13/08/2026
কালের বিবর্তনে জগতের মধ্যে বহু জ্ঞানী গুণী, মহা মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে যাদের পুণ্য পরশে সমগ্র বৌদ্ধ জাতি অতীতে উপকৃত হয়েছেন,বর্তমানে উপকৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও উপকৃত হবেন। বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে যে কয়জন মহা মনীষী ধ্যানসাধনার মাধ্যমে সদ্ধর্ম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তাদের মধ্যে পরম পূজনীয় ধূতাঙ্গ সাধক ভদন্ত শরণঙ্কর থের মহোদয় অন্যতম। হাটহাজারী থানার অন্তর্গত ভারত বাংলা উপমহাদেশের সাগরকুন্তলা কর্ণফুলীর শাখা হালদার উপকণ্ঠে সমৃদ্ধ বৌদ্ধ জনপদ মধ্যম মাদার্শা গ্রাম। বহু সংঘপুরুষের জন্ম তীর্থ এই গ্রামে ১৯ ৮৪ সালের ১৬ আগস্ট চারিদিক আলোকিত করে মাতা শ্রীমতি ডেজি বড়ুয়া ও পিতা দিলীপ বড়ুয়ার ঔরসে পূণ্যলক্ষণ পরিশোভিত এক নবশিশু জন্মগ্রহণ করেন। শিশুর আগমনে মাতা পিতা মহানন্দে শিশুর নামকরণ করেন রনি বড়ুয়া। জন্মের কিছুদিন পর তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন, আরোগ্য লাভের মানসে মামার বাড়ির দাদু তখন মানত করেন নাতির ২০ বছর পূর্ণ হলে চিংম্রং বৌদ্ধবিহারে ভিক্ষু করাবেন। অতঃপর জন্ম জন্মান্তরের অপরিহার্য ঊর্ধ্বমুখী শোভন সংস্কারের প্রবল আকর্ষণে উপযুক্ত বয়সে পদার্পণ করার পর ২০০৪ সালের ২৪ শে অক্টোবর পূজনীয় শ্রীমৎ জ্ঞানবংশ থের মহোদয়ের উপাধ্যায়ত্বে ভিক্ষু শরণংকরে পরিণত হন। ভিক্ষু হওয়ার পর তিনি আগারিক - অনাগারিক ধূতাঙ্গ শীল পালন করার জন্য প্রথমে বেছে নিয়েছিলেন হরিহর সম্মিলিত শ্মশানবিহার। উক্ত বিহারে তিন বছর অবস্থান করে ২০০৮ সালের ১লা জানুয়ারি পশ্চিম আধারমানিক সুখানন্দ বিহারে গমন করেন। বিহার ভিত্তিক ভিক্ষু জীবনেও তিনি গোপনে কিছু কিছু ধূতাঙ্গ শীল পরীক্ষামূলকভাবে পালন করেন। পারমী সম্ভার পরিপূরণের লক্ষ্যে বুদ্ধ প্রশংসিত সর্বোৎকৃষ্ট শীল ধূতাঙ্গ শীল পালনের জন্য উক্ত বিহারের ৩ বছর অতিবাহিত হবার পর জ্ঞানস্মরণ পশ্চিম আধারমানিক উত্তর গুজরা শ্মশান ভূমিতে অবস্থান করেন। সেখানে বাৎসরিকাল অবস্থানের পর আরো 16 টি শ্মশানে অবস্থান করেন। এভাবেই শ্মশানে শ্মশানে অবস্থান করে তিনি আরন্যক জীবনের আস্বাদ উপলব্ধির জন্য ২০১২ সালের ২০ শে জুলাই পদুয়া শ্মশান ভূমি ত্যাগ করে জ্ঞানস্মরণ মহারন্যভূমিতে পদার্পণ করেন যা দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া পদুয়া ইউনিয়নের ফলা হারিয়া গ্রামের দক্ষিণ বনাঞ্চলে অবস্থিত নির্জন জনকোলাহলের বাইরে, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক অরণ্যময় প্রদেশ যা বনহস্তি সহ বিবিধ প্রাণীকুলের বিচরণ ক্ষেত্র। পূজনীয় ধূতাঙ্গ সাধক ভদন্ত শরনংকর মহোদয়, তার সন্যাস জীবনজুড়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে নিবেদিত রয়েছেন। ১৭ ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ সাল থেকে ৩ আগস্ট ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পথ হেটে বাংলাদেশ ও ভারতে অসংখ্য ধর্ম দেশনা প্রোগ্রামে অংশ নেন। তার শিক্ষাগুলি শান্তি, করুণা এবং সমঝোতার উপর জোর দেয়, যা বহু অনুসারীদের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। শান্তির বার্তা প্রচার সত্ত্বেও ভদন্ত শরনংকর থের মহোদয় কে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে, তিনি একাধিক হত্যাচেষ্টায় বেঁচে গেছেন,যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল জুলাই ২০২০ এ যখন স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তাকে আক্রমণ করে। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যেখানে প্রবাসী বৌদ্ধরা আছেন তারা সকলেই এই ঘটনায় বিক্ষোভ প্রকাশকরে।
প্রথমবারের মতো পূজনীয় ভান্তে ঢাকা মহানগরে সদ্ধর্ম দেশনা ও ধর্ম প্রচারের জন্য ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ রোজ বুধবার জ্ঞানশরন মহারণ্য রাঙ্গুনিয়া হতে পদব্রজে রওনা হন। যাত্রাপথে হোয়ারা পাড়া, চট্টগ্রাম বৌদ্ধবিহার, বারবকুণ্ড, নিজামপুর, মিরসরাই, ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমী, শালবন বিহার কুমিল্লা, সনাতনী মহাশ্মশান দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার, মেরুল বাড্ডা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহার, কালাচাঁদপুর বৌদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করে শতাধিক ভক্ত সেবক বৃন্দ সহকারে উত্তরা বাংলাদেশ বৌদ্ধ মহাবিহার ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮। এই পূর্ণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বাংলাদেশ দূতাবাস হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাসিয় এস বি বার্নিকেট ও থাইল্যান্ডের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত সোওয়ান্নাপোনাস উভয়ে পূজনীয় ভান্তেকে শ্রদ্ধা জানান ও ধর্মসভায় উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন বুড্ডিস্ট ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট এর প্রার্থনায় পূজনীয় ধূতাঙ্গ ভান্তে ৬ জানুয়ারি রওনা হন এবং বিভিন্ন গ্রামে পিন্ডচরণ ও দেশনা প্রদান করেন ১২ই জানুয়ারি রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড ময়দানে পৌঁছান। ১৩ই জানুয়ারি ২০১৭ সালে বিডিটি কর্তৃক আয়োজনে এবং পূজনীয় ভারতের সকল সেবক বৃন্দের সহযোগিতায় ১ম বারের মতো চট্টগ্রাম মহানগরী ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড ময়দানে আনুমানিক অর্ধ লক্ষ ধর্মপ্রাণ উপাসক উপাসিকার উপস্থিতিতে পূজনীয় ধূতাঙ্গ ভান্তের একক সদ্ধর্মদেশনা ও ১৩ তম ধূতাঙ্গ বর্ষপূরণ অনুষ্টান স্মরণাতীতকালের উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ জন সমাগমের উপস্থিতিতে ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় ভাব গম্ভীর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সুসম্পন্ন হয়। পূজনীয় ভান্তের এই অনুষ্ঠানটি বাঙালি বৌদ্ধ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পূজনীয় ধূতাঙ্গ ভান্তে উক্ত অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে জ্ঞানস্মরণ মহারন্য হতে রওনা হয়ে রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, চট্টগ্রাম মহানগর, চাঁদগাও বড়ুয়াপাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া উপজেলার ৩০ টির ও অধিক বৌদ্ধ গ্রামে অবস্থান ও সদ্ধর্মপ্রচার করেন । 10ই ফেব্রুয়ারি জ্ঞানশরণ মহারণ্যে পদব্রজে প্রত্যাবর্তন করেন।
এছাড়া পূজনীয় ভান্তে ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৮ টি শ্মশানে ধ্যান করেন এবং দুইটি মহারন্যে ধ্যান অনুশীলনে ৯ বছর কঠোর ধ্যান করেছেন গভীর বনে।তিনি বাংলাদেশ ভারত শ্রীলংকা এই তিনটি দেশে পদব্রজে ১৩ হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটে প্রায় এক হাজারেরও অধিক গ্রামে ধর্ম প্রচার করেছেন . তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া জ্ঞানোস্মরণ মহারণ্য বৌদ্ধবিহার থেকে ২০১৯ সালে ভারতে বুদ্ধগয়া পদব্রজে তীর্থ গমন করেন,প্রায় ৬হাজার কিলোমিটার অতিবাহিত করেন।এবং ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ১০০০ কিলোমিটার পদব্রজে শ্রীপাদ,দন্ত ধাতু ও শ্রী মহাবৌধি পূজা করেন । ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা বুদ্ধশারাণা মেডিটেশন সেন্টার, ২০২৩ সালে বুদ্ধ শারানা মেডিটেশন সেন্টার, ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া বুদ্ধ শারাণা মেডিটেশন সেন্টার, ২০২৫ সালে মায়ানমার বুদ্ধ শারাণা মেডিটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।এছাড়া বাংলাদেশের ১৩ টি মেডিটেশন কুটির প্রতিষ্ঠা করেন, ১টি মহারণ্য বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি অনাথ আশ্রম রয়েছে। বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশ শ্রীলংকা, মায়ানমার, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড - বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিষ্যরা বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে বিদ্যাশিক্ষা উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের অধ্যয়ন করছেন। পূজনীয় ভান্তের ধর্ম দেশনা অত্যন্ত সুমধুর ও তথ্যপূর্ণ৷ তাঁর দেশনা শুনতে হাজার লক্ষ মানুষের সমাগম হয় প্রতিবছরে ।
এই মহান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মঙ্গল শত আয়ু কামনা করছি, আরো অনেক বুদ্ধের শাসন শ্রী বৃদ্ধির জন্য ও সমাজ সেবামূলক কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করুন, বুদ্ধের কাছে এই প্রার্থনা। শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধেয় ভান্তে।