10/18/2025
পূজনীয় ভান্তে জ্যোতিসার স্থবিরের ৪০তম শুভ জন্মদিনে বিনম্র বন্দনা নিবেদন করছি
লেখক: সম্পাদক: জ্যোতি
বঙ্গীয় বুদ্ধ শাসনের অনন্য থেরবাদ চর্চার আদর্শীক প্রতিষ্ঠান জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্রের সফল উত্তরসুরী, যিনি ইউরোপের অনন্য সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন, সুগন্ধি শিল্পের শহর ফ্রান্সের প্যারিসের কুশলায়ন বুড্ডিস্ট মেডিটেশন সেন্টারের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, বঙ্গীয় ভিক্ষুসংঘের মধ্যে অনন্য সুকণ্ঠের অধিকারী, পূজনীয় ভদন্ত জ্যোতিসার থের মহোদয় এর ৪০তম শুভ জন্মদিনে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও বন্দনা নিবেদন করছি।
ে_পূজনীয়_ভান্তে_ভদন্ত_জ্যোতিসার_স্থবিরের__জীবন_ও_কর্মের_সংক্ষিপ্ত_পর্যালোচনা:
অত্যন্ত সুকন্ঠের অধিকারী শ্রদ্ধেয় ভদন্ত জ্যোতিসার থের মহোদয় আজকের এই দিনে ৮ অক্টোবর ১৯৮৫ ইংরেজি রোজঃ রবিবার পরলোকগত পিতা বাবু ভুলু চরণ বড়ুয়া ও মাতা শ্রীমতী নীতু বালা বড়ুয়া দ্বয়ের কোল আলোকিত করে কুতুপালং গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। জন্মকালে পিতা-মাতা ও বয়জৈষ্ঠ্যদের কর্তৃক নাম আরোপ করেন রাজিব বড়ুয়া। শৈশবে তিনি কুতুপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। এর পরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষান্তে পূজ্য গুরুভান্তে বিনয়শীল ভদন্ত কুশলায়ন মহাথের মহোদয়ের সান্নিধ্যে গমন করে ১৯৯৮ সনের ২৩শে জুন গুরুমহ সমাজ সংস্কারক, পশ্চিমরত্না সুদর্শন বিহারে অধ্যক্ষ, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, পন্ডিত প্রবর ভদন্ত শাসনবংশ মহাথের মহোদয়ের সান্নিধ্যে পবিত্র প্রব্রজ্যা শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নাম ধারণ করেন জ্যোতিসার শ্রামণ।
একই বছর তিনি কক্সবাজারস্থ পাহাড়তলী উঃ কৌশল্যা বৌদ্ধ বিহারে গুরুভান্তের সাথে অবস্থান করেন। গুরু ভান্তের নিকট প্রতিনিয়ত পালি ও ধর্ম বিনয় অধ্যয়ণ করতে থাকেন। পাশাপাশি স্কুলের সাধারণ শিক্ষাও চলমান রাখেন। প্রব্রজ্যা গ্রহণের পরবর্তী বছর ১৯৯৯ সনে পটিয়া মুকুট নাইট বিহারে আয়োজিত বাংলাদেশের অধিকাংশ ভিক্ষু-শ্রামণদের অংশগ্রহণে জাতীয় সুত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে প্রথমস্থান লাভ করে কৃতকার্য হন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি কর্তৃক আয়োজিত চট্টগ্রাম নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহারে সুত্র ও দেশনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান লাভ করেন। পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় ভান্তের সুন্দর মধুময় কণ্ঠ বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে প্রকাশিত হয়।
২০০২ সালে জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু-শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্রের অনন্য সফল শিক্ষার্থী হিসেবে ধর্ম বিনয়ে পারদর্শীতা লাভ ও অত্যন্ত সুকণ্ঠের অধিকারী হিসেবে "মহাপরিত্রাণ" নামক সুত্রপাঠের একটি অসাধারণ ক্যাসেট (যেখানে মহাসময় সুত্রসহ ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুত্র সন্নিবেশিত ছিল) তৎকালীন বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে ব্যাপক সাড়া পেলেন এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এই মর্মে বুদ্ধের সেই ধম্মপদের মহান বাণী প্রণিধান যোগ্য বলে মনে করি, বুদ্ধ ভিক্ষুবর্গের ৪ নং গাথা বলেছেন,
"যো মুখসঞ্ঞতো ভিক্খু মন্তভাণী অনুদ্ধতো,
অত্থং ধম্মঞ্চ দীপেতি, মধুরং তস্স ভাসিতং"
অর্থাৎ, যে ভিক্ষু বাক্যসংযমী ও মন্ত্রভাষী, (প্রজ্ঞাভাষী), যিনি অনুদ্ধতভাবে অর্থ ও ধর্ম ব্যাখ্যা করেন, তাঁহার ভাষণ মধুর হয়। -----* ধম্মপদ নং-৩৬৩।
পূজনীয় ভদন্ত জ্যোতিসার স্থবিরও বাংলাদেশী ভিক্ষুসংঘের মধ্যে মধুর ভাষী হিসেবে এখনো দেদীপ্যমান।
শ্রদ্ধেয় জ্যোতিসার শ্রামণ ২০শে মে, ২০০৫ইংরেজী, শুক্রবারে শৈলেরঢেবা চন্দ্রোদয় বৌদ্ধ বিহার ও জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্রের শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে পবিত্র উপসম্পদা (ভিক্ষুত্বধর্ম) জীবন লাভ করে হন জ্যোতিসার ভিক্ষু। ভিক্ষু জীবনে পদার্পণে চর্তুপর্থায় দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাবেক আইজিপি ভূমি দানশীল ব্যাক্তিত্ব, উপাসকরত্ম বাবু প্রভাসরঞ্জন বড়ুয়া ও সহধর্মিণী শ্রীমতী শ্যামলী বড়ুয়া চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম।
ভদন্ত জ্যোতিসার শ্রামণ শিক্ষা জীবনে একজন প্রখর মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের কৃতিত্বতা বারবার প্রমাণ করেছেন। তিনি কৃতিত্বের সাথে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাস করেন। এবং উখিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাস করে কক্সবাজার সরকারী কলেজ অনার্সে ভর্তি হয়ে অনার্স শেষ না করে তিনি ধর্মীয় উচ্চতর গবেষণার জন্য ঢাকাস্থ মিয়ানমার এমবাসির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মায়ানমারের প্রশিদ্ধ International Theravada Buddhist Missionary University (ITBMU) এর স্কলারশিপ লাভ করেন।
তিনি ২০০৮ সালে ১ জুলাই, ধর্মীয় উচ্চতর শিক্ষার জন্য পুণ্যভূমি মায়ানমারে গমন করেন। মায়ানমারে তিনি ৩ বৎসর মেয়াদি Diploma ও B A অনার্স কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন। এরপরে তিনি থাইল্যান্ডের বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র Mahachulalongkornrajavidyalaya University এর International Buddhist Studies College ডিপার্টমেন্ট থেকে থিসিসসহ (An Analytical Study of the Contemplation of Body as Body (Kayagatasati) বিষয়ের উপর কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন করেন।
পূজনীয় ভান্তে জ্যোতিসার স্থবির নবীন ভিক্ষু সংঘের মধ্যে দ্রুততার সাথে বুদ্ধ শাসনের প্রচার কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভান্তে অতি অল্প বয়সে ইউরোপ আমেরিকার মত দেশে ধর্মাভিযানে গিয়েও কখনো লোভ, দ্বেষ মোহের বন্ধনে নিজের দেবদুর্লভ পুণ্যময় ভিক্ষুজীবনকে জলাঞ্জলি দেননি। তিনি বুদ্ধের মহান বাণী "চরত্থা ভিক্খাবে চরিকং, বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়" এই মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তিনি বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশী বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের মধ্যে সর্বপ্রথম ইউরোপের পরাশক্তিধর দেশ ফ্রান্সের প্যারিসে বাংলাদেশী ও ইউরোপীয় বৌদ্ধদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ফ্রান্স মেডিটেশন ফোরাম, কুশলায়ন বুড্ডিস্ট মেডিটেশন সেন্টার বৌদ্ধ বিহার। তিনি বাংলা ভাষাভাষী বৌদ্ধদের পাশাপাশি ইউরোপীয়দের ধর্মীয় খোরাক মিটিয়ে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
তাই মহাকারুণিক বুদ্ধের ভাষায় বলতে পারি,
" যো হবে দহরো ভিক্খু যুঞ্জতি বুদ্ধসাসনে,
সো' মং লোকং পভাসতি অব্ ভা মুত্ত'ব চন্দিমা।"
অর্থাৎ, নিতান্ত তরুণ হইলেও যে ভিক্ষু বুদ্ধের শাসনে আত্মনিয়োগ করেন, তিনি মেঘমুক্ত চন্দ্রের ন্যায় এই জগৎকে উদ্ভাসিত করেন। *ধর্মপদ, ভিক্ষু বর্গ -২৩ নং গাথা।
তিনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্মাভিযান করে কাজ করে যাচ্ছেন। আধুনিক এই যুগসন্ধিক্ষণে বুদ্ধশাসনের শ্রীবৃদ্ধি ও রক্ষায় পূজ্য জ্যোতিসার থের মহোদয়ের মত পরিশ্রমী বুদ্ধ শাসনের একনিষ্ঠ কর্মী বেঁচে থাকুক শতবছর। বিদেশের মাটিতে একটি বিহার প্রতিষ্ঠা করা কত যে কষ্টকর তা ভুক্তভোগী মাত্রাই জ্ঞাত। আপনি তা প্রমাণ করে যাচ্ছেন।
হে পূজনীয় আজকের এই শুভ ৪০তম জন্ম দিবসে জানাই পূজার্ঘ, শ্রদ্ধা বন্দনা ও অভিবাদন। পুণ্যরাশি দান করছি আপনার উজ্জীবিত জীবনের সুখ শান্তি পরসে হাজারো মানুষ যেন সুখী হয়।