Sri Vyas Gaudiya Math

Sri Vyas Gaudiya Math Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Sri Vyas Gaudiya Math, Religious organisation, P. O. : Kurukshetra, Kurukshetra.

06/03/2026
News Media coverd || Sri Chaitanya mahaprabhu Divine Appearance Day Celebration And Dol Yatra Mahotsav || Gaudiya Missio...
06/03/2026

News Media coverd || Sri Chaitanya mahaprabhu Divine Appearance Day Celebration And Dol Yatra Mahotsav || Gaudiya Mission

09/02/2026

On the occasion of Srila Prabhupad 152nd Birth Anniversary, special Nagar Sankirtan Sabhajatra (Srila Bhaktisiddhanta Saraswati Goswami Prabhupad)

‘পুত্ৰদা’একাদশী ব্রতোপবাস ৩১ ডিসেম্বর বুধবার ,২০২৫ পারণ - পরের দিন দিবা ৯। ৫২ মিঃ মধ্যে।(একাদশীতে কী কী করা এবং খাওয়া উচ...
28/12/2025

‘পুত্ৰদা’একাদশী ব্রতোপবাস

৩১ ডিসেম্বর বুধবার ,২০২৫
পারণ - পরের দিন দিবা ৯। ৫২ মিঃ মধ্যে।
(একাদশীতে কী কী করা এবং খাওয়া উচিত নয়-
একাদশী একটি চান্দ্র তিথি। হিন্দু ধর্মমতানুসারে পূণ্যতিথি হিসেবে বিবেচিত। হিন্দুধর্মমতে এ দিন বিধবাদের, বিশেষত উচ্চবর্ণীয় বিধবাদের নিরম্বু উপবাস বিহিত। অবশ্য বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কেউ একাদশী পালন করতে পারেন। এই সময় সাধারণত ফলমূল ও বিভিন্ন সবজি এবং দুধ খাওয়া যায়। তবে একাদশীতে পঞ্চরবি শস্য বর্জন করা বাঞ্ছনীয়।
এখন দেখে নেওয়া যাক একাদশীতে কোন পাঁচ প্রকার রবিশস্য গ্রহণ নিষিদ্ধ:
১। ধান জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন চাল, মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েস, খিচুড়ি, চালের পিঠা, খই ইত্যাদি
২। গম জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন আটা, ময়দা, সুজি, বেকারির রুটি, সব রকম বিস্কুট, হরলিকস ইত্যাদি।
৩। যব বা ভূট্টা জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন ছাতু, খই, রুটি ইত্যাদি।
৪। ডাল জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন মুগ, মাসকলাই, খেসারি, মুসুরী, ছোলা, অড়হর, মটরশুঁটি, বরবটি ও সিম ইত্যাদি।
৫। সরষের তেল, সয়াবিন তেল, তিল তেল ইত্যাদি। উপরোক্ত পঞ্চ রবিশস্য যে কোনও একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হয়।)
অদ্য চক্রধারী শ্রীবিষ্ণুর ষোড়শোপচারে পূজা। পঞ্চামৃতে স্নান। নৈবেদ্য -অন্ন, ব্যঞ্জন, ভাজা, শাক, ডাল, অম্ল, দধি, দুগ্ধ, ক্ষীর, পরমান্ন, লাড্ডু, অপূপ, মিষ্টি, বিবিধ ফল ও বিবিধ সৌগন্ধ পুষ্প মাল্যাদি অর্পণ করবে। মধ্যাহ্নকালে ভোগারতি, নামসঙ্কীৰ্ত্তন, নৃত্য-গীত, স্তবপাঠ ও দণ্ডবতাদি করবে। অতঃপর চক্রধারী শ্রীবিষ্ণুর মহিমা শ্রবণ করবে।
কথারম্ভ স্তব-
অনাদি নিধনং বিষ্ণুং ত্রিলোকেশং ত্রিবিক্রম্,
নারায়ণং চতুর্ব্বাহুং শঙ্খ চক্র গদাধরম্।
পীতাম্বরং নিত্যং বনমালা বিভূষিতম্
শ্রীবৎসাঙ্কং জগৎসেতুং শ্রীকৃষ্ণং শ্রীধরং হরিম্।।
শ্রীমদ ভাগবত মহাপুরাণে সুত শৌনক সংবাদ—ক্ষীরসাগর পরিবেষ্টিত অযুত যোজন উচ্চ অতি মনোহর দৃশ্যাবলীতে পরিপূর্ণ ‘ত্রিকূট’ নামক এক পৰ্ব্বত ছিল। সেই পর্ব্বতে স্বর্ণ রৌপ্য ও লৌহ তিনটি শিখর ছিল। পর্ব্বত গাত্রে নানাপ্রকার ধাতু শোভা পাচ্ছিল। তথায় বহুবিধ বৃক্ষ, লতা, গুল্ম ও ঝরণা সকল বিদ্যমান ছিল। ঐ পর্ব্বতের গুহা প্রদেশে গন্ধর্ব্ব, সিদ্ধ, চারণ, কিন্নর ও বিদ্যাধরগণ বিহার করছিল।
সেই ত্রিকূট পর্ব্বতোপরি এক বৃহৎ সরোবর শোভা পাচ্ছিল। সরোবর তটে ছিল সুবৃহৎ নিবিড় অরণ্যভূমি। সেই বনস্থলীতে নিবাস করত এক মদমত্ত করিরাজ। উহার সহস্র সহস্র পত্নী, পুত্র-কন্যা ছিল। মদমত্ত করিরাজের ভয়ে সিংহ, ব্যাঘ্র ও শুকরাদি জন্তুগণ দূরে দূরে অবস্থান করত।
একদা মদমত্ত করিরাজ নিদাঘ সন্তপ্ত হয়ে সরোবর মধ্যে পত্নী পুত্রবর্গের সহিত সন্তরণ ও অবগাহন করতে লাগল। সরোবরের মধ্যে বাস করত এক সুবৃহৎ কুম্ভীর। তার সদনকে বিধবস্ত করেছে বলে অতি রোষে কুম্ভীরটি ছুটে এল এবং করিরাজের পায়ে কামড়ে ধরল। ক্রমে উভয়ে যুদ্ধ আরম্ভ হল। বহুদিন ধরে যুদ্ধ চললো। বীর পুত্র, কন্যা ও পত্নীগণ হস্তিরাজের সহায় দিতে লাগল। কিন্তু তাতে করিরাজের কিছু সুবিধা হল না। পত্নী পুত্রগণ পরাভূত হয়ে ধীরে ধীরে সকলে স্থান ত্যাগ করতে লাগল। গজরাজের দৈব অনুকূল নহে, কুম্ভীরগ্রস্ত হয়ে নিরাহারে দিন দিন ক্ষীণ হতে লাগল। গজরাজ বনচর, কুম্ভীর জলচর, কুম্ভীরের বলবীর্য্য অটুট রইল।
গজরাজের পুত্র ও পত্নীগণ ধীরে ধীরে সকলেই গজরাজকে ত্যাগ করে চলে গেল। গজরাজের বলবীর্য্য হীন হয়ে এল, তখন চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগল।
জীবের মৃত্যুকালে কেহই সহায় হয় না। অন্তর্যামী শ্রীহরি একমাত্র সহায় হন। তিনি জীবের সখা, মিত্র ও গুরু। তিনি কদাপি জীবকে ত্যাগ করেন না। কিন্তু জীব তাঁকে ভুলে যায়।
গজরাজ মনে মনে বলতে লাগল-
সংসার সংসার করে মিছে গেল কাল।
লাভ না হৈল কিছু ঘটিল জঞ্জাল।।
কিসের সংসার এই ছায়াবাজি প্রায়।
ইহাতে মমতা করি বৃথা দিন যায় ।
(মহাজন গীতি)
গজরাজের সামনে মৃত্যু, অন্য কোন উপায় নেই যে এর থেকে উদ্ধার পায়। নয়ন জলে বুক ভাসছে। মহার্ত্ত গজরাজের এমন সময় অনাথের নাথ শ্রীনারায়ণের নাম স্মরণ হল।
শ্রীমন্নারায়ণ শ্রীমন্নারায়ণ।
শ্রীমন্নারায়ণ শ্রীমন্নারায়ণ।।
তাঁর এ নাম পুর্ব্বজন্মের সুকৃতিফলে স্মরণ হল। গজরাজ পূর্ব্বজন্মে দ্রাবিড়াধিপতি ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে রাজা ছিলেন। তিনি হরির আরাধনা করবার জন্য গৃহ, পুত্র ও পত্নী প্রভৃতি ত্যাগপূর্বক অরণ্যবাসী হন এবং সর্ব্বপ্রকার সঙ্গ ত্যাগ করে শ্রীহরির অর্চ্চন ধ্যানে রত হন। কোন সময় মহামুনি অগস্ত্য বহু শিষ্যসহ তার আশ্রমে উপস্থিত হন। রাজা মহামুনির আগমন জানতে পেরেও বাইরে এসে স্বাগত পূজাদি কিছুই করলেন না। তাঁর এ প্রকার অশিষ্টাচার দর্শনে মুনিবর অভিশাপ দিয়েছিলেন—তুমি হস্তীযোনীতে জন্মগ্রহণ করবে। হস্তীর শরীর বৃহৎ, চক্ষু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, তুমি কর্ম করছ বৃহৎ কিন্তু সদাচার শিষ্টাচার চক্ষু শূন্য। মহারাজ মুনিবরের চরণ ধরে অপরাধের ক্ষমা চাইলেন। অনন্তর মুনিবর বললেন—শ্রীহরি সুদর্শন চক্র দ্বারা যখন তোমায় বিপদ হতে স্বহস্তে উদ্ধার করবেন, সেই কালে তুমি উদ্ধার হবে।
গজরাজ যখন আর্তস্বরে শ্রীনারায়ণ নামসকল উচ্চঃস্বরে বলতে লাগলেন, তৎক্ষণাৎ গরুড়ে আরোহণ করে শ্রীবিষ্ণু তথায় আগমন করলেন এবং চক্রের দ্বারা কুম্ভীরকে কেটে বামহস্তে গজরাজকে ধরে উদ্ধার করলেন। গজরাজ প্রভু-হস্ত স্পর্শে চতুর্ভুজত্ব প্রাপ্ত হলেন, অর্থাৎ স্বারূপ্য মুক্তি পেলেন।
কুম্ভীরটী পূর্ব্ব জন্মে ‘হুহু' নামক গন্ধৰ্ব্ব ছিল। সে কোনদিবস এক ব্রহ্মবিদ্ দ্বিজকে দেখে হাস্য করেছিল। সেই অপরাধে সে কুম্ভীর যোনী প্রাপ্ত হয়েছিল। বিষ্ণুর চক্রে কুম্ভীর যোনী হ’তে উদ্ধার ঘটল। সে সুখে গন্ধৰ্ব্বলোকে চলে গেল।
গজরাজ সারূপ্য মুক্তি পাবার পর শ্রীবিষ্ণুকে এরূপ স্তব করতে লাগলেন-
ওহে দীনবন্ধু দীননাথ ভগবান।
তোমার চরণযুগ সদা করি ধ্যান।।
তুমি প্রভু এ বিশ্বের সৃষ্টির কারণ।
স্থিতি লয় আদি হেতু তুমি নারায়ণ।।
জন্মাদি রহিত তুমি সদা বিদ্যমান।
তব অবতার লীলা জীবের তারণ।।
অচিন্ত্য অগম্য তুমি পুরুষ উত্তম।
ব্রহ্মা শিব ধ্যেয় তুমি সবার শরণ।।
বিশ্বনাথ তুমি প্রভু বিশ্বত্রাণকারী।
বিশ্ব জীব হিত লাগি অবতার ধারী।।
সৰ্ব্বভূত অন্তৰ্য্যামী সৰ্ব্বাধ্যক্ষ স্বামী।
তোমার চরণ যুগে বার বার নমি।।
তুমি সর্ব্বসাক্ষী হও অন্তর বাইরে।
তোমার চরিত্র নাথ কে বুঝিতে পারে।।
তুমি জীব আত্মার অংশী, তুমি নারায়ণ।
সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ হও সবার কারণ।।
তুমি অধোক্ষজ হরি ভক্তিবেদ্য তুমি।
পশু প্রায় আমি হই কি কহিব স্বামী।।
ভক্তি বিনা দরশন তোমার না হয়।
কেবল জ্ঞানাদি যোগে তোমা না মিলয়।।
ওহে জগন্নিবাস জগন্নাথ প্রভো।
বার বার নমি পদে ওহে নাথ বিভো।।
শ্রীহরিবাসরে যারা গজরাজের আখ্যান ও স্তব শ্রবণ করবেন তাঁরা অনায়াসে সর্ব্ববিধ পাপ ও বিপদশূন্য হয়ে মুক্তি পদ পাবেন। জয় চক্রধারী শ্রীবিষ্ণু কী জয়।
ইতি পুত্রদা একাদশী তিথি বাসরে গজ-মোক্ষণ কথা সমাপ্ত।

श्रील प्रभुपाद की असीम कृपा से गौड़ीय मिशन हरिद्वार में कदम रख रहा है।सभी समर्पित भक्तों से विनम्र निवेदन है कि कृपया हर...
17/12/2025

श्रील प्रभुपाद की असीम कृपा से गौड़ीय मिशन हरिद्वार में कदम रख रहा है।
सभी समर्पित भक्तों से विनम्र निवेदन है कि कृपया हरिद्वार गौड़ीय मठ बनाने में अपना पूरा योगदान दें।
7982261675/9163127394

पक्षवर्धिनी महाद्वादशी व्रत ✨श्री लक्ष्मी वघ्रण दत्ता ठाकुर और श्रील महेश पंडित ठाकुर का तिरोभाव ✨16 दिसंबर, 2025 📌पारण-...
15/12/2025

पक्षवर्धिनी महाद्वादशी व्रत ✨
श्री लक्ष्मी वघ्रण दत्ता ठाकुर और श्रील महेश पंडित ठाकुर का तिरोभाव ✨
16 दिसंबर, 2025 📌
पारण- अगले दिन सुबह 9.45 बजे महाद्वादशी व्रत का पारण किया जाएगा।
उन्मिलानि ब्यांजलि च त्रिस्पृशा पक्षवर्धिनी।
जया च विजया चैव जयंती पापनाशिनी।
द्वादश्योष्ठौ महापुण्य सर्वपापहारा द्विजा।
तिथियोगेन जयन्ते छात्रश्चपरस्तथा।
नक्षत्र योगच्च बलात पापं प्रशमयंति ता।
(ह: भा: भ: 13.265-66 ब्रह्म वैवर्त पुराण वक्ति)
ब्रह्म वैवर्त पुराण में सुतसौनक संगबाद में कहा गया है - हे द्विजा! उन्मिलनी, व्यंगूली, त्रिस्पृशा, पक्षवर्धिनी, जया, विजया, जयंती और पापनाशिनी - ये अठारह अष्टादवदशी बहुत पुण्य देने वाली हैं और पापों का पूरी तरह नाश करती हैं। इन आठ अष्टादवदशियों में से चार तिथि योग में और बाकी चार नक्षत्र योग में होती हैं। ये सभी बारह पातकरशियां नाश करने वाली हैं।

पक्षवर्धिनी बारह का निर्धारण - जिन बारह दिनों के बाद पूर्णिमा या अमावस्या आती है, वे 60 दंड भोग के बाद अगले दिन थोड़ी बढ़ जाती हैं, उससे पहले के बारह दिन पक्षवर्धिनी कहलाते हैं। एकादशी छोड़कर इन बारह दिनों में व्रत रखना चाहिए।

#गौड़ियामिशन #गौड़ियामठ #प्रभुपाद #श्रीलप्रभुपाद #श्रीलप्रभुपाद #प्रभुपाद150 #प्रभुपद150

শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদের ৮৯ তম  বার্ষিক তিরোভাব তিথি 🙏০৮ ডিসেম্বর সোমবার, ২০২৫ নমঃ ওঁ বিষ্ণ...
08/12/2025

শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদের ৮৯ তম বার্ষিক তিরোভাব তিথি 🙏

০৮ ডিসেম্বর সোমবার, ২০২৫

নমঃ ওঁ বিষ্ণুপাদায় কৃষ্ণপ্রেষ্ঠায় ভূতলে।
শ্রীমতে ভক্তিসিদ্ধান্তসরস্বতীতি-নামিনে।।
শ্রীবার্যভানবীদেবীদয়িতায় কৃপাজয়ে।
কৃষ্ণসম্বদ্ধবিজ্ঞানদায়িনে প্ৰভবে নমঃ।।
মাধুর্য্যোজ্জ্বলপ্রেমাঢ্য শ্রীরূপানুগভক্তিদ।
শ্রীগৌর করুণাশক্তিবিগ্রহায় নমোস্তুতে।।
নমস্তে গৌরবাণী-শ্রীমূর্তয়ে দীনতারিণে।
রূপানুগবিরুদ্ধাপসিদ্ধান্তদ্ধান্ত হারিণে।।

শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদের সঙ্গে যাঁদের নিত্য সম্বন্ধ ছিল তাঁরা তাঁর অপ্রাকৃত ভজনশীল জীবনের কথা বলতে পারেন। জাগতিক কর্মবীর কিংবা ধর্মবীরের মত তাঁর জীবন গঠিত হয় নাই। শিশুকাল থেকে শুদ্ধ ভাগবত সঙ্গে ভাগবত জীবন গঠিত হয়েছিল। জাগতিক চমৎকারিতায় জগতের লোক মুগ্ধ হয়। কিন্তু শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর জীবনে এরূপ কোন জড় বিভূতি দেখানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি বরং ঐ প্রকার জড় বিভূতিকে বড় ঘৃণা করতেন। সর্ব্ব বিভূতিময় ভগবান যাঁদের বশীভূত হন, তাঁদের কোন বিভূতি লাভ করতে কি আর বাকী থাকে? “সর্বসিদ্ধি করতলে তাঁর।

শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় ডেপুটী ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ করবার সময় যখন শ্রীশ্রীজগন্নাথ পুরীধামে শ্রীমন্দির—সন্নিকটে নারায়ণ ছাতা নামক ভবনে বাস করছিলেন, তাঁর গৃহে শ্রীমদ্ভক্তিক সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দের (১২৮০ বঙ্গাব্দের) ৬ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার মাঘী কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে আবির্ভূত হন। এই মহাপুরুষের জননীর নাম ছিল শ্রীমতী ভগবতী দেবী।শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শ্রীবিমলা দেবীর প্রসাদ দ্বারা শিশুর অন্নপ্রাশন করিয়ে নামকরণ করলেন “বিমলা প্রসাদ”।

শ্রীশ্রীসরস্বতী ঠাকুরের আবির্ভাবের ছয় মাস পরে রথযাত্রা হয়। এই রথ যাত্রার সময় তিন দিন শ্রীজগন্নাথের রথ বড় দাঁড়ের উপর সরস্বতী ঠাকুরের জন্ম গৃহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন জননী ভগবতী দেবী শিশুকে নিয়ে রথোপরি আরোহণ করলেন এবং তাকে শ্রীজগন্নাথের শ্রীপাদপদ্মমূলে ছেড়ে দিলেন। শ্রীজগন্নাথদেব যেন শিশুর কত কালের পরিচিত। আনন্দভরে শ্রীজগদীশকে শিশু জড়িয়ে ধরল। ঠিক সেই সময়ে শ্রীজগন্নাথদেবের কণ্ঠ থেকে একটি ফুলের মালা ছিন্ন হয়ে শিশুর শিরে পতিত হল। তা দেখে পূজারী পাণ্ডাগণ আনন্দে 'হরি হরি' ধ্বনি করে উঠলেন। বললেন মা! তোমার এই শিশু কালে একজন মহাপুরুষ হবে। শ্রীজগন্নাথদেব একে আশীৰ্ব্বাদী মালা দিয়েছেন। এ তাঁর কথা জগতে প্রচার করবে। জ্ঞানী ব্রাহ্মণের আশীর্ব্বাদ শুনে আনন্দে অশ্রুসিক্ত নয়নে শিশুকে কোলে নিলেন এবং বারংবার ব্রাহ্মণগণকে এবং জগন্নাথদেবকে বন্দনা করতে লাগলেন। আবির্ভাবের পরে শিশু জননীর সহিত দশমাস কাল পুরী থাকার পর পাল্কীতে স্থল পথে রাণাঘাটে উপনীত হন।
শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় পরম নিষ্ঠাবান সদাচার সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন। তাঁর পত্নী শ্রীভগবতী দেবীও তদ্রূপ সদগুণ সম্পন্না ছিলেন। তাঁরা পুত্র-কন্যাগণকে কদাপি ভগবদ প্রসাদ ছাড়া অন্য কোন বস্তু খেতে দিতেন না। কোন অসৎ সঙ্গেও মিশতে দিতেন না। ১৮৮১ সালে কলিকাতার রামবাগানে ভক্তি ভবনের ভিত্তি খনন কালে এক শ্রী কুর্মদেবের মূর্তি প্রকট হয়। সপ্তমবর্ষ বয়স্ক শ্রীসরস্বতী ঠাকুরকে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীনাম ও মন্ত্র দিয়ে সেই কুর্মদেবের সেবা করতে নির্দেশ দিলেন।

১৮৮৪ সালে ১লা এপ্রিল শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীরামপুরের সিনিয়ার ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হন। এই সময় সরস্বতী ঠাকুরকে শ্রীরামপুর হাইস্কুলে ভক্তি করান হয়। তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করতেন বিকৃত্তি বা Bicanto নামে এক নূতন লেখন প্রণালী আবিষ্কার করেন। এই সময় তিনি পণ্ডিতবর মহেশচন্দ্র চূড়ামণির নিকট গণিত ও জ্যোতিষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।

প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। তিনি লাইব্রেরীতে বসে বিভিন্ন দর্শন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন। এই সময় তিনি শ্রীযুত পৃথ্বীধর শর্মার নিকট বেদও অধ্যয়ন করতেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর বেশী দিন কলেজে অধ্যয়ন করতে পারলেন না। কলেজ ত্যাগের কারণ সম্বন্ধে তিনি আত্মচরিতে লিখেছেন – “আমি যদি মনোযোগ সহকারে বিদ্যালয়ের পাঠ শিক্ষা করতে থাকি তাহা হইলে সংসারে প্রবেশের জন্য আমার প্রতি যৎপরোনাস্তি পীড়ন হইবে। আর যদি মূর্খ তাকর্মন্য রূপে প্রতিপন্ন হই, তাহা হইলে সাংসারিক উন্নতির জন্য প্রবৃত্ত হইতে কেহ আর তাদৃশী প্ররোচনা করিবে না।

পাঠ্যাবস্থায় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় পারমার্থিক প্রবন্ধাদি লিখতেন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সহিত গৌড় মণ্ডলের বিভিন্ন শ্রীগৌর পার্ষদগণের শ্রীপাট সকল দর্শন করেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর ১৮৯৮ সালে সারস্বত চতুষ্পাঠীতে অধ্যাপনা করবার সময় পৃথকভাবে ‘ভক্তি ভবনে' পণ্ডিতবর শ্রীযুত পৃথ্বীধর শর্মার নিকট সিদ্ধান্ত কৌমুদী অধ্যয়ন করেন। অল্প কালের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত কৌমুদীতে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি ভক্তিভবনে স্বতন্ত্র একটি সারস্বত "চতুষ্পাঠী” স্থাপন করেন। তাতে ছাত্রগণকে জ্যোতিষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করান।'সারস্বত চতুষ্পাঠি' হতে সরস্বতী ঠাকুর জ্যোতির্ব্বিদ, বৃহস্পতি প্রভৃতি মাসিক পত্রিকা এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে অনেক প্রাচীন গ্রন্থ প্রকাশিত করেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর কিছুদিন স্বাধীন ত্রিপুরা এস্টেটে কর্ম গ্রহণ করে ত্রিপুরার রাজন্যবর্গের জীবন চরিত 'রাজরত্নাকর' গ্রন্থ প্রকাশের সম্পাদকতা করতে লাগলেন। পরে তিনি যুবরাজ ব্রজেন্দ্র কিশোরের সংস্কৃত ও বাংলা শিক্ষার ভার গ্রহণ করেন। কিছুদিন এই কার্য্য করার পর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন কার্য্য পরিদর্শনের ভার নেন। বৈষয়িক কার্য্য মধ্যে বিবিধ প্রকারের হিংসা দ্বেষ মাৎসর্য্য প্রভৃতি দেখে তিনি উহা শীঘ্রই ত্যাগ করতে ইচ্ছা করলেন। মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুর তা' অনুমোদন করে তাঁকে পূর্ণ বেতনে পেন্সন প্রদান করেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর তিন বছর পেন্সন ভোগ করে তা নিজেই বন্ধ করে দেন।

১৮৯৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সহিত কাশী, প্রয়াগ ও গয়া প্রভৃতি তীর্থস্থানে গমন করেন। কাশীতে শ্রীরামমিশ্র শাস্ত্রীর সহিত রামানুজ সম্প্রদায় সম্বন্ধে নানা আলাপ আলোচনা হয়। তখন থেকে তাঁর অদ্ভুত বৈরাগ্যময় জীবন বিকশিত হতে থাকে। তিনি মনে মনে সদ্গুরুর অনুসন্ধান করতে লাগলেন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে তাঁকে বৃন্দাবনে সিদ্ধ বাবা শ্রীশ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের শ্রীপাদপদ্ম আশ্রয় করতে নির্দেশ দিলেন।
শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর শ্রীল ভক্তিবিনোদের উপদেশ মত শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজীর নিকট দীক্ষা প্রার্থনা করেন। প্রথম দিন শ্রীল বাবাজী মহারাজ বললেন—আমি আপনাকে কৃপা করতে পারি কিনা মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা না করে বলতে পারব না। দ্বিতীয় দিন সরস্বতী ঠাকুর শ্রীল বাবাজী মহারাজের নিকট উপস্থিত হলেন। বাবাজী মহারাজ বললেন আমি মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছি। তৃতীয়দিন সরস্বতী ঠাকুর উপস্থিত হলেন। শ্রীল বাবাজী মহারাজ বললেন—আমি মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বললেন—সুনীতি বা পাণ্ডিত্য ভগবদ্ভক্তির কাছে অতি তুচ্ছ। তদ্ভবণে সরস্বতী ঠাকুর বললেন আপনি কপট চূড়ামণির সেবা করেন তাই বঞ্চনা করছেন, আমায় কৃপা করতে চান না। গোষ্ঠিপূর্ণের নিকট শ্রীরামানুজ আচার্য্য অষ্টাদশ বার প্রত্যাখ্যাত হয়ে পরে তাঁর কৃপালাভ করেছিলেন। আমিও তার আপনার শ্রীপাদপদ্মের কৃপালাভ একদিন না একদিন করবই। শ্রীল বাবাজী মহারাজ সরস্বতী ঠাকুরের এইরূপ সুদৃঢ় নিষ্ঠা দেখে, শ্রীগোদ্রুমের জন সুখদ কুঞ্জে তাঁকে ভাগবতী দীক্ষা প্রদান করলেন। শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজ সাক্ষাদ্বৈরাগ্য মূর্তি। কাকেও মন্ত্র-দীক্ষাদি দিতে চাইতেন না। তিনি গঙ্গাতটে বৃক্ষমূলে বাস করতেন। গঙ্গায় পরিত্যক্ত মৃত ব্যক্তির বস্ত্র কৌপীনরূপে ব্যবহার করতেন। কখনও গঙ্গাজলে চাল ভিজিয়ে লঙ্কা ও লবণ দিয়ে তা খেতেন। কখনও পরিত্যক্ত মৃদ্ভান্ড গঙ্গাজলে ধুয়ে তাতে অন্ন রান্না করে ঠাকুরের ভোগ দিয়ে তা' গ্রহণ করতেন।

১৯০০ সালের মার্চ মাসে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সহিত সরস্বতী ঠাকুর বালেশ্বর, রেমুণা, ভুবনেশ্বর ও পুরী প্রভৃতি স্থানে পরিভ্রমণ করেন। স্থানে স্থানে ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নির্দেশ মত শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতাদি ব্যাখ্যা করেন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের দৌলতে শুদ্ধ ভক্তির মন্দাকিনী পুনঃ প্রবাহিত হয়। শ্রীগৌর পার্ষদগণের অপ্রকটের পর গৌড়ীয় বৈষ্ণার জগতে এক অন্ধকার যুগ এসেছিল। সেই যুগের অবসানে ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীগৌর-নিত্যানন্দের বাণী জগতে প্রচার করেন। তিনি শুদ্ধ ভক্তি সিদ্ধান্ত বিষয়ক বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, বহু পারমার্থিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন। তাঁর কৃপায় বহু সজ্জন ব্যক্তি গৌরসুন্দরের ভজন করতেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে শ্রীনামহট্ট ও প্রপন্নাশ্রমাদি সংস্থাপন করেন।

১৯১৬ সালে বঙ্গাব্দ ১৩২১, ৯ই আষাঢ় গৌর শক্তি পণ্ডিতের তিরোভাব তিথির দিন শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অপ্রকট হন। ঠাকুর মহাশয় নিত্যলীলা প্রবেশ করবার পূর্বে শ্রীসরস্বতী ঠাকুরকে বললেন ষড়-গোস্বামীর গ্রন্থ ও শ্রীগৌরসুন্দরের শিক্ষা বিশেষভাবে সর্ব্বত্র প্রচার কর। মহাপ্রভুর জন্মস্থানের উন্নতিও করা চাই। জননী শ্রীভগবতী দেবীও কয়েক বৎসর পরে পরলোক গমন করেন। যাবার সময় তাঁর হাত ধরে বললেন তুমি অব্যশ্যই আমার গৌরসুন্দরের কথা ও তাঁর ধাম শ্রীমায়াপুর সর্ব্বত্রই প্রচার করবে। শ্রীসরস্বতী ঠাকুর পিতৃ মাতৃ আজ্ঞা শিরে ধারণ করে বিপুল উদ্যমে শ্রীগৌরসুন্দরের বাণী প্রচার করতে আরম্ভ করলেন।

ইতঃপূর্ব্বে শ্রীসরস্বতী ঠাকুর শ্রীমায়াপুরে অবস্থান করে শতকোটি মহামন্ত্র জপ ব্রতের উদযাপন করেছিলেন। সমস্ত বাংলাদেশে আচার্য্য সন্তানগণ স্মার্ত্ত জাতিবাদ দিয়ে বৈষ্ণবদের অবজ্ঞা ও নির্যাতন করছিল। এই বিষয় নিয়ে মেদিনীপুর বালীঘাই নামক স্থানে একটি বিরাট সভার আয়োজন করা হয়। এই সভাতে শ্রীবৃন্দাবন ধামের শ্রীযুত মধুসূদন দাস গোস্বামী ও গোপীবল্লভ পুরের পণ্ডিতবর শ্রীবিশ্বম্ভরানন্দ দেব গোস্বামী উপস্থিত ছিলেন। তথায় গোস্বামীদ্বয়ের আহ্বানে শ্রীসরস্বতী ঠাকুরও উপস্থিত হন। সভার কার্যা আরম্ভ হল। স্মার্ত্ত পণ্ডিত নিজ নিজ মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করতে থাকলে গোস্বামীদ্বয়ের অনুমোদনে শ্রীসরস্বতী ঠাকুর ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব তত্ত্ব সম্বন্ধে একটি সুদীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন। শ্রীসরস্বতী ঠাকুরের যথার্থ শাস্ত্র যুক্তি সম্পন্ন সে বক্তৃতা শ্রবণে স্মার্ত্ত আচার্য্য সম্ভানগণ মোহিত ও আশ্চার্য্যান্বিত হন। সকলে ব্রাহ্মণগণ অপেক্ষা বৈষ্ণবগণের মহিমা উপলব্ধি করতে পারলেন।

১৯১২ সালে কাশিম বাজারের মহারাজ শ্রীমণীন্দ্র নন্দী নিজ ভবনে একটি বৃহৎ বৈষ্ণব সম্মিলনীর আয়োজন করেন। সেই সম্মিলনীতে মহারাজ শ্রীসরস্বতী ঠাকুরকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ করে নিয়েছিলেন। শ্রীসরস্বতী ঠাকুর চারদিন যাবৎশুদ্ধাভক্তি সম্বন্ধে চারটি বক্তৃতা প্রদান করেন। কিন্তু তথায় তথাকথিত প্রাকৃত সহজিয়াগণের সমাবেশ ও কেবলমাত্র লোক দেখানো ভাব দেখে তিনি চারদিন কিছু ভোজন করেন নাই। এ চারদিন উপবাসাস্তে শ্রীমায়াপুরে এসে মহাপ্রভুর প্রসাদ গ্রহণ করেন। তথায় কোন কোন লোক তাঁকে ভোজনের জন্য অনুরোধ জানালে তিনি বলেছিলেন—অভক্তি বিচার পর বারোয়ারী স্থানে ভোজন করতে নাই। পরে মহারাজা মণীন্দ্র নন্দী এ ব্যাপার বুঝতে পেরে দুঃখিত হন এবং মায়াপুরে আগমন করে তাঁর চরণে অনেক অনুনয় বিনয় প্রকাশ করেন।

তখন সারা বাংলাদেশ আউল, বাউল, কৰ্ত্তাভজা, নেড়া নেড়ী দরবেশ ও সাঁই প্রভৃতি প্রাকৃত সহজিয়া রূপ অপসম্প্রদায়ে ভরা ছিল। শ্রীসরস্বতী ঠাকুর এ সমস্ত অপসম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করেন। তিনি এই সমস্ত মহাপ্রভুর নামের কলঙ্ককারী অপসম্প্রদায়কে কিছুমাত্র প্রশ্রয় দিতেন না। এই সময় অনেক প্রসিদ্ধ গোস্বামী নামধারী ব্যক্তিও এই প্রাকৃত সাহজিয়াগণকে প্রশ্রয় দিতেন। প্রাকৃত সাহজিয়াবাদীর দল যখন পরমহংস গোস্বামী গুরুবর্গের পরমহংস বেষ ধারণ পূর্ব্বক জগৎকে প্রবঞ্চনা করতে লাগল তখন শ্রীসরস্বতী ঠাকুর দুঃখে অসৎসঙ্গ বর্জন পূৰ্ব্বক নির্জ্জনে ভজন করতে আরম্ভ করলেন। সে সময় অকস্মাৎ একদিন দিব্য মূৰ্ত্তিতে মহাপ্রভু ও ষড়গোস্বামী পূর্বতন আচার্য্যগণ যেন আবির্ভূত হয়ে বলতে লাগলেন—তুমি নিরুৎসাহ হয়ো না। উৎসাহের সহিত পুনঃ দৈববর্ণাশ্রম ধর্ম স্থাপন কর ও বৈধমার্গে ক্রমবিধিতে ভগবদ্ ভজন প্রণালী প্রচার কর। তিনি সে দিব্য প্রেরণা পেয়ে সেদিন থেকে বিপুল উদ্যমে জগতে গৌরবাণী পুনঃ প্রচার করতে আরম্ভ করলেন। শ্রীসরস্বতী ঠাকুর ১৯১৮ সালের ৭ই মার্চ শ্রীগৌরজয়ন্তী বাসরে শ্রীধাম মায়াপুরে ভাগবত ত্ৰিদণ্ডী সন্ন্যাস লীলা প্রবর্তন করলেন। সেদিন শ্রীচন্দ্রশেখর ভবনে শ্রীচৈতন্য মঠ স্থাপন করলেন ও শ্রীগুরু গৌরাঙ্গ এবং শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দ বিগ্রহ স্থাপন করলেন।

বরিশালের ভোলা নিবাসী ভূতপূর্ব্ব হাইকোর্টের বিচারপতি চন্দ্রমাধব ঘোষের ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীরোহিণী কুমার ঘোষ হরিভজন করবার আশায় সংসার ত্যাগ করে নবদ্বীপ কুলিয়ায় আসেন এবং একজন বাউলের চরণাশ্রয় করে। তাঁদের শিক্ষাদীক্ষানুসারে চলতে লাগলেন। কিন্তু বাউলদের সেবাদাসী ব্যাপার দেখে তাঁর মনে মনে ঘৃণা হতে লাগল। রোহিণীবাবু একদিন মায়াপুরে যোগপীঠ দর্শনে এলেন। সেদিন শ্রীল প্রভুপাদ যোগপীঠে হরিকথা বলছেন। রোহিণীবাবু শ্রীল প্রভুপাদের অপূর্ব্ব তেজপুঞ্জ বিশিষ্ট শ্রীমূর্ত্তি এবং অদ্ভুত সিদ্ধান্ত পূর্ণ বাণী সকল শুনে অতি আনন্দ অনুভব করতে লাগলেন। সেদিন শ্রীপ্রভুপাদের সমস্ত কথা শুনে তিনি কুলিয়ার বাউল গুরুর আশ্রমে ফিরে এলেন। একটু রাত্র হয়েছিল। রোহিণীবাবু শ্রীল প্রভুপাদের মুখে যে সমস্ত শুদ্ধ ভক্তিময়ী কথা শুনেছেন তা চিন্তা করতে করতে শুয়ে পড়লেন, কিছু খেলেন না। নিদ্রিত হলে স্বপ্নে দেখছেন সেই বাউলটি একটা ব্যাঘ্র মূর্তিতে ও সেবাদাসী ব্যাঘ্ৰী মূর্তিতে তাকে খাবার জন্য যাচ্ছে। রোহিনীবাবু ভয়ে কম্পিত কলেবরে মহাপ্রভুকে ডাকছেন। এমন সময় দেখলেন শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করছেন। রোহিণীবাবু সেইদিনই চিরতরে বাউল গুরুকে ত্যাগ করে শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীচরণ আশ্রয় করলেন।

শ্রীশ্রীঅন্নদাপ্রসাদ দত্ত (শ্রীল প্রভুপাদের বড় ভাই) দেহত্যাগের কিছুদিন পূর্ব্বে ভীষণ শিরঃপীড়ায় আক্রান্ত হন। তাঁর নির্ধান দিবসে শ্রীল প্রভুপাদ সমস্ত রাত্র তাঁর নিকট উপস্থিত থেকে তাঁকে হরিনাম শুনান। অতঃপর দেহত্যাগের কিছু পূর্ব্বে তাঁর জ্ঞান ফিরে এল। তখন তিনি শ্রীল প্রভুপাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে শ্রীহরি স্মরণ করতে বললেন। সে সময় এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। অন্নদাপ্রসাদ বাবুর ললাটে এ অপূর্ব্ব রামানুজীয় তিলক চিহ্ন স্পষ্ট ভাবে দেখা যেতে লাগল। তিনি সকলের সামনে পূর্ব্ব জীবনের কথা বলতে লাগলেন। তিনি রামানুজীয় বৈষ্ণব ছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীচরণে কিছু অপরাধ করার ফলে তাঁর পুনর্ব্বার জন্ম হয়। পূৰ্ব্বকৃত সুকৃতি ফলে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ঘরে আগমন হয়। এই সমস্ত কথা বলবার পর অন্নদাপ্রসাদ বাবু দেহত্যাগ করেন। এক সময়ে মায়াপুরে শ্রীব্রজপত্তনে শ্রীল প্রভুপাদ ভজন করছেন। ভাদ্রমাসে জন্মাষ্টমীর আগের দিন, ঠাকুরের নৈবেদ্যে দুগ্ধাদির কোন ব্যবস্থা করতে পারেন নি। শ্রীল প্রভুপাদ চিন্তা করতে লাগলেন আজ দুধ পাওয়া গেলে মহাপ্রভুকে ভোগ দেওয়া যেত। পরক্ষণে প্রভুপাদ চিন্তা করতে লাগলেন, আমার নিজের জন্য এইরূপ চিন্তা হল না কি? অন্যায় হয়। তখন বর্ষাকাল। গৌর জন্মভিটা জলমগ্ন। নৌকা ছাড়া চলা দুষ্কর। এই অবস্থায় অপরাহকালে একজন গোয়ালা সেই জল কাদা ভেঙ্গে প্রচুর পরিমাণে দুধ, ক্ষীর, মাখন ও ছানা প্রভৃতি নিয়ে উপস্থিত হলো। তখন জানতে পারা গেল গোয়ালাটিকে জমিদার হরিনারায়ণ চক্রবর্তী মহাশয় মহাপ্রভুর প্রেরণা অনুযায়ী এই সমস্ত জিনিষ দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঠাকুরের ভোগের পর সেই প্রসাদ শ্রী প্রভুপাদের কাছে নেওয়া হল। এত প্রসাদ দেখে তিনি অবাক হলেন। তারপর সমস্ত কথা শুনলেন। অনন্তর তিনি প্রসাদ নিয়ে মহাপ্রভুকে বলতে লাগলেন —“আমি আপনাকে কত কষ্টই না দিলাম। কেন আমার এইরূপ একটি দুবুদ্ধির উদয় হল ? আপনি আমার জন্য অপরলোকের হৃদয়ে প্রেরণা দিয়া এই সকল দ্রব্য পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়াছেন।”

শ্রীল প্রভুপাদের অলৌকিক প্রভাবে জগৎ মুগ্ধ হল। তাঁর আকর্ষণে বহু সম্ভ্রান্ত কূলের বিদ্বান ব্যক্তি শ্রীগৌরসেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। ১৯১৮ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে শ্রীনবদ্বীপ, মায়াপুর, কলিকাতা, ঢাকা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম মেদিনীপুর, রেমুণা বালেশ্বর, পুরী, আলালনাথ, মাদ্রাজ, কতুর, দিল্লী, পার্টনা, গয়া, লক্ষ্মৌ, কাশী, হরিদ্বার, এলাহাবাদ, মথুরা, বৃন্দাবন, আসাম, কুরুক্ষেত্র, ভারতের বহির্দেশে রেঙ্গুন ও লন্ডন প্রভৃতি স্থানে শ্রীল প্রভুপাদ ৬৬টি শুদ্ধভক্তি মঠ স্থাপন করেন এবং মন্দার পর্ব্বতোপরি, শ্রীনৃসিংহাচল এবং দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে শ্রীগৌরপাদপীঠ স্থাপন করেন। প্রাচ্য তথা পাশ্চাত্য উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ২৫ জন ব্যক্তিকে ভাগবত ত্রিদণ্ডি সন্ন্যাস প্রদান করেন। তিনি জগতে বৈকুণ্ঠবানী প্রচারের জন্য বহু শুদ্ধভক্তি পত্রিকা প্রকাশ করেন।

(১)সজ্জনতোষণী বা (The Harmonist) পাক্ষিক পত্রিকা, (২) সাপ্তাহিক গৌড়ীয় পরিকা, (৩) হিন্দী পাক্ষিক ভাগবত নামক পত্রিকা, (৪) দৈনিক নদীয়া প্রকাশ, (৫) আাসামী ভাষায় মাসিক কীৰ্ত্তন নামক পত্রিকা, (৬) উড়িষ্যা ভাষায় পরমার্থী নামক পত্রিকা। এতদ্ব্যতীত বহু বৈষ্ণব গ্রন্থও প্রকাশ করেন। তিনি পারমার্থিত জগতে একটি নুতন যুগ আনয়ন করেছিলেন। তিনি পৃথিবীর সর্বত্র গৌর বাণী প্রচারের জন্য শুদ্ধ আচরণশীল-ত্রিদণ্ডি সন্ন্যাসীদের প্রেরণ করলেন। মহা উদ্যমে শ্রীগৌরকৃষ্ণের বাণী পৃথিবীতলে প্রচার হতে লাগল। তিনি ষষ্টি বর্ষ পর্যান্ত এইরূপ উদ্যমে গৌর বাণী প্রচার করে যখন সঙ্কল্প কতকটা সিদ্ধ হয়েছে দেখলেন তখন হৃষ্ট মনে শ্রীগৌরকৃষ্ণের নিত্য সেবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করলেন। নিত্য লীলায় প্রবেশ করার কয়েকদিন পূর্বে তিনি প্রধান প্রধান শিষ্য ভক্তগণকে সমবেত করে তাঁদের প্রচুর আশীর্ব্বাদ প্রদান করলেন। পরিশেষে উপস্থিত অনুপস্থিত ভক্তগণকে আশীর্ব্বাদ করে বললেন—“সকলে রূপরঘুনাথের কথা পরমোৎসাহের সহিত প্রচার করবেন। শ্রীরূপানুগগণের পাদপদ্ম ধুলি হওয়াই আমাদের চরম আকাঙ্খা। আপনারা সকলে এক অন্বয় জ্ঞানের অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয় তৃপ্তির উদ্দেশ্যে আশ্রয় বিগ্রহের আনুগত্যে মিলেমিশে থাকবেন।" শ্রীল প্রভুপাদ এইরূপ বহু মূল্যবান উপদেশ নিয়ম নীতি প্রভৃতি দিবার পর, গত ৪ নারায়ণ গৌরাব্দ ৪৫০, ১৭ই পৌষ বঙ্গাব্দ ১০৪, ১ জানুয়ারী ১৯৩৭ সালে শুরুবার নিশান্তঃকালে শ্রীশ্রীরাধা গোবিন্দের নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন।

জয় নিতালীলা প্রবিষ্ট জগদগুরু ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদ কি জয়।

গৌড়ীয় বৈষ্ণবাচার্য শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজের  তিরোভাব তিথি ৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার,২০২৫      পূর্ববঙ্গে নোয়াখালি...
04/12/2025

গৌড়ীয় বৈষ্ণবাচার্য শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজের  তিরোভাব তিথি

৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার,২০২৫

পূর্ববঙ্গে নোয়াখালি জেলায় সন্দীপ হাতিয়া গ্রামে বাংলা ১২৮৩ সালে চৈত্র মাসে শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজের জন্ম হয়। পিতা শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত বসু, মাতা শ্রীযুক্তা বিধুমুখী বসু। শ্রীযুক্ত রজনী কান্ত বসু মহাশয় সরকারী চাকুরী করতেন। তিনি বাঘনা পাড়া গোস্বামীদের শিষ্য ছিলেন, পরে শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের শ্রীচরণ আশ্রয় করেন।
শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাঁকে বাবাজী বেশ দেন এবং শ্রীরাধাগোবিন্দ দাস বাবাজী নাম প্রদান করেন। জীবনের শেষ সময়ে পুরী ধামে তিনি অবস্থান করেছিলেন। তাঁর পত্নী শ্রীযুক্তা বিধুমুখী বসুও শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের শিষ্যা ছিলেন। তিনি শেষ বয়সে শ্রীনবদ্বীপ ধামে অবস্থান করেছিলেন।
শৈশবে শ্রীমদ ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজের নাম ছিল—শ্রীজগদীশ। তিনি কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বি. এ. ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়ে শিক্ষকতার কার্য করতেন। তিনি সপত্নীক কলিকাতায় থাকতেন। জগদীশ বাবুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীঅনন্ত বসু (ভক্তিপ্ৰসাদ পুরী গোস্বামী ঠাকুর)।
বাংলা ১৩১৬ সালে ১১ই চৈত্র, ইংরাজী ১৯১০ সালে ২৫শে মার্চ ফাল্গুনী পূর্ণিমায় শ্রীশ্রীগৌর-জন্মোৎসব-দিনে জগদীশবাবু পণ্ডিত বৈকুণ্ঠনাথ ঘোষাল ভক্তিতত্ত্ব বাচস্পতি মহাশয়ের সঙ্গে ধুবুলিয়া ষ্টেশন থেকে পদব্রজে শ্রীমায়াপুরে আগমন করেন এবং শ্রীশ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের প্রথম দর্শন লাভ করেন। তখন শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীমহাপ্রভুর মন্দির সন্নিকটে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর সম্মুখে শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর ও টাকির জমিদার রায় শ্রীযতীন্দ্রনাথ চৌধুরী এম. এ. মহাশয় প্রমুখ সজ্জন ব্যক্তিগণ বসে তাঁর মুখে হরিকথা শুনছিলেন।
অতঃপর শ্রীমদ্ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সঙ্গে পণ্ডিত বৈকুণ্ঠনাথ ঘোষাল মহাশয় শ্রীযুত জগদীশ বাবুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। শ্রীযুত জগদীশবাবু শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের শ্রীচরণ ধরে দণ্ডবৎ করে ক্রন্দন করতে করতে তাঁর কৃপা ভিক্ষা করলেন। শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় বললেন—“আপনি শিক্ষিত সম্মানার্হ । সুতরাং আপনি যদি শ্রীমন্মহাপ্রভুর কথা প্রচার করেন বহুলোক তাতে আকৃষ্ট হবে।”
ঐদিন অপরাহ্ন কালে শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর জগদীশ বাবুকে বহুক্ষণ হরিকথা শ্রবণ করান এবং বলেন—আপনি শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয়ের আদেশ নিয়ে আগামী কল্য কুলিয়ার চড়ায় ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীমদ্ গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের শ্রীচরণ দর্শন করুন। জগদীশবাবু প্রাতঃকালে কুলিয়ার চড়ায় শ্রীল বাবাজী মহারাজের দর্শনে এলেন, ভূমিতে পড়ে দণ্ডবৎ করলেন এবং একটি তরমুজ ফল ভেট দিলেন। শ্রীল বাবাজী মহারাজ বাইরের লোকের দেওয়া জিনিস প্রায় গ্রহণ করতেন না, কিন্তু কৃপা করে সেই তরমুজটী গ্রহণ করলেন।
শ্রীল বাবাজী মহারাজ বললেন—আপনাকে কে পাঠালেন?
জগদীশবাবু - ---আমি ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ও সরস্বতী ঠাকুরের নিৰ্দ্দেশে এসেছি।
শ্রীল বাবাজী মহারাজ- -আপনি কীৰ্ত্তন জানেন?—একটি কীৰ্ত্তন করুন ।
জগদীশবাবু শ্রীনরোত্তম ঠাকুর মহাশয়ের 'গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর' গীতটী করলেন। শ্রীল বাবাজী মহারাজ শুনে খুব খুশী হলেন। বললেন গুরুবৈষ্ণবের প্রতি শ্রদ্ধাবিশিষ্ট হবেন, তৃণাদপি সুনীচ ও তরুর ন্যায় সহিষ্ণু হয়ে সর্ব্বদা নাম করবেন ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করবেন।
জগদীশ বাবু -- আমার এখনও গুরু পদাশ্রয় হয় নাই।
শ্রীলবাবাজী মহারাজ---মায়াপুরে ও শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের দর্শন পেয়েছেন। মায়াপুর আত্মনিবেদনের স্থান সেখানে সদগুরুর চরশে আত্মনিবেদন করেছেন আবার গুরু পদাশ্রয় হয় নাই বলছেন কেন? ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। যান তাঁর কৃপা গ্রহণ করুন। শ্রীল বাবাজী মহারাজের কথা শুনে জগদীশবাবু সেই দিনেই কুলিয়ায় মাথা মুণ্ডন করে গঙ্গাস্নান পূর্ব্বক গোদ্রুমে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজন কুটীরে এলেন ও দ্বিপ্রহরে মন্ত্র দীক্ষা প্রাপ্ত হলেন। ঠাকুর মহাশয়ের সেবক শ্রীযুত কল্যাণ কল্পতরু দাস ব্রহ্মচারী ঠাকুরের ভোজন অবশেষ প্রসাদ জগদীশ বাবুকে দিলেন। তিনি আগে শ্রীগুরুর অধরামৃত নিয়ে তারপর ভোজন করলেন। ঐ দিবসে বেলা দুইটার সময় শ্রীমদ্ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শিক্ষাষ্টক ব্যাখ্যা করে সকলকে শুনান। অপরাহ্ন কালে শ্রীকৃষ্ণদাস বাবাজী চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ করেন এবং শ্রীল ঠাকুর মহাশয় ব্যাখ্যা করেন।
কিছুদিন পরে কলিকাতা 'ভক্তিভবনে' শ্রীমদ্ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নির্দেশে শ্রীজগদীশ বাবুকে, বসন্ত বাবুকে ও মম্মথ বাবুকে শ্রীগোপালভট্ট গোস্বামীর সৎক্রিয়াসার দীপিকার বিধান অনুসারে পঞ্চরাত্র উপনয়ন সংস্কার প্রদান করেন এবং ব্রহ্মগায়ত্রী ও গৌরাঙ্গ গায়ত্রী প্রদান করেন।
জগদীশ বাবুর শাস্ত্র অনুশীলন ও সাধু গুরুর সেবা প্রভৃতি দেখে শ্রীমদভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাঁকে ‘’ভক্তিপ্রদীপ” আখ্যা প্রদান করেন। তখন থেকে তিনি শ্রীজগদীশ ভক্তিপ্রদীপ নামে খ্যাত হন। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিশাস্ত্রী এবং সম্প্রদায় বৈভবাচার্য্য পরীক্ষা প্রবর্তন করেন। জগদীশবাবু সে পরীক্ষা দিয়ে বিদ্যাবিনোদ ভক্তিশাস্ত্রী সম্প্রদায় বৈভবাচার্য্য পদবী লাভ করেন। তিনি ছুটি পেলেই গোস্লম ধামে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নিকট যেতেন এবং ছুটির দিনগুলি তথায় কাটাতেন। তথায় অপরাহ্ন কালে তিনি শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের নির্দেশ অনুসারে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পাঠ করতেন স্বয়ং ঠাকুর মহাশয় তার ব্যাখ্যা করতেন। শ্রীগোক্রমে শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের কাছে শ্রীমদ্ কৃষ্ণদাস বাবাজী ও কয়েকজন ভক্ত থাকতেন। শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুরের আদেশে প্রাতঃকালে তাঁরা গোদ্রুম ধামে টহল দিতেন। তখন তাঁরা এই গানটা গাইতেন—“নদীয়া গোদ্রুম নিত্যানন্দ মহাজন পাতিয়াছে নামহট্ট জীবের কারণ।।”
ইংরাজী ১৯১৪ সালে ২৩শে জুন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অপ্রকট হলেন। সে দিবস তথায় শ্রীজগদীশ বিদ্যাবিনোদ ভক্তিপ্রদীপ মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। সেই দিবস রাত্রে শ্রীল প্রভুপাদ কর্মজড় স্মাৰ্ত্তবাদ খণ্ডন এবং শ্রীহরি ভক্তিবিলাস ও সৎক্রিয়া সার দীপিকায় সদাচার সম্বন্ধে বহু উপদেশ বাণী সকলকে শ্রবণ করান।
শ্রীজগদীশ বিদ্যাবিনোদ ভক্তি প্রদীপ মহাশয়ের পত্নী স্বধামে গমন করলে ইংরাজী ১৯২০ সালের কার্তিক মাসে শ্রীল প্রভুপাদ সরস্বতী ঠাকুর তাঁকে ভাগবত ত্রিদণ্ডী সন্ন্যাস প্রদান করেন। তখন থেকে ত্রিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ এই নামে অভিহিত হন। সন্ন্যাসের পরদিন তাঁকে প্রভুপাদ পূর্ববঙ্গে প্রচারে যাবার আদেশ করেন। তিনি কতিপয় ব্রহ্মচারী সহ তার পরের দিনই পূর্ব্ববঙ্গে যাত্রা করেন।
তিনি যেমন ছিলেন বিদ্বান তেমনি ছিলেন রূপবান—তিনি সুবক্তাও ছিলেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহারে সকলে মুগ্ধ হত। তিনি কিছুদিন পূৰ্ব্ববঙ্গে প্রচার করার পর কলিকাতায় ফিরে এলেন এবং বর্দ্ধমান, মেদিনীপুর ও উড়িষ্যার দিকে যাত্রা করেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদের প্রথম সন্ন্যাসী ছিলেন। প্রভুপাদ অতঃপর পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তাঁর চব্বিশ জন শিষ্যকে ত্রিদন্ডী সন্ন্যাস প্রদান পূর্ব্বক গৌরবাণী প্রচারের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।
জগদগুরু শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ ইংরাজী ১৯৩৩ সালের ১৮ই মার্চে ত্রিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ, ত্রিদণ্ডীস্বামী শ্রীমদ্ভক্তিহৃদয় বন মহারাজ ও শ্রীযুত সচ্চিদানন্দ দাসাধিকারী ভক্তিশাস্ত্রী এম. এ. মহোদয়কে ইউরোপে গৌর-বাণী প্রচার করবার জন্য বিদায় অভিনন্দন প্রদান করেন।
ইউরোপে শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ উৎসাহের সহিত কিছু বর্ষ গৌরবাণী প্রচার করেন। সেই সময় তিনি তথায় ইংরাজী ভাষায় শ্রীগৌরসুন্দরের জীবনী ও গীতার অনুবাদ করেন। এ ছাড়া আরও বহু প্রবন্ধাদি লেখেন।
বাংলা ১৩৪৩ সাল ইংরাজী ১৯৩৬ সন ৩১শে ডিসেম্বর ১৫ই পৌষ জগদগুরু শ্রীশ্রীমভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ অপ্রকট লীলা আবিষ্কার করেন। সে সময় শ্রীমক্তিপ্রদীপ তীর্ঘ মহারাজ শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীপাদপদ্মে ছিলেন। তাকে এবং অন্যান্য শিষ্যগণকে তিনি কৃপা আশীর্ব্বাদ দিয়ে সকলকে পরম উৎসাহের সহিত শ্রীরূপ-রঘুনাথের কথা প্রচার করতে আদেশ দিয়ে অপ্রকট হন ।
বাংলা ১৩৪৩, ইংরাজী ১৯৩৭, ২৬শে মার্চ শ্রীধাম মায়াপুরে যোগপীঠে শ্রীগৌরজয়ন্তী বাসরে ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি প্রসাদ পুরী গোস্বামীর আচার্যাভিষেক কার্য্য আরম্ভ হলে শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজ ত্রিদণ্ডিপাদগণের তরফ থেকে অভিনন্দন অর্থে জানিয়ে ছিলেন।
বাংলা ১৩৪৭, ইংরাজী ১৯৪১ সন ২৯শে ফাল্গুন শ্রীচৈতন্য মঠে প্রাতে গৌড়ীয় মিশনের (১৮৬০ খৃষ্টাব্দের আইনানুযায়ী রেজিস্ট্রীকৃত) সভ্যবৃন্দের সম্মিলিত প্রথম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিশনের সভাপতি ত্ৰিদণ্ডিস্বামী শ্রীমদ্ভক্তি প্রদীপ তীর্থ মহারাজ হন।
সুদীর্ঘকাল গৌড়ীয় মিশনের প্রচার কার্য্য করবার পর শ্রীমদ্ভক্তিপ্রদীপ তীর্থ মহারাজ বাংলা ১৩৫০ সালের বৈশাখ মাসে শ্রীজগন্নাথ ক্ষেত্র ধামে আগমন করেন ও গুরুবর্গের নির্দেশক্রমে তথায় শ্রীপুরুষোত্তম মঠে ঐকান্তিক ভজন করতে থাকেন। তখন তাঁর বয়স আনুমানিক ৮২ বছর।
ইংরাজী ১৯৫৪ সন অগ্রহায়ণ মাস পূর্ণিমা তিথি শ্রীল মহারাজের তিরোধান দিন। শ্রীপুরুষোত্তম ধাম, পবিত্র মাস ও পবিত্র তিথি, সবের একাধারে সমাবেশ। সেদিন প্রাতঃকাল থেকেই শ্রীল মহারাজের এক অভিনব বাৎসল্য ভাব সকলের প্রতি প্রকাশ পাচ্ছিল, সকলকে ডেকে কত স্নেহ করে ভগবদ ভজনের উপদেশ দিতে লাগলেন। তাঁর দৈনন্দিন নিয়ম অনুযায়ী প্রাতঃকালে শ্রীবিগ্রহ দর্শন, দণ্ডবৎ, স্তবাদি পাঠ করে নিজ ভজন গৃহে এসে বসলেন। প্রাতঃকালে কিছু দুধ মাত্র পান করলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ স্মরণ মঙ্গল ও শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীর স্বনিয়ম দশকম্ পাঠ করতে করতে কত রোদন, কত দৈন্যভাব প্রকাশ করলেন। তারপর শ্রীমদ্ভাগবতের দশমস্কন্ধীয় স্তব (ব্রহ্মাস্তবাদি) ভাবাবিষ্ট হৃদয়ে পড়তে লাগলেন, সাড়ে এগারটা পর্যন্ত পাঠ করলেন। সেবক শ্রীযুত অনাথনাথ দাস ব্রহ্মচারী দ্বিপ্রহর কালে স্নানাদির জল ঠিক করে মহারাজের শ্রীঅঙ্গে তৈলমর্দন করে দিলেন, অনন্তর শ্রীল মহারাজ স্নান করলেন। সেবককে নূতন বস্ত্র বের করে দিতে বললেন, সেবক নূতন বস্ত্র শীঘ্রই বের করে দিলেন। মহারাজ পরিধান করে নূতন আসনে বসে দ্বাদশ অঙ্গে তিলকাদি ধারণ করলেন। নিত্য নিয়মিত জপ অন্তে শ্রীতুলসীতে জল প্রদান করে প্রদক্ষিণ করলেন ও তথা হতে শ্রীজগদীশের উদ্দেশ্যে প্রণাম করলেন। অতঃপর প্রসাদ সেবা করলেন। একটু বিশ্রাম করার পর সেবককে ডাকলেন এবং নিতা নিয়মিত শ্রীচৈতন্যভাগবত তাঁর সম্মুখে পড়তে আদেশ করলেন। পাঠ শ্রবণের জন্য তিনি এক নূতন আসনে বসলেন, হস্তে নামের জপ মালিকা ছিল। শ্রবণ করতে করতে মাঝে মাঝে উচ্চৈঃস্বরে হা গৌরহরি, হা নিত্যানন্দ বলে ডাকছেন। তখন শ্রীচৈতন্যভাগবতের মধ্য লীলায় শ্রীমহাপ্রভুর নগর সংকীর্তনের কথা সেবক ব্রহ্মচারী সুস্বরে পাঠ করেন
তথাহি –পাহিড়া রাগ
নাচে বিশ্বম্ভর
জগত ঈশ্বর
ভাগীরথী তীরে তীরে।
যার পদধূলি
হই' কুতূহলী
সবে ধরিল শিরে।।
অপূর্ব্ব বিকার
নয়নে সু ধার
হুঙ্কার গর্জ্জন শুনি।
হাসিয়া হাসিয়া,
শ্রীভুজ তুলিয়া
বলে 'হরি হরি' বাণী।।
মদন সুন্দর
গৌর কলেবর
দিব্য বাস পরিধান।
চাঁচর চিকুরে
মালা মনোহরে
যেন দেখি পাঁচ বাণ।।
চন্দন চৰ্চ্চিত
শ্রীঅঙ্গ শোভিত
গলে দোলে বনমালা।
ঢুলিয়া পড়য়ে,
প্রেমে থির নহে
আনন্দে শচীর বালা।।
কাম শরাসন,
ভ্রু-যুগ পত্তন
ভালে মলয়জ বিন্দু।
মুকুতা দশন
শ্রীযুত বদন
প্রকৃতি করুণাসিন্ধু।।
ক্ষণে শত শত,
বিকার অদ্ভূত
কত করিব নিশ্চয়।
অশ্রু,, কম্প, ঘর্ম,
পুলক বৈবর্ণা
না জানি কতেক হয়।।
ত্রিভঙ্গ হইয়া
কভু দাঁড়াইয়া
অঙ্গুলে মুরলী বায়।
জিনি মত্ত গজ
চলই সহজ
দেখি নয়ন জুড়ায়।।
অতি মনোহর
যজ্ঞ-সূত্র-বর
সদয় হৃদয়ে শোভে।
এ বুঝি অনন্ত
হই গুণবন্ত
রহিলা পরশ লোভে।।
নিত্যানন্দ চাঁদ
মাধব নন্দন
শোভা করে দুই পাশে।
যত প্রিয়গণ
করয়ে কীৰ্ত্তন
সবা চাহি চাহি হাসে।।
যাঁহার কীর্তন,
করি অনুক্ষণ
শিব দিগম্বর ভোলা।
সে প্রভু বিহরে
নগরে নগরে।
করিয়া কীৰ্ত্তন খেলা৷
(চৈঃ ভাঃ ২৩।২৭১-২৮০)
এ পর্যন্ত শ্রবণ করে শ্রীল মহারাজ প্রেমভরে অজস্র অশ্রুপাত করতে করতে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন—শ্রীগৌরসুন্দরের দুই পাশে শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীগদাধর কি অপূর্ব্ব শোভা পাচ্ছেন। এই বলে হাতের জপ মালিকাটি সামনে চৌকির উপর রেখে কর জোড়ে নতশিরে অতি করুণস্বরে হা গৌর ! হা নিতাই ! হা গদাধর ! বলে তিনি যেন নিঃশব্দে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পাঠের পর তাঁর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে, পাঠক ব্রহ্মচারী মহারাজ ! মহারাজ ! বলে কয়েকবার ডাকলেন, তথাপি কোন সাড়া না পেয়ে মহারাজের শ্রীঅঙ্গে হাত দিয়ে দেখলেন তিনি আর এ জগতে নাই। যোগাসনে বসে শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর নিত্য মহাসংকীর্ত্তন রাস লীলায় চলে গেছেন।
শ্রীল মহারাজকে মর্ত্যলোকে আর দেখতে না পেয়ে বিরহ বেদনাশ্রু জলে বক্ষস্থল প্লাবিত করতে করতে রোদন করতে লাগলেন। সকলের শ্রীহরিদাস ঠাকুরের অন্তর্ধানের কথা মনে হতে লাগল। গৌড়ীয় বৈষ্ণব জগতে একটি মহারত্ন অন্তর্হিত হলেন।
এ মহাপুরুষের অপার কৃপা ও গুণের কথা কি বর্ণন করে সমাপ্ত করতে পারব? তথাপি মুকের ভাগ্য ও জিহ্বার উল্লাসে কিছু বলে যাই। এরা স্নেহ ছিল সহস্ৰ পিতৃ-মাতৃ স্নেহ সম। সেই স্নেহের আকর্ষণে আমার ন্যায় শিশু মহাপ্রভুর সেবায় নিযুক্ত হয়েছিল।
তিনি বলতেন প্রথমে সাধু-গুরু-বৈষ্ণব সেবা, সঙ্গে সঙ্গে ভগবতগ্রন্থ অনুশীলন ও কথা শ্রবণাদি করতে হবে। সেবা করার সঙ্গে সঙ্গে হরিকথা শ্রবণ করতে হবে। “শুশ্রূষা"- সেবা করার ইচ্ছা, শ্রবণ করার ইচ্ছা যার আছে সেই শুশ্রূষু ব্যক্তি। তিনি হাতে ধরে সকলকে সেবা শিক্ষা দিতেন আবার সংগ্রহানুশীলন এবং ভাগবত ও গীতা অনুশীলনের দিকে সুতীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখতেন।
শ্রীল মহারাজ হরিকথা নোট করতে বলতেন, আর বলতেন যাদের স্মরণ শক্তি নাই তাদের হরিভজন হবে না। প্রাতকালে মাধুকরী ভিক্ষা করতে যেতাম, রাত্রে তাঁর মুখে যে সমস্ত কথা শুনতাম তা লোকের কাছে বলতাম। বিকালে গৌড়ীয় মঠের সারস্বত শ্রবণ সদনে শ্রীল মহারাজ ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাস করতেন। জিজ্ঞাসা করতেন মাধুকরী করতে গিয়ে কার সঙ্গে কি কি কথা বলেছ? রাত্রে আপনার থেকে যে সব কথা শুনেছি তাই বলেছি তা শুনে তিনি বড় খুশী হতেন, বলতেন হরিকথা ভাল করে নোট করে নিও। লোকের কাছে বলতে পারবে। নিজে শুনতে হবে। সেবা করতে হবে। অন্যকে শুনাতে হবে, সেবা করাতে হবে।
প্রায় সাত আট বছর কাল শ্রীল মহারাজের সেবায় নিযুক্ত ছিলাম। এক বার মহারাজকে বললাম মায়াপুরে টোলে ব্যাকরণ পড়ব কি? তিনি বললেন— সেবা কর শ্রীহরি-গুরু-বৈষ্ণব কৃপায় তোমার সর্ব্বতত্ত্ব স্বয়ং স্ফুরিত হবে। সেবোন্মুখের স্বয়ং সৰ্ব্বতত্ত্ব স্ফুরিত হয়। আর আমি পড়বার কথা বললাম না। চিন্তা করলাম পড়তে ত আসি নাই; সেবা করবার জন্য এসেছি। পড়ে কি হবে? অন্য দিন মহারাজ বললেন যে সমস্ত কথা হচ্ছে তা ভাল ভাবে শুন। তাতে পড়ার কাজ হবে।
তখন শ্রীচৈতন্য মঠের নাট্যমন্দিরে ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীমদ্ভক্তি প্রসাদ পুরী গোস্বামী ঠাকুর প্রতিদিন ভক্তি সন্দর্ভ পাঠ করতেন। আমরা তা মনোযোগের সহিত শুনতাম। এ সব কথা ইংরাজী ১৯৪৬ সালের। শ্রীল তীর্থ মহারাজ কোন কোন দিন ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাস করতেন। তখন সকলকে বক্তৃতা করা শিখাতেন। আমরাও বক্তৃতা করতে শিখতাম। পাঁচ মিনিট বলবার পর আর বলতে পারতাম না। মহারাজ বলতেন বলতে বলতে হবে। শ্রীল মহারাজ সেবা বিষয়ে কিংবা পাঠ বক্তৃতা বিষয়ে সকলকে খুব উৎসাহ দিতেন। তিনি অতিশয় সরল ছিলেন। কোন কোন দিন আমাদের বলতেন তোরা কুড়ে। “পূর্বে রান্না অর্জন করে শ্রীল প্রভুপাদের ভোজন করায়ে দৈনিক নদীয়া প্রকাশ বিক্রী করতে নবদ্বীপে যেতাম। বৈকালে এসে ঠাকুর জাগাতাম, রান্না করতাম, প্রবন্ধ লেখা প্রভৃতি সেবা করতাম। তখন মায়াপুরে পাকা মন্দির হয়নি। চৈতন্য মঠে, শ্রীবাস অঙ্গনে ও যোগপীঠে খড়ের ঘর ছিল। চাষী রেখে বাগ বাগচার কাজ ও জমি চাষ প্রভৃতি করাতাম। তাতে ধান কলাই মটর যাহা হত তার দ্বারা সারা বৎসর প্রভুর সেবা চলত।"
শ্রীল মহারাজ পরম দয়ালু ছিলেন। সকলকে হরিভজন করাতে চাইতেন। যাঁরা পাঠ কীৰ্ত্তনে যোগদান করতে অবহেলা করতেন, তাদের তিনি বলতেন, —তুই আজ খেতে পাবি না। পাঠের সময় অনেক ব্রহ্মচারী ঘুমায় দেখে একদিন প্রসাদ পাওয়া স্থানে পাঠ করতে লাগলেন। সকলের সামনে প্রসাদের থালা। বললেন এখন দেখি কে ঘুমায়? যারা ইষ্টগোষ্ঠী ক্লাসে ভাল বলতে পারতেন না তাদের দাঁড় করিয়ে শ্লোক মুখস্থ করাতেন। স্নেহ করে কাকে মারতেনও। মহারাজ ছিলেন শিক্ষা গুরু। তিনি বলতেন বিষ্ঠার জলে পূর্ণ কলসী গঙ্গায় ডুবালে কি হবে? যতটা বিষ্ঠার জল কম হবে ততটা গঙ্গা জল ঢুকবে। তোর যতটা হরিকথা কানে যাবে ও যতটা সেবা করবি, ততটা ভক্তি লাভ হবে। বিষয় বিষ্ঠা জলে হৃদয় কলসী ভরা থাকলে ভক্তি গঙ্গা জল তাতে ঢুকতে পারে না।
তিনি আরও বলতেন——–সম্বন্ধ জ্ঞান না হলে ভক্তি হয় না। ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসীর অভিমান ছাড়তে হবে। আমি শ্রীকৃষ্ণ দাসানুদাস এই অভিমান চব্বিশ ঘণ্টা মনে রাখতে হবে। এই অভিমান ভুললে মায়া এসে ধরবে। জীবের কৃষ্ণ সেবা করাই হল স্বধর্ম। পতিব্রতার স্বামী-সেবাই যেমন স্বধর্ম। যাঁরা কৃষ্ণ সেবা করে না তারা স্বধর্মত্যাগী বেশ্যা। সাধু, গুরু ও কৃষ্ণকে কান দিয়ে দেখ। অর্থাৎ শ্রৌত পথে শ্রবণ কর। চক্ষু দিয়ে দেখলে পাপ। আগে শ্রবণ, পরে দর্শন। যারা হরিকথা শুনে না তাদের দর্শন হয় না।
শ্রীল মহারাজ সেবকগণকে কখনও অমর্যাদা করতেন না। সকলকে ‘প্রভু' বলে সম্বোধন করতেন। পত্র লিখলে পত্রের প্রারম্ভে “শ্রীশ্রীভাগবত চরণে দণ্ডবৎ প্রণতি পূঝিকেয়ং" পত্রের শিরোনামায় লিখতেন "পরম ভাগবত ইংরেজি ১৯৪৮ সালের কার্তিক মাসে আমি প্রথম ''দশবতার বন্দনা '' পদ্য লিখে তা ছাপিয়ে শ্রীল মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পণ করি। তিনি তা পেয়ে কত আনন্দ ভরে আমাকে কৃপাশীৰ্ব্বাদজনক এক পত্র দেন— তোমার শ্রীশ্রীদশাবতার বন্দনা" বন্দনা-পূৰ্ব্বত গ্রহণ করিয়া শিরে ধারণ করিলাম। বন্দনা রচনা নৈপুণ্যে শুদ্ধা সরস্বতী (ভক্তিসিদ্ধান্ত) যে তোমার কণ্ঠে উদিত হইয়া লেখাইয়াছেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কবে তোমার শ্রীমুখে এই শ্রীদশাবতার বন্দনা কীৰ্ত্তন-মুখে শুনিবার সৌভাগ্য পাইব। তোমাদের সর্ব্বাঙ্গীন কুশল প্রার্থী, বৈষ্ণব দাসানুদাস—শ্রীভক্তি প্রদীপ তীর্থ।
শ্রীশ্রী মহারাজের দয়া দাক্ষিণ্যের তুলনা হয় না। অধিক আর কি বলব। তাঁর সেই কৃপামৃতের বিন্দু গলবস্তু কৃতাঞ্জলি হয়ে প্রার্থনা করি। জন্মে জন্মে যেন তাঁর আশীর্ব্বাদ বাণী শিরে ধারণ করে শ্রীশ্রীহরি-গুরু-বৈষ্ণগনের শ্রীচরণ সেবা করতে পারি। ইহাই আমার একমাত্র বিনীত প্রার্থনা।

Address

P. O. : Kurukshetra
Kurukshetra
132118

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sri Vyas Gaudiya Math posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share