05/10/2026
🌺 ॥ শ্রীরামচন্দ্রকৃত দুর্গাপূজা — শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ ॥ 🌺
#দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী
#তৃতীয়_পর্ব
ভৃঙ্গীশ সংহিতার মহারাজ্ঞী প্রাদুর্ভাব অংশে কাশ্মীরের #ক্ষীরভবানী-র কাহিনী আলোচিত হয়েছে। তিনি রাবণোপাসিতা শ্রীবিদ্যা, দশাননের ইষ্টদেবী। উক্ত গ্রন্থে তাঁকে মহাসংকর্ষিণী, নিকুম্ভিলা, ভদ্রকালী নামেও অভিহিত করা হয়েছে। তাঁকে শ্রীরামচন্দ্র পূজা করেছিলেন । আবার এখানে বলা হয়েছে শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধও হয়েছিল আশ্বিনের শুক্ল সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত, যা দুর্গাপূজার সঙ্গে সঙ্গতপূর্ণ।
🌷 কিরূপে দেবী #ভবানী লঙ্কা ত্যাগ করে কাশ্মীরে এলেন, সেই কাহিনীটি নিম্নরূপ—
মহর্ষি পুলস্ত্যের পুত্র রাক্ষসরাজ রাবণ বাল্যকালেই একবার কুবেরের রত্নখচিত লঙ্কাপুরী দেখে সেটি পাওয়ার লোভে কাঁদতে শুরু করেন।
ভগবান শিব তখন মহর্ষি পুলস্ত্যকে জানান যে এই বালক ভবিষ্যতে ত্রিলোকের জন্য অত্যন্ত দুঃখের কারণ হবে। ভগবান শিব রাবণকে উপদেশ দেন প্রথমে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। এরপর রাবণ বিন্ধ্য পর্বতে গিয়ে দশ হাজার বছর ধরে অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করেন।
তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে লঙ্কার রাজত্ব এবং অজেয় হওয়ার বর প্রদান করেন। তবে ব্রহ্মা তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ভগবান বিষ্ণুর অন্তরঙ্গা শক্তি 'সীতা' রূপে জন্মগ্রহণ না করা পর্যন্তই তাঁর এই অজেয়ত্ব বজায় থাকবে।
লঙ্কা লাভ করার পর রাবণ অহংকারী হয়ে ওঠেন এবং দেবতাদের নানাভাবে অত্যাচার করতে শুরু করেন।
তিনি মলয় পর্বতে ভৈরবভট্টারকের আরাধনায় মগ্ন হন এবং নিজের মস্তক ছিন্ন করে পরমেশ্বর শিবের চরণে অর্পণ করলেও শিব প্রসন্ন হননি।
তখন দেবর্ষি নারদ সেখানে এসে রাবণকে উপদেশ দেন যে, মহাদেব ভূতেশ্বর কেবল শরীর ছেদনে বা স্তুতিপাঠে প্রসন্ন হন না, তিনি নন্দী ও তুম্বুরুর মতো 'নাদ' বা মধুর ধ্বনিতে সন্তুষ্ট হন।
নারদের উপদেশে দশানন রাবণ তাঁর অবশিষ্ট একটি মাত্র মাথা দিয়ে অত্যন্ত মধুর ও প্রবোধক 'ভৈরব নাদ' সৃষ্টি করেন।
এই নাদে মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ হয় এবং তিনি রাবণের প্রতি তুষ্ট হয়ে তাঁকে তিনটি বর দেন: রাবণ রাগ-অনুরাগের রাজা হবেন, তাঁর দশটি মাথা আগের মতোই ফিরে আসবে এবং তিনি দানবদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হবেন।
শিবের বর পেয়ে বলদর্পী রাবণ ত্রিলোকের মুনি-ঋষি, দেবতা ও মানবদের ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার শুরু করেন।
একদা ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য এক লক্ষ বছর ধরে কঠোর তপস্যা শুরু করেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ আহার ত্যাগ করে, ইন্দ্রিয় সংযম করে এবং একটি মাত্র পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এই ঘোর তপস্যা করছিলেন।
একদিন তাঁর আশ্রমে হঠাৎ একদল শিকারী সিংহ ও বন্য শূকর তাড়া করতে করতে প্রবেশ করে। শিকারীদের বাণে বিদ্ধ ও ভীত পশুদের কোলাহলে রাবণের ধ্যানে বিঘ্ন ঘটে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে রাবণ এক তীরের আঘাতেই সব শিকারী ও পশুদের হত্যা করার কথা চিন্তা করেন। ঠিক এই ধ্যানের সময়ই তিনি মহাদেবের প্রলয়ংকরী, ত্রিনেত্রধারী ও তামসী রূপের দর্শন পান।
ভক্তিভরে রাবণ ভগবান শিবের স্তুতি ও সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলে, শিব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বর চাইতে বলেন। কিন্তু শিব বুঝতে পেরেছিলেন যে রাবণের মন তখনও হত্যাক্রিয়ার তামসিক প্রবৃত্তিতে পূর্ণ। তাই তিনি রাবণকে উপদেশ দেন তাঁর মহাশক্তি 'তামসী' রূপের আরাধনা করতে, যিনি ত্রিগুণের অতীত, তরুণী এবং দ্বাবিংশাক্ষর মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্যামা।
শিবের নির্দেশে রাবণ পুনরায় দশ হাজার বছর ধরে মধ্যাহ্ন-সূর্যের মতো তেজস্বিনী দেবী #শ্যামা-র আরাধনা করেন। রাবণের কঠোর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া দেবী আবির্ভূত হন এবং তাঁকে তিন যুগ পর্যন্ত ত্রিলোকের নিষ্কণ্টক রাজা হওয়ার বর প্রদান করেন। রাবণের বিনীত প্রার্থনায় দেবী তাঁর লঙ্কাপুরীতে অবস্থান করতেও সম্মত হন।
দেবী লঙ্কায় ঈশান কোণে অনন্ত নাগের আসনে বিরাজমান হন।
ধর্ম সংস্থাপনের জন্য স্বয়ং ঈশ্বর দশরথের পুত্র শ্রী #রামচন্দ্র রূপে জন্মগ্রহণ করেন।
রাবণ সীতাকে হরণ করার পর শ্রী রাম বানর সেনা নিয়ে লঙ্কা আক্রমণ করেন এবং আশ্বিন মাসের শুক্ল সপ্তমী তিথিতে ঘোর যুদ্ধ শুরু হয়।
যুদ্ধে মেঘনাদ নিহত হলে রাবণ অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন।
এই সময় তাঁর পতিব্রতা স্ত্রী মন্দোদরী তাঁকে দেবর্ষি নারদের পূর্বকথিত সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দেন।
মন্দোদরী রাবণকে অনুরোধ করেন সীতাকে সসম্মানে রামের হাতে তুলে দিতে, বিভীষণকে লঙ্কার রাজ্যভার দিতে এবং নিজেরা শিবের তপস্যায় মনোনিবেশ করতে।
রাবণ মন্দোদরীর এই হিতোপদেশ ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।
🌸 তিনি অত্যন্ত অহংকারের সাথে নিকুম্ভিলা ( #ভদ্রকালী) মণ্ডপে যান, —
ইতি শ্রুত্বা বচস্তস্যা মন্দোদর্যা মুখাম্বুজাৎ । নিরাদৃত্য গতঃ স্থানং যত্র দেবী নিকুম্ভিলা ॥৪৮॥
~ ভৃঙ্গীশ সংহিতা, মহারাজ্ঞী মাহাত্ম্য, অধ্যায় ২
🔴 অর্থ — "মন্দোদরীর মুখপদ্ম নিঃসৃত সেই বাক্য শুনে সেটিকে উপেক্ষা করে, সে (রাবণ) সেই স্থানে গমন করলেন যেখানে দেবী #নিকুম্ভিলা অবস্থিতা।"
দশানন আস্ফালন করে বলেন যে তিনি শ্রী রামকে সেখানে আকর্ষণ করে এনে দেবীর চরণে বলি দেবেন।
রাবণের আহ্বানে শ্রী রামচন্দ্র সত্যিই সেই মণ্ডপে আবির্ভূত হন।
🌸 রাবণ রামকে সীতা ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বললে, শ্রী রামচন্দ্র দেবী শ্যামার পাদুকা স্পর্শ করে শপথ নেন যে, —
শ্রীশ্যামায়াঃ পাদুকায়াং প্রাহ রাজীবলোচনঃ ॥
ভো ভো দুষ্ট দুরাচার কিং ব্রজাম গৃহং প্রতি । সোতাং গৃহ্ণামি শ্রী শ্যামাং গৃহীত্বা ত্বাংনিপাত্যচ । লঙ্কাং দাস্যামি তে ভ্রাত্রে ভক্তায় সুহৃদায় মে॥
~ ভৃঙ্গীশ সংহিতা, মহারাজ্ঞী মাহাত্ম্য, অধ্যায়২
🔴 অর্থ — "শ্রীশ্যামার পাদুকাস্পর্শ করে রাজীবলোচন শ্রীরামচন্দ্র বললেন:
"হে দুষ্ট দুরাচার, তুমি কেন গৃহের দিকে যাচ্ছ? আমি সীতাকে উদ্ধার করব, শ্রীশ্যামাকে নিয়ে যাব এবং তোমাকে নিপাত করে লঙ্কা আমার সেই ভক্ত ও সুহৃদ ভ্রাতাকে (বিভীষণকে) প্রদান করব।"
এই কথা শুনে আশ্বিন মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথির মধ্যরাত্রে রাবণ খড়্গ নিয়ে রামকে আক্রমণ করতে যান।
ঠিক সেই মুহূর্তে দেবী শ্যামা #মহারাজ্ঞী আবির্ভূতা হয়ে রাবণের দুষ্কর্মের জন্য তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং জানান যে তিনি লঙ্কা ত্যাগ করে সতীসর বা কাশ্মীর উপত্যকায় চলে যাচ্ছেন।
রাবণবধের পর শ্রী রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ ও প্রিয় দূত মহাবলী হনুমানের কাঁধে চড়ে দেবী ভবানী সতীদেশ বা কাশ্মীর অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর সাথে ছিল অনন্ত নাগ এবং আরও ৩৬০টি বিশেষ জলসর্প। তাঁদের এই যাত্রাপথটি ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর:
সর্বপ্রথম তাঁরা পীর পঞ্চাল পর্বতমালা অতিক্রম করে পাথরময় 'বিষ্ণুপাদ' নামক পবিত্র তীর্থে পৌঁছান।
এরপর তাঁরা 'মধ্যগ্রাম' এবং বিষ্ণুগঙ্গা নদীর তীরে 'দিব্যস্থলী' হয়ে 'খল্বারণী' নামক সুন্দর বনে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে জলাভাব দেখে দেবী আরও উত্তরের দিকে অগ্রসর হন।
তাঁরা মার্তণ্ড তীর্থের কাছে 'লঘুপুর', তারপর 'লোকপুর', 'রায়স্থল', 'বাদিপুর', বরাহমূলের 'কোটিতীর্থ' এবং 'চণ্ডুপুর' ও 'টক্কর' (টুক্কর) গ্রাম ভ্রমণ করেন। অবশেষে 'শারদা' তীর্থ হয়ে তাঁরা সতীদেশে সিন্ধু ও বিতস্তা নদীর সঙ্গমস্থলের (শাদিপুর) কাছে উপস্থিত হন।
সঙ্গমস্থলের চারপাশটি পবিত্র নদীর জলবেষ্টিত কাদা ও জলাভূমিতে পূর্ণ থাকায়, দেবী এটিকে তাঁর অনুচর সাপেদের বসবাসের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত মনে করেন। তিনি হনুমানকে নির্দেশ দেন সাপেদের তুলার মতো নরম কাদা মাটিতে ছেড়ে দিতে এবং নিজে সেখানকার সুবিশাল ছায়াঘেরা স্থানে বিশ্রাম নেন। এই মনোরম স্থানটি হরিমুকুট পর্বত দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এখানকার মাটি তুলার (তুল) মতো নরম এবং জমি অত্যন্ত সুলভ (মূল্য) হওয়ায় এই স্থান কালক্রমে 'তুলমূল্য' বা বর্তমানে 'তুলমূল' নামে বিখ্যাত হয়।
দেবী #হনুমান-কে বিদায় জানিয়ে নিজেই এই স্থানে সম্পূর্ণ শান্ত ও সাত্ত্বিক রূপ ধারণ করেন।
সেই সময়ে দেবী ভবানীকে শ্রীরামচন্দ্র, সীতা, হনুমান ও সমগ্র বানরসেনা পূজা করেছিলেন,
তদা প্রভৃতি শ্রী রামঃ পূর্ণিমায়াং দিবা নিশম্ ॥৭০॥ যাত্রাং করোতি বিধিবৎ স সীতাং সানুজঃ হরিঃ ।
মন্দোদর্যাথ চাষ্টম্যাং নবম্যাং বা বিভীষণঃ ॥৭১॥
হনূমাস্তু সদৈবাত্র বর্ততে দ্বারপো বলী ।
পর্বস্বেতেষু সম্পূজ্য জনৈঃ সর্বার্থসিদ্ধয়ে ॥ ৭২॥
~ ভৃঙ্গীশ সংহিতা, মহারাজ্ঞী প্রাদুর্ভাব, তৃতীয় পটল
লঙ্কায় যিনি ছিলেন ঘোর তামসী 'শ্যামা', তুলমূলে এসে তিনি দুধ, চিনি ও ঘি-এর নৈবেদ্য গ্রহণকারী পরম শান্ত 'মহারাজ্ঞী' নামে পরিচিতা হলেন। তামসিক দ্বাবিংশাক্ষর মন্ত্রের বদলে তিনি এখানে পঞ্চদশাক্ষরী শান্ত মহামন্ত্র দ্বারা পূজিতা হতে লাগলেন।
সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, কাশ্মীরের শাস্ত্রেও শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গা-উপাসনার বর্ণনা রয়েছে।
জয় মা ভবানী 🙏🏻🌺
#দুর্গোৎসব #শারদীয়া #দুর্গাপূজা **ra #তন্ত্র #পার্বতী #কালীকুল