09/10/2026
সূর্য, চন্দ্র এবং পৃথিবী সম্পর্কে পাঠকের জন্য কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া যাবে কিনা?
অংশ-১ঃ অবশ্যই দেওয়া যাবে। নীচে একে একে সূর্য, পৃথিবী এবং চন্দ্রের কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করা হলঃ
ক) সূর্য একটা অগ্নিকুন্ডলীসম উজ্জ্বল গোল ভাষমান তারকা বা নক্ষত্র যা শূন্যে মধ্যাকর্ষন শক্তির সাহায্যে নিজ কক্ষপথে আল্লাহ কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত নিয়মে সদা বিচরনশীল আছে। তবে আমাদের দৃষ্টিতে সূর্যকে স্থির মনে হয়। সূর্যের চারিদিকে ঘুর্নায়মান ৮টা গ্রহ আছে। পৃথিবী তারমধ্যে একটা।
১) সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব Ds = ৯,৩৬,০৮,০০০ মাইল
২) সূর্যের ব্যাসার্ধ Rs = ৪,৩২,২৮৮ মাইল
৩) সূর্যের পরিধি Cs = ২৭,২০,৯৮৪ মাইল
৪) সূর্যের ওজন Ws = ১.৯৮৯x১০**৩০ কিলো,
খ) পৃথিবী একটা আলোহীন গোলাকার জড় পদার্থ বিশিষ্ট ভাষমান গ্রহ যা শুন্যে মধ্যাকর্ষন শক্তির সাহায্যে নিজ কক্ষপথে আল্লাহ কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত নিয়মে সার্বক্ষনিক ভাবে সূর্যের চারিদিকে বিচরনশীল আছে। একই সাথে পৃথিবী নিজ অক্ষ বা মেরুদন্ডের চারিদিকে লাটিমের মত ঘুরপাক খেয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে দিবা রাত্রি বানাচ্ছে। পৃথিবীর নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্যের প্রতিফলিত আলোর কারনে সকল প্রানী বেঁচে আছে। পৃথিবীর চারিদিকে একমাত্র ঘূর্নায়মান উপগ্রহের নাম হচ্ছে চাঁদ।
১) পৃথিবী হতে সূর্যের দূরত্ব (ds) = ৯,৩৬,০৮,০০০ মাইল
২) পৃথিবী হতে চন্দ্রের দূরত্ব (dm) =
২,৩৮,৯০০"
৩) পৃথিবীর ব্যাসার্ধ (rw) =৩,৯৬০"
৪) পৃথিবীর পরিধি(cw) =২৪,৯০২
৫) পৃথিবীর কক্ষ পথের দূরত্ব (ow) = ৫৮,৪০,০০,০০০
৬) পৃথিবীর গতি প্রতি দিনে (vwd) =
১৫,৯৮,৮৭৮
৭) ঘন্টায় পৃথিবীর গতিবেগ (vwh) =
৬৬,৬২০
৮) পৃথিবীর ওজন (ww) = ৫.৯৭২০১০**২৪ কিলো,
গ) চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ যা মধ্যাকর্ষন শক্তির কারনে পৃথিবীর চারিদিকে নিজ কক্ষপথে প্রতি মাসে একবার ঘুরে এসে চান্দ্রমাস বানায়। চাঁদ শুন্যে ভাসমান একটা গোলাকার জড় পদার্থ যার নিজস্বা কোন আলো নেই। তবে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর কারনে আমরা প্রতিদিন তার বিভিন্ন রুপ দেখতে পাই।
১) পৃথিবী হতে চাঁদের দূরত্ব (de) = ২,৩৮,৯০০ মাইল
২) চাঁদের ব্যাসার্ধ (rm) = ১,০৮০
৩) চাঁদের পরিধি (cm) = ৬,৭৮৬
৪) চাঁদের কক্ষপথের দূরত্ব
(om) = ১৫,০০,২৯২
৫) চাঁদের গড় দৈনিক গতিবেগ (vmd) = ৫০,৮৫৭
৬) ঘন্টায় চাঁদের গতিবেগ
(vmh)= ২,১২০
৭) চাঁদের ওজন (wm) = ৭.৩৫x১০**২২ কিলো।
মন্তব্যঃ মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে নিজ কক্ষপথে ঘন্টায় ২,১২০ মাইল বেগে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমরা যেই পৃথিবী পৃষ্ঠে বাস করি এবং চলাফেরা করি সেই পৃথিবী চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে ঘন্টায় ৬৬, ৬২০ মাইল বেগে সূর্যের চারিদিকে নিজ কক্ষপথে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। অধিকক্ত পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর ২৪ ঘন্টায় একটা চক্কর খালে অথচ আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি কতই মেহেরবান।
অংশ-২ঃ উপরের সবগুলো তথ্যই দেওয়া হয়েছে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। এবার এই তিন বস্তুর তা বিশ্লেষণ প্রদানের চেষ্টা করা হবে, ইংশাআল্লাহ।
# সূর্যঃ
১) আকার = গোলাকার।
২) কি দিয়ে গঠিত = বাষ্প জাতীয় অগ্নিকুন্ডলী দিয়ে গঠিত।
৩) উষ্ণতা = ৯,৯৩০ ডিগ্রী ফারেনহাইট পৃষ্ঠে। ২৮০ লক্ষ ভিতরে।
৪) আলোকচ্ছটা = নিজস্ব প্রখর আলো চারিদিকে বিকিরন করে।
৫) বড়ত্ব = পৃথিবী হতে প্রায় ১৩ লক্ষগুন বড়।
৬) পরিচিতি = তারকা বা নক্ষত্র।
৭) অবস্থান = পৃথিবী হতে মনে হয় সূর্য স্থীর। আসলে সূর্যও নিজ কক্ষপথে ঘোরে। সূর্যের চাইতেও নে
কোটি গুন বড় নক্ষত্র আছে।
# পৃথিবী:
১) আকার = গোলাকার।
২) কি দিয়ে গঠিত = প্রধানতঃ মাটি, পাথর, ধাতব পদার্থ, পানি, গ্যাস
কোমিকেল পদার্থ দিয়ে গঠিত যার কেন্দ্রে জলন্ত লাভাও আছে।
৩) উষ্ণতা = গড়ে ৭০ ডিগ্রী।
৪) আলো = নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্যের কাছ থেকে আলো পায়।
৫) বড়ত্ব = চাঁদের তুলনায় ৩.৭০ গুন বড়।
৬) পরিচিতি = গ্রহ।
৭) অবস্থান = সূর্যের চারিদিকে মধ্যাকর্ষন শক্তির কারনে নিজস্ব
কক্ষপথে সদা বিচরনশীল।
# চাঁদঃ
১) আকার = গোলাকার।
২) কি দিয়ে গঠিত = শুষ্ক ও কঠিন পাথর দিয়ে গঠিত।
৩) উষ্ণতা = ২৬০ ডিগ্রী ফারেনহাইট।
৪) আলো = নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্য থেকে আলো পায়।
৫) বড়ত্ব = পৃথিবীর তুলনায় ৩.৭০ গুন ছেট।
৬) পরিচিতি = উপগ্রহ।
৭) অবস্থান = মধ্যাকর্ষন শক্তির সাহায্যে পৃথিবীর চারিদিকে নিজস্ব কক্ষপথে পরিভ্রমনরত।
আংশ-৩: জরুরী কিছু বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা ও বিশ্লেষন প্রদান করা হল।
১। "চাঁদ" = আরবীতে "ক্বমার" এবং ইংরেজীতে MOON বলা হয়। এই উপগ্রহটা শক্ত পাথরের একটা গোলাকার বস্তু মাত্র। এই বস্তু কখনো বাড়ে না এবং কমেও না। এই গোলকের নিজস্ব কোন আলো নেই। চাঁদ নামক গোল পাথরটা আল্লাহ তা'আলার হুকুমে পৃথিবীর চারিদিকে নিজ কক্ষপথে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে।
২। চাঁদ দেখা = এই কথার অর্থ হচ্ছে চাঁদের গোল পাথরের বস্তুটাকে দেখা। কোরআন এবং হাদীসের কোথাও চাঁদের গোলক দেখার কথা বলা হয়নি। তাই এমন কথা বলার কোন অর্থ হতে পারে না। তথাপি বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম "চাঁদ দেখে রোজা রাখ, চাঁদ দেখে ঈদ কর" এমন অবান্তর কথা বলে মানুষকে বোকা বানিয়ে থাকেন।
৩। "নতুন চাঁদ" = আরবিতে "হেলাল" = ইংরেজীতে New Moon. চাঁদ নামক গোলক পাথরের উপর সূর্যের প্রতিফলিত আলো যা অমাবস্যার পর পৃথিবী হতে প্রথম দেখা যায় তাকে "নতুন চাঁদ' বলা হয়। জ্যোতিষবিদ্যায় এর নাম হচ্ছে "প্রথমা" অর্থাৎ চাঁদের উপর পড়া প্রথম আলো। দ্বিতীয় দিনের বর্ধিত আলোর নাম হচ্ছে দ্বিতীয়া। এই ভাবে তৃতীয় দিনে তৃতীয়া পরে চতুর্থী, পশ্চমী ইত্যাদি হিসাব করা হয়।
৪। "চান্দ্রমাস" = আরবীতে "আসশাহরু" = ইংরেজীতে Lunar Month. চাঁদ নামক গোলাকার বস্তুর উপর সূর্য হতে আসা প্রতিফলিত আলো অমাবস্যার পর ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে পূর্নিমা হয় এবং পরে কমতে কমতে অমাবস্যাতে এসে শেষ হয়। প্রতিফলিত আলোর বাড়া-কমা দিয়েই চান্দ্রমাসের সৃষ্টি হয়। প্রথম দিনের আলো অর্থাৎ "নতুন চাঁদ" বা প্রথমা দিয়েই চান্দ্রমাসের হিসাব শুরু করা হয়। এই ভাবে ২৯/৩০ দিনে একটা চান্দ্রমাস এবং ১২ মাসে চান্দ্রবর্ষ বা হিজরী সন গননা করা হয়।
৫। "নতুন চাঁদের হিসাব' পবিত্র কোরআন ১২টা নতুন চাঁদ দিয়ে ১২মাস শুরু করতে বলেছে (২:১৮৯)। এই ভাবে চান্দ্রমাস হিসাব এবং চান্দ্রবর্ষ গননা করে হিজরী ক্যালেন্ডার তৈরী করে তা দিয়ে নতুন চাঁদের সাথে সম্পর্কিত সকল এবাদত করার কথা কোরআনের অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে খালী চোখে নতুন চাঁদ দেখার কথা একবারও বলা হয়নি; বরং বার বার হিসাবের কথাই বলা হয়েছে। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের সাহায্যে জ্ঞানের চোখে নতুন চাঁদ দেখাকে নিশ্চিত করে চান্দ্রমাস শুরু করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। সেই মোতাবেক ১৯৯৯ সালে সৌদিআরবের উম্ম আল-কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীগন ১৪২০-১৪৫০=৩০ হিজরী সনের জন্য হিজরী ক্যালেন্ডার তৈরী করে দিয়েছেন। অতএব মুসলিম উম্মাহ তা অনুসরন করে বিশ্বব্যাপী একই তারিখে ও বারে সওম/ঈদ পালন করতে পারে।
৬। "নতুন চাঁদ দেখা"= কঠিন পাথরের গোলকার চাঁদের উপর সূর্যের প্রতিফলিত প্রথম দিনের আলোকেই বলা হয় "নতুন চাঁদ"। যখন পবিত্র
কোরআনের কথা মত হিসাব করা সম্ভব ছিল না তখন রাসুল (সাঃ)
উম্মতদেরকে বিভিন্ন কাওলী হাদীসের মাধ্যমে নতুন চাঁদ খালি চোখে দেখে চান্দ্রমাস শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারন ফরজ রোজা ত্যাগ করা যায় না। বর্তমানে কোরআনের হুকুম মোতাবেক বিশ্বহিজরী ক্যালেন্ডার পাওয়ার পর "নতুন চাঁদ দেখার" কোনই প্রয়োজন নেই। তারপরও যদি কেউ দেখে সওম/ঈদ করতে চান তবে শরীয়তের হুকুম (কোরআনের হুকুম) লঙ্ঘন করা হবে।
৭। "আসবাকুর রুইয়া"= অর্থ হচ্ছে- দেখার মধ্যে যেটা সবার আগে।
পবিত্র কোরআন নতুন চাঁদের হিসাব করে চান্দ্রপঞ্জীকা (২:১৮৯) দিয়ে সওম/ঈদ করতে বলেছে। কিন্তু ১৪০০ বৎসর আগে হিসাব করা সম্ভব ছিল না বিধায় ক্বাওলী হাদীসে নতুন চাঁদ দেখার কথা বলা হয়েছে। নতুন চাঁদ দেখা নিয়েও নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু ফরজ রোজাতো ছাড়া যাবে না। তাই প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া নিয়ে বিতর্ক না করে "আসবাকুর রুইয়া" অর্থাৎ দেখার মধ্যে যেটা সর্বপ্রথম সেটা দিয়েই মাস শুরু করতে হয়েছে। সূত্রঃ সহীহ মুসলিম-২৪১৯ (তাও)। কথায় বলে ওজরের কোন মাসআলা নেই। অবস্থা বুঝে তখন এমন ব্যবস্থাই নিতে হয়েছে। বর্তমানে সেই অবস্থা অনুপস্থিত বিধায় হিজরী ক্যালেন্ডার অনুসরন করে সওম/ঈদ পালন করতে হবে।