15/09/2020
ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম প্রচণ্ড জেদী ছেলে। বাবাকে হারিয়েছিলাম খুব অল্প বয়সে। একটা সময়ে আমাদের ছিল খুব টানা-পোড়নের সংসার। সে সময়ে কত রকম বায়না ধরে যে মাকে বিপাকে ফেলেছিলাম! মনে হলেই লজ্জা লাগে।
খুব ইমোশোনাল ছিলাম। এতো আবেগ দিয়ে নাকি জীবন চলে না। কখনো যুক্তি কিংবা ফলাফল বিচার করে কোন কাজ করতাম না বরং কাজ শেষ হলে নিজেই সে কাজের পিছনে একটা যুক্তি দাঁড় করাতাম। ছেলেবেলা মানেই ছিল ক্রিকেট খেলা। স্কুলে না যেয়ে ক্রিকেট খেলা দেখা। তারপর কৈশোর আসল। এক রাশ আবেগ এসে ভর করল। কোন একজনকে অজানা কারণে মনে ধরল। কিন্তু বেশ ভালোমতই জানতাম, পাহাড়সম লজ্জা নিয়ে কাউকে কিছু বলার সাহস আমার নেই।
হতাশ লাগত। জীবনের কোন মানে খুঁজে পেতাম না। এরকম কত মন খারাপ করা রাত হুমায়ুন আহমেদ-জাফর ইকবালের বই, রবীন্দ্রনাথের গীতি-বিতান পড়ে পড়ে শেষ করেছি তার ইয়াত্তা নেই। কত রাত কল্পনার ডানায় ভর করে ডায়েরী লিখে শেষ করেছি সেটার হিসেবও আমার কাছে নেই। আমার ক্লাসমেটদের উপন্যাসের বই গিফট করতাম। ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’- উপন্যাসটা কত ছেলেকে পড়িয়েছিলাম। হুমায়ুন সাহিত্য চিন্তা-চেতনায়, কথায়-কাজে হেঁয়ালিপনা এনে দিল। পরে জানতে পারলাম, জীবন নাকি এতো হেঁয়ালিতেও চলে না। ছিলাম আর দশটা ছেলের মত। একেবারেই সাধারণ। আলাদা করে চোখে পড়ার মত কিছু আমার কখনোই ছিল না।
ক্লাস টেনে থাকতে ডিসকভারি চ্যানলে স্টিফেন হকিং- এর একটা প্রোগ্রাম দেখেছিলাম। তার সহজ যুক্তিগুলো খুব ভালো লাগত। বাহ! এতো সুন্দর করে বিজ্ঞান বুঝানো যায়! বিজ্ঞানের প্রতি কিছুটা ভালোবাসা সৃষ্টি হলো। কিন্তু মাঝখান দিয়ে চিড় ধরল আমার ঈশ্বরে বিশ্বাসে । আধুনিক এস্ট্রোনমাররা যা করেন স্টিফেন হকিংও তাই করলেন। তিনি বিজ্ঞানের মাঝে সূক্ষ্ণভাবে নাস্তিকতা ঢুকিয়ে দিলেন। সেসময়ে তার বলা সবকিছু বুঝে ফেলেছিলাম এমনটা দাবী করব না। আর “ঈশ্বর বলতে কেউ নেই”- এটাও তিনি আমাকে পুরোপুরি বোঝাতে পারেননি। আসলে বিজ্ঞান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভবও না। তবে সন্দেহ জিনিসটা খুবই দূষিত। একবার ঢুকে গেলে সহজে আর বের হতে চায় না।
সেই দূষিত দেহ আর মন আমাকে টানা দুইমাস মসজিদের চৌকাঠ মাড়াতে দেয়নি। জুমার নামায পর্যন্ত পড়িনি। মা জুমার দিন হালকা বকাবকি করে থেমে যেতেন। কিন্তু বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন কখনোই হইনি। মনের এই অবস্থার কথা পরিবারের কারো সাথেই সেভাবে শেয়ার করিনি। ক্লাসমেটদের অনেককেই জিজ্ঞেস করতাম, “প্রমাণ করতে পারবা ঈশ্বর আছেন?” সবাই চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। কেউ হয়তো রসিকতা ভেবে হাসত। ক’দিন পর এসএসসি দিবে এমন ছেলের মুখে এধরনের প্রশ্ন শুনতেও তো অদ্ভুত লাগে।
তবে আমি সবসময়ই স্রষ্টাকে জানার জন্য একটা হাত বাড়িয়ে রেখেছিলাম। আর সে সময়েই হঠাৎ আমাদের ক্যাবলে নতুন একটা চ্যানেল যুক্ত হলো-‘পিস টিভি বাংলা’। আমার এখনো মনে আছে যত যাই হোক, যত পরিক্ষাই থাকুক, কখনোই ‘সত্যের উন্মোচন’ আর ‘সম্মুখ সমরে’ এই দুইটা অনুষ্ঠান মিস করতাম না। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মনে হলো এতো সুন্দর প্রজ্ঞাপূর্ণ জীবন-বিধান অবশ্যই একজন স্রষ্টা পাঠিয়েছেন।
একসময় ভালো লাগা শুরু হলো ধর্মের প্রতি। পরিচিত হলাম কিছু ভাইয়ের সাথে যারা আমাদের দেশের প্রচলিত ধর্ম-মতকে উপেক্ষা করে বিশুদ্ধভাবে ইসলাম প্র্যাক্টিস করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু আমার আবেগ এসে আমার যুক্তিকে বাঁধা দিলো। এতো মুভি-গান, তাকে নিয়ে লেখা কবিতা-উপন্যাস সব শুধু ধর্মের কারণে ছেড়ে দিতে হবে? দাঁড়ি রাখতে হবে, টাখনুর উপরে কাপড় পরতে হবে, এই করা যাবে না, সেই করা যাবে না-এতো কিছু মানা সম্ভব?
কিছু সময় থমকে থাকলাম। কলেজ লাইফে ইচ্ছা করল পুরো কুরআনের বাংলাটা পড়ে দেখতে। কুরআন পড়ার সময় যে বিষয়টা আমাকে নাড়া দিত, সেটা হচ্ছে- ‘থট প্রসেস’। কোন আয়াত পড়ে আমি যখন তা নিয়ে চিন্তা করতাম, তারপরের আয়াতেই দেখতাম আল্লাহ্ তায়ালা বলছেন, “তোমারা কি ভাব যে...............”-বলেই যেন আমার ভাবনাটাকে কোট করে দিলেন! কী আশ্চর্য! ‘আল-কোরআন একাডেমী লন্ডন’- এর সেই বাংলা অনুবাদের কাছে আমি আজীবন ঋণী থাকব। এটি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। বেঁচে থাকার একটা মানে দিয়েছে। আমার ভেতর তৈরি করেছে জানার স্পৃহাটাকে।
একসময় টেবিলের তাকে ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘গীতিবিতান’- কে সরিয়ে জায়গা করে নিল হাদীসের বইগুলো। তারপরের পথ ছিল কন্টকময়। সেটাও পার হয়েছে আশা-হতাশার দোলাচলে। কেউ যখন প্রথম ইসলাম প্র্যাক্টিস করা শুরু করে তখন তার ঈমানের লেভেল অনেক হাই থাকে। একসময় পরিবেশ ও সঙ্গের দোষে ঈমান উঠা-নামা শুরু করে। মাঝে মাঝে সে নিজেই এমন কাজ করা শুরু করে যেটা সে প্রথম অবস্থায় চিন্তাও করতে পারত না। ব্যাপারটা এমন কখনোই না যে, আজ থেকে সে ইসলাম প্র্যাক্টিস করা শুরু করলো, আর তারপর কখনোই তাকে কোন পাপ-পঙ্কিলতা স্পর্শ করবে না। সে একদম মাসুম হয়ে যাবে। পথটা সরল। কিন্তু নফস, এই সমাজ, বারবার তাকে হোঁচট খাওয়ায়। কিন্তু তাও সে উঠে দাঁড়ায়। পদস্খলন ঘটে। তারপরেও সে থাকে স্রষ্টার দয়া প্রার্থী। তিনি তো বলেছেন, আকাশসম গোনাহ নিয়েও ক্ষমা চাইলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দিবেন।
মাঝে মাঝে নেটে বসে ক্লাসমেটদের ফ্যান্টাসীতে ভরা জীবনটা দেখি। বান্ধবীদের নিয়ে রসালো স্ট্যাটাস, মুভি নিয়ে রিভিও। শুধু ‘চিল’ করার জীবন। আল্লাহ্ চাইলেই আমাকেও সেখানে রাখতে পারতেন। এটা ভেবে নিজের হতাশ জীবনে এক চিলতে আলো খুঁজতে চেষ্টা করি।
আমি নিজেকে ট্রুথ সিকার ভাবতে ভালবাসি। ভালবাসি তাদের যারা সত্যকে হৃদয় দিয়ে খুঁজে। হোক সে আস্তিক বা নাস্তিক- সত্য খোঁজার চেষ্টা করলে, হৃদয় দিয়ে চাইলে, আল্লাহ পথ দিয়ে দেন। কেউ তাঁর দিকে এক হাত অগ্রসর হলে তিনি তার দিকে দু’ হাত অগ্রসর হন। কেউ তাঁর দিকে হেঁটে আসলে তিনি তার দিকে দৌড়ে আসেন।
আমি যেমন islamqa, answeringchristianity, quraneralo- ভিজিট করেছি, তেমনি ভিজিট করেছি muktomonablog, answeringislam, wikiislam। আমি বিশ্বাস করি একপেশে তথ্য তো কেবল প্রবঞ্চনাই নিয়ে আসে, যদি না তাতে সত্য থাকে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আমি মুসলিম কেন তবে বলব – আমি নাস্তিক নই, কারণ আমি বিশ্বাস করি না এই অসীম মহাবিশ্ব শুণ্য থেকে কোন বাহ্যিক ফোর্স ছাড়া আপনা আপনি সৃষ্টি হয়েছে। এতো সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিক মহাবিশ্ব কোন স্রষ্টা ব্যতীত সৃষ্টি হয়েছে সেটা বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হয়। আমি খ্রিষ্টান নই, কারণ আমি বিশ্বাস করি না একজন মানুষ ঈশ্বরের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারেন আর তিনি পৃথিবীর সকল মানুষের পাপের ভার বহন করতে পারেন।
আমি ইহুদিও নই, কারণ আমি মনে করি না স্রষ্টার ধর্ম কোন গোষ্ঠীর বাপ-দাদার সম্পত্তি; ভিন্ন জাতির কারো তাতে প্রবেশে এতো বাধা থাকবে। একেশ্বরবাদী রিলিজিওন হিসেবে এরপর বাকি থাকে কেবল ইসলাম। যেটা আমার কাছে অন্য যে কোন ধর্মের চেয়ে রেশনাল মনে হয়েছে।
যারা ভাবে ‘ইসলাম পালন করলে আমার হাতে এক লম্বা হারামের লিস্ট ধরিয়ে দেয়া হবে- এই করা যাবে না, ঐ করা যাবে না, জগতের সকল আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হবে’- তাদের জন্য কিছু কথা বলে শেষ করি। কারণ, আমি বেশ লম্বা একটা সময় এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলাম। আমরা যেমনটা ভাবি ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সেরকম না।
এখানেও আনন্দ আছে। কান্না আছে। একটু সময় দিন। আসমান ও জমীনের রবকে একান্তে ডাকুন। একসময় মনে হবে, চোখের পানি কি এতোই সস্তা যে উপন্যাসের বই কিংবা মুভির সীন দেখে কাঁদতে হবে? কাঁদতে যদি হয় তো কতো সত্যি গল্পই সামনে পড়ে আছে। মুস’আব ইবনে উমাইরের (রা) গল্প, খুবাইবের (রা) এর গল্প, আহমেদ ইবনে হাম্বলের(রহ) গল্প, উমার মুখতারের (রহ) গল্প। এ এক লম্বা লিস্ট। সবার জন্য এক রাত করে কাঁদলেও মনে হয় জনম শেষ হয়ে যাবে। শত মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিঃস্বার্থ আত্নত্যাগের কারণেই আমরা আজকের ইসলামকে পেয়েছি।
এগুলো তো কষ্টের কথা। আনন্দের কিছু কি নেই?
হ্যাঁ আছে, থাকবে না কেন? সেটাও এক লম্বা লিস্ট। বর্ষার দিনে আনন্দ করে বৃষ্টিবিলাস করলে, খালি পায়ে হেঁটে হিমুগিরি করলে সেটাও সওয়াবের খাতায় লেখা হয়। যদি তা আল্লাহর রাসূলকে (সা) ভালোবেসে করা হয়ে থাকে। একইভাবে পূর্ণিমার রাতে প্রিয়তমাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, তাকে চিমটি দিয়ে দুজনে মিলে দৌড়াদৌড়ি করা, তার দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকানো, তাকে জড়িয়ে ধরা - সবই ইবাদতের অংশ। যদি তা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে।
আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য আপনি যা যা ছাড়বেন, আল্লাহ্ তায়ালা অবশ্যই তার চেয়ে অনেক উত্তম কিছু দান করবেন। গান শোনা ছেড়ে দিলে তিনি আমাদের অন্তরে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দিবেন। আফাসির কণ্ঠে সূরা মুলকের সামনে কি এই পৃথিবীর কোন সঙ্গীত দাঁড়াতে পারবে? মনে হয় না। আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য হারাম রিলেশান ত্যাগ করলে তিনি পবিত্র কারো ভালোবাসা দিয়ে আমাদের জীবনটাকে রাঙিয়ে দিবেন।
আমাদের জীবনটা খুব ছোট। যেন শুরু করার আগেই শেষ। এ জীবনে আমরা কেন এসেছি, কী করছি, কোথায় বা যাচ্ছি- এই চিন্তাগুলো করা খুব জরুরী । কিন্তু আমরা তা করি না। আমাদের ভয় হয় যদি নির্মম কোন সত্য বের হয়ে আসে। মাঝে মাঝে এই দুনিয়ার মোহ আমাদের দূরে সরিয়ে রাখে।
আচ্ছা, জীবন মানে আসলে কী? ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে অর্ধেক জীবন শেষ করে দেয়া, স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েদের পিছনে বাকিটুকু শেষ করে দেয়া, তারপর বৃদ্ধ বয়সে হুইল চেয়ারে বসে না মেলা জীবনের হিসেব মিলাতে মিলাতে কবরে চলে যাওয়া? এটার মানেই কি জীবন? এর জন্যেই কি আমরা পৃথিবীতে এসেছি? শুধু বেঁচে থাকার জন্য, নিজের জীনটাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যে জীবন, সে জীবন তো কুকুরও বাঁচে, শেয়ালও বাঁচে।
সত্য বোঝার চেষ্টা না করলে মানুষ আর দুপেয়ে জন্তুর মাঝে কোন পার্থক্য থাকে কি?
| আল্লাহর কাছে আসার গল্প |
✍️লেখা: শিহাব আহমেদ তুহিন
FEAR_ALLAH