16/11/2021
বৈদিক খাদ্য বিজ্ঞান ও বৈদিক শাস্ত্রে অনুমোদিত আহার্য্য বস্তু
মানবের আহার কেমন হবে, সেটা বৈদিক শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় যেমন বর্ণিত হয়েছে, আবার বৈদিক শাস্ত্রের সারাতিসার গীতাতেও স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে উত্তম (সাত্ত্বিক), মধ্যম ( রাজসিক) ও অধম (তামসিক) আহার সম্বন্ধে। গীতায় বর্ণিত সাত্ত্বিক আহার হচ্ছে নিরামিষাহার; মাছ, মাংস, মস্তিষ্ক উদ্দীপক বস্তু যেমন পেঁয়াজ, রসুন, মদ ইত্যাদি রাজসিক আহার; এবং এই রাজসিক আহারগুলিই যখন বাসি, পঁচা, এঁটো অবস্থায় গ্রহণ করা হয়, সেটাই তামসিক আহার। প্রকৃতির তিন গুণ সত্ত্ব, রজো ও তমো বিভিন্ন মানবের মধ্যে বিভিন্নভাবে মিশ্রিত থেকে বিভিন্ন মানবের বিভিন্ন চেতনা তৈরি করে। ঠিক এ কারণেই কেউ পরোপকার করে আনন্দ লাভ করে, আবার কেউ বা অপরের অনিষ্ট করে আনন্দ অনুভব করে। মানবের দ্বারা প্রকাশিত কর্ম তার চেতনার অনুগামীই হয়ে থাকে। দৈনন্দিন জীবনের আহারের মধ্যেও তাই বিভিন্ন চেতনাধারী মানব তার চেতনার ভিন্নতা অনুযায়ী উত্তম, মধ্যম ও অধম আহারের মধ্যে যেকোন একটি বেছে নেয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিশ্র একটি আহারপদ্ধতিই বেছে নেয় মানব। সেজন্যই দেখা যায় যে, শুদ্ধ নিরামিষাশী আহারকারীর সংখ্যা যেমন কম, আবার নিরামিষবিহীন শুধুই মাংসাশী আহারকারীর সংখ্যাও কম। অধিকাংশ মানবই নিরামিষ-মাংসাশী আহার মিশ্রিত আহারকারী তাই। মানব যে তার চেতনার ধরন অনুযায়ী খাদ্য বাছাই করে, তার সহজ উদাহরণ হলো, কেউ বাজারে দুধ বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে পঁচা শুঁটকিমাছ কিনে নিয়ে আসে। আবার কেউ শুঁটকি বিক্রি করে সে টাকায় দুধ কিনে নিয়ে আসে। তাইতো এখনকার দিনে মানবকে কষ্ট করে মদের দোকান হতে মদ কিনে আনতে হয়, মদবিক্রেতাকে কখনো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নিকৃষ্ট আহার্য্য বস্তু মদ বিক্রি করতে হয় না। কিন্তু গোয়ালার বাড়িতে কেউ আদর্শ খাদ্য দুধ কিনতে যায় না। বরং গোয়ালাকেই আদর্শ খাদ্য দুধকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতে হয়, বা বাজারে গিয়ে ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তাই মদের দোকানে যতটা ভীড় থাকে দুধ বিক্রির স্থানে ঠিক ততটাই পাতলা থাকে। এখনকার জমানার সবকিছুই কেমন যেন উল্টো, বিপরীত। অর্থাৎ আদর্শ খাবার দুধ না কিনে যে মানুষ পঁচা গলা শুঁটকি কিনে নিয়ে আসে, সেটা তার চেতনা ও আসক্তির স্বরূপ দ্বারাই নির্ধারিত।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মানব যে মাছ, মাংস আহার করে, সেটার উদ্দেশ্য প্রতিদিনের দেহের ৮ টি অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিডের প্রয়োজনীয় চাহিদা পুরণের জন্য। এজন্য মানবের দৈহিক ওজন অনুযায়ী মাত্র ৬০-১০০ গ্রাম প্রোটিন বা আমিষের প্রয়োজন হয়। দেহ আমাদের কাছে সাত্ত্বিক বা রজোস্তমো আহার মাছ মাংস চায় না, সে ৮ টি অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড প্রয়োজনীয় পরিমাণে চায়। এবার আমরা সে অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড যেভাবেই সরবরাহ করি না কেন আমাদের দেহকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগাবার পাশাপাশি কোন খাদ্য দ্বারা আমাদের দেহের যেন কোন ক্ষতি না হয়, সেটা আমাদেরই লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ একই খাবার দ্বারা কোন প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেহকে যোগান দিলে সেই খাবারই যদি দেহের উপকারের পাশাপাশি ক্ষতিসাধন করে, তাহলে সে খাবার বর্জন করাই শ্রেয়। উদাহরণস্বরূপ, রেড মিট বা লাল মাংসের কথা বলা যেতে পারে। লাল মাংস দেহের এমাইনো এসিডের চাহিদা পুরণ করে ঠিকই কিন্তু এর কোলেস্টেরল সহ অন্যান্য ক্ষতিকর চর্বি ও ট্যাঙ্গেলস আমাদের অনেক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসলে আমাদের রসনা ও জিহ্বার লালসাই সেসকল রজোস্তমো আহার গ্রহণ করতে চায়। জগতের অধিকাংশ রজোস্তম সুস্বাদু খাবারই দেহের জন্য খুব বেশি উপকারী নয়, বরং দেহে অনেক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে থাকে। কিন্তু ভালো জিনিস সেরকম সুস্বাদু হয়না অনেক ক্ষেত্রেই। সেজন্যই স্বাস্থ্যের জন্য চিরতা উপকারী হলেও তিক্ততার জন্য এর রস কেউ খায় না, বরং কোমল পানীয় ক্ষতিকারক জেনেও অধিকাংশে সেটা আয়েশ করেই খায়। যাই হোক, সেই ৮ টি অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড যোগাবার জন্য রজোস্তমো আহার গ্রহণ করে দেহে রোগের আধার হিসেবে গড়ে তোলার নিশ্চয়ই কোন যুক্তি নেই। প্রতিদিন আধ লিটার দুধ, দুরকমের ডাল, একটু শিমবিচি হলেই প্রতিদিনের আবশ্যকীয় ও প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিডের চাহিদা পুরণ হয়ে যায়। আর সয়া প্রোটিন তো আছেই। তাহলে মাংসাশী হয়ে দেহকে রোগের আধার হিসেবে তৈরি করার যুক্তিটা কোথায়?
গীতাতে স্পষ্ট বর্ণনা আছে যে, সাত্ত্বিক আহার বলকারক, স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, রোগের আধার নয়, বরং রোগের উপশমকারী। নিরামিষাহার হচ্ছে সাত্ত্বিক আহার। রাজসিক আহার অতি সুস্বাদু, তাই প্রথমে খুব উপভোগ্য, কিন্তু পরিণামে দুঃখময়। মাছ, মাংস, বিভিন্ন উত্তেজক খাবার, মদ ইত্যাদি রাজসিক আহার যে খেতে খুবই সুস্বাদু, এটা সকলেই জানে। কিন্তু এসব আহার দেহে হাজারো ব্যাধির আগমন ঘটায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছে কিভাবে এসকল রাজসিক আহারের কারণে দেহে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনীর রোগ ইত্যাদি সহ শত রোগের আগমন ঘটে দেহে। আর এখনকার দিনে বাসি, পঁচা, গলা তামসিক আহার অধিকাংশে গ্রহণ করে না বলেই মনে হয়।
বৈদিক শাস্ত্র অতি প্রাচীনকাল হতেই ঘোষণা দিয়ে আসছে যে, মানবের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরামিষ আহারই শ্রেষ্ঠ। আর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও সেটাই বলে। কিন্তু কিছু শাস্ত্রে যে সীমিত আকারে প্রাণীজ আমিষাহারের অনুমোদন দেয়া আছে, সেটা গীতায় বর্ণিত সাত্ত্বিক আহারের নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে পরস্পরবিরুদ্ধ হবার কারণ কতগুলি আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে যুগধর্মের কারণে। ধর্মীয় রীতি বা প্রথা যুগের সাথে আংশিক পরিবর্তিত হতে পারে। সত্য যুগে যেখানে ধ্যান যুগধর্ম, ত্রেতাতে সেখানে যজ্ঞ, দ্বাপরে অর্চনা যুগধর্ম। আর কলির যুগধর্ম হলো নাম সঙ্কীর্তন। উদাহরণস্বরূপ, ধ্যানে চিত্তের একাগ্রতা ও নিবিষ্টতার জন্য সামান্য পরিমাণ উত্তেজক খাবার গ্রহণ নিষেধ। ঠিক এ কারণেই পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাবার নিষিদ্ধ। আহার যে মানবের শুধু দেহই গঠন করে না, তার মন ও চেতনার বিভিন্নতার জন্যও অনেকাংশে দায়ী, সেটার চাক্ষুষ প্রমাণ থাইল্যান্ডের এক মন্দির কর্তৃপক্ষের ১৩০ টি বাঘের শাবককে লালন পালনের ঘটনা। তাদেরকে দুধ, সবজি খাবার দিয়ে পালন করা হয়েছিল, তাই তারা বড় হয়েও হিংস্র হয়নি, অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীর ন্যায় তারাও নিরীহ প্রাণী হিসেবে গড়ে উঠেছে। পর্যটকেরা সেখানে ঘুরতে গিয়ে নির্ভয়ে বাঘের সাথে ছবি তুলে আসে। এজন্যই প্রবাদ আছে, "আপনি তাই যা আপনি খান।" ব্যবহারিক জীবনেও এটা প্রযোজ্য। নিরামিষ আহার গ্রহণকারীর চিত্ত স্থির, মন নির্মল ও শান্ত। তাই উপাসনার সময় সে সহজেই চিত্ত নিবিষ্ট করতে পারে সহজেই। আর তার মধ্যে ভোগেচ্ছার পরিমাণও কম থাকে বলে সে আরো অধিক ভোগ্য বস্তু আহরণের জন্য সমাজকে লুন্ঠন করে না। জগতে সাত্ত্বিক আহারের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। তাই সেই স্বল্প সংখ্যক ব্যঞ্জন আহরণের জন্যও আহারকারীর ভোগেচ্ছা বর্ধিত না হয়ে ক্রমশ কমতেই থাকে। বিপরীতক্রমে, রজোস্তামসিক আহারের সংখ্যা এবং ধরণও অসংখ্য। তাই রজোস্তম আহারকারীর কিন্তু সেসকল অসংখ্য ভোগ্য ব্যঞ্জনের ভোগেচ্ছা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। ভোগ্য বস্তুর সংখ্যা যদি অসীম হয়, তাহলে মানবের ভোগেচ্ছাও অসীমই হবে, যদি না সে নিজে থেকে সে ভোগ্য বস্তু ভোগের সীমানা নির্ধারণ না করে। আবার রজোস্তামসিক আহার গ্রহণকারীর চিত্ত থাকে অস্থির, তার মস্তিষ্ক সর্বদা থাকে উত্তেজিত। তাই সে থাকে অশান্ত, প্রায়শই উগ্র এবং ক্রোধী। সে অপরকে সহ্য করতেই পারে না, অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে। আবার প্রার্থনার সময় তার মন আরাধ্য সত্তায় সহজে নিবিষ্টও হয় না মনের অস্থিরতা হেতু।
যেসকল খাদ্য সাত্ত্বিক আহারের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে বর্জনের আদেশ, আবার ঔষধ হিসেবে সেসবের ব্যবহার অনুমোদিত। আধুনিক এলোপথি পেঁয়াজ হতে সর্দিকাশির ঔষধ আবিষ্কার করেছে, আয়ুর্বেদ সেসব জানতো, তাই সেও পেঁয়াজ হতে আরো অনেক প্রকার ঔষধ তৈরি করতো। তাই খাদ্য হিসেবে উত্তেজক খাবার পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি অনুমোদিত না হলেও ঔষধ হিসেবে সেসকল অনুমোদিত। ঠিক যেমন এলকোহল নিষিদ্ধ হলেও অধিকাংশ ঔষধেই কিন্তু দ্রাবক হিসেবে এলকোহল থাকে।
শাস্ত্রে যে আহার্য্য তালিকাকে পরস্পরবিরুদ্ধ মনে হয়, তার আরো গূঢ় কারণ আছে। প্রবৃত্তিমার্গ অনুসরণকারী অর্থাৎ ভোগী ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে সীমিত পরিমাণে ভোগ্য বস্তু স্বরূপ রজো-তামসিক আহার যেমন মাছ, মাংস ভোগ করার অনুমতি দিয়ে তাদেরকে ধীরে ধীরে নিবৃত্তিমার্গে উন্নীত করার জন্যই শাস্ত্রে সীমিত কয়েক প্রকারের মাংস ও মাছ ইত্যাদি রজো-তামসিক আহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জগতে সকলে জন্মগতভাবে বা সহসা নিবৃত্তমার্গের অনুসারী হতে পারে না। রজো-তামসিক বস্তু ভোগের প্রতি মানবের আকাংখ্যা দুনির্বার। তাই শুরু হতে সেই ভোগেচ্ছা পূর্ণরূপে দমন না করে সীমিত পরিমাণে ভোগ করে ধীরে ধীরে মানব ভোগী হতে ত্যাগীতে যেন রূপান্তরিত হতে পারে, সেজন্যই শাস্ত্রের এই সীমিত রজো-তামসিক আহারের প্রতি অনুমোদন। তবে যারা মুমুক্ষু, দেহমনের উপর আহারের প্রভাব সম্পর্কে জানেন, যারা তপস্যা বা ঈশ্বর সাধনার জন্য উপযোগী আহার গ্রহণের জন্য সাত্ত্বিক আহার গ্রহণে ইচ্ছুক, সুস্বাদু কিন্তু ক্ষতিকর রজো-তামসিক আহার ত্যাগে প্রস্তুত, তারা সেসকল সীমিত পরিমাণে অনুমোদিত রজো-তামসিক আহারও গ্রহণ করেন না। কিন্তু সকলেই তো আর জন্মাবধি এই উত্তম চেতনার অধিকারী হয়ে গড়ে ওঠে না।
আবার মানবের বর্তমান জন্মের আচরণের উপর তার পূর্বজন্মের সংস্কারের প্রভাবও ব্যাপক। যে পূর্বজম্মে রজো-তামসিক আহারে প্রচন্ড আসক্ত ছিল, সে বর্তমান জন্মেও সেই পূর্বজন্মের সংস্কার দ্বারা রজো-তামসিক আহারেই আসক্ত হবে। তাকে যদি শুরুতেই সেই রজো-তামসিক আহার সীমিত পরিমাণে না দেয়া হয়, তাহলে তার যেমন মনোদৈহিক বিকার দেখা দিতে পারে, তেমনই সে বিদ্রোহও করতে পারে। তাই এ ধরনের রজো-তামসিক চেতনার মানবকে অতি সীমিত পরিমাণে রজো-তামসিক আহারের অনুমতি দিয়ে তাকে ধীরে ধীরে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণের স্তরে উত্তীর্ণ করাটাই হচ্ছে শাস্ত্রের উদ্দেশ্য। আর একারণেই শাস্ত্রে সীমিত পরিমাণে রজো-তামসিক আহারের অনুমোদন। কিন্তু শাস্ত্রের উদ্দেশ্য আবার মানবকে সেই রজোস্তম আহারে আসক্ত করে রাখা নয়, বরং তাকে সে স্তর হতে সাত্ত্বিক স্তরে উত্তীর্ণ করা। কারণ অনেকের ভোগেচ্ছা অত্যধিক, তারা ভোগ না করে ত্যাগ করতে পারে না। এ ধরনের ভোগী ব্যক্তিকে ত্যাগীর স্তরে উত্তীর্ণ করার জন্যই শাস্ত্রের এ সিদ্ধান্ত। আর যে শুরু হতেই ত্যাগী ও সাত্ত্বিক, তার আর শাস্ত্রের সেই সীমিত অনুমোদিত রজোস্তমো আহারে আসক্তিও নেই, আর তার সে প্রয়োজনও পড়ে না।
ডাঃ শৈবাল
এবার সুকুমার চন্দ্র মন্ডলকে সাধুবাদ দিয়ে তার লেখাটি হুবহু তুলে দিলাম।
সংগৃহীত পোস্ট
লেখকঃ Sukumar Chandra Mondol
(হিন্দু ধর্মের সাপেক্ষে নিষিদ্ধ খাবারের সূচী)
হিন্দুদের কাছে খাবার বাছাই করা একটি ব্যাক্তিগত, পরম্পরাগত ও নির্দিষ্ট মতবাদের বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। কাজেই এমন অনেক হিন্দু আছেন যারা তাদের বংশানুক্রমিক পরম্পরা ও বিশ্বাসের জন্য কিছু জিনিস খাওয়া ত্যাগ করেছে। যেমন - ভারতের অনেক বৈষ্ণব সম্প্রদায় ভুক্ত হিন্দু (উত্তর ভারত) আছেন যাদের বাড়িতে মাছ তোলা নিষিদ্ধ। আবার অনেকের হিন্দু বাড়িতে (উত্তর-পশ্চিম ভারত) মাছ মাংশ দুটোই তোলা নিষিদ্ধ। কাজেই হিন্দুদের মধ্যে পরম্পরাগত, ব্যাক্তিগত ও বিশ্বাসী মতবাদগত ফ্যাকটর গুলির উপর অনেক অংশে নির্ভর করে নিষিদ্ধ খাবার গুলি বাছাই এর ক্ষেত্রে।
তাই কারো ব্যাক্তিগত বা পরম্পরাগত পছন্দ তে হস্তক্ষেপ করার জন্য এই নিবন্ধ টি লিখা হয়নি! বরং উক্ত নিবন্ধটি সেইসব বাঙালী হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য লিখা হয়েছে যারা হিন্দু সংস্কার (সম্প্রদায় ভিত্তিক নয়) কে অবলম্বন করে চলেন এবং জানতে ইচ্ছা রাখেন কোন কোন খাবার গুলো হিন্দু শাস্ত্রের সাপেক্ষে সিদ্ধ বা নিষিদ্ধ। এখানে হিন্দু শাস্ত্র বলতে বেদ, পুরাণ ও তন্ত্রের মূল গ্রন্থ গুলি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই বৈধ-অবৈধ খাবারের সূচীটি বানানো হয়েছে।
-
প্রাণীজ
-
{দুধ}
-
[১] উট ও ভেড়ার দুধ পান করা নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২২-২৩, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.১১-১২, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭০
-
[২] এক খুর বিশিষ্ট প্রাণীর (যেমন - ঘোড়া) দুধ পান করা নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৩, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭০
-
[৩] গরু, মোষ, ছাগলের বাচ্চা জন্মানোর পর থেকে ১০দিন যাবৎ তাদের দুধ পান নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৪, বসিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৩৫, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৯, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭০
-
[৪] নিচুস্তরের পশু (যেমন - কুকুর, বেড়াল) ও মাংসাশী পশুর (যেমন - বাঘ, সিংহ, শৃগাল) দুধ পান নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - লৌগাক্ষিগৃহ্ম সূত্রাণি ২.১৮৪
__________
{ডিম}
-
[১] হাঁস, মুরগি, ময়ুরের ডিম খাওয়া সিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মানব গৃহসূত্র ১.৪.২-৪, ভেল সংহিতা - চিকিতসাস্থানম - ২৬৭, চরক সংহিতা ২৭.৬৩-৬৪
__________
{মাছ-মাংস}
-
[১] সাপ, কুমীর, ঘড়িয়াল, শুশুক, সর্প আকৃতির মাছ, ব্যাঙ, অনিয়তকার মস্তক বিশিষ্ট মাছ (যেমন - ইল, কুঁচে মাছ, হাঙর, তিমি ইত্যাদি) ও জলজ শামুক, ঝিনুক, গুগলি ইত্যাদি খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪১, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.৩৬, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.৩৮-৩৯
-
[২] বন্য মোরগ/মুরগি খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৭.৬.৪
★ অর্থ্যাৎ গৃহপালিত মোরগ/মুরগি খাওয়া সিদ্ধ।
-
[৩] যে সমস্ত পাখী শুধু তাদের পা দিয়ে মাটিতে আঁচড়ে আঁচড়ে খাবারের সন্ধান করে এবং যেসব পাখীরা লিপ্তপদী (যেমন - হাঁস) তাদের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৮, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.৩৪-৩৫, বিষ্ণু স্মৃতি LI.২৮-৩১, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৭
-
[৪] রাজহাঁস, সারস, পানকৌড়ি, বক, কাক, পায়রা, টিয়া, ঘুঘু, তিতির, বাজ, চিল, শকূন, বাদুড়, ময়ূর, স্টার্লিং, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোঁকরা, মাছরাঙা এবং নিশাচর পাখীর মাংশ খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৮, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.৩৪-৩৫, বিষ্ণু স্মৃতি LI.২৮-৩১, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৭, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭২-১৭৪
-
[৫] মাংসাশী পাখির মাংশ আহার নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.৩৪, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭২
-
[৬] যেকোনো বিস্বাদ ও খাদ্য অনুপযোগী মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মনু স্মৃতি ৫.১১-১৭, বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৪
-
[৭] যে সমস্ত পশুর দুধের দাঁত ভাঙেনি তাকে জবাই করা নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৫, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.৩০-৩১
★ অর্থ্যাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক পশুর মাংস আহার নিষিদ্ধ।
-
[৮] যে সমস্ত পশুর একটি মাত্র চোয়ালে দাঁত আছে (যেমন-ঘোড়া) তাদের মাংস আহার নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪০, মনু স্মৃতি ৫.১৪, বিষ্ণু স্মৃতি LI.৩০
-
[৯] যে সমস্ত প্রাণীর পা বহু অংশে বাঁকা। যেমন শজারু, কাঁটাচয়া, শশক, খরগোশ, কচ্ছপ, গোধা, গোধিকা ইত্যাদির মাংশ খাওয়া সিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৩৯, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.২৭, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৫, মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৭.৬.৪
-
[১০] গণ্ডার ও বন্য শূকরের মাংশ খাওয়া সিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৭, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৫
-
[১১] নরমাংস বা নরাকার যন্তুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মহানির্ব্বাণ তন্ত্র ৮.১০৮
-
[১২] গৃহপালিত পশু, ছাগল, ভেড়ে, শূকরের মাংশ খাওয়া বৈধ।
তথ্যসূত্র - বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.১-৪
★ অর্থ্যাৎ গৃহপালিত শূকরের মাংস বৈধ।
-
[১৩] গ্রাম্য শূকরের মাংস নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৭.৬.৪, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৯
★ গ্রাম্য শূকর বলতে ফালতু শূকরের সেইসব প্রজাতি গুলোকে বোঝানো হয়, যারা আকারে ছোটো এবং পঙ্কিল নোংরা স্থানেই শুধু বাস করে। নোংরা স্থানে থাকার জন্য এদের মাংসে কৃমিজাতীয় পরজীবীর সিস্ট থাকে যা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করলে মানুষ সংক্রমিত হয়। উক্ত কারণের জন্য গ্রাম্য শূকরের মাংস নিষিদ্ধ কিন্তু গৃহপালিত শূকর নয়।
-
[১৪] যেকোনো মৃত প্রাণীর মাংস আহার করা নিষিদ্ধ। তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৬.১৬
-
[১৫] বহু উপকারী গোজাতির মাংস আহার নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মহানির্ব্বাণ তন্ত্র ৮.১০৮, বিষ্ণু পুরাণ ৩.৩.১৫, ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ ১.৯.৯, বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৩-৪৫
-
[১৬] গৌর, ঘায়ল, সরাভ, ষাঁড় প্রভৃতি গো সম্প্রদায় ভুক্ত জীবের মাংস নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৩, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৯
-
[১৭] মাংসাশী প্রাণীর মাংস নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - মহানির্ব্বাণ তন্ত্র ৮.১০৮, গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.৩৪
★ মূলত মাংসাশী প্রাণী বলতে উচ্চতর প্রাণীদের বোঝানো হয়েছে যেমন - বাঘ, সিংহ, শৃগাল, বন্য কুকুর ইত্যাদি। এদের শিকার করা কঠিন এবং মাংস নিরস, দুর্গন্ধ এবং কুরুচিকর স্বাদ যুক্ত হওয়ার জন্য পরিত্যাজ্য।
-
[১৮] একখুর বিশিষ্ট প্রাণীর (যেমন - উটের) মাংস নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৯
-
[১৯] কৃষ্ণসার, নীলগাই, সাধারণ হরিণ, বন্য শূকরের মাংস খাওয়া বৈধ।
তথ্যসূত্র - বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৬
-
[২০] স্বাদু ও লবণাক্ত জলের মাছ (যেমন- বিভিন্ন মেজর ও মাইনর কার্প, খাঁড়ির মাছ ইত্যাদি) আহার হিসাবে গ্রহণ করা বৈধ।
তথ্যসূত্র - বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.৮
_______________
{অন্যান্য}
[১] মাদক দ্রব্য মিশ্রিত পানীয় নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২১
-
[২] সুরা ও সুরা প্রস্তুতের জন্য ব্যাবহৃত দ্রব্য সমূহ নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৫
-
[৩] ব্যাঙের ছাতা, শালগম নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৮, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৭১, বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৩৩
-
[৪] যেকোনো আহারে উপযোগী বীজ, ফল, মূল, সব্জি খাওয়া বৈধ।
তথ্যসূত্র - নারদ পুরাণ ১১.১২-২২
-
[৫] সুস্বাদু আহারে উপযোগী রস (যেমন - খেঁজুরের রস, তালের রস, আখের রস, ডাবের জল, ফলের রস ইত্যাদি), দুগ্ধজাত পদার্থ (যেমন - দুধ, ঘি, মাখন, দই) মধু ইত্যাদি বৈধ।
তথ্যসূত্র - নারদ পুরাণ ১৮.১২-১৩
-
[৬] রসুন, পেঁয়াজ, পলাণ্ডু খাওয়ার উপর বিতর্কিত বিধান আছে, কাজেই ইহা খাওয়া যেতে পারে।
★আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২৬, মনু স্মৃতি ৫.৫, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ১.১৭৬, বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৩৩ অনুসারে পেঁয়াজ রসুন খেলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অপরদিকে বৈদিক আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্র গুলিতে ভিন্ন চিকিৎসার কাজে পেঁয়াজ রসুনের ব্যাবহার উল্লেখ রয়েছে। কাজেই পেঁয়াজ রসুন খাওয়া কে নিষিদ্ধ বলা অযৌক্তিক।
-
[৭] টকে যাওয়া (ব্যাতিক্রম - দই) বা পচে যাওয়া বা কোনো খাবারে উভয়ে মিশ্রিত খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৭.২০, বৌধায়ন ধর্মসূত্র ১.৫.১২.১৫, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৬৭
-
[৮] কুকুর, বিড়াল, বানর, মহিষ প্রভৃতি বন্য প্রাণীর মাংস আহার নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র - লৌগাক্ষিগৃহ্ম সূত্রাণি ২.১৯৩, বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৩৩, মানব গৃহসূত্র ১.৪.২-৪
-
[৯] যে খাবারে কোনো পশু মুখ দিয়েছে তা খাওয়া নিষিদ্ধ। তথ্যসূত্র - গৌতম ধর্মসূত্র ১৭.১০, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৬৭
-
[১০] যে সব খাবারে পোকা জন্মছে তা খাওয়া নিষিদ্ধ। তথ্যসূত্র - আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১.৫.১৬.২৬, যাজ্ঞবল্ক স্মৃতি ৭.১৬৭
-
উক্ত নিষিদ্ধতার বাইরের খাদ্য বস্তু বা আহার সামগ্রী সমূহ বৈধ, কারণ সেইসব আহার সামগ্রীর উপরে নিষিদ্ধতা আরোপ হয়নি হিন্দুশাস্ত্র সমূহে।