27/11/2025
মহান আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি কী? আরশ, পানি নাকি কলম? এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে ''ব্যাখ্যার ভিন্নতার'' কারনে। বিষয়টা আমাদের জন্য অতীব জরুরী কোন বিষয় নয়।
বাংলাদেশে জনৈক ব্যক্তি যে দাবি করেছে আল্লাহ তিন রকম কথা বলেছেন *নাউযুবিল্লাহ* তা পুরোপুরি মিথ্যা। মানুষ তিনরকম ব্যাখা করেছে।
কলম সর্বপ্রথম সৃষ্টি না কি আরশ সর্বপ্রথম সৃষ্টি এ ব্যাপারে আলেমগণ থেকে দু’টি কথা বর্ণিত হয়েছে। হাফেয আবুল আলা আল-হামাদানী এ মত দু’টি উল্লেখ করেছেন। এ মত দু’টির মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে কলমের পূর্বে আরশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ছহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
كتب الله مقادير الخلائق قبل أن يخلق السماوات والأرض بخمسين ألف سنة قال: وعرشه على الماء
‘‘আল্লাহ তা‘আলা আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। তখন তার আরশ ছিল পানির উপর’’।[ছহীহ বুখারী, হা/৩১৯১।]
এখানে সুষ্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আরশ সৃষ্টির পর তাকদীর লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আর কলম সৃষ্টি করার সময় তাকদীর লিখা হয়েছে। উবাদাহ বিন সামেত রাদ্বিয়াল্লাহুর হাদীছ দ্বারা এটি সাব্যস্ত।
নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ ‘‘আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন...’’ পুরো হাদীছ মিলে বাক্য মাত্র একটি হতে পারে আবার দু’টিও হতে পারে। বাক্য যদি একটি হয়, তাহলে অর্থ হবে আল্লাহ তা‘আলা কলম সৃষ্টি করে তাকে প্রথম আদেশ দিলেন, লিখো।
এ হাদীছের শব্দ থেকে বুঝা যায়। নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ: لَهُ اكْتُبْ এখানে اولَ শব্দের লাম বর্ণের উপর যবর এবং القلم শব্দের মীম বর্ণের উপর যবর দিয়ে পড়া থেকে বুঝা যায় বাক্য মাত্র একটি। আর যদি বাক্য দু’টি হয়, তাহলে এখানে اولَ শব্দের লাম বর্ণের উপর পেশ এবং القلم শব্দের মীম বর্ণের উপরও পেশদিয়ে পড়তে হবে। এতে করে অর্থ হবে কলএ প্রথম সৃষ্টি । এতে করে উবাদাহ ইবনে সামেত এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীছের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয়। কেননা আব্দুল্লাহ ইবনে আমরের হাদীছে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ রয়েছে যে, তাকদীর সৃষ্টির আগেই আরশ ছিল। আর তাকদীর ও কলম একসাথেই সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্য বর্ণনায় এসেছে,
«لما خلق الله القلم قال له: اكتب»
‘‘আল্লাহ তা‘আলা যখন কলম সৃষ্টি করলেন, তখন কলমকে বললেন, লিখো’’।[ত্ববারানী, মু‘আজুম কাবীর]
সুতরাং কলএ হলো প্রথম কলম, সর্বোত্তম কলম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কলম। একাধিক মুফাস্সির বলেন, এটি হলো সেই কলম, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা সূরা কলমের শুরুতেই শপথ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
ن وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ
‘‘নূন, শপথ কলমের এবং লেখকরা যা লিখে চলেছে তার’’। (সূরা কালাম: ১-২)
দ্বিতীয় কলম হলো, অহী লিখার কলম। এর মাধ্যমে নাবী-রসূলদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর অহী লিখা হয়। এ কলমের ধারকরাই সৃষ্টিজগতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। দুনিয়ার সমস্ত কলম তাদের কলমের সেবক।
মিরাজের রাতে নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এত উপরে উঠানো হয়েছিল যে, তিনি কলম দিয়ে অহী লিখার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন। এ কলমগুলো দিয়েই আল্লাহ তা‘আলার ঐসব অহী লিখা হয়, যার মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছু পরিচালনা করেন। উর্ধ্বজগৎ ও নিমণণজগতের যাবতীয় বিষয়ের অহী এ কলমগুলো দিয়েই লিখা হয়।
কুরআনের ২১টি আয়াতে আরশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। সে সমস্ত হাদীস মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌছেগেছে। মূলতঃ আরশ হলো আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। সেটা প্রকাণ্ড ও সর্ববৃহৎ সৃষ্টি।
আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর ‘আর্শ ছিল পানির উপর [১], তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ [২] তা পরীক্ষা করার জন্য [৩]। আর আপনি যদি বলেন, ‘নিশ্চয় মৃত্যুর পর তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে’, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, ‘এ তো সুস্পষ্ট জাদু [৪]। সূরা হূদ ।
১. অধিকাংশ বিদ্বানের মতে আরশ প্রথম সৃষ্টি যা ছিল পানির উপর।
২. অনেকের মতে আগে পানির সৃষ্টি তারপর আরশের।
৩. দুনিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রথম সৃষ্টি কলমের।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ প্রশ্নের ব্যাপারে জানিয়েছেন যে, কোত্থেকে এ প্রশ্নের সূত্রপাত, কিভাবে এ প্রশ্নের সমাধান দিতে হবে:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মানুষ প্রশ্ন করতেই থাকবে, করতেই থাকবে। এক পর্যায়ে বলবে: এ সৃষ্টিগুলোকে তো আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। তাহলে আল্লাহ্কে কে সৃষ্টি করেছে? যে ব্যক্তি এমন কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে সে যেন বলে, আমি আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনলাম।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, “তোমাদের কারো কাছে শয়তান এসে বলে, কে আসমান সৃষ্টি করেছে? কে জমিন সৃষ্টি করেছে? সে যেন বলে: আল্লাহ্। এরপর পূর্বের হাদিসের ন্যায় (আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনলাম) উল্লেখ করেছেন। সে বর্ণনাতে, رسله (রাসূলগণ) কথাটি অতিরিক্ত আছে। (অর্থাৎ আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি। অর্থ- আমি আল্লাহ্র প্রতি ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনলাম)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের কারো কাছে শয়তান এসে বলে: এটা এটা কে সৃষ্টি করেছে? এক পর্যায়ে বলে: তোমার প্রতিপালককে কে সৃষ্টি করেছে? যদি কারো প্রশ্ন এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন সে যেন আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং এ প্রসঙ্গ বাদ দেয়।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বান্দার কাছে শয়তান এসে বলে: এটা এটা কে সৃষ্টি করেছে?....”[উল্লেখিত সবগুলো হাদিস ইমাম মুসলিম সংকলন (১৩৪) করেছেন]