04/26/2026
পবিত্র ত্রিত্ব ঈশ্বরের মতবাদ: বুঝা কঠিন কিন্তু সত্য
— আমোষ দেউরী
ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম খ্রীষ্ট ধর্মতত্ত্ববিদ J.I. Packer পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ত্রিত্ব ঈশ্বর সম্পর্কে — "it is not easy; but true" (সহজ বিষয় নয়; কিন্তু সত্য)। প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর তাঁর মণ্ডলীকে অনেক বড় আশীর্বাদ দিয়েছেন এই শিক্ষা প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
ত্রিত্ব ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত মণ্ডলী কী শিক্ষা দেয়?
ঈশ্বর এক — এক ঈশ্বরের তিন ব্যক্তি; প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পূর্ণ ঈশ্বর; তারা হলেন পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা।
(সূত্র: Mark Driscoll & Gerry Breshears, "Doctrine: What Christians Should Believe", page 30)
ত্রিত্ব ঈশ্বর
ত্রিত্ব শব্দ বাইবেলে না থাকলেও পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা — এই মিলে এক সত্তা (one substance) — এক ঈশ্বর। কিন্তু তিনজন ব্যক্তি। যীশু তাঁর মহান আদেশে বলেছেন: "অতএব শিষ্য কর, পিতা ও পুত্র এবং পবিত্র আত্মার নামে তাহাদিগকে বাপ্তাইজ কর" — যা ত্রিত্ব ঈশ্বরকে প্রকাশ করে। যীশুর বাপ্তিস্ম গ্রহণের সময় পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার উপস্থিতি ছিল (মথি ৩:১৬-১৭)।
ত্রিত্ব শব্দ আমরা কীভাবে পেয়েছি?
'ত্রিত্ব' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন আন্তিয়খিয়ার থিওফিলাস (Theophilus of Antioch) — ১৮০ খ্রিস্টাব্দে। (Dictionary of the Christian Church, 1641)
কেন এই শব্দের প্রয়োজন ছিল?
পবিত্র বাইবেলে ঈশ্বরকে যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে তা প্রকাশ করার জন্য একটি ধর্মতাত্ত্বিক শব্দের প্রয়োজন দেখা যায়। F.C. Baur বলেন: "বাইবেলের পিতা, পুত্র (Logos) ও আত্মা সংক্রান্ত ভাষা থেকে ত্রিত্ববাদ মতবাদ বিকশিত হয়েছে, কারণ চার্চের বিস্তারই প্রতিফলন, স্বীকারোক্তি ও সংলাপের প্রয়োজন তৈরি করেছিল।" (Dictionary of the Christian Church, 1641)
ধর্মতত্ত্ববিদ Loraine Boettner বলেন: "'Trinity' শব্দ বাইবেলে পাওয়া যায় না; তবে এটি যে ধারণা প্রকাশ করে তা শাস্ত্রসম্মত। আমরা অন্য কোনো শব্দ জানি না যা এই ধারণা এত ভালোভাবে প্রকাশ করে। আমরা যখন বলি ঈশ্বরের মধ্যে তিনটি আলাদা ব্যক্তি আছে, তখন এর মানে এই নয় যে প্রত্যেকে অন্যের থেকে আলাদা, যেমন এক মানুষ অন্য মানুষ থেকে ভিন্ন।" (Studies in Theology, pg. 109)
ত্রিত্ব শব্দ বাইবেলে না থাকলেও ত্রিত্ববাদ ধারণা নতুন কিছু নয়। পুরাতন নিয়মেই ঈশ্বর নিজেকে বহুবচনে প্রকাশ করেছেন (আদি ১:২৬; আদি ১১:৭)। সাধু পৌল তাঁর আশীর্বচনে ত্রিত্ব ঈশ্বরের কথা বলেছেন (২ করি ১৩:১৪)। সেই জন্য ত্রিত্ব ঈশ্বর প্রেরিত পৌলের সৃষ্টি নয় — সৃষ্টির শুরু থেকেই ত্রিত্ব ঈশ্বরের উপস্থিতি আছে। বাইবেলের প্রথম অধ্যায়ে পিতা, তাঁর পুত্র যীশু (অনন্তকালীন বাক্য) ও পবিত্র আত্মার উপস্থিতি রয়েছে (আদি ১:১-২)। (The MacArthur Study Bible, pg. 16)
ত্রিত্ব ঈশ্বর সম্পর্কে যেসব ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে (Heresies)
১. মডালিজম (Modalism)
এই শিক্ষা অনুসারে পিতাই পুত্র হয়েছেন, পুত্রই পবিত্র আত্মা হয়েছেন। মূলকথা, তারা মনে করে শুধু রূপের (mode) পরিবর্তন হয় — ত্রিত্ব ঈশ্বরের তিন ব্যক্তির আলাদা অস্তিত্ব স্বীকার করে না। এ দলের মধ্যে The United Pentecostal Church অন্যতম।
২. এরিয়ানিজম (Arianism)
যারা যীশুর ঈশ্বরত্বে বিশ্বাস করে না। যীশুকে তারা ঈশ্বরের সর্বোচ্চ সৃষ্টি হিসেবে বিশ্বাস করে। পবিত্র আত্মাকে ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে মণ্ডলী কর্তৃক ভ্রান্ত দল হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের শিক্ষা আজও Jehovah's Witnesses ও Christadelphians-সহ অনেক দলে বিদ্যমান।
৩. ত্রিঈশ্বরবাদ (Tritheism)
তারা মনে করে না যে এক ঈশ্বরের তিন ব্যক্তি আছে। তারা মনে করে তিন আলাদা ঈশ্বরে তিন সত্তা বিদ্যমান। Mormonism এই ভ্রান্ত মতের সাথে সম্পর্কিত। (সূত্র: Mark Driscoll & Gerry Breshears, "Doctrine", page 31-32)
সাধু পৌল কীভাবে ত্রিত্ব ঈশ্বরকে দেখেছেন?
পিতা ঈশ্বর:
"তবুও আমাদের জন্য ঈশ্বর মাত্র একজনই আছেন। তিনিই পিতা; তাঁরই কাছ থেকে সব কিছু এসেছে আর তাঁরই জন্য আমরা বেঁচে আছি। আর প্রভুও আমাদের মাত্র একজন, তিনি যীশু খ্রীষ্ট।" (১ করি ৮:৬) — আরও পড়ুন: গালা ১:১; ফিলিপীয় ২:১১।
পুত্র ঈশ্বর:
"পিতৃপুরুষেরা তাহাদের, এবং মাংস অনুসারে তাহাদেরই মধ্য হইতে খ্রীষ্ট উৎপন্ন হইয়াছেন, যিনি সর্বোপরিস্থ ঈশ্বর, যুগে যুগে ধন্য, আমেন।" (রোমীয় ৯:৫) — ঈশ্বরের মতো খ্রীষ্টেরও কোনো পাপ নেই (২ করি ৫:২১)। আরও পড়ুন: কলসীয় ২:৯; তীত ২:১৩।
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর:
ঈশ্বরের আশীর্বচনে (২ করি ১৩:১৪) পিতা ও পুত্রের মাঝখানে পবিত্র আত্মাকে সমমর্যাদায় বসানো হয়েছে। তুলনীয়: ১ করি ১২:২২; ৫:৫। (The MacArthur Study Bible, pg. 1785)
যীশু কীভাবে ত্রিত্ব ঈশ্বরকে উপস্থাপন করেছেন?
পিতা ঈশ্বর:
"যীশু তাঁহাকে কহিলেন, আমাকে স্পর্শ করিও না, কেননা এখনও আমি ঊর্ধ্বে পিতার নিকটে যাই নাই... তাঁহার নিকটে আমি ঊর্ধ্বে যাইতেছি।" (যোহন ২০:১৭; যোহন ৪:২৩)
পুত্র ঈশ্বর হিসেবে যীশু নিজে:
প্রেরিত থোমা বলেছিলেন, "প্রভু আমার, ঈশ্বর আমার!" (যোহন ২০:২৮) — যীশু তা অস্বীকার করেননি। পিতা ও পুত্র সমান (যোহন ১০:৩০)। বিশ্রামবারের কর্তা (যোহন ৫:১৮)। পাপ ক্ষমা করেন ঈশ্বরের মতো (মার্ক ২:৫)। অনন্তকালীন বাক্য হিসেবে ঈশ্বর (যোহন ১:১)। তিনি পুনরুত্থান ও জীবন (যোহন ১১:২৫)। একমাত্র পথ, সত্য ও জীবন (যোহন ১৪:৬)। সব সময় অপরিবর্তনীয় (মথি ২৮:২০)। সর্বজ্ঞ (যোহন ২:২৫)। পিতা ঈশ্বরের সাথে একই সম্মান (যোহন ৫:২৩)।
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর:
পিতা ও পুত্রের সাথে সমকক্ষ (মথি ২৮:১৯; ২ করি ১৩:১৪; ১ করি ১২:৬,১১)। প্রজ্ঞার উৎস (যোহন ১৬:১৩; ১৪:২৬)। যীশু সম্পর্কে সাক্ষ্য দেন (যোহন ১৫:২৬)। বাপ্তিস্মসূত্র (মথি ২৮:১৯)। শিক্ষাদাতা (লূক ১২:১২)। তাঁর বিরুদ্ধে পাপের ক্ষমা নেই (মথি ১২:৩১-৩২)। তাঁর শক্তিতে যীশুর কুমারীগর্ভে জন্ম (লূক ১:৩৫)। যীশুর বাপ্তিস্মে উপস্থিত ছিলেন (মথি ৩:১৬)। নতুন জন্মদান করেন (যোহন ৩:৫)।
প্রভু যীশুর শিক্ষার সাথে প্রেরিত পৌলের শিক্ষার কোনো বৈসাদৃশ্য আছে কি?
একেশ্বরবাদ: প্রভু যীশু শিক্ষা দিয়েছিলেন ঈশ্বর এক (মার্ক ১২:২৯)। সাধু পৌলও শিক্ষা দিয়েছেন ঈশ্বর এক (গালা ৩:২০)। তিনি এই শিক্ষার সাথে কখনও আপোষ করেননি। তিনি সমস্ত পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন (গালা ৪:৮; ১ করি ৮:৪-৬)। পবিত্র বাইবেলে আদিপুস্তক থেকে প্রকাশিত বাক্য পর্যন্ত — "ঈশ্বর এক।"
কেন আমাদের ত্রিত্ব ঈশ্বর সম্পর্কে অধ্যয়ন করা উচিত?
• এটি সত্যের মহা আশীর্বাদ।
• বিশ্বাসীদের তাদের প্রাপ্ত পরিত্রাণের জন্য আরও ঈশ্বরের প্রশংসা করতে সাহায্য করে।
আমাদের পরিত্রাণ সম্পন্ন হয়েছে ত্রিত্ব ঈশ্বরের কাজ ও মহিমায়:
প্রেমময় পিতা ঈশ্বর সম্পর্কে প্রেরিত পৌল বলেছেন:
"আর শান্তির ঈশ্বর আপনি তোমাদিগকে সর্বতোভাবে পবিত্র করুন; এবং তোমাদের অবিকল আত্মা, প্রাণ ও দেহ আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের আগমনকালে অনিন্দনীয়রূপে রক্ষিত হউক।" (১ থিষল ৫:২৩)
পুত্র ঈশ্বর তাঁর মণ্ডলীকে ভালোবেসে জীবন দিলেন:
"খ্রীষ্টও মণ্ডলীকে প্রেম করিলেন, আর তাহার নিমিত্ত আপনাকে প্রদান করিলেন; যেন তিনি জলস্নান দ্বারা বাক্যে তাহাকে শুচি করিয়া পবিত্র করেন, যেন আপনি আপনার কাছে মণ্ডলীকে প্রতাপান্বিত অবস্থায় উপস্থিত করেন, যেন তাহার কলঙ্ক বা সঙ্কোচ বা এই প্রকার আর কোন কিছু না থাকে, বরং সে যেন পবিত্র ও অনিন্দনীয় হয়।" (ইফিষীয় ৫:২৫-২৭)
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর যিনি আমাদের পবিত্র করেন:
"আমাদের ঈশ্বরের আত্মায় আপনাদিগকে ধৌত করিয়াছ, পবিত্রীকৃত হইয়াছ, ধার্মিক গণিত হইয়াছ।" (১ করি ৬:১১)
উপসংহার
আমরা যত পিতা ঈশ্বরপ্রদত্ত পরিত্রাণের মহত্ত্ব গভীরভাবে জানতে পারব, প্রভু যীশুর বলিদান সম্পর্কে বুঝতে পারব এবং পবিত্র আত্মার মুদ্রাঙ্ক সম্পর্কে অবহিত হব, তত বেশি আমরা ত্রিত্ব ঈশ্বরের ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ধন্যবাদ দিতে পারব।
আমেন।।
গ্রন্থপঞ্জি (Bibliography)
Boettner, Loraine. Studies in Theology. The Presbyterian and Reformed Publishing Company: Pennsylvania, 1970.
Berkhof, Louis. A Summary of Christian Doctrine. The Banner of Truth: London, 1960.
Driscoll, Mark & Breshears, Gerry. Doctrine: What Christians Should Believe. Crossway: Wheaton, 2010.
Stott, John R.W. The Message of Galatians. IVP: Leicester, 1968.
Tenney, Merril C. New Testament Survey. Bengali Translation by Michael Susmay Das. CDC Publication: Dhaka, 1978.
MacArthur, John (Author & Ed.). The MacArthur Study Bible. Thomas Nelson: Nashville, 1979.
Elwell, Walter A. (Ed.). Evangelical Dictionary of Theology. Baker Book House: Michigan, 1984.