11/22/2023
শীঘ্রই কর্তব্য কর্ম করুন, কাল পর্যন্ত বাঁচার নিশ্চয়তা কোথায়!
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
আমাদের কর্তব্য কর্ম সমূহ বিলম্ব না করে যথাসম্ভব শীঘ্রই করা ভাল। অনেকে কাল করব বা পরে করব বলে অবহেলা করে থাকে। কে জানে কাল সকালেই যে আমার মৃত্যু হবেনা!
জীবনের এখন অনেক শরৎকাল দেখেছি। না জানি, জীবনের বাকী আর কত দিন রয়েছে। যে কয়দিন বাঁচব, তার সদ্ব্যবহার কিভাবে হবে? এভাবেই সজাগ থাকতে হবে। এ সুযোগে ভগবানের কিছু কল্যাণ বাণী মানস পটে জাগ্রত হচ্ছে।
প্রসঙ্গ শ্রাবস্তীর অনাথ পিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর জীবন কালের। রাত্রিকালীন সময়। জেতবনারামে কিছু দেবপুত্র ভগবানের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। তাঁরা ভগবানের চরণ বন্দনা করে এক পাশে দাঁড়িয়ে চার পংক্তিতে নিজেদের বিচার প্রকট করেছেন। তাঁরা বলেছিলেন-
‘অচ্চেন্তি কালা, তরযন্তি রত্তিযো,
বযোগুণা অনুপুব্বং জহন্তি॥
এতং ভযং মরণং পেক্খমানো।
পুঞ্ঞানি কযিরাথ সুখাবহানি॥’
অর্থাৎ সময় নিরন্তর প্রবাহিত হচ্ছে। রাতের পর রাত অতিক্রম হচ্ছে। ক্রমশঃ বয়স ক্ষীণ হয়ে আসছে। আসন্ন মৃত্যুর ভয়কে দর্শন করে সুখদায়ক ফল সম্পন্ন পুণ্য কর্ম সম্পাদন করতে অগ্রসর হওয়া কর্তব্য।’
তাঁরা সঠিক কথাই বলেছেন। সত্যিকারভাবে সকাল হচ্ছে, এরপর সন্ধ্যা আসে। এভাবে চলে যাচ্ছে আমাদের বয়স। এ সময়ের মধ্যে আমাদের অমূল্য মানব জীবন যাতে ব্যর্থ না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আসন্ন মৃত্যুর ভয় হতেই সঠিক পুণ্য কর্মে রত থাকলে অবশ্যই সুখদায়ক ফল লাভ করা সম্ভব হবে। পাপ কর্ম সম্পাদন করলে পরিণামে দুঃখদায়ক ফল ভোগ করতে হবে। পুণ্য কর্ম সম্পাদন করলে সুফল অবশ্যই লাভ হবে। ইহা হল প্রকৃতির অটুট নিয়ম।
সুতরাং, পাপ কর্মের চেয়ে পুণ্য কর্ম বেশী করে সম্পাদন করা উচিত। অকুশলের চেয়ে কুশল সম্পাদন অধিকতর সমীচীন। দুঃখ হতে বাঁচার জন্য এবং সুখের নাগাল পাওয়ার জন্য কুশল কর্ম সম্পাদন প্রয়োজন। কিন্তু সর্বদা পরিবর্তন হতে থাকা সুখ-দুঃখ, দুঃখ-সুখের লোকচক্রে আমরা কত কাল হতে ঘুর্ণিপাক খেতে খেতে আসছি, তা জানা নাই এবং এরূপ সাংসারিক সুখ-দুঃখের ভব হতে ভবান্তরে ভ্রমণ সামনে আরও কত কাল চলবে তাও আমাদের অজানা। ভগবান মহাকারুণিক বুদ্ধ এরূপ ভব সংসরণ হতে সর্বথা বিমুক্ত হওয়ার জন্য সহজ-সরল মার্গ অনুসন্ধান করে দিয়েছেন। বিমুক্তি মার্গকে সবার জন্য সহজভাবে বানিয়ে দিয়েছেন।
ভগবান তথাগত কর্তৃক লোকদেরকে বিমুক্তিদায়িনী বিদর্শন বিদ্যা শিখানো হয়েছে, যা অনুশীলনের দ্বারা ভব মুক্ত হয়ে এরূপ অনিত্যধম্মা লৌকিক সুখ হতে অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ নিত্য, শাশ্বত, ‘নিব্বাণং পরমং সুখং’ অর্থাৎ নির্বাণ পরম সুখ লাভ করতে পারে, পরম শান্তি উপলব্দ করা সম্ভব হয়। কিন্তু তা তখনই সম্ভব হবে, যখন লৌকিক সুখের পেছনে অবিরাম ছুটে চলার অভ্যাসে লাগাম টানা যাবে। ভগবান বুদ্ধ নির্দেশিত বিদর্শন ভাবনা সে কাজই করে থাকে। অন্তর্মণের গভীরে রাগ-দ্বেষের সংস্কার সমূহের প্রজনন হতে থাকার স্বভাবকে রোধ করে থাকে বিদর্শন ভাবনা।
বিদর্শন ভাবনা সুখের প্রতি রাগ (আসক্তি) এবং দুঃখের প্রতি দ্বেষের সংস্কারের উৎখনন করে থাকে। অন্ধ প্রতিক্রিয়ার দীর্ঘকালীন স্বভাবের উন্মুলন করে থাকে। যতদিন পর্যন্ত লৌকিক সুখের প্রতি রাগ থাকবে, ততদিন পর্যন্ত লৌকিয় দুঃখের প্রতি দ্বেষও জাগতেই থাকবে এবং এ উভয়ের কারণে লোকচক্র নিরন্তর চলতেই থাকে। লোকচক্র ভগ্ন হলে, তবেই লোকাতীত, ভবাতীত, ইন্দ্রিয়াতীত পরম শান্তির উপলব্দি আসবে। সে কারণে, সে হ্তু প্রত্যয়ে ভগবান মহাকারুণিক বুদ্ধ কল্যাণকারী বিদর্শন বিদ্যা শিখিয়েছেন।
সেদিকে আরও ইঙ্গিত করতে গিয়ে ভগবান বুদ্ধ চার পংক্তির উপরোক্ত গাথা শুনে ইহার চতুর্থ চরণকে পরিবর্তন করে বলেছেন-
‘লোকমিসং পজহে সন্তিপেক্খো।’
অর্থাৎ পরম শান্তিকামী লোকদের উচিত যে, লোকীয় সুখের আকাঙ্খা অবশ্যই ত্যাগ করা।
বিদর্শন ভাবনার গভীর অনুশীলন দ্বারাই লোকীয় সুখের অভীপ্সা ছিন্ন হয়। এরূপ অনুশীলনকারী সাধক-সাধিকাকে আসন্ন মৃত্যুর প্রতি অবশ্যই সজাগতা থাকা প্রয়োজন। বিদর্শন ভাবনাকারীদের মৃত্যুভয় সামান্যমাত্রও থাকা উচিত নয়। যখনই মৃত্যু আসুক না কেন, প্রসন্ন চিত্তে মৃত্যুকে গ্রহণ করার জন্য তৈরী থাকা প্রয়োজন।
বিদর্শন ভাবনাকারী যোগীদেরকে জীবনের কোনো জন্ম-দিবসের ক্ষণে একদৃষ্টি অতীতের দিকে অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত জীবনে যা কিছু ভুল করা হয়েছে, তা যেন ভবিষ্যতে পুণরায় না হয়, তার জন্য পুণঃ দৃঢ় সঙ্কল্প নেওয়া উচিত। যে সমস্ত সৎ কর্ম এখন পর্যন্ত করা হয়েছে, তা শেষ জীবন পর্যন্ত করার জন্য কৃত সঙ্কল্পবদ্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৎ কর্ম তো মুক্তি প্রদায়ক ভব দুঃখ বিমোচক বিদর্শন সাধনা অনুশীলনই। তা যেন ছিন্ন না হয়। নিরন্তর যেন চলতে থাকে। আজকে যে অনুশীলন, তা যেন কালকের জন্য রাখা না হয়।
ভগবান মহাকারুণিক বুদ্ধের এরূপ কথন সর্বদা কানের মধ্যে গুঞ্জরণ হয়ে থাকে যে-
‘অজ্জেব কিচ্চমাতপ্পং, কো জঞ্ঞা মরণং সুবে।’
তপস্যার কাজ আজই সম্পাদন করো। তা কালকের জন্য বিলম্ব করোনা। কাল সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কোথায়!
মৃত্যুকে আমন্ত্রণ করার আবশ্যকতা নাই। কিন্তু তা যখন সম্মুখে আসে, তাতে ভয়ভীত হওয়ারও আবশ্যকতা নাই। আমাদেরকে মৃত্যুর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। সময়ে সময়ে আমাদেরকে মরণানুস্মৃতি ভাবনা করা উচিত। আমি নিজের অনুভব দ্বারা দেখেছি যে, মরণানুস্মৃতি অতীব ফলদায়ক।
এরূপ করতে গিয়ে কখনও কখনও স্বীয় মানসপটে পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে, যদি কাল সকালেই মৃত্যু হয়, তাহলে এ জীবনের অন্তিম ক্ষণের অবস্থা কিরূপ হবে? জীবনের কোন্ অভীপ্সা এখনও বাকী আছে, ধম্ম-পুণ্য কর্মের অভীপ্সা থাকলেও তা যথাসম্ভব সম্পাদন করা উচিত। অথবা যে কোন ভাবাবেশের কাজ মনের মধ্যে জাগ্রত হলে তাহলে তৎক্ষণাৎ মরণানুস্মৃতি করে দেখা উচিত যে, যদি পরের দিনই মৃত্যু হয়, তাহলে মনের এ ভাবাবেশ কি ভব ধারায় ভয়াবহ মোড় নেবে? তা চিন্তা করে কোনো ভাবাবেশ জাগ্রত হতেই তা হতে মুক্তির জন্য সজাগ থেকে মরণানুস্মৃতি করা উচিত।
সময়ে সময়ে মৃত্যুর রিহার্সল করলে এক লাভ ইহাও হয় যে, আমরা জানিনা কত জন্মাবধি ভব সংসরণ করতে করতে চলে আসছি। এবার কোনো পুণ্য কর্মের ফলে অমূল্য মনুষ্য জন্ম লাভ হয়েছে এবং শুদ্ধ ধম্মের সংসর্গ হয়েছে। অসার কর্মকাণ্ড এবং নিরর্থক, নিষ্ফল দার্শনিক মান্যতা সমূহ দ্বারা তথা সাম্প্রদায়িক জালের বন্দিদশা হতে মুক্ত, শুদ্ধ ধম্মের প্রতি শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছে। তাহলে এর দ্বারা আমার কি লাভ হাসিল হয়েছে? ইহার হিসাব-নিকাশ সামনে চলে আসে। এতে যা ঘাটতি রয়েছে, তা পুরণ করতে উৎসাহ জাগ্রত হয়। মৃত্যু কাল সকালে আসবে, না আরও অনেক শরৎ পরে আসবে তা আমার জানা নাই।
কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকব, অতীব প্রসন্ন চিত্তে স্বীয় পুণ্য পারমিতা সমূহ পুরণ করতে সচেষ্ট থাকব এবং মানব জীবনকে স্বার্থক করব। পরিণাম যা আসার আসুক, যখন আসবে আসুক। তা ধম্মের উপর ছেড়ে দিলাম। নিজের পক্ষ হতে যথাশক্তি এ মহত্বপূর্ণ জীবনের অবশিষ্ট সময়ের উত্তরোত্তর সদ্ব্যবহার করে যাব। এর জন্য ভগবানের প্রেরণাদায়ী এ বাণীর উদ্বোধন সদা সাথে থাকতে হবে-
‘উত্তিট্ঠে নপ্পমজ্জেয্য ধম্মং সুচরিতং চরে।’
অর্থাৎ উঠো! নির্ভুলভাবে উত্তমরূপে ধম্মাচরণে লেগে থাকো এবং ধম্মাচরণেই নিজেকে নিয়োজিত রাখো। পরিণাম সর্বদা মঙ্গলপ্রদ হবে।