28/02/2026
|| আজ গোবিন্দ দ্বাদশী তিথিতে শ্রীহৃদয়চৈতন্য ঠাকুরের তিরোধান তিথি মহোৎসব ||
শ্রীহৃদয়চৈতন্যের পূর্বনাম শ্রীহৃদয়ানন্দ। তিনি শ্রীগদাধর পণ্ডিতের ভ্রাতা দ্বিজ বাণীনাথের পুত্র এবং দ্বাদশ গোপালের অন্যতম শ্রীগৌরীদাস পণ্ডিত এর মন্ত্রশিষ্য তথা জগদগুরু শ্রীশ্রী শ্যামানন্দ প্রভুর শ্রীগুরুপাদপদ্ম।
"বন্দে শ্রীহৃদয়ানন্দং মগ্নং প্রেমরসে সদা ৷
মহাভাব--চমৎকার-গৌরভাব- কলেবরম্ ! "
[ শা° নি° ৫৮ ]
▪️সুবলসখার অবতার শ্রীগৌরীদাস পণ্ডিত শ্রীগৌরনিত্যানন্দের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পর একদিন শ্রীগদাধর পণ্ডিতের গৃহে যান। প্রাতে তাঁকে দেখে গদাধর পণ্ডিত অপরিসীম আনন্দে অভিভূত হন। কিছুক্ষণ শ্রীগৌরাঙ্গলীলার আলোচনা চলার পর তিনি আগমনের কারণ জানতে চান। তখন শ্রীগৌরীদাস জানান—বয়স বৃদ্ধ হওয়ায় প্রভুদের সেবার জন্য একজন সহকারী প্রয়োজন, তাই তিনি গদাধর প্রভুর ভ্রাতুষ্পুত্র হৃদয়কে ভিক্ষা নিতে এসেছেন।
সব বুঝে গদাধর পণ্ডিত সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ানন্দকে ডেকে তাঁর হাতে সমর্পণ করেন। শ্রীগৌরীদাস আনন্দভরে তাঁকে অম্বিকায় এনে শৈশব থেকেই শাস্ত্রশিক্ষায় শিক্ষিত করেন। ভক্তিরস থেকেই হৃদয়ানন্দের স্বভাব গঠিত হওয়ায় তাঁর অন্তরে দ্রুত প্রেমভক্তির বিকাশ ঘটে। উপযুক্ত বয়সে শ্রীগৌরীদাস নিজে তাঁকে দীক্ষা দিয়ে শ্রীনিতাইচৈতন্য সেবায় নিয়োজিত করেন। হৃদয়ানন্দও সেই সেবাকে প্রাণের ধন জেনে সর্বান্তঃকরণে আত্মনিয়োগ করেন। তা দেখে শ্রীগৌরীদাস নিশ্চিন্ত হন—নিজের পরেও প্রিয় ঠাকুরের সেবা যোগ্য হাতেই থাকবে। এরপর তিনি শান্ত মনে ভজন-সাধনায় অধিক মনোনিবেশ করেন।
▪️শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথির অল্প পূর্বে গৌরীদাস পণ্ডিত এক শিষ্যের গৃহে গমন করেন এবং শ্রীশ্রী গৌর-নিত্যানন্দের সেবার ভার অর্পণ করেন তাঁর শিষ্য হৃদয়ানন্দ-এর উপর। গভীর ভক্তিভাবে অভিভূত হয়ে হৃদয়ানন্দ পরম একাগ্রতায় তাঁদের সেবা করতে লাগলেন। মহোৎসবের আর মাত্র তিন দিন অবশিষ্ট থাকলেও গৌরীদাস পণ্ডিত প্রত্যাবর্তন না করায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে নিজ উদ্যোগে ভক্তবৃন্দকে নিমন্ত্রণপত্র প্রেরণ করলেন।
এই সময় গৌরীদাস পণ্ডিত আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করে বাহ্যত অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে স্বতন্ত্রভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য তাঁকে তিরস্কার করলেন এবং আশ্রম ত্যাগের নির্দেশ দিলেন। হৃদয়ানন্দ বিনীতচিত্তে গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে গঙ্গাতীরে এক বৃক্ষতলে অবস্থান করতে লাগলেন। অল্পকাল পর এক ধনবান বণিক নৌকাযোগে এসে গৌরীদাস পণ্ডিতের উদ্দেশ্যে বিপুল অর্থদান হৃদয়ানন্দের হাতে অর্পণ করলেন। পরে গুরুর নিকট উপস্থিত হলে গৌরীদাস তাঁকে গঙ্গাতীরে এক মহামহোৎসব আয়োজনের আদেশ প্রদান করেন। গুরু-আজ্ঞা শিরোধার্য করে হৃদয়ানন্দ মহাসংকীর্তনের আয়োজন করলেন এবং চারিদিক থেকে বৈষ্ণবসমাজ সমবেত হতে লাগল। সেই উল্লাসময় কীর্তনের মধ্যেই শ্রীশ্রী গৌর-নিত্যানন্দ স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে নৃত্য-গীত পরিবেশন করলেন, যা হৃদয়ানন্দ স্বচক্ষে দর্শন করলেন।
এদিকে মন্দিরের পূজারি সিংহাসনে বিগ্রহদ্বয়কে অনুপস্থিত দেখে বিষয়টি গৌরীদাস পণ্ডিতকে জানালেন। তিনি বুঝলেন, হৃদয়ানন্দের প্রেমবৃদ্ধির জন্যই প্রভুদ্বয় কীর্তনে গমন করেছেন। তখন গৌরীদাস পণ্ডিত হাতে লাঠি নিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হলেন। তাঁর গম্ভীর ভাব দর্শন করে গৌর-নিত্যানন্দ অন্তর্ধান করে হৃদয়ানন্দের হৃদয়ে প্রবেশ করলেন। এই অলৌকিক দৃশ্য উপলব্ধি করে গৌরীদাস পণ্ডিত প্রেমাবেশে অশ্রুসিক্ত হয়ে শিষ্যকে আলিঙ্গন করে বললেন— “আজ থেকে তোমার নাম ‘হৃদয় চৈতন্য’, কারণ তোমার হৃদয়ে শ্রীচৈতন্য বিরাজমান।”
কৃষ্ণপ্রেমে অভিভূত হৃদয় চৈতন্য বিনম্রভাবে গুরুচরণে পতিত হলেন। পরে গৌরীদাস পণ্ডিত তাঁকে গৃহে নিয়ে এসে প্রাঙ্গণে মহাসংকীর্তনের মাধ্যমে নৃত্য-গীতে মগ্ন হলেন; ভক্তবৃন্দের “হরি! হরি!” ধ্বনিতে দশদিক মুখরিত হয়ে উঠল। এভাবেই শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাব মহোৎসব সমাপ্ত হলো। পরিশেষে গৌরীদাস পণ্ডিত হৃদয় চৈতন্যকে দিব্যসেবার পূর্ণ অধিকার প্রদান করে আশীর্বাদ করলেন।
▪️শ্রীগৌরীদাস পণ্ডিতের প্রতি যেমন শ্রীহৃদয়চৈতন্যের অনন্য গুরুভক্তি ছিল, তেমনি শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুরও নিজের গুরু শ্রীহৃদয়চৈতন্যের প্রতি ছিল আরও গভীর নিষ্ঠা।
দুঃখী (শ্রীশ্যামানন্দের পূর্বনাম) পিতামাতার অনুমতি ও বিদায় নিয়ে শুভ ফাল্গুন মাসে গঙ্গাযাত্রীদের সঙ্গে অম্বিকা নগরে শ্রীগুরুর সন্ধানে উপস্থিত হন। তাঁকে দেখে শ্রীহৃদয়চৈতন্য কৃপাপ্রসন্ন হন এবং সব কথা শুনে এত অল্প বয়সে তাঁর কৃষ্ণভক্তি দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন। শুভ ফাল্গুনী পূর্ণিমায় তিনি দীক্ষা দিয়ে তাঁর নাম রাখেন “দুঃখী কৃষ্ণদাস” এবং ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে বৃন্দাবনে তাঁর “শ্যামানন্দ” নাম প্রসিদ্ধ হবে। এরপর দুঃখী কৃষ্ণদাস কিছুদিন গুরুসেবায় নিয়োজিত থাকেন।
পরে শ্রীগুরুদেব তাঁকে শ্রীধাম বৃন্দাবনে যাওয়ার আদেশ দেন। গুরু থেকে বিচ্ছেদে অনিচ্ছা থাকলেও আজ্ঞাপালন করেই তাঁকে যেতে হয়। বৃন্দাবনে তাঁর গভীর কৃষ্ণভক্তি দেখে বৈষ্ণবসমাজ মুগ্ধ হয়ে যায়। অম্বিকা থেকে শ্রীহৃদয়চৈতন্য পত্র লিখে শ্রীজীব গোস্বামীকে জানান—প্রাণপ্রিয় শিষ্য দুঃখী কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে সমর্পণ করলেন, যেন কৃপা করে তাঁর সাধ পূর্ণ করেন। একই সঙ্গে শিষ্যকেও নির্দেশ দেন, শ্রীজীব গোস্বামীকে গুরুর ন্যায় মান্য করে পরম ভক্তিভাবে সেবা করতে।
▪️এরপরই ঘটে শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুর প্রসিদ্ধ নূপুরপ্রাপ্তির লীলা। শ্রীশ্যামানন্দ তিলক পরিবর্তন করেছেন শুনে শ্রীহৃদয়চৈতন্য অন্তরে সব বুঝলেও শিষ্যের মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য বাহ্য ক্রোধ প্রকাশ করে বৃন্দাবনে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ তিলক তোকে কে দিয়েছে?”
শ্রীশ্যামানন্দ বিনীতভাবে বারবার উত্তর দিলেন, “প্রভু, আপনিই আমাকে দিয়েছেন; আপনার কৃপা ছাড়া অন্য কারও শক্তি নেই।” তখন বহু বৈষ্ণবের সামনে গুরুদেব তাঁর কপালের নূপুরচিহ্ন ছুরি দিয়ে মুছে ফেলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু পাঁচ দিনেও না বেরোল রক্ত, না মুছল চিহ্ন—শ্রীরাধারাণীর কৃপায় তা অক্ষত রইল।
এ দৃশ্য দেখে বৈষ্ণবরা বিস্মিত হলেন। শেষে শ্রীহৃদয়চৈতন্য শিষ্যকে বুকে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে বললেন, “বাপ দুঃখী কৃষ্ণদাস, আজ থেকে এই তিলকই আমি তোকে দিলাম।” শ্রীশ্যামানন্দও গুরুচরণে নিবিষ্ট হয়ে রইলেন।
▪️"যং লোকভুবি কীর্তয়ন্তি হৃদয়ানন্দস্য শিষ্যং প্রিয়ং ।
সখ্যে শ্রীসুবলস্য যং ভগবতঃ প্রেষ্ঠানুশিষ্যং তথা ॥
স শ্রীমান্ রসিকেন্দ্রমস্তকমণিশ্চিত্তে মমাহর্নিশং ।
শ্রীরাধাপ্রিয়নর্মমর্মসু রুচিং সম্পাদয়ন্ ভাসতাম্ ॥"
অর্থঃ
যিনি এই জগতে হৃদয়ানন্দের অতি প্রিয় শিষ্যরূপে প্রসিদ্ধ, যিনি ভগবানের পরম প্রিয় সখা শ্রীসুবল সখার শিষ্য-পরম্পরায় অবস্থিত, এবং যিনি রসরসিক ভক্তবৃন্দের শিরোমণি— সেই শ্রীমান শ্যামানন্দ প্রভু দিনরাত্রি আমার চিত্তে প্রকাশিত হোন এবং শ্রীরাধার প্রিয় নর্মবিলাসের গুপ্ত রসতত্ত্বে আসক্তি ও রুচি প্রদান করুন।
(শ্রীরসিকানন্দ প্রভু বিরচিতম্ শ্রীশ্রীশ্যামানন্দ-শতকম্)