19/06/2026
*"যিনি ব্রহ্ম তিনিই মা তিনিই অবতার"* — এই কথাটা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের। অদ্বৈত বেদান্তের সার কথা তিনি এক লাইনে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
*১. তিন রূপে একই সত্তা*
*ব্রহ্ম* = নির্গুণ, নিরাকার। কোনো রূপ নেই, গুণ নেই। যেমন বিশাল সমুদ্র — স্থির, অনন্ত। এটা বেদান্তের "ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা"র সেই ব্রহ্ম।
*মা* = সগুণ, সাকার। সেই নির্গুণ ব্রহ্মই যখন শক্তি হয়ে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় করেন, তখন তিনি মা কালী, দুর্গা, জগজ্জননী। সমুদ্রে যখন ঢেউ ওঠে, সেটাই শক্তি। ঠাকুর বলতেন, "ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ। আগুন আর তার দাহিকা শক্তি যেমন আলাদা নয়।"
*অবতার* = যখন সেই ব্রহ্ম-মা জীবের কল্যাণে মানুষ রূপে আসেন, তখন তিনি অবতার। রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ। সমুদ্রের জলই যখন বরফ হয়ে ভাসে, তাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায় — সেটাই অবতার।
*২. ঠাকুর কী বোঝাতে চেয়েছেন?*
১. *ঝগড়া নেই*: শাক্ত বলবে মা বড়, বৈষ্ণব বলবে কৃষ্ণ বড়, বেদান্তী বলবে ব্রহ্মই সব। ঠাকুর বললেন, তর্ক কোরো না। যাঁকে ব্রহ্ম বলছ, তাঁকেই মা ডাকছ, তিনিই আবার যুগে যুগে আসছেন।
২. *রূপ আর অরূপ এক*: কেউ নিরাকারে ডাকে, কেউ মূর্তি পুজো করে, কেউ গুরুকে মানে। সব পথই একই ছাদের দিকে যাচ্ছে। "যত মত তত পথ" এর ভিত্তি এটাই।
৩. *ভয় ভাঙানো*: অনেকেই ভাবে নির্বিকল্প সমাধিতে ব্রহ্মজ্ঞান হলে মা-কালী মিথ্যে হয়ে যায়। ঠাকুর তোতাপুরীর কাছে অদ্বৈত সাধনার সময় মা কালীকে "খড়্গ দিয়ে দু-খণ্ড" করতে গিয়েও কাঁদলেন। শেষে বুঝলেন — যে ব্রহ্ম, সেই মা।
*৩. সহজ উদাহরণ ঠাকুরের*
"জল স্থির থাকলেও জল, হেললে-দুললেও জল, আর বরফ হলেও জল।"
- *স্থির জল* = নির্গুণ ব্রহ্ম
- *ঢেউ তোলা জল* = সগুণ মা, আদ্যাশক্তি
- *বরফ* = অবতার, মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে
*৪. আমাদের জন্য কী শিক্ষা?*
১. *ঘৃণা নয়*: কালীভক্ত বৈষ্ণবকে, বা নিরাকারবাদী সাকারবাদীকে ছোট ভাববে না। সবাই একই জনকে ডাকছে।
২. *ভয় নেই*: তুমি মা মা করে কাঁদো, না হয় ব্রহ্ম-ব্রহ্ম করে ধ্যান করো — যেটা ভালো লাগে। পৌঁছাবে একই জায়গায়।
৩. *মানুষে ঈশ্বর দেখা*: অবতার মানে শুধু রাম-কৃষ্ণ নয়। যে মানুষের মধ্যে ত্যাগ, প্রেম, জ্ঞান দেখবে, জানবে তাঁর মধ্যেই তিনি একটু বেশি প্রকাশিত।
*শেষ কথা*: ঠাকুর বলতেন, "মাটির হাঁড়িতে জল থাকে, সোনার হাঁড়িতেও জল থাকে। জলটা আসল।" ব্রহ্ম, মা, অবতার — নাম আলাদা, পাত্র আলাদা, কিন্তু বস্তু এক।
*জয় মা। ওঁ তৎ সৎ।*