17/08/2026
আজ দ্বিতীয় নাগ পঞ্চমী । শুভ শ্রাবণী সোমবার নাগপঞ্চমী। নীচের ছবিতে যারা রয়েছেন তাঁরা ভারতের নাগদেবী গণ। আগে নাগেদের ব্যাপারে আপনাদের বলেছি আজ নাগদেবীদের কথা রইলো। আগে পরিচয়দান। একদম উপরের সারিতে রয়েছেন বাঁদিকে রয়েছেন দেবী সুরসা মধ্যে রয়েছেন দেবী মনসা এবং ডান দিকে রয়েছেন দেবী কদ্রু, নিচের দুদিকে যে দুজন রয়েছেন তারা হলেন ডানদিকে রেনুকা এবং বাঁদিকে নাগাম্মা, মাঝখানে রয়েছেন রাঢ়বঙ্গের ঝঙ্কেশ্বরী, আর একদম নিচের ডান দিকে রয়েছেন জৈনদের পদ্মাবতী এবং বাঁদিকে রয়েছে বৌদ্ধ তন্ত্রের জাঙ্গুলি।
কাহিনী শুরু হলো:-
শ্রাবণের নাগপঞ্চমীর রাত। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, কোথাও দূরে শঙ্খ বাজছে, কোথাও আবার নাগদেবীর সামনে প্রদীপ জ্বলছে। আর পৃথিবীর মানুষের অগোচরে এক অলৌকিক আড্ডায় বসেছেন ভারতভূমির নানা নাগশক্তি—মনসা, কদ্রু, সুরসা, রেণুকা, পদ্মাবতী, জাঙ্গুলী, নাগাম্মা আর রাঢ়বঙ্গের ঝঙ্কেশ্বরী। ব্যাপারটা কোনো গুরুগম্ভীর দেবসভা নয়; বরং বহুদিন পরে আত্মীয়স্বজন এক জায়গায় এসে বসলে যেমন গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা আর পুরনো দিনের কথা ওঠে, ঠিক তেমনই।
কদ্রু প্রথমেই মনসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “ওরে মনসা, তুই তো দেখি আজকাল বেশ বড় দেবী হয়ে গেছিস! কিন্তু একটা কথা বল তো—পুরাণে তোকে তো নাগকুলের সঙ্গে, আমার বংশের সঙ্গে দেখতে পাই; আর বাংলার লোককথায় গেলি কোথা থেকে দেবাদিদেব শিবের মেয়ে হয়ে?” মনসা হেসে বললেন, “মা, এ নিয়ে তোমার রাগ এখনও গেল না?” কদ্রু বললেন, “রাগ করব না? আমি কশ্যপের পত্নী, নাগদের জননী; আমার সন্তানদের মধ্যে অনন্ত, বাসুকি, তক্ষক—কত নাম! আর তুই টুক করে বাংলায় গিয়ে বললি, ‘আমি শিবের কন্যা!’” সবাই হেসে উঠল। মনসা মুচকি হেসে বললেন, “মানুষের ভালোবাসা বড় বিচিত্র জিনিস, মা। পুরাণে আমার পরিচয়ের এক রূপ, বাংলার লোকবিশ্বাসে আর-এক রূপ। বাংলার মঙ্গলকাব্যের জগতে আমি শিবকন্যা, আবার আমার জন্মকে ঘিরে নানা অলৌকিক কাহিনি আছে। আর আমার আরেকটি পরিচয়ও আছে—জরুৎকারু। ঋষি জরুৎকারুর সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছিল, আর তাঁরই সঙ্গে আমার পুত্র আস্তিক। সেই আস্তিকই তো পরে জনমেজয়ের সর্পসত্র থামিয়ে নাগকুলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই আমার কাহিনি শুধু বাংলার চাঁদ সদাগর আর বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনীতে শেষ হয় না; মহাভারতের সর্পকথার সঙ্গেও আমার যোগ আছে। আর লোকবিশ্বাসে তো আমাকে নাগদের ভগিনী, কখনও নাগকুলের মাতৃশক্তির সঙ্গেও দেখা হয়। আমি একাধারে অষ্টনাগের ভগিনী আবার অষ্ট নাগের জননী। চাঁদ সদাগরের কাছে আমি যতই অপমানিত হই, যতই পূজা অস্বীকার করা হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে মঙ্গলদাত্রী হিসেবেই আমাকে স্থান করে নিতে হয়েছে। আমার লড়াইটা ছিল স্বীকৃতির জন্য—অবহেলিত দেবী থেকে পূজিতা দেবী হয়ে ওঠার লড়াই।” কদ্রু তখন চোখ বড় বড় করে বললেন, “ তা হলে শিবের মেয়ে হয়েছিস, সে তো বলবিই; তার উপর আবার নাগদের ভগিনী ঠিক আছে আস্তিকের মা— তা বেশ! কিন্তু অষ্টনাগের জননী তো আমিই। মা তুই আমার চাকরিটাও খাবি?” সবাই হেসে উঠল। মনসা মুচকি হেসে বললেন, “আরে মা, তোমার চাকরি কে খায়! ওই একটু উতঙ্ক মুনি অভিশাপ দিলো বলে, তুমি নাগদের আদিম জননী, আমি তো শুধু তোমার আত্মীয়তার একটু ছায়া নিয়ে বাংলার মানুষের ঘরে বসেছি।” কদ্রু বললেন, “এই তো ভালো কথা! শিবের মেয়ের পরিচয় রাখ, কিন্তু আমার নাগকুলটাকেও ভুলিস না।”
তারপর কদ্রু একটু নরম হয়ে বললেন, “আর আমার সঙ্গে বিনতার সেই পুরনো ঝগড়ার কথাও ভুলিস না। কশ্যপের দুই পত্নী—আমি আর বিনতা; আমার সন্তান নাগেরা, আর তার সন্তান অরুণ ও গরুড়। সেই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই তো পরে নাগ আর গরুড়ের বিরোধের কত কাহিনির জন্ম দিল।” মনসা হেসে বললেন, “আহা, দেবলোকের পারিবারিক ঝগড়াও শেষ পর্যন্ত পুরাণ হয়ে যায়!” তখন সুরসা বললেন, “তোমরা নিজেদের পারিবারিক ঝগড়া নিয়েই বসে আছ, আমার কথাও একবার মনে পড়ছে না?” কদ্রু বললেন, “তোমার আবার কী?”
সুরসা চোখ টিপে বললেন, “আরে, সেই হনুমান! সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কার পথে যাচ্ছিল, আর আমি তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলাম। দেবতারা তাঁর শক্তি আর বুদ্ধির পরীক্ষা নিতে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আমি মুখ বড় করলাম, সে দেহ বড় করল; শেষে সে ক্ষুদ্র হয়ে আমার মুখে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল। তখন বুঝলাম—শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধিও আছে ছেলেটার!”
রেণুকা আম্মা হেসে বললেন, “তুমি হনুমানের কথা বলছ? সেই হনুমান, যাঁর আরাধ্য রামচন্দ্র? আর সেই রামচন্দ্রের বহু পূর্ববর্তী বিষ্ণু-অবতার পরশুরামের জননী আমি। আমার রাম, জমদগ্নির পুত্র, পিতার আদেশে একসময় আমাকে হত্যা করেছিলেন; পরে বর পেয়ে আমাকে পুনর্জীবিত করেন। সেই সন্তানই পরে পরশু হাতে পৃথিবীজোড়া কাহিনির নায়ক হয়ে উঠল।” সুরসা হেসে বললেন, “তাহলে আজ আমাদের আড্ডায় আত্মীয়তা বেশ জমে গেল!” রেণুকা বললেন, “দেবীদের আড্ডায় আত্মীয়তা বেরোতে সময় লাগে নাকি?” সবাই আবার হেসে উঠল।
পদ্মাবতী তখন বললেন, “তোমরা সবাই পুরাণের গল্প করছ, আমার কথাটাও শুনবে? আমার সম্পর্ক তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের সঙ্গে। পার্শ্বনাথের তপস্যার সময় নাগরাজ ধরণেন্দ্র তাঁর ফণা মেলে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই নাগচ্ছত্রই আজও পার্শ্বনাথের মূর্তির অন্যতম পরিচয়। আমি তাঁর শাসনদেবী; তাই আমার রূপেও নাগশক্তির উপস্থিতি।” মনসা হেসে বললেন, “তা হলে তোমার সঙ্গে আমার বেশ ভাব হতে পারে!” পদ্মাবতী মৃদু হেসে বললেন, “সর্পের আত্মীয়ের সঙ্গে সর্পদেবীর ভাব না হয়ে যায় কোথায়?”
এই সময় দক্ষিণের নাগাম্মা মনসার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা মনসা, তোকে একটা কথা বলি—দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলে নাগদেবতার সঙ্গে যুক্ত পবিত্র সিজ বা মনসা বৃক্ষকে ‘চেংমুর’ নামে ডাকার প্রচলন আছে—এটা জানিস?” মনসা কৌতূহলী হয়ে বললেন, “চেংমুর? সে আবার কী?” নাগাম্মা বললেন, “নাগশক্তি আর পবিত্র বৃক্ষের সম্পর্ক আমাদের দক্ষিণের লোকাচারে খুব গভীর। সেই সূত্রেই অনেকে নাগদেবতার বাসস্থান হিসেবে এমন পবিত্র বৃক্ষকে মানেন। তাই সেই সুবাদে তুই কিন্তু চেংমুর বৃক্ষের সঙ্গেও বেশ আত্মীয়তা করে ফেলেছিস—এটা মাথায় রাখিস!” মনসা ভুরু তুলে হেসে বললেন, “তাই বলেই কি আমার নাম চ্যাংমুড়ি হয়ে গেল নাকি?” নাগাম্মা হেসে বললেন, “ওরে না না! এত তাড়াতাড়ি নিজের নাম বদলে ফেলিস না! আমি শুধু বলছি, যেখানে নাগশক্তি আর পবিত্র বৃক্ষ পাশাপাশি থাকে, সেখানে তোর মতো নাগদেবীর সঙ্গে সেই বৃক্ষের আত্মীয়তা থাকবেই।” মনসা মুচকি হেসে বললেন, “বেশ, আজ নাগপঞ্চমীতে নতুন আত্মীয়ও জুটল—কদ্রুর নাগকুল, তোমাদের দক্ষিণের নাগবৃক্ষ আর আমার বাংলার মনসামঙ্গল—সব মিলিয়ে দেখি আমার সংসারটা বেশ বড়!”
এতক্ষণ জাঙ্গুলী চুপ করে শুনছিলেন। ঝঙ্কেশ্বরী তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “জাঙ্গুলী, তোমাকে নিয়েও রাঢ় বাংলার মানুষের মুখে কিন্তু কত কথা! অনেকে বলে, আমি নাকি তোমারই পরিবর্তিত রূপ—তোমার প্রাচীন সর্পশক্তি বাংলার লোকাচার, গ্রামের বিশ্বাস আর মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়ে আমার এই রূপ নিয়েছে। কেউ বলে নামের মধ্যেও তোমার ছায়া আছে। আমি অবশ্য কোনটা শাস্ত্র, কোনটা ইতিহাস আর কোনটা লোককথা—তা নিয়ে তর্ক করি না। তবে তোমার দিকে তাকালে সত্যিই মনে হয়, কোথাও যেন আমার নিজেরই একটা পুরনো ছায়াকে দেখতে পাচ্ছি। তুমি তন্ত্রের মন্ত্রে সর্পের বিষ নাশ করো, আর আমি রাঢ় বাংলার উঠোনে সেই জীবন্ত সর্পের মধ্যেই দেবীর রূপ হয়ে উঠেছি। শাস্ত্রের পথে আমরা আলাদা হলেও লোকমনের পথে এসে কোথাও যেন আমাদের হাত এক হয়ে গেছে।” জাঙ্গুলী হেসে বললেন, “তাহলে তুমি বলছ, আমি তোমার পুরনো আত্মীয়া?” ঝঙ্কেশ্বরী হেসে উত্তর দিলেন, “আত্মীয়া বলেই তো এত কথা বলছি! তবে ইতিহাসের পুঁথিতে যা লেখা নেই, তাকে পাকা সত্য বলে দাবি করছি না—এ আমাদের বাংলার মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা এক মধুর বিশ্বাস।”
জাঙ্গুলী বললেন, “আমার কাহিনী একটু অন্যরকম। আমি বৌদ্ধ তন্ত্রের সর্পশক্তি; আমার সঙ্গে বিষনাশ, সর্পভয় থেকে রক্ষা এবং মন্ত্রসাধনার সম্পর্ক আছে। সর্পের বিষ যেমন শরীরকে দগ্ধ করে, তেমন মানুষের মনে ক্রোধ, লোভ, হিংসারও বিষ থাকে। তাই আমার তান্ত্রিক রূপে সর্প শুধু প্রাণী নয়, অন্তরের বিষ জয়েরও প্রতীক।”
ঝঙ্কেশ্বরী বললেন, “সেই জন্যই তো তোমার মধ্যে নিজের একটা ঝলক দেখতে পাই।” তিনি একটু হেসে যোগ করলেন, “আর আমার কাহিনি তো আরও মাটির। রাঢ় বাংলার কিছু অঞ্চলে জীবন্ত বিষধর কেউটে সাপকেই আমার রূপ বলে মানা হয়। কোথাও প্রতীকী পূজা, কোথাও জীবন্ত নাগকে দেবীজ্ঞানে সম্মান—এই আমার বিশেষত্ব। তবে সাপকে ধরে উত্ত্যক্ত করা ভক্তি নয়; তাকে তার নিজের জগতে শান্তিতে থাকতে দেওয়াই প্রকৃত সম্মান।”
মনসা তখন মৃদু হেসে বললেন, “দেখেছ মা কদ্রু? তোমার নাগকুলের সন্তানদের নিয়ে আমাদের কত রকম গল্প! কোথাও আমি শিবকন্যা, কোথাও তোমার কন্যা; কোথাও জাঙ্গুলী তন্ত্রের সর্পশক্তি, কোথাও পদ্মাবতীর মাথার উপর নাগচ্ছত্র, কোথাও নাগাম্মা দক্ষিণের গৃহদেবী, কোথাও ঝঙ্কেশ্বরীর উঠোন দিয়ে সত্যিকারের কেউটে চলে যায়।” কদ্রু মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ রে, নাম আলাদা, গল্প আলাদা, কিন্তু শেষে দেখি সবাই আমার নাগদের কাছেই এসে বসে!” সুরসা বললেন, “আর আমার হনুমানের কথাও ভুলিস না!” রেণুকা হেসে বললেন, “তোমার হনুমান, আমার পরশুরাম—আজকের আড্ডায় দেখছি বিষ্ণুর অবতারদেরও আত্মীয়তা জুড়ে গেল!” সবাই আবার হেসে উঠলেন। বাইরে তখন নাগপঞ্চমীর বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। মনসা শেষবার বললেন, “আজ আমাদের এই আড্ডা মানুষের কানে না পৌঁছালেও ক্ষতি নেই। তারা যদি শুধু এটুকু মনে রাখে—সর্পকে অকারণে হত্যা করো না, প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করো না, আর মাতৃশক্তির নানা রূপকে সম্মান করো—তাহলেই আমাদের নাগপঞ্চমীর আড্ডা সার্থক।” দূরের কোনো গ্রামের উঠোনে তখন একটি জীবন্ত সাপ নিঃশব্দে পথ পার হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ঝঙ্কেশ্বরী তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “দেখলে? ফুল-ধূপ কিছুই লাগল না—আজ আমার পূজা হয়ে গেল।”