16/03/2025
ইসলামে শিক্ষক ও শিক্ষকতার গুরুত্ব
"ইসলামে শিক্ষক : জ্ঞান ও সৎকর্মের চিরন্তন উত্তরাধিকার(ধারক এবং বাহক)"। মুসলিম সমাজে প্রচলিত গভীর অর্থবহ উক্তিটি, “শিক্ষকের মৃত্যু হয় না, ছাত্রের আমলের মধ্যে সে পুনর্জীবিত হয়...” — ইসলামে শিক্ষকতার মর্যাদাকে চিরন্তনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। একজন শিক্ষকের প্রভাব(জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা) শুধুমাত্র ব্যক্তিকে নয় বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে। তাইতো ইসলামে শিক্ষকতা এবাদতের স্থান প্রাপ্ত, আর শিক্ষক পবিত্র মর্যাদা এবং ঐশ্বরিক পুরস্কারের সুসংবাদ প্রাপ্ত।
ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্ব :
আল্লাহ তাআলা কুরআনে জ্ঞানের মর্যাদাকে উচ্চস্থানে স্থান দিয়েছেন:
**“قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ”**
“বলো, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”(সুরা আয-যুমার ৩৯:৯)।
প্রথম ওহি নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাযিল হয়েছিল “পড়!” (সুরা আলাক ৯৬:১) আদেশের মাধ্যমে, যা জ্ঞানার্জনের কেন্দ্রীয়তা প্রতিষ্ঠা করে। শিক্ষকরা জ্ঞানের মশাল বহনকারী হিসেবে এই ঐশ্বরিক মিশন পূরণ করেন।
নবীজি (সা.): সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক :
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ইসলামের সর্বোত্তম শিক্ষক। তিনি বলেছেন:
“إن الله وملائكته وأهل السموات والأرض حتى النملة في جحرها وحتى الحوت ليصلون على معلم الناس الخير”
“নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান-জমিনের সকল সৃষ্টি—এমনকি পিপীলিকার গর্তের পিপীলিকা ও সমুদ্রের মাছও—সেসব মানুষের জন্য রহমত প্রেরণ করে, যারা মানুষকে কল্যাণ শেখায়।” (তিরমিজি)।
এই হাদিস শিক্ষকতাকে ইবাদতের মর্যাদা দেয়, যা ইহকাল এবং পরকালের রহমতের দরজা খুলে দেয়।
শিক্ষকতার চিরন্তন পুরস্কার :
একজন শিক্ষকের বিতরণ করা জ্ঞান "সাদাকায়ে জারিয়া" হিসেবে অমর হয়ে থাকে। নবীজি (সা.) বলেছেন:
**“إذا مات ابن آدم انقطع عمله إلا من ثلاث: صدقة جارية، أو علم ينتفع به، أو ولد صالح يدعو له**
“মানুষ যখন মারা যায়, তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ব্যতীত: চলমান সদকা, উপকারী জ্ঞান, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম)।
জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের সৎকর্মের মাধ্যমে চিরস্থায়ী সওয়াব লাভ করতে থাকেন :
1.
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)
ইমাম আবু হানিফা ইসলামী আইন (ফিকহ) নিয়ে যে অসাধারণ কাজ করেছেন, তার রচিত বিধান ও ফিকহীয় ব্যাখ্যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ মুসলমানের জীবনে পথপ্রদর্শক হয়ে আছে। আজ পর্যন্ত তাঁর জ্ঞানের আলো থেকে যে কেউ উপকৃত হলে ইমাম আবু হানিফা সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবেন।
ইমাম বুখারী (রহ.)
ইমাম বুখারী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "সহিহ আল-বুখারী" সংকলন করেছেন, যা মুসলমানদের জন্য হাদিসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ উৎস হিসেবে স্বীকৃত। যুগে যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর সংকলিত হাদিস পড়ে ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছে। প্রতিবার যখন কেউ তাঁর গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আহরণ করে বা আমল করে, ইমাম বুখারীও সেই সওয়াবের ভাগী হন।
2.
ইবন আল-হাইথাম (আলহাজেন) (রহ.) — বিজ্ঞানের গবেষণা পদ্ধতির পথপ্রদর্শক।
ইবন আল-হাইথাম ছিলেন একজন বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী যিনি বিজ্ঞানের গবেষণায় Scientific Method বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি-এর ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের একটি পদ্ধতি তৈরি করেন যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফাতিমা আল-ফিহরি :
৮৫৯ সালে আল-কারাওইয়িন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন।
তাইতো, কুরআনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী:
**“يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ”**
“আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা উচ্চ করবেন।” (সুরা আল-মুজাদালা ৫৮:১১)।
আর, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ দীনার বা দিরহাম (সম্পদ) উত্তরাধিকার রেখে যান না; বরং তাঁরা রেখে যান জ্ঞান। অতএব, যে ব্যক্তি এই জ্ঞান অর্জন করল, সে বিরাট অংশ লাভ করল।"
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হল সে, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে তা শেখায়।"
...... সংগৃহীত।