19/05/2026
🔴🌺।। মঙ্গল চন্ডী ।।🌺🔴
গৃহে গৃহে যিঁনি মঙ্গল প্রদান করেন, দেবীর সেই স্বরূপ ভক্তের কাছে "মঙ্গলচণ্ডিকা"। বৈশাখ মাসের সমস্ত মঙ্গল ও শণিবারে দেবীর এই রূপের পূজা হয় । দেবী মঙ্গল চণ্ডীর দুটি রূপে পূজা হয়, এক কমলে বিরাজিতা মূর্তি, অপরটি সিংহাসীনা মূর্তি। দেবী মঙ্গলচণ্ডী "চণ্ডীমঙ্গল" কাব্যের বর্ণিত সেই দেবী। পাঁচালীতে সেই কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান পাঠ করা হয় । মঙ্গলকাব্যের সেই দেবী চণ্ডী আজ গৃহে গৃহে মঙ্গলচণ্ডী নামে পূজিতা ।।
বাংলা মায়ের বারো মাসে তেরো পার্বণ৷ আর সেই তেরো পার্বণে হাজারও বারব্রত৷ পূর্ববঙ্গে এই রীতির কিছুটা ছাড়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মায়েরা নাছোড় এই বারব্রত পালনে৷ ঋতুর হাওয়াবদলের সঙ্গে সঙ্গে বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই বাঙালিয়ানাটুকুকে সম্বল করে এখানকার মহিলারা বেশ হুল্লোড়ে থাকেন ওই দিনগুলোতে৷ যারা অফিস করেন তাঁরাও শুনি উপোসটুকুনি ছাড়তে নারাজ৷ ভোরবেলা ব্রতকথার বইখানিতে পেন্নাম ঠুকে কথকতায় চোখ বুলিয়ে তার পর দশটা -পাঁচটায় সামিল হন৷ সে দিন শিকেয় তোলা মাছের ঝোলভাত -ডাল -চচ্চড়ি৷ দুপুরে ফলাহার , রাতে ময়দার ভাজা সব সুস্বাদু৷
কাউকে আবার বলতে শুনেছি , মায়েদের মুখ বদলানোর সব উপায় করে দেওয়া হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে৷ কিন্ত্ত সত্যি কি তাই ? আসলে প্রতিটি ব্রতকথার আড়ালে যে ছোটো উপাখ্যানগুলি আছে সেগুলি প্রচলিত হলেও লোকশিক্ষার মোড়কে হাজির করা হয় আমাদের সামনে৷ আর বিশেষ দিনগুলি পালনের অর্থ হল সেগুলিকে বারবার নিজেদের সাংসারিক টানাপোড়েনে ঝালিয়ে নেওয়া৷ মনে মনে তাঁরা বলেন " বারব্রত নিষ্ফল হয় না , ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই " ।
জ্যৈষ্ঠের প্রতি মঙ্গলবারে কুমারী ও সধবারা সংসারের মঙ্গলকামনায় স্মরণ করেন মা মঙ্গলচণ্ডীকে৷ বর্ধমানের মায়েরা এই দিন কাঁঠালপাতায় দুব্বোঘাস , ধান , যব ও মুগকলাই রেখে খিলি বানিয়ে মা চণ্ডীকে নিবেদন করেন ও পরে কলার মধ্যে সেই ধান -যব পুরে ‘গদ ’ গিলে খান৷ আমলা বাটা আর হলুদ দিয়ে স্নান করানো হয় মা ’কে এবং পাঁচটি ফল দান করতে হয়৷
মঙ্গলচণ্ডীর এই ব্রতকথায় আছে , জয়দেব ও জয়াবতীর কথা৷ দেবীমাহাত্ম্য বিস্তারের জন্য স্বয়ং মা দুর্গাই বুড়ী ব্রাহ্মণীর বা দেবী ক্ষেমঙ্করীর বেশ ধরে মর্ত্যে চলেন৷ মহাবিদ্যা ধূমাবতীর ধনাত্মক রূপ দেবী ক্ষেমঙ্করী,এই দেবী গৃহী পুজ্য।
‘ মায়া করি ধরে মাতা জরাতীর বেশ ,
হাতে লাঠি কাঁধে ঝুলি উড়ি পড়ে কেশ ’ ৷
উজানীনগরে এক সওদাগরের বাড়িতে তিনি হাজির হন৷ প্রখর রোদে হঠাত্ গিয়ে ভিক্ষা চাইলেন৷ বেনেবউ থালায় করে চাল আর টাকা দিয়ে সিধে দিলেন৷ কিন্ত্ত ব্রাহ্মণীর সাতটি মেয়ে , একটিও পুত্র নেই৷ বুড়ি সেই শুনে আর ভিক্ষে নিলেন না৷ দিনে দুপুরে ভিক্ষা না নিয়ে চলে যাওয়ায় সংসারের অকল্যাণ হবে জেনে বেনেবউ কান্নায় ফেটে পড়লেন৷ এ দিকে সওদাগর খোঁজ করে সেই বুড়ির কাছে গেলেন৷ বুড়ি তার হাতে একটি ফুল দিয়ে বললে , সেই ফুলটি যদি তার বউ ধুয়ে জল খায় তবে সে সুপুত্রের জননী হবে৷ বুড়ো বয়সে বেনেবউ আবার গর্ভবতী হল৷ ফুটফুটে ছেলে হল তার৷ তার নাম রাখা হল জয়দেব৷ এ বার সেই ব্রাহ্মণী হাজির হল আর এক সওদাগরের গৃহে৷ তার সাতটি পুত্র, কন্যা নেই৷ তাই ভিক্ষে নিলেন না তাঁর ঘরে৷ এ বারে কারণ হল কন্যাসন্তানকে প্রাধান্য দেওয়া৷ ঠিক আগের মতোই এই গৃহেও ফুল ধোয়া জলপান করে গৃহিণীর কন্যাসন্তান হল৷ তার নাম রাখা হল জয়াবতী৷ পাশাপাশি দু’টি গ্রামে জয়দেব আর জয়াবতী বড়ো হয়৷
তারা খেলে বেড়ায় , আপনমনে ছেলেখেলার ছলে মঙ্গলচণ্ডীর পুজো করে৷ জয়দেবের বিশ্বাস নেই কিন্ত্ত জয়াবাতীর অগাধ বিশ্বাস৷ এ ভাবেই একদিন জয়দেবের পায়রা এসে বসে জয়াবতীর কোলে৷ জয়াবতী দিতে নারাজ৷ জয়দেব প্রশ্ন করে , সে কি পুজো করছে ? জয়াবতী বলে এই চণ্ডীপুজো করলে ‘হারালে পায় , মলে জিওয় খাঁড়ায় কাটে না৷ আগুনে জলে ফেলে দিলে মরণ ঘটে না৷ সতীন মেরে ঘর পায় , রাজা মেরে রাজ্য পায় ’৷
জয়দেবের তা শুনে ভালো লাগে৷ জয়াবতীকে সে বিয়ে করতে চায় , মা ’কে জানায়৷ জৈষ্ঠ্যমাসের মঙ্গলবারে তাদের বিয়ে হয়৷ সে দিন জয়াবতী আঁচল থেকে গদ বের করে গিলে খায়৷ এ বার জয়দেবের জয়াবতীকে পরখ করার পালা৷ অঢেল ধনরত্ন , গয়নাগাটি নিয়ে জয়াবতী জলপথে শ্বশুরঘরে যাত্রা করে৷ মাঝপথে জয়দেব জয়াবতীকে বলে ডাকাতের উপদ্রবের কথা৷ কাপড়ের পুঁটুলিতে সব গয়নাগাটি বেঁধে জয়দেব সেটিকে জলে ফেলে দেয়৷ জয়াবতী তা দেখে মা চণ্ডীকে স্মরণ করে৷ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পর দিন বউভাতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য নদীতে জাল ফেলে যে মাছ ধরে আনা হয় সেই মাছ কাটতে গিয়ে লোকজন হিমশিম৷ বঁটি , দা , কুড়ুল কিছু দিয়েই সেই বোয়ালমাছটি কাটা যায় না৷ তখন জয়াবতীর ডাক পড়ে৷ জয়াবতী মা মঙ্গলচণ্ডীকে স্মরণ করে অতি অনায়াসেই বঁটিতে মাছের পেট কেটে ফেলে আর তার গয়নাশুদ্ধ পুঁটুলিটা পায়৷ তখন জয়দেবও বুঝতে পারে দেবী মাহাত্ম্য৷ তাই বুঝি মঙ্গলচণ্ডীর পুজোয় এখনও মেয়েরা আওড়ায় এই মন্ত্র ,
" আটকাটি ,
আটমুঠি সোনার মঙ্গলচণ্ডী রুপোর পা ,
কেন মাগো মঙ্গলচণ্ডী হল এত বেলা ?
হাসতে খেলতে ,
তেলহলুদ মাখতে ,
আঘাটায় ঘাট করতে ,
আইবুড়োর বিয়ে দিতে ,
অন্ধের চক্ষু দিতে ,
বোবার বোল ফোটাতে ,
ঘরের ঝি বৌ রাখতে ঢাকতে হল এত বেলা৷ " -
এ ভাবেই সংসারের রমণীটি সংসারের সার্বিক সুখ শান্তি কামনা করে থাকে৷ আর একটা কারণ হল , গ্রীষ্মের দাবদাহে ফুটিফাটা বাংলার মাঠঘাট৷ মা চণ্ডীর পুজোয় যদি সময়মতো বর্ষা নামে , তবে বাংলার কৃষিপ্রধান বর্ধমান জেলাটির শস্যভাণ্ডারটিও ফুলে ফেঁপে উঠবে সেই আশায় বুঝি মা চণ্ডীর শরণাপন্ন হওয়া৷
মা মঙ্গলচণ্ডী -
" বিশ্বের মূল স্বরূপা প্রকৃতিদেবীর মুখ হ'তে মঙ্গলচণ্ডী দেবী উৎপন্না হয়েছেন। তিনি সৃষ্টিকার্য্যে মঙ্গলরূপা এবং সংহারকার্য্যে কোপরূপিণী, এইজন্য পণ্ডিতগণ তাঁকে মঙ্গলচণ্ডী বলিয়া অভিহিত করেন। " -
দেবীভা-৯স্ক-১।
" দক্ষ অর্থে চণ্ডী এবং কল্যাণ অর্থে মঙ্গল। মঙ্গলকর বস্তুর মধ্যে দক্ষ বলে তিনি মঙ্গলচণ্ডী নামে প্রসিদ্ধ। প্রতি মঙ্গলবারে তাঁহার পূজা বিধেয়। মনু বংশীয় মঙ্গল রাজা নিরন্তর তাঁহার পূজা করিতেন। " -
দেবীভা-৯স্ক-৪৭।
-
🔴 মঙ্গলচণ্ডী ব্রত :
জৈষ্ঠ্যমাসের প্রতি মঙ্গলবারে মা চণ্ডীর আরাধনা করা হয় বলে এ ব্রতের নাম মঙ্গলচণ্ডী ব্রত। জীবনে শ্রেষ্ঠ মাঙ্গল্যের প্রতিষ্ঠার জন্যই এ ব্রতের অনুষ্ঠান। মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের নানা রূপ আছে। কুমারীরা যে মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের আচরণ করে, তা অতি সহজ ও সংক্ষিপ্ত। দেবী অপ্রাকৃত মহিমার প্রশস্তিগীতি ব্রতের ছড়ায় এসে ধরা দেয়।।
🔴 যথা :
সোনার মা ঘট বামনী।
রূপোর মা মঙ্গলচণ্ডী।।
এতক্ষণ গিয়েছিলেন না
কাহার বাড়ি?
হাসতে খেলতে তেল সিন্দুর মাখতে
পাটের শাড়ি পরতে সোনার দোলায় দুলতে
হয়েছে এত দেরী।
নির্ধনের ধন দিতে
কানায় নয়ন দিতে
নিপুত্রের পুত্র দিতে
খোঁড়ায় চলতে দিতে
হয়েছে এত দেরী।।
অভীষ্ট সিদ্ধিমানসে হিন্দু মহিলা মঙ্গলবারে মঙ্গলচণ্ডী দেবীর অর্চনা ও ব্রত উপসাবাদি করে থাকেন। ধনপতি সওদাগরের পত্নী খুল্লনা প্রথম মঙ্গলচণ্ডীদেবীর পূজার প্রবর্তন করেন। এই খুল্লনার নামানুসারেই বাংলাদেশের 'খুলনা' জেলার নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি।।
দেবীর করুণাশক্তি অমোঘ। তাঁর শরণাগত হলে নির্ধন ধনী হয়, অন্ধ নয়ন পায়, বন্ধ্যা পুত্র লাভ করে, খঞ্জ চরণযুক্ত হয়। সংসারজীবনে এই মঙ্গলময়ীর আরাধনা তাই একান্তই প্রয়োজন। কুমারীজীবন থেকেই তারা আরাধনা শুরু করে এবং সমগ্র জীবনব্যাপী তা চলতে থাকে।।
অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় সংসারের মঙ্গল কামনায় মহিলাগণ মঙ্গলচণ্ডীর পূজো করে থাকেন। পুরাণের দেবী চণ্ডী অস্ত্রধারিনী, অসুর মর্দিনী। কিন্তু মঙ্গলচণ্ডী দেবীর যে পট ছবি আমরা দেখি তাতে তিনি দ্বিভুজা, হাতে পদ্ম পুস্প, পদ্মাসীনা। সমগ্র মাতৃত্বের রূপ দেবীর মধ্যে প্রস্ফুটিত। চণ্ডীদেবীর কথা বৃহধর্ম পুরাণে পাওয়া যায়। ভবিষ্যপুরাণে মঙ্গলচণ্ডী ব্রতের উল্লেখ আছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে ইনি কেবল স্ত্রীলোকের দ্বারা পূজিতা বলা হয়েছে। চণ্ডীমঙ্গল কাব্য অনুসারে চন্ডীদেবীর আবির্ভাবের প্রথম পর্বে দেখি কালকেতু ও ফুল্লরার কথা। কালকেতু জাতিতে শবর ব্যাধ, তার পত্নী ফুল্লরা এক শবরী । কালকেতু বনে শিকার করে মাংস হাটে বিক্রি করে সংসার চালাতো। একদা দেবী চণ্ডী তাদের গৃহে ছদ্দবেশে এসে পরীক্ষা নেন। কালকেতু ও ফুল্লরাকে শেষে দশভুজা রূপে দর্শন দিয়ে তাঁদের গুজরাট প্রদেশের অধিপতি করেন।
🔴♦মা মঙ্গলচণ্ডীর ধ্যান:
যৈষা ললিতকান্তাখ্যা দেবী মঙ্গলচণ্ডিকা ।
বরদাভয়হস্তা চ দ্বিভুজা গৌরদেহিকা ।
রক্তপদ্মাসনস্থা চ মুকুটোজ্জ্বলমণ্ডিতা ।
রক্তকৌষেয়বসনা স্মিতবক্ত্রা শুভাননা ।
নবযৌবনসম্পন্না চার্ব্বঙ্গী ললিতপ্রভা ।।
🔴 অর্থ - যাঁহার নাম মধুর ও মনোহর, যাঁহার হস্তে বর ও অভয় মুদ্রা, যিনি দ্বিভুজা ও গৌরবর্ণা, যিনি রক্তপদ্মাসনে উপবিষ্টা ও মুকুট দ্বারা উজ্জ্বলরূপে ভূষিতা, যিনি রক্তবর্ণ কৌষেয় (চেলির) বস্ত্র পরিধান করিয়া আছেন, যিনি সহাস্যবদনা, সুন্দরাননা ও নবযৌবনা, যিনি সুন্দরাঙ্গী ও মধুর লাবণ্যযুক্তা, তিনিই দেবী মঙ্গলচণ্ডী।
🔴 দেবীমায়ের প্রণাম মন্ত্র :
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বাথসাধিকে । শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে||
🔴 অর্থ :
ॐ আপনিসর্বমঙ্গলস্বরূপা,সর্বাভীষ্টসাধিকা,একমাত্র স্মরণযোগ্য ,ত্রিভুবন জননী বা ত্রিনয়না (সূর্যচন্দ্রাগ্নিলোচনা ) ও গৌরবর্ণা | হে নারায়ণী ,আপনাকে প্রণাম করি ||
🔴 শিবশম্ভুপাঠকৃত মঙ্গলচণ্ডিকা স্তোত্র :
রক্ষ রক্ষ জগন্মাতর্দেবী মঙ্গলচণ্ডিকে ।
হারিকে বিপদাং রাশের্হর্ষমঙ্গলদায়িকে ।।
হর্ষমঙ্গলদক্ষে চ হর্ষমঙ্গলদায়িকে ।
শুভে মঙ্গলদক্ষে চ শুভে মঙ্গলচণ্ডিকে ।।
মঙ্গলে মঙ্গলার্হে চ সর্বমঙ্গলমঙ্গলে ।
সতাং মঙ্গলদে দেবী সর্বেষাং মঙ্গলালয়ে ।।
পূজ্যে মঙ্গলবারে চ মঙ্গলাভীষ্টদেবতে ।
পূজ্যে মঙ্গলবংশস্য মনুবংশস্য সন্ততম্ ।।
মঙ্গলাধিষ্ঠাতৃদেবী মঙ্গলানাঞ্চ মঙ্গলে ।
সংসারমঙ্গলাধারে মোক্ষমঙ্গলদায়িনী ।।
সারে চ মঙ্গলাধারে পারে চ সর্বকর্মণাম্ ।
প্রতিমঙ্গলবারে চ পূজ্যে মঙ্গলসুখপ্রদে ।।
🔴 বঙ্গানুবাদ-
হে জগজ্জননী ! বিপদবারিণি ! হর্ষমঙ্গলপ্রদায়িনী ! দেবী! মঙ্গলচণ্ডিকে ! রক্ষা কর, রক্ষা কর। তুমি হর্ষ এবং মঙ্গলদানে দক্ষা – তুমি হর্ষ এবং মঙ্গল দান করিয়া থাক । তুমি শুভ এবং মঙ্গল বিষয়ে নিপুণা বলিয়া শুভা এবং মঙ্গলচণ্ডিকা নামে প্রসিদ্ধা হইয়াছ । হে মঙ্গলে ! মঙ্গলার্হে ! সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে ! সাধুগণের মঙ্গলদায়িনী! হে দেবী! তুমি সকলের মঙ্গল দান কর। হে মঙ্গলরাজের অভীষ্ট দেবী! মঙ্গলবারেই তোমার পূজা বিধেয় এবং মণুবংশজাত মঙ্গল রাজা নিরন্তর তোমার অর্চনা করেন । হে মঙ্গলাধিষ্ঠাতৃদেবি। পৃথিবীতে যত প্রকার মঙ্গলকর বস্তু আছে , তুমি সেই সকলের স্বরূপা । হে সংসারমঙ্গলাধারে । তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ মোক্ষ দান করিতে পার । হে মঙ্গলজনয়িত্রি । হে সাররূপিনী ! তুমি সকল কর্মের অগোচর এবং প্রতি মঙ্গলবারে পূজিতা হইয়া বহু সুখ প্রদান কর।
শ্রী ব্রহ্মবৈবর্তপূরাণে(প্রকৃতিকাণ্ডের ৪৪/২০-৩২ শ্লোক) মঙ্গলচণ্ডিকা স্তোত্র সম্পূর্ণম্।।
(শ্রী ব্রহ্মবৈবর্তপূরাণের প্রকৃতিকাণ্ডের ৪৪/২০-৩২ শ্লোক)
🔴 উজ্জয়নী মঙ্গলচণ্ডী শক্তিপীঠ :-
পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে ত্রয়োদশ শক্তিপীঠ হল উজ্জয়নী । এখানে দেবীর কর্পূর/ কনুই পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম মঙ্গলচণ্ডীকা আর ভৈরব হলেন কপিলাম্বর । উজ্জয়নী হল পশ্চিম মালবের রাজধানী । তবে এই উজ্জয়নীতে দেবীর ভৈরব ও দেবীপীঠ নিয়ে মতান্তর দেখা যায় । দ্বাদশ জ্যোতি লিঙ্গের একটি লিঙ্গ মহাকাল এখানেই অবস্থিত । অনেকে মনে করেন এই মহাকাল মন্দিরেই সতী পীঠ অবস্থিত । দেবীর ভৈরব হলেন মহাকাল । আবার উজ্জয়নীর শাসক দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য হরসিদ্ধি নামক এক দেবীর পূজা করতেন । তান্ত্রিকদের মতে তিনিই সতী পীঠের দেবী মঙ্গলচণ্ডীকা ।
আবার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের মঙ্গলকোট থানার কোগ্রাম বা উজানী গ্রামকেও এই পীঠ বলে ধরা হয় । লোকশ্রুতি অনুসারে এখানেই ভগবতী মা সতীর কনুই পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম মঙ্গলচণ্ডী আর ভৈরব হলেন কপিলেশ্বর । তবে বহু যুগ থেকে সাধু সন্ন্যাসীরা ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীকেই শক্তিপীঠ মেনে এসে সেখানেই সাধনার জন্য যান । পীঠনির্ণয়তন্ত্র বলে-
" উজ্জয়িন্যাং কূপারশ্চ মাঙ্গল্য কপিলাম্বর ।
ভৈরবঃ সিদ্ধিদঃ সাক্ষাদ্দেবী মঙ্গলচণ্ডীকা ।।"
উজ্জয়নী সতী পীঠ। সনাতনী সংস্কৃতি ও মিলনের আবহাওয়া এখানে । এখনও এখানে কুম্ভ মেলা বসে। শাস্ত্রে বলে-
" মেষরাশিগতে সূর্য্যে সিংহরাশ্যাং বৃহস্পতৌ ।
উজ্জয়িন্যাং ভবেৎ কুম্ভঃ সর্বসৌখ্যবিবর্ধনঃ ।।"
এর অর্থ- সূর্য মেষ রাশিতে এবং বৃহস্পতি সিংহ রাশিতে অবস্থান কালে উজ্জয়নী তে সকলের সুখ দায়ক কুম্ভযোগ হয় । বৃহস্পতি সিংহ রাশিতে থাকেন বলে ইহা সিংহস্থ কুম্ভ যোগ নামে খ্যাত ।
" ঘটে সুরিঃ শশিসূর্য্যাঃ কুহবাং দামোদরে যদা ।
ধারায়শ্চ তদা কুম্ভো জায়তে খলু মুক্তিদঃ ।।"
এর অর্থ- তুলারাশিতে বৃহস্পতি, চন্দ্র ও সূর্য অবস্থান করিলে অমাবস্যা তিথিতে ধারায় ( উজ্জয়নীতে) শিপ্রা তটে মুক্তিপ্রদ কুম্ভ যোগ হয় । কুম্ভ মেলার সময় অসংখ্য যোগী, মহারাজ, সাধু, সিদ্ধ, সন্ত, মহাত্মা এই কুম্ভে আসেন।
অন্য দিকে বছরের এই সময়টা জুড়ে রোগভোগের প্রকোপও নিদারুণ, তাই সংসারে যাতে সেই প্রাদুর্ভাব না হয় তার খেয়ালও রাখেন গৃহকর্ত্রী৷ বাকিটুকু মায়ের কৃপা৷ আসলে ঘরে ঘরে এই শীতলা , ষষ্ঠী , চণ্ডীর প্রতি মাসে পূজো তো আর কিছুই নয়৷ মা দুর্গা বা কালীর শরণ নেওয়া৷ মহাযানী বৌদ্ধধর্মের অবলোকিতেশ্বর কোয়াননের মধ্যে একটি দেবীমূর্তির পূজা হয়৷ জাপানি ভাষায় এই দেবীর নাম ‘চনষ্টী ’৷ এই চনষ্টী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চণ্ডীর অনুরূপ৷ সুকুমার সেনের মতে চণ্ডী শব্দটি এসেছে চাণ্ডী থেকে৷ চাণ্ডী একজন অনার্যা দেবী , যিনি ওঁরাও , বীর , হোড়দের দ্বারা পূজিতা৷ আর তাই বুঝি বিরচিত চণ্ডীমঙ্গলে আমরা ওঁরাও উপজাতিদের দ্বারা পূজিতা দেবীদুর্গার এই চাণ্ডী রূপটিই পাই৷ কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর এই চণ্ডীমঙ্গল সর্বজনবিদিত৷ তাঁর জন্ম বর্ধমানের দামুন্যা গ্রামে৷ চণ্ডীমঙ্গলে আমরা যে উজানী গ্রামের কথা পাই সেখানে একটি চণ্ডীমন্দির আজও আছে৷ এ ছাড়া অজয় নদীর তীরে কোগ্রামেও রয়েছে বর্ধমানের পল্লিপ্রেমী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বিখ্যাত চণ্ডীমন্দিরটি৷
🌺 সংগৃহীত 🌺
শেয়ার করুন 🙏🏻
আর নিজের বন্ধুদের এই পেজে Invite করুন।
পরিবার কে বড় করার ছোট পদক্ষেপ।
ধন্যবাদ