01/05/2026
কর্মের গতি
লেখক- সাংখ্যযোগী পরমহংস দর্শনবিজ্ঞানী আচার্য্য স্বামী সমাধি প্রকাশ আরণ্য মহারাজ
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ সংসারে অনেক সময়ই এ প্রশ্ন মনে জাগে মানুষের জীবনে ভাগ্যের প্রাধান্য না কর্মের? সাধারণতঃ আমরা কোন কিছু লাভ করতে না পারলে ভাগ্যের দোহাই দিই। অথচ যখন আমার কাঙ্খিত বা অভীষ্ট বস্তু লাভ করি, তখন আমরা নিজের কর্মক্ষমতা বা কর্মকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে বসে যাই। আমাদের চরিত্রের মধ্যে এই দ্বিমুখী চিন্তাধারা অহরহঃ কাজ করে চলেছে। আমরা নিজেরাই কিন্তু এ বিষয়ে সচেতন নই। এর কারণ ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞানতা । ভারতীয় দর্শনের এক প্রধান শাখা- সাংখ্যদর্শন। সেখানে মানুষের কর্মফলকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করলে বোঝা যায় মানুষ নিজের ভাগ্য তৈরী করে নিজের কর্মের দ্বারা। এই কর্ম শুধুমাত্র হাতে করা কোন কাজ নয়। মানবের দ্বারা কৃত সব কাজই কর্ম। শুধু কৃত কাজই কর্ম নয়। আমরা মনের দিক থেকে যে চিন্তাভাবনা করি.;তাও আমাদের মানসিক কর্মের সৃষ্টি করে। কেউ যদি ঘরে বসে ভালো চিন্তা, সৎ আলোচনা, সৎ গ্রন্থাদি, পাঠ ইত্যাদি কর্ম করে তার দ্বারা সেই ব্যক্তির মানসিক কর্ম ভালো ফল দান করে। যেমন তার মনের প্রশান্তি মনের স্থৈর্য, সাধারণ লোকের চেয়ে বেশী হয়। সেজন্য এই ব্যক্তি কখনই এমন কোন কাজ করে না, যা তার পক্ষে বা অপর কোন ব্যক্তির পক্ষে কোন খারাপ কর্মের সৃষ্টি করে। অপর দিকে যদি কোন ব্যক্তি সব সময় খারাপ বই পড়া, চুরি-ডাকাতির চিন্তা, আলোচনা ও অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের কথা চিন্তা করে তবে তার দ্বারা প্রারদ্ধ কর্ম অসৎ কর্মেরই সৃষ্টি করবে। কারণ মানুষের মন পূর্বাহ্নে যে বিষয়ে চিন্তা করে তার কর্ম তাকে সেই অভিমুখে নিয়ে যায়। মানুষের মনই কর্মের কর্তা। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষের মানসিক কর্ম সৃষ্টি হয় আগে । এই মানসিক কর্মই মানুষকে সুপথগামী বা বিপথগামী করে। এইবার প্রশ্ন আসতে পারে বাস্তবক্ষেত্রে দেখাযায় দুটি যুবকের একজন চাকুরী লাভ করে, অপরজন করেনি। সাধারণভাবে আমরা বলি প্রথমজনের ভাগ্যটি ভালো কিন্তু একটু গভীরভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে পারবো আমাদের এই চিন্তাধারাটি ভ্রাপ্ত। চাকুরী করারূপ কর্মের ক্ষেত্রে যোগ্যতার একটি প্রশ্ন থাকে। এক্ষেত্রে যদি স্বীকার করেও নিই একই যোগ্যতা উভয়ের ক্ষেত্রে থাকা সত্বেও অপরজনের কর্মলাভ ঘটেনি । তার কারণ হয়তো তার মুরুব্বীর জোর নেই । এক্ষেত্রে স্বীকার করতে হবে এগুলি সামাজিক ব্যাধি। আমরা প্রায়শই সামাজিক জীব হিসাবে এই ব্যাধির শিকার হই। রোগ যেমন আক্রমন করার সময় প্রাণীর বিচার করে না। সেইরূপ সমাজ-সংসার যখন নিম্নগামী চিন্তার ধারক, বাহক হয়, সামাজিক জীব হিসাবে আমরাও তার অংশীদার হয়ে পড়ি, সেটা জ্ঞানতই হই বা অজ্ঞানতাবশত হই। ভারতীয় জীবনে উৎকোচ গ্রহণ, অসাধু সুযোগ গ্রহণ বর্তমান যুগের জীবনের অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। ভারতীয় শব্দটি আমি ইচ্ছাপূর্বকই যুক্ত করেছি কারণ গবেষণার ফলে জানা যায় ভারতীয় জীবনে নৈতিকতার মান অনেক দেশের চেয়ে নেমে যাচ্ছে। সুযোগ লাভ করলে আমরা এই অনৈতিকতার পথে অগ্রসর হতে পিছপা হইনা। সুতরাং বিষবৃক্ষের ফল তো অমৃত হতে পারে না। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, 'অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে, উভয়েই সম দোষী। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাও অন্যায়। বর্তমানযুগে এমনই সমাজিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবাদকারীর অনিষ্ট অনিবার্য। সমাজিক ক্ষেত্রে আজকে কংসই প্রাধান্য লাভ করছে। সুতরাং আমরাও আপনি বাঁচলে বাপের নাম বলে নিজেকে কোন ঝুট ঝামেলার মধ্যে জড়াতে চাইনা। ফলে তারই অনিবার্য ফল হিসাবে সামাজিক সংকট বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতার পর পরই যদি কড়া হাতে এই অসামাজিক প্রবণতাকে দমন করা যেত তাহলে অসৎ মানসিকতা এত বাড়তো না মনে হয়। মানুষের লোভ সততার অভাব, চোরাবাজারী, অসৎ কর্ম, অসৎ চিন্তা সমাজকে ছেয়ে ফেলছে। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা এই চিন্তাধারার সমর্থক হলেও পরোক্ষভাবে সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও প্রচারের মাধ্যমে শিশু কিশোরদের মনে হিংসা দ্বেষ, কখনো বা ভালোবাসার নামে হিংস্রতারূপ বীজ বপন করছি। এই ভাবেই চিন্তারূপ কর্মের দ্বারা মানসিক কর্মের কর্মফল সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিগত জীবনেও আমরা প্রত্যেক মানুষ, তার নিজস্ব ধ্যান ধারনা, চিন্তাধারাকে বেশী গুরুত্ব দিই ও সঠিক মনে করি। অথচ প্রত্যেক মানুষের চিন্তাধারার মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্য আসে তার স্বভাব বা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট থেকে। ভারতীয় দর্শন পূর্বজন্ম বিশ্বাস করে। ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী আত্মা অবিনশ্বর, এক দেহ ত্যাগ করে মানুষ তার কর্মফল অনুযায়ী পরবর্তী জীবনে প্রবেশ করে। এই জন্মের সংস্কার পরবর্তী জন্মেও সুপ্তভাবে থাকে। বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রকাশ ঘটে এই বিষয়ে বলা যায় এই জন্মে একজন পিতা বা মাতা অত্যন্ত স্নেহশীল। পরবর্তী জন্মেও তার এই সংস্কার তার চরিত্রের মধ্যে কাজ করে, যদিও স্নেহের পাত্রে পরিবর্তন ঘটে। এইভাবে দেখা যায়, প্রতিটি মানুষের মনের ধারণা বা ভাবের পার্থক্য অনুযায়ী মানসিকতার প্রভেদ থাকে । কিন্তু এই প্রভেদকে আমরা সহজভাবে মেনে নিতে পারি না। পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে এ থেকেই সৃষ্টি হয় নানা ভুল বোঝাবুঝির ও নানা অশাস্তির। আমরা সবাই ভাবি, ‘আমিই সঠিক’ মানুষে মানুষে বিভেদ মেনে নিয়েও যদি উন্নততর চিন্তাধারার শরিক হতে পারি তবে অনেক অশান্তি, বিরোধ মিটে য়ায় জীবনকে সহজভাবে নেওয়া এবং ব্যক্তিচরিত্রের উন্নয়ণের প্রচেষ্টার ধারা অব্যাহত রাখারূপ কর্ম দ্বারা মহৎ কর্মফলের সৃষ্টি করা যায় । এতে সামাজিক উন্নয়ণ ও সম্ভব। কারন সমাজ তো মানুষ নিয়েই। মানুষ যদি ভালো হয়, তবে সমাজও ভালো হবে। আজকের যুগে একথা হাস্যকর মনে হবে সব লোককে ভালো করা অবাস্তব কথা। হিন্দু পৌরানিক মতে প্রাচীন সত্য যুগে মানুষ মিথ্যাকথা বলতো না। তাই তাকে সত্য যুগ বলা হোত। কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ সত্যযুগের সত্যতা সম্ভন্ধে বিশ্বাস না করলেও ইতিহাস কে তো অস্বীকার করতে পারবে না। মধ্যযুগের ইতিহাস বলছে ইউয়েন সাঙ যখন এদেশে এসেছিলেন মানুষ ছিল অত্যন্ত সৎ রাতে মূল্যবান জিনিস বাইরে পড়ে থাকলেও চুরি ডাকাতি, হত না। মানুষ রাতে দরজা খুলে ঘুমোত, সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি সমাজ, সংসারকে পরিবর্তন করতে গেলে আগে মানুষকে পরিবর্তিত হতে হবে। আর এই পরিবর্তন বাইরে থেকে কখনো করা সম্ভব নয়। আর এইসবের পশ্চাতে দারিদ্রই একমাত্র কারণ নয়। স্বভাবের মধ্যে কুচিন্তার প্রভাব মানুষকে অসৎ হতে সাহায্য করে। মানুষ যখন নিজের দোষ, ত্রুটি বুঝতে পারে এবং তার পরিবর্তনের ইচ্ছা এবং প্রয়োজন বুঝতে পারে তখনই নিজেকে পাল্টানো সম্ভব। আর এজন্য, চরিত্রের ভালো ও মন্দ বিষয়গুলি সম্মন্ধে স্পষ্ট ধারণার প্রয়োজন। চুরি, ডাকাতি, খুন, মারপিট, উৎকোচ গ্রহণ এগুলি অত্যন্ত খারাপ ;কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে আমরা এমন অনেক কাজ করি যেগুলো অন্ততঃ ভালো কাজ নয়। এগুলি আমাদের মানসিক কর্ম থেকে সৃষ্টি হয়। প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের মধ্যে নানা কামনা, বাসনার সৃষ্টি হয় আজকে এই ভোগবাদীযুগে মানুষের চাহিদার শেষ নেই। সবাই চাই আরামে ও সুখে থাকতে, কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে এই সুখে থাকা বা আরামে থাকার মাপকাঠি কোথায় বা শেষ কোথায় বা শুরু এটা কেউ বলতে পারছে না। ফলে যখনই আমার কোন চাহিদা বা কামনা বাধা পাচ্ছে। তখনই তাই থেকে সৃষ্টি হচ্ছে লোভ ক্রোধ, পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা। এই ভাবে প্রতিনিয়ত আমার মানসিক কর্ম আমাকে খারাপ কর্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর আমরা ভাগ্যকে দোষারোপ করছি। এইবার আমাদের বুঝতে হবে দেহ ধারণ করলেই দেহ রক্ষার জন্যও কর্ম করতে হবে। নইলে দেহ বাঁচে না। সমাজও বাঁচে না। কিন্তু শুদ্ধ কর্ম অর্থাৎ ভালো কাজ মানুষকে উন্নত করে। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন -কর্ম করো কিন্তু 'মা ফলেষু কদাচন'। অনেক সময় এর অর্থকে বিকৃত করা হয়। ফল ছাড়া কি কৰ্ম হয় ? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন জীবনের ধর্ম - কর্তব্য করা। এই কর্তব্য কর্মই মানুষকে সঠিক পথ দেখাবে। কর্ম সম্মন্ধে বিচার করতে গেলে নিজের মন ও চিত্ত বৃত্তিকে বুঝতে হবে। নিজের মনকে আয়নার মতো স্বচ্ছ রাখতে হবে। প্রত্যাবেক্ষা অর্থাৎ নিজেকে ফিরে ফিরে দেখার দ্বারা, বার বার মনকে যাচাই করতে হবে। কোন কামনা কোন বাসনা, সেই মনের উপর ঢেউ তুলছে- অবসর সময়ে তাকে পর্যবেক্ষণ, আলোচনা ও সমালোচনা করতে হবে। আরো একটু সহজ করে বললে মনে হয় বুঝতে সহজ হবে। ধরি, আজ প্রভাতে কোন কারনে আমি ক্রুদ্ধ হয়েছি বা কারো উপর বিরক্ত হয়ে তাকে কটূ কথা বলেছি। দিনের কোন অবসর সময়ে আমি বুদ্ধিরূপ টর্চের আলো ফেলে মনের সেই কোন্টিকে দেখতে পেলাম। সেখানে কি দেখবো? কোন একটি প্রত্যাশা বা কামনা বাধা পাবার ফলে আমার মনের প্রতিক্রিয়া থেকে এরূপ ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল। কবি তাই বলেছেন – “রাগ কমিয়া গেলে মনে দুঃখ পাই।” সুতরাং আমাকে বুঝতে হবে মনের চেয়ে বুদ্ধি বড়। এইবার বুদ্ধি দিয়ে মনকে সংযত করতে হবে। “শ্রুতি বলছে" ইলিয়েভ্যঃ পরা হথা অর্থে ভ্যশ্চ পরং মনঃ। মনসস্তু পরা বুদ্ধি বুদ্ধেরাত্মা মহান পরঃ।” এইভাবে নিজ চরিত্রকে সংশোধন করতে হবে। চরিত্র সংশোধন কথাটি বলা বা লেখা যত সহজ কাজটি কিন্তু তত সহজ নয়। চরিত্র সংশোধন করার জন্য আগে মনকে এমন একটা স্তরে নেবার চেষ্টা অহরহ চালাতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে নিরবচ্ছিন্ন সুখ কোন মানুষ সমস্ত জীবন ধরে লাভ করতে পারে না। জীবন ধারন করলেই সুখ দুঃখ উভয়কেই মেনে নিতে হবে। সমগ্র জীব জগতে মানবজন্ম সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। মানুষ অমৃতস্য পুত্রাঃ। আমরা যদি মূল বিষয়টিকে মনে রাখতে পারি তবে জীবন ধারণের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম হবে। প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বরের অংশ রয়েছে। ক্ষুদ্র বৃহৎ জীবাত্মামাত্রই পরমাত্মার অংশ। সাংখ্যমতে প্রতিটি আত্মাই ঈশ্বর কিন্তু জীব নিজ স্বরূপকে জানে না। সাধনা দ্বারা সমাধি দ্বারা, সিদ্ধ হলে জীব যখন নিজ আত্মাকে, স্ব- রূপকে জানতে পারে তখন সে ব্রহ্মা হয়, ঈশ্বর হয়। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সুন্দরভাবে এই তত্বটিকে বুঝিয়েছেন, “আমি সর্বভূতে অবস্থিত, কিন্তু সর্বভূত আমাতে নেই।” আমরা মূর্খ মানুষ ক্ষুদ্র পাথরে, মন্দিরে দেউলে ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ করি । অতিরিক্ত ভোগ অথবা অতিরিক্ত উপবাস বা সাধনার নামে কঠোরতা করে দেহস্থিত পরমাত্মার অংশ জীবাত্মাকে কষ্ট দিই। ভগবানের কথায় “নিজেরাও কষ্ট পায়, আমাকেও কষ্ট দেয়” আমরা যদি মনে রাখতে পারি – এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি শুধুমাত্র আত্মসুখের জন্য নয়। আমি বলতে আমি এবং আমার পরিবারই শুধু নয়, আমার গন্তব্য আরো দূরে কোথাও কোনো সুদূরে । ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করে মহৎ হওয়া, মহতের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলা। সেই চলাই ‘চরৈবতি'। মৃত্যুকে সেই ফিরে যাওয়া মনে করলে ভুল হবে। কারণ মৃত্যু তো একটা পরিবর্তন মাত্র। জীর্ণ বস্ত্রের মতো একটি দেহ ত্যাগ করে অপর দেহে যাওয়া ।সেই বস্ত্র ত্যাগের মতোই ব্যাপার। তবে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায় জীবনে এসে একটা দাগ রেখে যাবার প্রচেষ্টাই আসল। জীবনধারণের মূল উদ্দেশ্যকে যদি মাথায় রাখা যায়। তবে সংসারের সুখ-দুঃখ লাভ ক্ষতির চুল-চেরা বিচার মনকে পীড়া দেবে না -
"I slept and deamt
That life is beauty, But I woke and found
That life is duty." এই বোধ সম্মন্ধে গীতা বলছেন- যারা কর্মকে অকর্ম ও অকর্মকে কর্ম বলে বোঝেন তাদের সেই বোঝার মধ্যে যথার্থতা খুঁজতে হবে। অর্থাৎ আমরা জীবন ধারণের জন্য সব কিছুকে গুলিয়ে ফেলি। সেটাকেই মূল উদ্দেশ্য বলে ভাবি। অথচ আমরা যদি বুঝতে চেষ্টা করি। জীবনে বিত্ত লাভ ও পার্থিব সুখ লাভ একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না তবে দুঃখ কে মেনে নেওয়া সহজ হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে আত্মকেন্দ্রিকতা ও সম্পদ লাভের মধ্য দিয়েই সম্পূর্ণ সুখী হওয়া যায় না। জরা, ব্যাধি মৃত্যুরূপ দুঃখকে চিরদিনের জন্য ঠেকানো যায় না। কাজেই আমাদের মনগড়া সুখের সন্ধান না করে মনকে তৈরী করতে হবে এমন যা সুখে দুঃখে নিরুদ্বিগ্নমনা হতে পারে। আর এইভাবে মনকে তৈরী করতে হবে। এইভাবে মনকে তৈরী করা সাধারণ কাজ বা সাধারণ লোকের কাজ নয়। সত্ত্ব, রজঃ ও তম- এই তিনগুণের ফলেই মানুষ সব কাজ করে। মানুষ যখন বুঝতে পারবে সে যা করে তা এই তিনগুনের প্রভাবেই করে তখন সে নিজেকে অর্থাৎ নিজের স্বভাব ও চরিত্রকে পর্যালোচনা করতে পারবে। মানুষের মধ্যে সব সময় এই গুণগুলিই কাজ করে। সত্বগুণের ফল প্রকাশশীলতা। রজোগুণের ফলে মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য ও গতিশীলতার লক্ষণ দৃষ্ট হয়। তমঃগুণে মানুষের সৎগুণকে আবৃত করে নিদ্রা ও অলসূতা দিয়ে জীবকে আবদ্ধ করে রাখে। তখন জীব সেই গুণ অনুযায়ী কর্ম করে। মানুষ যদি মনকে ঈশ্বরাভিমুখী রাখতে পারে এবং ঈশ্বরের শান্ত সমাহিতরূপের ধারণায় মনকে স্থির করতে পারে তবে মানুষের স্বভাব ও চরিত্রের মধ্যে সেই প্রশান্তির প্রকাশ ঘটে। তখনই সেই মানুষের মধ্যে দার্শনিক মনোবৃত্তির জন্ম হয়। তার ফলে সংসারের সুখ-দুঃখ, শীত-গ্রীষ্ম, আনন্দ-বেদনা, লাভ লোকসান - সবকিছুকে সহজভাবে নেবার ক্ষমতা জন্মায়। আমাদের গ্রামীন কবির ভাষায় সংসারে সে তখন থাকে ‘পাকাল মাছের মত। তাই তো কবির উপদেশ -
‘আমার যেমন বেণী, তেমনি রবে, চুল ভিজাবো না, বেণী ভিজাবো না,
ঈশ্বরে মন ন্যস্ত করলে তখন এই পার্থিব দুঃখকে একটা বিরাট কিছু বলে মনে হয় না। মন তখন ঈশ্বরের সান্নিধ্য, ঈশ্বরের উপলব্ধি চায়। সাধক মানুষ তখন বুঝতে পারে পার্থিব সুখে বর্তমানে মুগ্ধ হলে ভবিষ্যতে দুঃখ পেতে হয়। তাই পার্থিব সুখও সে কামনা করে না, দুঃখ সহজ করার শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করে। একেই বলা হয় কর্মফল ত্যাগ ও ঈশ্বরে কর্মফল অর্পণ আর এই কর্মফল ত্যাগ করাকেই কর্মযোগ বলা হয়। অথচ লক্ষ্যনীয়, ঈশ্বরে শরণকারীর মঙ্গল আপনিই আসে। ঈশ্বরের কাছে তার কিছু চাইতে হয় না সৎ কর্মের ফলে সৌভাগ্য তৈরী হয়। সুতরাং আমরা একটু গভীরভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে পারবো ভক্তি, কর্ম, জ্ঞান এবং যোগ সবই অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এক-কে ধরলে অপরও আসবে। ঈশ্বরে মন ন্যস্ত করাই প্রথম কাজ। পথ ও পদ্ধতি পরের পদক্ষেপ। যোগ হচ্ছে সেই পরবর্তী পদক্ষেপ। সুখ ও শাস্তির তাই একমাত্র পথ। এছাড়া আর কোন পথ নেই। আমরা মোহের বশে ভুল পথে ঘুরে নিজেদের দুঃখ নিজেরাই ডেকে আনি। তাই মনকে ঈশ্বরাভিমুখী করার চেষ্টাই সাধনা। এই দেহের মধ্যে আত্মারূপী ঈশ্বর অবস্থান করছেন তাঁকে চেনার জন্যই সাধনা। সেই সাধনার অনেক ধাপ। সেই ধাপের পর ধাপে এগিয়ে চলা এবং আত্মজ্ঞানকে জাগানো ঈশ্বর-সাধনার অঙ্গ। সেই সাধনাই সৎকর্মের দ্যোতক এবং সৎ কর্মের স্রষ্টা। সৎ কর্মের ফলও কখনোই অশুভ হতে পারে না। সৎ ভাবনা নিয়ে সৎকর্মই মানুষের জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা হতে পারে ।
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। 🙏🌸🙏 জয় গুরু 🙏🌸🙏