24/08/2026
শ্রাবনের বর্ষামুখর সন্ধ্যাতেই বসে শ্রী শ্রী কৃষ্ণ রাধার হিন্দোল যাত্রা বা ঝুলনযাত্রা । এই ঝুলনযাত্রার পুন্যলগ্নে বাংলার পুণ্যভূমির এই বৈষ্ণব তীর্থের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য আমাদের আলোচ্য । গঙ্গাতীরের ঐতিহাসিক জনপদ হল আগরপাড়া, সেখানেই রয়েছে শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ জীউর কুঞ্জ মন্দির। বিটি রোড বা ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের উপর আগরপাড়ার মোল্লার হাটে নামতে হবে। সেখান থেকে হলধর বসু রোড ধরে গঙ্গার দিকে এগোলেই পথে পড়বে গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের আদলে নির্মিত এই দেবস্থান । দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মন্দিরের সঙ্গে এই মন্দিরের এতটাই মিল যে অনেকেই, এই মন্দিরকে ছোট দক্ষিণেশ্বরও বলে থাকেন । গঙ্গার তীরে অবস্থিত দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রধান দেবী হলেন দক্ষিণকালী তেমনি গঙ্গার তীরবর্তী এই মন্দিরের প্রধান দেবতা হলেন শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ জিউ । এই মন্দিরের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রানি রাসমণির নাত বৌ । জানবাজারের জমিদার রাজা শ্রী গোপালকৃষ্ণ দাসের বিধবা স্ত্রী ছিলেন শ্রীমতী গিরিবালা দাসী। প্রয়াত স্বামী শ্রী গোপালকৃষ্ণ দাস ও তিন পুত্রের স্মৃতিতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। গিরিবালা দাসীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বলে এই মন্দিরটি গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি নামেই পরিচিত।বাংলার ১৩১৮ সনের ১৮ জ্যৈষ্ঠ, মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলে গিরিবালা দাসী। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্রাঙ্গণের মধ্যে ৭ ফুট উঁচু বেদীর উপর মন্দির অবস্থিত। মন্দিরের প্রবেশপথটি তিন খিলানযুক্ত, প্রবেশ দ্বারের মাথায় রয়েছে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশের মূর্তি । প্রবেশপথের সিঁড়ির দুপাশে পাথরের শ্রী শ্রী গৌর ও নিতাইয়ের মূর্তি রয়েছে। মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। মন্দিরের পশ্চিম দিকে রয়েছে গিরিবালা ঘাট। এছাড়াও রয়েছে নহবতখানা এবং নাটমন্দির। তদানিন্তন সময়ে, মন্দির নির্মাণে খরচ হয়েছিল সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার গগনচন্দ্র বিশ্বাস এবং এস এম ঘোষ অ্যান্ড কোং। গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি অর্থাৎ মূল মন্দির, নহবতখানা, ছ’টি শিবমন্দির ও সুদৃশ্য নাটমন্দির নিয়ে নির্মিত। গিরিবালা দাসীর উত্তরসূরিদের ইচ্ছায় ১৯৮৫ সালের ২৩ জানুয়ারি মহামণ্ডলেশ্বর শ্রী শ্রী শিবানন্দ গিরি মহারাজজির তত্ত্বাবধানে হরিদ্বারের ভোলানন্দ সন্ন্যাস আশ্রম এই মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এখন গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি ভোলাগিরি স্নেহনীড় নামেও পরিচিত।মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে কষ্টিপাথরের বংশীধারী শ্রী শ্রী গোবিন্দ জিউ ও অষ্টধাতুর শ্রী শ্রী রাধারানীর বিগ্রহ । সঙ্গে রয়েছেন গণেশ, শালগ্রাম নারায়ণ শিলা ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি। এই মন্দির তৈরির সময় শ্রী শ্রী রাধারানির বিগ্রহটি চুরি হয়ে গেলে স্বামী শিবানন্দ গিরি বৃন্দাবন থেকে অষ্টধাতুর শ্রী শ্রী রাধারানীর বিগ্রহ নিয়ে আসেন এবং সেই বিগ্রহটিই বর্তমানে পূজিত হচ্ছেন । মন্দিরের সামনেই রয়েছে বাঁধানো প্রাঙ্গণ। তারপরেই নাটমন্দির, উত্তর দিকে মূল মন্দির। নাটমন্দিরটি লম্বায় প্রায় পঞ্চাশ ফুট এবং প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া, মেঝে শ্বেতপাথরে বাঁধানো। নাটমন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে স্তম্ভ বোধিকা। গঙ্গার তীরে ছয়টি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত । ছয়টি শিব মন্দিরে লিঙ্গ স্বরূপ যথাক্রমে শ্রী শ্রী কামেশ্বর, রাজেশ্বর, গোপেশ্বর, তারকেশ্বর, ভুবনেশ্বর ও গিরিশ্বর নামে মহাদেব অধিষ্ঠান করছেন । প্রতিটি মন্দিরের দরজায় খিলানের ওপর শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলার অলঙ্করণ স্থান পেয়েছে, যেমন কামেশ্বর মন্দিরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলন, রাজেশ্বর মন্দিরে স্থান পেয়েছে মথুরানাথ, গোপেশ্বর মন্দিরে খোদিত রয়েছে গোষ্ঠলীলা, অনন্তশয্যা রয়েছে তারকেশ্বর মন্দিরে, ভুবনেশ্বর মন্দিরে রাই রাজার কাহিনী স্থান পেয়েছে এবং গিরিশ্বর মন্দিরে কালিয়াদমনের দৃশ্য রয়েছে। মন্দিরের পূর্ব দিকের দরজার উপরে যেমন কৃষ্ণের লীলা তেমন পশ্চিমদিকেও রয়েছে নানান দৃশ্য কৃষ্ণ-বলরাম মূর্তি, রামরাজার মূর্তি, নন্দীর পিঠে হরপার্বতী মূর্তি, সঙ্গে শিঙ্গাবাদক ও শঙ্খবাদক, শিব ও অন্নপূর্ণার মূর্তি, নন্দীর পিঠে শিব-গণেশজননী ও ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতের পিঠে ইন্দ্র-শচি। মূল মন্দিরের পূর্ব দিক বরাবর রয়েছে অজস্র ঘর। একটিতে ভোগ রান্না হয়, রয়েছে অফিস, ভাঁড়ার ঘর, ভক্ত ও সেবকদের জন্যও রয়েছে কিছু ঘর। এই শিব মন্দির গুলিতে শিবরাত্রি ও নীলষষ্ঠীর দিন সারারাত মহাদেবের বিশেষ পুজো হয়। এছাড়া মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসে বিশেষ উৎসব হয় এবং বিভিন্ন বৈষ্ণব উৎসব যেমন জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, দোলযাত্রা, স্নানযাত্রা, ঝুলনযাত্রা ও রাসযাত্রার উৎসব মহাসমারোহে পালিত হয়। এই মন্দিরের নাটমন্দিরে প্রতিমা এনে অন্নপূর্ণা পুজো ও দুর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গা অষ্টমীতে ও অন্নপূর্ণা পুজোয় বছরের এই দুদিনে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এই মন্দির খোলে সকাল ছয় টা তে তারপরে সকাল ৮ টা তে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ জিউর ফল মিষ্টি মাখন মিছরি দিয়ে বাল্যভোগ হয়। এরপরে দুপুরে ১২ টার সময় অন্ন, ডাল, নানা পদের ব্যঞ্জন, চাটনী, পায়েস সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোগ হয় প্রভুর তবে বিশেষ পূজা পার্বনের দিনে অন্নের সাথে পুষ্পান্ন, ছানার কালিয়া, ধোঁকার কালিয়া, পনিরের তরকারী ইত্যাদি নানা রকমের বিশেষ পদ প্রভুকে নিবেদন করা হয় । মধ্যাহ্ন ভোগের পরে মন্দির বন্ধ হয়ে যায় আবার বিকাল চার টা তে মন্দির খোলে সন্ধ্যা সাত টায় সন্ধ্যারতির পরে লুচি, তরকারী , সুজির হালুয়া ও মিষ্টি সহযোগে শীতলভোগের পরে রাত আট টায় মন্দির বন্ধ হয়। মন্দিরে দুপুরে দেড়শো টাকার কুপন কেটে প্রভুর অন্ন ভোগ গ্রহণের সুবন্দোব্যস্ত আছে মন্দিরে। এই মন্দিরে আসতে গেলে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে আগরপাড়া স্টেশনে নেমে, এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাইরে থেকে অটো ধরে গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি ঘাট নেমে সামান্য হেঁটে গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি বা শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দের কুঞ্জ মন্দির।
🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
শুভ ঝুলনযাত্রা ১৪৩৩
শুভ ঝুলনযাত্রা ১৪৩৩ উপলক্ষে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ জিউর হিন্দোল যাত্রার দর্শন
স্থান ঃ শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দের কুঞ্জ মন্দির ( গিরিবালা ঠাকুরবাড়ি )
©Koushick Banerjee
Do not post these picture without prior permission