং উপাসনা ও স্বাধ্যায় আত্মশুদ্ধিরই উপায়।
🌸 সনাতন ধর্মে নারী কেবল পরিবারের সদস্য নন; তিনি জননী, শিক্ষিকা, অর্ধাঙ্গিনী এবং দেবীরূপে পূজিতা। তাই স্মৃতিশাস্ত্রে বলা হয়েছে—
“যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ”
(মনুসংহিতা ৩.৫৬)
অর্থঃ— যেখানে নারীগণ পূজিত হন, সেখানে দেবতাগণ আনন্দের সঙ্গে অবস্থান করেন।
বেদ, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি এবং বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রের আলোচনায় দেখা যায় যে নারীকে স্বভাবতই শুদ্ধ, পবিত্র ও সম্মাননীয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋতুস্রাব একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া; এটি কোনো পাপ, অভিশাপ বা স্থায়ী অশুদ্ধতার কারণ নয়। ঋতুকালে কোনো নারীর শারীরিক দুর্বলতা, ব্যথা, জ্বর বা অস্বস্তি থাকলে তিনি বিশ্রাম নেবেন—এটাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তিনি যদি সুস্থ বোধ করেন, তবে ঈশ্বরচিন্তা, প্রার্থনা, স্বাধ্যায়, যজ্ঞ বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে তাকে স্বভাবত অপবিত্র গণ্য করার ভিত্তি নেই।
অতএব, ঋতুস্রাবকে অপবিত্রতার প্রতীক না দেখে নারীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় অবস্থা হিসেবে দেখা উচিত। সনাতন ধর্মের মূল চেতনা নারীকে অবমাননা নয়, বরং সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনই প্রকৃত ধর্মাচরণের লক্ষণ।
“যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ” — যেখানে নারী সম্মানিত, সেখানেই দেবত্বের আবির্ভাব ঘটে।
ও৩ম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।