28/05/2026
|| মঙ্গলচণ্ডিকা ||
বঙ্গে বহুকাল ধরেই পূজিতা হচ্ছেন মঙ্গল চণ্ডী। কেবলমাত্র বঙ্গ বলে নয় আসাম , ত্রিপুরা , ওড়িশ্যাতেও তার পূজা লক্ষিত হয়। তিনি মঙ্গলকারিনী তথা মঙ্গলের আরাধ্যা তাই মঙ্গলচণ্ডিকা নামে বিখ্যাতা। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচিত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যও এনাকে আধার করেই রচিত। সারাবছর প্রতি মঙ্গলবারে দেবীর পূজাদি হলেও জৈষ্ঠ্য মাসে তার পূজা সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। সাধারণত মনসা , শীতলার মতোন এনাকেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লৌকিক অনার্য দেবী বলা হয়ে থাকলেও আদতে ইনি তা নন। ইনি সম্পুর্ণ একজন শাস্ত্রীয় দেবী। দেবী_ভাগবত_মহাপুরাণ , ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে তাঁর উল্লেখ আছে। এনার কৃপাতেই করেই মহেশ্বর ত্রিপুরাসুর বধ করে ত্রিপুরারি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। মূলত লৌকিকভাবে পূজিতা হলেও আদতে ইনি তন্ত্রাচারে পূজ্যা তথা বলিপ্রিয়া। স্বরূপগতভাবে এনাকে অতিসৌম্যা বলে মনে হলেও ইনি অসুরনাশিনী।
দেবী ভাগবতে আমরা পাই ,
দক্ষা যা বর্ত্ততে চণ্ডী কল্যাণেষু চ মঙ্গলা।
মঙ্গলেষু চ যা দক্ষা সা চ মঙ্গলচণ্ডিকা।।
পূজ্যা যা বর্ত্ততে চণ্ডী মঙ্গলোহপি মহীসুতঃ।
মঙ্গলাভীষ্টদেবী যা সা বা মঙ্গলচণ্ডিকা।।
মঙ্গলো মনুবংশশশ্চ সপ্তদ্বীপধরাপতিঃ।
তস্য পূজ্যাভীষ্টদেবী তেন মঙ্গলচণ্ডিকা।।
মূর্ত্তিভেদেন সা দুর্গা মূলপ্রকৃতিরীশ্বরী।
কৃপারূপাতিপ্রত্যক্ষা যোযিতামিষ্টদেবতা।।
প্রথমে পূজিতা সা চ শঙ্করেণ পরাৎপরা।
ত্রিপুরস্য বধে ঘোরে বিষ্ণুনা প্রেরিতেন চ।।
ব্রহ্মণ্ ব্রহ্মোপদেশেন দুর্গতেন চ সঙ্কটে।
আকাশাৎ পতিতে যানে দৈত্যেন পাতিতে রুষা।।
ব্রহ্মবিষ্ণুপদিষ্টশ্চ দুর্গাং তুষ্টাব শঙ্করঃ।
সা চ মঙ্গলচণ্ডী যা বভূব রূপভেদতঃ।।
উবাচ পুরতঃ শম্ভোর্ভয়ং নাস্তীতি তে প্রভো।
ভগবান্ বৃষরূপশ্চ সর্ব্বেশস্তে ভবিষ্যতি।।
যুদ্ধশক্তিস্বরূপাহং ভবিষ্যামি ন সংশয়ঃ।
মায়াত্মনা চ হরিণা সহায়েন বৃষধ্বজ।।
জহি দৈত্যং স্বশত্রুঞ্চ সূরাণাং পদঘাতকম্।
ইত্যুক্ত্বান্তর্হিতা দেবী শম্ভোঃ শক্তির্বভূব সা।।
ব্রহ্মবিষ্ণুশ্চ সন্তুষ্টো দদৌ তস্মৈ শুভাশিষম্।
ব্রহ্মবিষ্ণুপদিষ্টশ্চ সুস্নাতঃ শঙ্করস্তদা।।
পূজয়ামাস তাং ভক্ত্যা দেবীং মঙ্গলচণ্ডিকাম্।
পাদ্যার্ঘ্যাচমনীয়ৈশ্চ বস্ত্রৈশ্চ বিবিধৈরপি।।
পুষ্পরক্তচন্দননৈবেদ্য-র্ভক্ত্যা নানাবিধৈর্মুনে।
ছাগৈর্মেষৈশ্চ মহিষৈ-র্গবয়ৈঃ পক্ষিভিস্তথা।।
বস্ত্রালঙ্কারমাল্যৈশ্চ পায়সৈঃ পিষ্টকৈরপি।
মধুভিশ্চ সুধাভিশ্চ ফলৈর্নানাবিধৈরপি।।
সঙ্গীতের্নর্ত্তকৈর্ব্বাদ্যৈ-রুৎসবৈর্নামকীর্ত্তনৈঃ।
ধ্যাত্বা মাধ্যন্দিনোক্তেন ধ্যানেন ভক্তিপূর্ব্বকম্।।
( হর্ষমঙ্গলচণ্ডী উপাখ্যান - দেবীভাগবতম্ )
অর্থাৎ-
দক্ষ অর্থে চন্ডী এবং কল্যাণ অর্থে মঙ্গল, মঙ্গলকর বস্তুর মধ্যে দক্ষা বলিয়া তিনি মঙ্গলচণ্ডী নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছেন!
যিনি ভুমিপুত্র মঙ্গলের পূজনীয়া ইষ্টদেবী, তিনিই মঙ্গলচন্ডিকা।
সপ্তদ্বীপা পৃথিবীর পতি মনুবংশসম্ভূত মঙ্গলের অভীষ্টদায়িনী এবং আরাধ্যা বলিয়াই তাঁহার নাম মঙ্গলচন্ডী হইয়াছে।
কৃপারূপিনী দুর্গাদেবীর মূর্তিভেদ মূলপ্রকৃতি ঈশ্বরী মঙ্গলচণ্ডী রমণীগণের প্রত্যক্ষ অভীষ্টদেবতা। পূর্বে পরমেশ্বর বিষ্ণু কর্তৃক প্রেরিত মহাদেব ত্রিপুরবধের নিমিত্ত তাঁহার পূজা করিয়াছিলেন। হে ব্রহ্মকুমার! পূর্ব্বে অসুরসমরে আকাশ হইতে বাহন নিপতিত হইলে দুঃখতচিত্ত মহাদেব, ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর আদেশে দুর্গার স্তব করিয়াছিলেন।
দুর্গাদেবী সেইকালে মঙ্গলচন্ডী রূপে প্রকটিত হইয়া মহাদেবকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন,- হে শঙ্কর ! আপনার ভয় নাই।
স্বয়ং জনার্দন বিষ্ণু বৃষরূপ ধারণ করিয়া আপনার বাহন হইবেন।
আমিও আপনার যুদ্ধে শক্তিস্বরূপা হইব। হে বৃষবাহন! মূলপ্রকৃতির অংশভূত বিষ্ণু ও আপনার সাহায্য করিবেন। আপনি আমাদের আনুকূল্যে দেবগনের অধিকারনাশক শত্রুকে হনন করুন- এই বাক্য বলিয়া দেবী স্থান হইতে অন্তর্হিতা হইলেন এবং শক্তিরূপে শম্ভুর সাহায্য করিতে লাগিলেন।
অতঃপর, অসুর বধের পর ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু সন্তুষ্ট হইয়া মহাদেবকে শুভাশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন।
মহাদেব ও, - ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর উপদেশে স্নান দ্বারা শুদ্ধ হইয়া পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, নানাপ্রকার পুজোপহার, পুষ্পরক্তচন্দন, ভক্তি- পূর্ব্বক প্রদত্ত নানাপ্রকার নৈবেদ্য, ছাগ, মেষ, মহিষ, গবয়, পক্ষী প্রভৃতি পশুবলি, বস্ত্রালংকার মাল্য, পায়েস, পিষ্টক, মধু, সুধা, নানা প্রকার ফল, নিত্য গীত বাদ্য, নামকীর্তন প্রভৃতির দ্বারা মহোৎসব মঙ্গলচন্ডী দেবীর পূজা করিয়াছিলেন এবং মধ্যন্দিনোক্ত মন্ত্র দ্বারা ভক্তিপূর্বক ধ্যান করিয়াছিলেন।
ভগবতীর কৃপাতে সকলের অমঙ্গল দুর্ভোগাদি কেটে জীবন মঙ্গলময় হয়ে উঠুক ❤
জয়তু মঙ্গলচণ্ডিকা । 🌺