07/09/2020
® #ত্রিপিটক_খুদ্দকনিকায়ে_মিলিন্দ_প্রশ্ন
#সদ্ধর্মশোভন_দেবশ্রী_মহাথের
#নাগসেন_ও_মিলিন্দের_পূর্বযোগ_কথা
৪. পূর্বযোগের অর্থ—তাঁহাদের পূর্বজন্মে কৃতকর্ম।
অতীতকালে ভগবান কশ্যপ-বুদ্ধের শাসনের সময় গঙ্গানদীর সমীপে এক আশ্রমে এক বৃহৎ ভিক্ষুসংঘ বাস করিতেন। তথায় ব্রত-শীলসম্পন্ন ভিক্ষুগণ প্রাতঃকালেই গাত্রোত্থান করিয়া যষ্টি সম্মার্জনী লইয়া বুদ্ধের গুণাবলি চিন্তা করিতে করিতে অঙ্গন সম্মার্জন করিতেন এবং আবর্জনাগুলি স্তূপীকৃত করিতেন।
৫. একদিন এক ভিক্ষু কোনো শ্রামণেরকে কহিলেন, এখানে এসো, শ্রামণের। এই আবর্জনাগুলি ফেলিয়া দাও। সে না শোনার মতো ভান করিয়া চলিয়া যায়। দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার আমন্ত্রিত হইয়াও সে না শোনার ন্যায় চলিয়া যায়। তৎপর সেই ভিক্ষু “এই শ্রামণের বড়ই অবাধ্য” চিন্তা করিয়া ক্রোধবশত সম্মার্জনী দণ্ডের দ্বারা তাহাকে প্রহার করিলেন। তখন সে রোদন করিতে করিতে ভয়ে আবর্জনা ফেলিবার সময়—“এই আবর্জনা নিক্ষেপজনিত পুর্ণ্যকর্ম প্রভাবে যে পর্যন্ত আমি নির্বাণ লাভ না করি, ইহার মধ্যে যে যে স্থানে জন্মধারণ করি না কেন আমি যেন মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় সমর্থ ও মহাতেজস্বী হই” প্রথমত এইরূপ প্রার্থনা করিল।
৬. আবর্জনা পরিষ্কার করিয়া সে স্নানের নিমিত্ত গঙ্গা নদীর ঘাটে গেল। গঙ্গার গড়গড় শব্দায়মান তরঙ্গবেগ দর্শন করিয়া—“যাবত আমি নির্বাণপ্রাপ্ত না হই তাবৎ জন্মে জন্মে যেন এই তরঙ্গবেগের ন্যায় প্রত্যুৎপন্ন ও অক্ষয় প্রতিভাসম্পন্ন হইতে পারি” এই বলিয়া দ্বিতীয়বার প্রার্থনা করিল।
৭. সেই ভিক্ষুও সম্মার্জনী-ঘরে সম্মার্জনী রাখিয়া স্নানের নিমিত্ত গঙ্গা তীর্থে যাইবার সময় শ্রামণের প্রার্থনা শুনিলেন এবং চিন্তা করিলেন, “এই শ্রামণের আমা দ্বারা নিয়োজিত হইয়াই যদি এরূপ প্রার্থনা করে তবে আমার প্রার্থনা কেন সিদ্ধ হইবে না?” এই চিন্তা করিয়া তিনিও প্রার্থনা করিলেন, “যতদিন আমি নির্বাণপ্রাপ্ত না হই, ইতিমধ্যে জন্মে জন্মে আমি যেন গঙ্গার তরঙ্গবেগের ন্যায় অক্ষয়-প্রতুৎপন্নমতি হই, ইহার দ্বারা জিজ্ঞাসিত সর্ববিধ জটিল প্রশ্নকে নির্জটিল করিতে ও ব্যাখ্যা করিতে সমর্থ হই।”
৮. তাঁহারা উভয়ে দেবলোক ও মনুষ্যলোক সংসরণ করিতে করিতে এক বুদ্ধান্তর কাল গত করিলেন। তখন ভগবান বুদ্ধ যেমন মোগ্গলিপুত্র তিষ্য স্থবির সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, সেইরূপ ইঁহাদের সম্বন্ধেও করিয়াছিলেন, “আমার পরিনির্বাণের পঞ্চশত বৎসর পর ইঁহারা দুজন জন্মগ্রহণ করিবে, আর যে সকল ধর্মবিনয় আমি সূক্ষ্মভাবে উপদেশ করিয়াছি, তাহারা তাহা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উপমা যুক্তিবলে সরল স্পষ্ট করিয়া বিভাগ করিবে।”
৯. তাঁহাদের মধ্যে সেই শ্রামণের জম্বুদ্বীপের সাগল নামক নগরে মিলিন্দ নামে রাজা হইলেন। তিনি বড় পণ্ডিত, চতুর, মেধাবী ও ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান মন্ত্র ও যোগবিধান ক্রিয়ার আচরণ করিবার পরীক্ষা করিতেন। তিনি অনেক বিদ্যা অধ্যয়ন করেন; যথা : (১) শ্রুতি (২) স্মৃতি (৩) সাংখ্য (৪) যোগ (৫) ন্যায় (৬) বৈশেষিক (৭) গণিত (৮) সঙ্গীত (৯) চিকিৎসা (১০) চতুর্বেদ (মতান্তরে ধনুবিদ্যা) (১১) পুরাণ (১২) ইতিহাস (১৩) জ্যোতিষ (১৪) জাদুবিদ্যা (১৫) হেতু বা তর্ক (১৬) মন্ত্রণা (১৭) যুদ্ধবিদ্যা (১৮) ছন্দ এবং (১৯) সামুদ্রিক এই ঊনবিংশতি শাস্ত্রে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন তার্কিক, দুর্ধর্ষ, দুঃসহ বিভিন্ন তীর্থঙ্করদের মধ্যে অগ্রণীরূপে সম্মানিত। সমগ্র জম্বুদ্বীপে মিলিন্দ রাজার ন্যায় শৌর্য, বীর্য ও পরাক্রমে এবং প্রজ্ঞায় অপর কেহ ছিলেন না। তিনি ধনাঢ্য, মহাধনী এবং বিপুল সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁহার সৈন্যসামন্ত ছিল অসংখ্য।
১০. তখন একদিন রাজা মিলিন্দ অনন্ত বলাবাহনযুক্ত স্বীয় চতুরঙ্গিনী সেনার দর্শন অভিলাষে নগরের বাহিরে গেলেন। তথায় গণনা করাইয়া বাদপ্রিয়, লোকায়ত ও বিতণ্ডাবাদীদের সহিত তর্কেচ্ছায় আলাপপ্রবণ, ঔৎসুক্যচিত্ত, নির্ভীক ও বিজৃম্ভনকারী সেই রাজা উপরদিকে সূর্য অবলোকন করিলেন এবং নিজের অমাত্যকে আহ্বান করিলেন, “এখনো অনেক সময় বাকি আছে, এত সত্বর নগরে প্রবেশ করার কী প্রয়োজন? এমন কোনো পণ্ডিত শ্রামণ, ব্রাহ্মণ, সংঘনেতা, গণনেতা, গণাচর্যা আছেন কি যিনি অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ সম্বন্ধে জানেন, যিনি আমার সহিত আলাপ করিতে ও আমার সন্দেহ নিরসন করিতে পারেন, যাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া সংশয় বিনোদন করিতে পারি?”
১১. এইরূপ উক্ত হইলে পঞ্চশত যবন রাজা মিলিন্দকে কহিলেন, “হ্যাঁ মহারাজ, ছয়জন ধর্মগুরু আছেন: (১) পূরণ-কাশ্যপ, (২) মক্খলি গোশাল, (৩) নিগণ্ঠ নাথপুত্র, (৪) সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্র, (৫) অজিত কেশকম্বলী ও (৬) ককুধ কচ্চায়ন। তাঁহারা সংঘনায়ক, গণনায়ক, গণাচার্য, প্রাজ্ঞ, যশস্বী ও তীর্থঙ্কর এবং বহুজনের দ্বারা সম্মানিত। মহারাজ, আপনি তাঁহাদের নিকট গিয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন এবং সংশয় নিরসন করুন।”