03/01/2024
#একদিন কথায় কথায় কেষ্টদা শ্রীশ্রীঠাকুরকে বললেন, - “আপনার বাণীগুলি ইংরেজি ভাষায় তর্জমা করতে গিয়ে দেখেছি তা’তে তার মৌলিক ভাবটা বজায় রাখা কঠিন। তাই আপনি যদি সরাসরি ইংরেজি ভাষায় কিছু বাণী দেন তা’ ভালো হয়।”
তাঁর কথা শুনে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন --- “আপনারা এতদিন আমার সঙ্গে আছেন, আমাকে একটা সম্পূর্ণ ইংরেজি বাক্য কখনো বলতে শুনেছেন কি? ভাষা না জানলে, তার দ্বারা ভাব প্রকাশ করা কি সম্ভব?”
তাঁর এ প্রতিবাদ সত্ত্বেও কেষ্টদা বললেন, --- “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি ইচ্ছা করলে ইংরেজী ভাষাতেও বাণী দিতে পারেন।”
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে হঠাৎ এক সময় কেষ্টদাকে ডেকে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন,--- “শীগ্গীর কাগজ-পেন্সিল নিয়ে আসুন!” ...... তারপর অনর্গল ইংরেজিতে বলে যেতে লাগলেন, ---কি ক’রে সৃষ্টি, অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হয়ে উঠল,---
“The booming commotion of Existence,
that rolls in the bosom of the Beyond,
evolves into a thrilling rhyme
and upheaves
into a shooting becoming of the Being,
with echoes thet float
with an embodiment of Energy:---
that is Logos, the Word, the Beginning.
..... এই ভাবে তিনি ব’লে যেতে লাগলেন, দিনের পর দিন! ----
এই বাণীগুলির পান্ডুলিপি নিয়ে প্রথমে শ্রদ্ধেয় কেষ্টদা ও শুশীলদা স্কটিশচার্চ কলেজের প্রিন্সিপাল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলার Dr. W. S. Arquhart (M.A. D. Litt) এর নিকট যায়। তিনি এর কয়েক পাতা প’ড়ে বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে বললেন, --- “শ্রীশ্রীঠাকুরকে আমি আপনাদের উৎসব উপলক্ষ্যে পাবনা গিয়ে দেখে এসেছি। কিন্তু আমি ত’ জানতাম তিনি মোটেই ইংরেজী জানেন না। এখন এই লেখা প’ড়ে দেখছি যে এতে কতগুলি word এমন archaic sense এ ব্যবহার করা হয়েছে, --- যা’ একজন perfect master of the English tongue ছাড়া আর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। it is something like a revelation to me!”
শ্রীশ্রীঠাকুরের ইংরেজী dictation শেষ হলে একদিন তাকে প্রশ্ন করা হল,--- “আপনি ইংরেজী না জেনেও এ-ভাষায় এমন সুন্দর বাণী দিলেন কি ক’রে?”
উত্তরে তিনি বললেন --- “আপনারা ধরে পড়লেন,- আমিও ভাবতে লাগলাম। ..... দেখলাম, নদীর জলে যেমন মাছের ঝাঁক বেরিয়ে যায়, সেইরকম ভাব-রাজি ইংরাজী ভাষায় ভূষিত হয়ে ভেসে চ’লে যাচ্ছে। আমি তাদের ধরে-ধরে আপনাদের কাছে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। ..... ওসব কথার মানে যদি এখন আমায় জিজ্ঞাসা করেন, তা’হলে হয়তো’ আর তা’ বলতে পারব না।”
----“তাই যদি হয়, তবে ত’ আপনি শুধু ইংরেজি কেন, অন্য যে কোনও ভাষাতে,--- যেমন ধরুন জার্মান ভাষাতেও, এ-রকম অনর্গল বাণী দিতে পারেন?”
শ্রীশ্রীঠাকুর একটু ভেবে বললেন, “হয়ত’ তা’ সম্ভব,--- কিন্তু একটা impulse দরকার।”
----Impulse বলতে আপনি কী mean করছেন?
----“ধরুন একজন জার্মান ভাষা জানা লোক যদি আমার কাছে থাকে আর মাঝে-মাঝে ঐ ভাষায় দু’-একটা কথা বলতে শুরু করে, তা’হলে সেটা sufficient impulse হতে পারে আমার কাছে, --- হয়ত’ ঐ ভাষায় বাণী দেওয়ার পক্ষে।”
সুশীলদা অবাক হয়ে বললেন --- “বলেন কী ঠাকুর! আমরা ছেলেবেলা থেকেই ইংরেজী লিখতে-পড়তে আরম্ভ করেছি, তবু এত বয়সেও ইংরেজী লিখতে বা বলতে গেলে বেশ যেন একটু বেগ পেতে হয়। আর আপনি বলছেন --- দু'-চারটা কথা শোনার পরেই আপনি যে-কোন বিদেশী ভাষায় বিশুদ্ধভাবে উত্তর দিতে পারেন? এ-কথা ত’ আমরা ভাবতেও পারি না!”
শ্রীশ্রীঠাকুর শুধু বললেন,--- “তা’ কেন, ওরকম ত’ সবারই হতে পারে।”
তাঁর এই ইংরেজী বাণীগুলি ১৯৩৫ সালে, ‘The Message’ নাম দিয়ে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলে, তার এক কপি ল’-কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ ও পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার শ্রীপ্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে পড়ে। তাঁর Stenographer শ্রীভূষণ মিত্র তাঁকে বইটি পড়তে দিয়েছিলেন।
বইখানি প’ড়ে তিনি ভূষণদাকে জিজ্ঞাসা করেন,--- আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে থাকেন, এমন কোন ব্যক্তি এখানে এখন আছেন কি?
ভূষণদা সুশীলদাকে প্রমথবাবুর কাছে নিয়ে গেলে তিনি বললেন,--- “শুনেছিলাম আপনাদের ঠাকুর নাকি লেখাপড়া জানেন না। তারপরে যখন কানে এলো যে তিনি ইংরেজীতে বই লিখেছেন, তখন মনে করলাম, তাঁর কাছে উচ্চ-শিক্ষিত ব্যক্তি যাঁরা আছেন তাঁরাই হয়তো’ বই লিখে তাঁর নামে চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার নিজেরও একটু গর্ব আছে যে আমি ইংরেজী বেশ ভালই জানি, কিন্তু বইখানা প’ড়ে বুঝলাম, শুধু আমি কেন, কোনও University product এর পক্ষে এ লেখা সম্ভব নয়। কাজেই মেনে নিতে বাধ্য হলাম যে এ-সব শ্রীশ্রীঠাকুরেরই লেখা--- and so wonderful!”
‘The Message’--- প্রকাশিত হওয়ার পরেও শ্রীশ্রীঠাকুর মাঝে-মাঝে ইংরেজীতে যে সব বাণী দিয়েছেন, সেগুলি বিষয়ানুক্রমে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আরও ৮ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে।
‘The Message’ প্রকাশিত হলে শ্রদ্ধেয় কেষ্টদা শ্রীশ্রীঠাকুরকে এবার ধরে বসলেন,--- ছড়ায় বা কবিতায় কিছু বলতে,--- যা’ সকলেই, এমনকি মেয়েরাও সহজে বুঝতে পারে।
শ্রীশ্রীঠাকুর হেসে বললেন,--- “আমি কি কবি, যে ছড়ায় বা কবিতায় কিছু বলব?”
কেষ্টদা নাছোড়বান্দা হয়ে ধরাতে শ্রীশ্রীঠাকুর ছড়ায় বা ছন্দে বলতে শুরু করলেন। .....প্রকৃতপক্ষে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছ থেকে এই সব অমৃতময়ী বাণী বের ক’রে নেওয়ার কৃতিত্ব, শ্রদ্ধেয় কেষ্টদার। বাছুরে যেমন ঠুকরে-ঠুকরে গাভীর দুধ বের ক’রে, কেষ্টদা সেই রকম নিরন্তর লেগে থেকে, শ্রীশ্রীঠাকুরের ভান্ডার থেকে এই রত্নগুলি আহরণ করেছেন। পরে এইসব ছাড়া বা কবিতা ‘অনুশ্রুতি’ নামে বইয়ে কয়েক খন্ডে ছাপা হয়েছে।
“মাতৃভক্তি অটুট যতঃ
সেই ছেলে হয় কৃতী তত।”
“ধর্মে সবাই বাঁচে-বাড়ে
সাম্প্রদায়টা ধর্ম না রে।”
----ইত্যাদি slogan সৎসঙ্গে প্রচলিত আছে, যা’ শ্রদ্ধেয় কেষ্টদাই চেষ্টা ক’রে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছ থেকে বের ক’রে নিয়েছিলেন।
✓ সংগ্রহীত......
• মানসতীর্থ পরিক্রমা (পৃঃ- ২৫৫-২৫৬)।
• সুশীলচন্দ্র বসু।