02/01/2026
কল্পতরু দিবসের গল্প
দিনটা ছিল ৩১শে ডিসেম্বর। শীতের রাতে বাড়িটা নিস্তব্ধ। বাইরে কুয়াশা পড়ছে, ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ছবির সামনে একটি প্রদীপ। রাই প্রতিদিনের মতো ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটি ছোট কাগজে তার মনের কথাটা লিখল— কাগজটা সে যত্ন করে ঠাকুরের ছবির সামনে রেখে শুয়ে পড়ল।
ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাসটা তার।
পয়লা জানুয়ারি এলেই রাই জানে—আজ বিশেষ দিন। আজ কল্পতরু উৎসব। এই দিনটায় তাদের বাড়িতে যেন এক আলাদা উৎসবের আমেজ থাকে। দাদু-ঠাম্মা, বাবা-মা সবাই মিলে ভোর থেকে রান্নাবান্না শুরু করেন। খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস—সব মিলিয়ে ঠাকুরের ভোগ। ধূপ-ধুনোর গন্ধে সারা বাড়ি ভরে ওঠে।
ছোটবেলায় রাই শুধু জানত—আজ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব ইচ্ছা পূরণ করেন। কিন্তু কেন করেন, কীভাবে করেন, কেনই বা কৃপা কল্পতরু তাকে বলা হয়?—সেসব তখন সে বুঝত না।
এখন তার বয়স ১২ বছর।
পয়লা জানুয়ারির সকালে সে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে ,স্নান সেরে নতুন জামা পরে ঠাকুরঘরে ঢুকল। মা শ্রীতমা তখন আলপনা দিচ্ছিলেন।
রাই মায়ের পাশে বসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“মা, তুমি তো বলেছিলে আজ ঠাকুর কল্পতরু হয়েছিলেন। কল্পতরু মানে কী গো?”
শ্রীতমা মৃদু হেসে বললেন,
“তুমি চুপচাপ বসে শোনো।
শ্রীতমা, বলতে শুরু করলেন—
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সাল ছিল ১৮৮৬ তাঁর গলায় ক্যান্সার হয়েছিল। তখন তিনি থাকতেন কাশিপুর উদ্যানবাটিতে। শরীর খুব দুর্বল ছিল। ভক্তরা তাঁকে দেখতে আসতেন।
রাই মন দিয়ে শুনছিল।
এমনই একদিন,
“১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি,”
“সেদিন ঠাকুর একটু সুস্থ ছিলেন। ঠাকুর জানতেন গৃহি ভক্তরা তার সাথে একটিবার দেখা করার জন্য প্রতিদিন কাশিপুর উদ্যানবাটিতে আসেন। যেহেতু তিনি অসুস্থ থাকেন তাই তাদেরকে ফিরে যেতে হয়।
পয়লা জানুয়ারির দিনটিতে ঠাকুর একটু সুস্থ ছিলেন , সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমের আস্তে আস্তে ঠাকুর বাগানের দিকে যান। সেখানে বসে ছিলেন তার গৃহী ভক্তরা, ঠাকুরকে দেখে তখন তারা হতবাক। ঠাকুরের ভক্ত নাট্যকার গিরিশ ঘোষ দেখে বলেন ঠাকুর তুমি এসেছ। ঠাকুর ভক্তদের কাছে এগিয়ে গেলেন। সকল ভক্তদের স্পর্শ করলেন এবং বললেন" তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক"।
ঠাকুরের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই ভক্তরা নিজেদের মধ্যে অভূতপূর্ব অনুভূতি অনুভব করলেন।
যা পরবর্তীতে, সেই সময়ে উপস্থিত ভক্তরা নিজেরাই বর্ণনা করেছেন।
গৃহী ভক্তরা ঠাকুরের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই, জোরে জোরে বলতে লাগলেন ওরে তোরা কে কোথায় আছিস দেখে যা আজ আমাদের ঠাকুর কৃপা-কল্পতরু হয়েছেন।
সেই সময় থেকে ঠাকুরের এই কল্পতরু উৎসবের শুভারম্ভ। সকল ভক্তরা আজকের দিনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে বিবেক ,বৈরাগ্য ও চৈতন্য দেওয়ার জন্য।
রাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আজকের দিনে ঠাকুর বিবেক চৈতন্য এগুলো দান করেন?
শ্রীতমা দেবী বললেন, হ্যাঁ মা আজকের দিনে ঠাকুরের কাছে প্রেম ভক্তি শ্রদ্ধা দিয়ে যারা প্রার্থনা করেন তাদের ঠাকুর চৈতন্য ,বিবেক, বৈরাগ্য দান করেন।
রাই একটু চুপ করে থেকে বলল,
“তাহলে আমি যা কাগজে লিখেছি… ভালো মানুষ হতে চায় সেটা ঠিক তো মা?”
শ্রীতমা রাইকে বুকে টেনে নিলেন।
“একদম ঠিক। ঠাকুর আজও শুনছেন। কল্পতরু মানে শুধু ইচ্ছা পূরণ নয়, মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।”
ঠিক তখনই ঠাকুরঘরের ঘণ্টা বেজে উঠল। ধূপের গন্ধে ঘর ভরে গেল। রাই চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল—
“ঠাকুর, আমাকে ভালো মানুষ হতে চাই”
আর সেদিন থেকেই রাই বুঝে গেল—
কল্পতরু মানে শুধু চাওয়া নয়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রতিটা কথা, প্রতিটা বাণী মেনে চলা।
কলমে :বর্ষা ঘোষ
আজ ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন আজ কল্পতরু উৎসব। আজকের দিনে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব কৃপাকল্পতরু রূপে দর্শন দিয়েছিলেন ভক্তদের।
আমার লেখায় গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই আপনারা নামসহ শেয়ার করতে পারেন। 🙏
গল্পটি আপনাদের পড়ে কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন। 🙏
ইংরেজি নববর্ষের সকলকে শুভেচ্ছা রইল
গল্প ও কবিতায় কন্ঠে বর্ষা