17/11/2024
দুইদিন আগে নিউজফীডে একটা পোস্ট ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। অপরাধী মা শিরোনামে লেখাটি হয়তো অনেকেই পড়েছেন।
পোস্টে দেখা যাচ্ছে একজন কর্মজীবি মা সন্তানকে বাসায় রেখে লুকিয়ে অফিসে যাচ্ছেন। তার বাচ্চা সারা বাসা তাকে খুজে হয়রান হয়ে গেছে। বাচ্চার নানু তাকে বলেছে মা ওয়াশরুমে গেছে। বাচ্চা তখন মায়ের ওড়না গায়ে জড়িয়ে ওয়াশরুমের পাপোশের উপর শুয়ে পড়েছে, সে কোনোভাবেই মাকে বাইরে যেতে দিবেনা।
পোস্টের শেষে মায়ের অপরাধবোধ প্রকাশ পেলেও নিজের স্বপ্নপূরণে তাকে এরকম করতেই হচ্ছে বলে ভদ্রমহিলা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
খুঁজে খুঁজে মহিলার প্রোফাইলে গেলাম। তিনি একজন আর্কিটেক্ট। রাজধানীর সবচেয়ে পশ এলাকায় তার ছবির চেয়েও সুন্দর একটি বাসা আছে। বাসার প্রতিটি রুমের ছবি প্রোফাইলে পোস্ট করা হয়েছে।
(যাই হোক উনার বাচ্চার ব্যাপারে উনি ই জানেন।
তবে আমাদের বলার উদ্দেশ্য হলো অন্য বোনদের কিছু রিমাইন্ডার দেয়া)
একটা হাদিস শেয়ার করি - 🍀
"রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির উপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোন ব্যাক্তির দাস স্বীয় মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব জেনে রাখ, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।"
নারী চাকরি করতে পারবে কিনা এটা নিয়ে তর্ক বিতর্কের শেষ নাই। আমি সেদিকে যাবো না। আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি -
১. উনি বা এইরকম অবস্থায় থাকা সবাই জব না করলে কি উনার সন্তান বা উনি কি না খেয়ে মরতেন?
২. তার জব কি এমন কিছু যেখানে তার কোনো বিকল্প নেই বা তার জন্য সেই জব করা বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে জরুরি?
৩. প্রতিটি মা-ই তার সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। সন্তান সাবালেগ হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে তার হক বিনষ্ট হলে তার জবাবদিহিতা মা কিভাবে করবেন?
যদি আমাদের এমন সব বোনেরা বাচ্চাকে সময় দিতেন, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে তার ক্যারিয়ার হতো না, হয়তো ক্ষণস্থায়ী জীবনে অকল্পনীয় সুন্দর বাসস্থান হতো না। সামাজিক স্ট্যাটাস উঁচুতে উঠতো না। কিন্তু আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে পারতেন। নারীর জন্য আল্লাহর ঠিক করে দেয়া ফরজ ক্যারিয়ারে সফলতা অর্জন করে জান্নাতে অবর্ণনীয় সুন্দর বাসস্থান তার হতো চিরকালের জন্য ইনশাআল্লাহ।
আজকাল একটা ফ্রেইজ খুব বেশি চলমান - সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দিতে হবে, কোয়ান্টিটি টাইম নয়। খুবই ভুল কথা। এ কথার দোহাই দিয়ে কেউ যদি সন্তানকে দিনে এক ঘন্টা টাইম দেয় আর বাকি সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে সেটা সেই বাচ্চার জন্য জুলুম।
একটা বাচ্চার জীবনের প্রথম পাঁচ বছর হলো গোল্ডেন পিরিয়ড। এই সময়ে তার মস্তিষ্ক বিস্ময়কর গতিতে পূর্ণতা পেতে থাকে। এই পাঁচ বছরে সে পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে যে স্টিমুলেশান গ্রহণ করে, সেটাই তাকে পরের পঞ্চাশ বছর এগিয়ে নিয়ে যায়। মা বাচ্চাকে এক ঘন্টা কোয়ালিটি টাইম দিলো, তাহলে কি আর বাকি সময় তার স্টিমুলেশানের দরকার নেই? সেই সময়ে কি তার মাকে প্রয়োজন হতে পারে না?
সন্তানের সাথে ভালোবাসাময় সম্পর্ক সব বাবা মা-ই চায়। এই পাঁচ বছরে সন্তানকে যতটুকু ভালোবাসা আদর যত্ন দেয়া হবে, বড় হয়ে তার দ্বিগুণ সন্তান তার বাবামাকে ফিরিয়ে দিবে। অনেক বাবা মায়ের মনে কষ্ট - সন্তান তাদেরকে সময় দেয় না, তাদের যথেষ্ট ভালোবাসে না, যত্ন নেয় না। সত্য হচ্ছে এই যে ছোটবেলার যে কোনো একটি সময়ে, যখন সন্তানের কোর মেমোরি তৈরী হচ্ছিলো, তখন কোনো না কোনো ভাবে তার সাবকনসাশ মাইন্ডে বাবা মায়ের করা কোনো অবহেলা, তাচ্ছিল্য বা তাকে গুরুত্ব না দেয়া, আনওয়ান্টেড অনুভব করানোর অভিজ্ঞতা গেড়ে বসে গেছে। বাবা মা সন্তানের ছোটখাটো বায়না, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, তার অর্থহীন গল্প শোনা, তার সাথে খেলা করা - এগুলোতে ততটা মনোযোগ দিচ্ছেনা, ভাবছে ছোট মানুষ, ওর এসব মনেও থাকবে না।
মনে থাকবে না কিন্তু আপনার কাছ থেকে যে কষ্টটা সে পেলো তা তার ঠিকই মনে থাকবে। আধুনিক সময়ে একটা নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে - স্লিপ ট্রেনিং। নিওনেটাল পিরিয়ড শেষ হবার কিছুদিন পর বাচ্চাকে আলাদা রুমে বা কটে শোয়ানো হয়। এতদিন ঘুম থেকে উঠে কান্না করে উঠলেই মা দৌড়ে যেত। এখন দৌড়ে না গিয়ে বলা হচ্ছে বাচ্চাকে কাঁদতে দাও। একসময় নিজেই সেল্ফ সুদিং মেথড অর্থাৎ ফিংগার সাকিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে।
একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্ট বললেন, এটা পুরাই একটা ভ্রান্ত ধারণা। বাচ্চা নিজেকে ঘুম পাড়ায় না, সে আসলে একটা সময় যেয়ে হাল ছেড়ে দেয় যে কেউ আসবেনা তাকে আদর করে ঘুম পাড়াতে।
এক্স্যাক্টলি সেইম জিনিস পরেও হয়, আপনি বাচ্চাকে টাইম না দিয়ে ভাবছেন ও নিজে নিজে খেলতে শিখুক। তাকে অচেনা কোনো বাসায় বেড়াতে নিয়ে বা মেহমানের সামনে ফেলে দিয়ে ভাবছেন ও সোশ্যালাইজেশান শিখুক। তাকে আবাসিক স্কুলে দিয়ে ভাবছেন এখানে থেকে সে পড়াশোনার সাথে এডাপ্টেশান শিখুক, একা একা যে কোনো বিপদ পাড়ি দিতে শিখুক।
কিন্তু আদতে সে কি শিখছে জানেন? যে আসলে আমাকে হেল্প করতে, গাইড করতে কেউ আসবেনা। আমাকে একাই করতে হবে।
কোনো কোনো বাচ্চা উতরে যায়। সেল্ফ সাফিশিয়েন্ট হয়। কনফিডেন্ট হয়। তাদেরকে নিয়েই স্টাডি হয় - ওয়ার্কিং ওম্যানদের বাচ্চারা সেল্ফ রিলায়েন্ট হয়, কনফিডেন্ট হয়। বাট এট হোয়াট কস্ট? খুব কম বাচ্চাই এজন্য নিজের মাকে এপ্রিশিয়েট করে। বেশিরভাগ বাচ্চাই ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স, সেপারেশন এংজাইটি, প্যানিক ডিজওর্ডার, যে কোনো বিপদের মুখে সহজে দিশাহারা হয়ে যাওয়া, এবিউজিভ পার্টনারের সাথে শুধুমাত্র অল্প কিছু মুহূর্তের ভালোবাসার জন্য থেকে যাওয়া - এরকম হাজারো সমস্যায় ভুগে।
এ তো গেল সায়েন্টিফিক কথাবার্তা।
ইসলামে একজন সন্তানের বাবামায়ের প্রতি হক্ব তিনটি - তার জন্য সুন্দর নাম রাখা, তাকে ইসলামের বিধিনিষেধ ও নিয়ম শিক্ষা দেয়া এবং সে অনুযায়ী বড় করা, প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিয়ে দেয়া।
বাচ্চারা অনুকরণপ্রিয়। ইসলামের বিধিনিষেধ শিখানোর সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে বাবা মা নিজে তা মেনে চলা। সন্তান যখন দেখছে মা দিনে পাঁচ বার জায়নামাযে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছে, বিকালে কুরআন তিলাওয়াত করছে, রামাদানে রোযা রাখছে, কোনোকিছুর জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করছে - তখন ধীরে ধীরে সে এগুলো শিখতে থাকে। দিনের অল্প সময় কোয়ালিটি টাইম দিয়ে এগুলো কি শিখানো সম্ভব? যারা এটাকে সম্ভব মনে করেন, সম্ভবত ইসলামের বিধিনিষেধ ও নিয়মগুলো সম্পর্কে তাদের সম্যক জ্ঞান নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন যারা বাসায় থাকে তাদের বাচ্চারা কি এ ধরণের সমস্যায় ভুগতে পারেনা? তাদের বাচ্চারা কি ১০০% ভালো আছে?
অবশ্যই তাদের বাচ্চাও উপরোক্ত সমস্যায় ভুগতে পারে যদি তারা মাইন্ডফুল প্যারেন্টিং না করেন। বাসায় থাকা গৃহিণী অফিস যান না বলে সবাই ভাবেন তার কোনো ক্যারিয়ার নাই। বরং তার ক্যারিয়ারটাই সবচেয়ে কঠিন। আর যদি যৌথ পরিবার হয় তাহলে তো কথাই নাই। পরিবারের সবার খেদমত করতে করতে বাচ্চাকেই দিনশেষে বঞ্চিত করা হয়৷
আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। ছোট ছোট হাত পা নিয়ে আল্লাহর সবচেয়ে আদরের বান্দারা দুনিয়ায় আসে। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের প্যারেন্টস হিসেবে কবুল করেন, আমাদেরকে তার প্রিয় বান্দাদের দায়িত্ব দেন। অথচ আমরা দুনিয়ায় নিজেদের জন্য জান্নাত বানানোর দৌড়ে আল্লাহর সেই নিয়ামতগুলোর উপর জুলুম করে চলি। এরপর আমরা আখিরাতে জান্নাতের আশা করি কিভাবে?
© Dr. Sadia Hossain
📌 সবার অবস্থা পরিস্থিতি প্রয়োজন এক নয়
এবং কেও কেও বাধ্য হয়েই কিছু করেন সেটা আলাদা কথা। তবে প্রত্যেকের ই এটা বুঝতে হবে যে একজন মুসলিম মা হিসেবে আমার আসল দায়িত্ব কর্তব্য আমি যথাযথভাবে আদায়ের চেষ্টা করছি তো?
Collected