28/04/2019
" ব্রহ্মই কালী ও কালীই ব্রহ্ম " -
শুভ্র ভট্টাচার্য্য।
একজন জানতে চেয়েছেন, ঈশ্বর পুরুষ না মহিলা? ইচ্ছা করেই এর উত্তর প্রকাশ্যে দিলাম। এই প্রশ্নের মধ্যেই আমাদের ঈশ্বরভাবনার দীনতা যে কত গভীর, তা প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা জড় দেহের বাইরে কিছু ভাবতেই পারিনা। তাই ঈশ্বরকেও আমাদের মতোই একজন দেহধারী ভেবে জিজ্ঞাসা করি, সেটা কি পুং-দেহ, না নারী দেহ?
প্রথমেই জানতে হবে। মায়া দ্বারা এই জগৎ সৃষ্ট। যা কিছু সাকার রূপ সবই মায়ার অন্তর্গত। কিন্তু ঈশ্বর মায়া দ্বারা বশীভূত নন। তাই বিশেষ কোনও আকৃতি দ্বারা তাঁকে আবদ্ধ করা যায়না। সেই জগন্নাথের তাই কোনও অঙ্গ নেই। নেই কোনও মায়িক রূপ। তিনি অঙ্গবিহীন, তাঁর প্রকাশ বাক্য মনের অগোচর। তিনি জ্ঞানী নন, তিনি জ্ঞানস্বরূপ। তিনি প্রেমিক নন, তিনি প্রেমস্বরূপ। তিনি কোনও ব্যক্তি নন তিনি তত্ত্ব।
" অঙ্গবিহীনং স্মর জগন্নিধানং।
শ্রোত্ৰস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যদ্বাচোহবাচং বাগাতীতং প্রাণস্য প্রাণং পরং বরেণ্যং ||
ঈশ্বরের চেয়েও ব্যাপকতর তত্ত্ব হলেন ব্রহ্ম। ব্রহ্মের যে অংশে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়রূপ ভ্রম সাধিত হচ্ছে, তাকেই আমরা 'ঈশ্বর' নামে চিহ্নিত করি। ব্রহ্ম যেমন অঙ্গবিহীন ঈশ্বরও তাই, কারণ অঙ্গ বা শরীর থাকলে তিনি সেই শরীর দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। কিন্তু অসীমের তো কোনও সীমা হয়না, কোনও আকার হয়না। আকার হয় জড়ের। ঈশ্বর তো জড় নন, তিনি জড়াতীত। যিনি জড় নন, যিনি কোনও মায়িক আকার দ্বারা বদ্ধ নন, তাঁর আবার শরীর কী! আর যাঁর শরীর নেই, তাঁর শরীর পুরুষ-শরীর না নারী-শরীর - এ প্রশ্নই অবান্তর।
শাস্ত্রে ব্রহ্মকে নির্গুণ ও সগুণ দুইই বলা হয়েছে । যখন সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় কোনও কাজ হচ্ছেনা জগৎ তার ব্রহ্ম-স্বরূপে লীন হয়ে আছে তখন বলি নির্গুণ ব্রহ্ম। আর এই ব্রহ্মই যখন ক্রিয়াশীল , সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় - রূপ কার্য সম্পন্ন হচ্ছে - তখন তাকেই সগুণ ব্রহ্ম বা শক্তি বলে । সাংখ্য দর্শনে ব্রহ্মের এই দুই স্বরূপকে যথাক্রমে পুরুষ ও প্রকৃতি বলা হয় ।
এই সগুণ ব্রহ্মেরই প্রতীক দুর্গা , কালী বা ভগবতী। আর নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক হলেন শিব। তাই সগুণ বা ক্রিয়াময়ী নৃত্যরতা কালীর পদতলে জড়ের মতো পড়ে আছেন নির্গুণ নিষ্ক্রিয় শিব । সুতরাং শিব ও কালী আসলে একই সত্তা। শিব ব্রহ্মের নির্গুণ স্বরূপ , তাই জড়বৎ । আর কালী হলেন ব্রহ্মের সগুণ স্বরূপ , তাই নৃত্যরতা ।
" বেদান্তের মায়া এবং তন্ত্রের মহামায়ার অর্থ এক নহে। বেদান্তের মায়ার ব্যবহারিক সত্তা আছে, পরমার্থিক সত্তা নাই। তন্ত্রের মহামায়া কালত্রয়াবাধিত সত্তাবিশিষ্ট ব্রহ্মময়ী।
অবশ্য বেদান্ত এবং তন্ত্রে কোন দ্বন্দ্ব নাই।
বেদান্ত সিদ্ধান্তশাস্ত্র এবং তন্ত্র সাধনশাস্ত্র। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শ্রীরামপ্রসাদ উভয়েই,
ব্রহ্মই কালী ও কালীই ব্রহ্ম - এই একটি বাক্যের দ্বারাই মহামায়া তত্ত্বটি অতি সহজ ও সুন্দররূপে বুঝাইয়া দিয়াছেন। বৈদান্তিকগন যাহাকে ব্রহ্ম বলেন, তান্ত্রিকগন তাহাকেই বিশ্বমাতা মহামায়ারূপে উপাসনা করেন। "
এই সগুণ ব্রহ্মই সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কারিণী কালী বা দুর্গা । এই নির্গুণ ও সগুণ ব্রহ্মকে আবার যথাক্রমে ব্রহ্ম ও শক্তিও বলা হয় । তাই দুর্গা বা কালীকে শিবের শক্তি বলা হয়েছে । বস্তুতঃ ব্রহ্ম ও শক্তি স্বরূপতঃ অভেদ । আগুনকে যেমন দাহিকা শক্তি থেকে পৃথক করা যায়না ঠিক তেমনি ব্রহ্মকেও শক্তি থেকে পৃথক করা যায়না। এই রূপগুলি সবই এক একটি ভাবের প্রতীক। জগদীশ্বর এবং জগন্মাতার এই অভিন্নতার তত্ত্বই প্রতিফলিত হয়েছে শিব ও শক্তির অর্ধনারীশ্বর মূর্তিতে , লিঙ্গমূর্তিতে এবং শিবের বুকের উপরে নৃত্যরতা কালী মূর্তিতে ।
তাহলে আমরা ঈশ্বরের যে নারীরূপে কল্পনা করি, যেমন যেমন কালী, দুর্গা প্রভৃতি, আবার পুরুষরূপে কল্পনা করি, যেমন শিব, বিষ্ণু ইত্যাদির পূজা করি তা কি সঠিক নয়? স্বামীজির একটি কথায় এর উত্তর পাওয়া যাবে। স্বামীজি এক জায়গায় বলছেন : বিড়াল যদি ঈশ্বর সাধনা করত, তবে সে ঈশ্বরকে বিড়াল রূপে দেখত, গরু যদি ঈশ্বর-উপাসনা করত, তবে তার ঈশ্বরের রূপ গরুর রূপই হত, আমরা মানুষ তাই ঈশ্বরকে মানুষের মতো আকৃতি বিশিষ্ট মনে করি। কারণ আমাদের কল্পিত ঈশ্বর আমাদেরই ভাবনার প্রতিফলন। কিন্তু এই বিড়াল-রূপ, গরু-রূপ, মানুষ-রূপ এগুলি যেন এক একটি পাত্র, এবং এই পাত্রগুলি ঈশ্বর-জলে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ এই কল্পিত রূপের মধ্যে ঈশ্বরই রয়েছেন। তাই কোনও উপাসনাই বিফল হবেনা। মানুষ যতদিন দেহ-ভাবে, জড়-ভাবে আচ্ছন্ন ততদিন সে এইসব রূপ-কল্পনার বাইরে যেতেই পারবেনা।
হিন্দু ধর্ম মানুষের মনের এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত, তাই হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এই রূপের উপাসনার মধ্যে দিয়ে সাধক যখন অগ্রসর হন তখন তিনি ক্রমশঃ উপলব্ধি করেন ঈশ্বর রূপাতীত। তাই ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন : কালী কি কালো? দূরে তাই কালো, জানতে পারলে আর কালো নয়। আকাশ দূর থেকে নীলবর্ণ। কাছে দেখ কোনো রং নাই। সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ, কোনো রং নাই।
সদানন্দময়ী কালী, মহাকালের মনমোহিনী গো মা !
তুমি আপন সুখে আপনি নাচ, আপনি দাও মা করতালি ||
আদিভূতা সনাতনী, শূণ্যরূপা শশী-ভালী |
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন হে মা, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি ||
সবে মাত্র তুমি যন্ত্রী, যন্ত্র আমরা তন্ত্রে চলি |
তুমি যেমন রাখো তেমনি থাকি, যেমন বলাও তেমনি বলি |
অশান্ত কমলাকান্ত বলে দিয়ে গালাগালি—
এবার সর্বনাশি, ধ’রে অসি, ধর্মাধর্ম দুটোই খেলি ||
ভয়ঙ্করী কালী মূর্তি বা প্রতিমা মহাবিশ্বের এক আশ্চর্য রূপ। এই রূপের মধ্যে আছে একটি ভাবের দ্যোতনা। অতিন্দ্রীয় শক্তিকে বোঝার জন্য প্রতীক অবলম্বন করা শাস্ত্রের বিধি। প্রতীক বা মূর্তির প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হল এক একটা ভাবের প্রতীক। প্রতিমা ইন্দ্রিয় থেকে ইন্দ্রিয়াতীতে যাওয়ার মাধ্যম। আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মূর্তির পাদদেশে বসে সম্পূর্ণ করে থাকেন অমূর্ত ব্রহ্মলোকের। একাদশ শতকের প্রারম্ভে সুলতান মামুদের সাথে ভারতে এসেছিলেন ইতিহাসবিদ আলবিরুনী। তিনি ভারতের মূর্তি পূজার প্রচলন দেখে বলেছিলেন ‘এসবই হল বাহ্য, আসলে ভারতীয়রা অমূর্তকেই সামনে রাখে তাদের লক্ষ্য হিসাবে। প্রতীক রূপের মধ্যদিয়ে এসেছে অপ্রতীম-অনন্ত।
মা কালী মূর্তি উর্বরা শক্তি ও মাতৃত্বের প্রতীক। উর্বরা হলেই মা দেন জন্ম, সতেজ হলেই তিনি করেন প্রতিপালন। মূর্তির পুষ্ট অঙ্গ স্তন জীবন ধারণের সহায়ক। আবার জীবন দান করার জন্য যে উদর ক্ষেত্র তাহল স্ফীত এবং জন্ম দাত্রী বলেই মা হলেন দিগম্বরী। শত গুণের প্রতীক শুভ্র দন্ত দ্বারা লোভ-লালসার প্রতীক জিহ্বাকে কেটে ধরেছেন মা কালী। আবার পরম পুরুষ শিবের ওপর পরমা প্রকৃতি দাঁড়িয়ে সৃষ্টি, স্থিতি প্রলয়ের খেলা খেলে চলেছেন।
কালী প্রতীকের এক হাতে বরমুদ্রা অপর হাতে অভয় মুদ্রা প্রবৃত্তি মার্গের সাধককে তিনি জাগতিক সমস্ত বস্তু প্রদান করে অভয় দান করেন। নিষ্কাম বা নিবৃত্তি মার্গের সাধকদের অবিদ্যা মায়া পাশ খড়গের দ্বারা তিনি ছেদন করেন। শানিত খড়গ জ্ঞানের প্রতীক। বাম অধ করে ছেদিত মুণ্ড সংযমহীন কামনা-বাসনা ও লোভের প্রতীক। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রণয় শেষে তিনি সব কিছুকেই নিজ অঙ্গে বিলীন করে রাখেন, তাই তার গলায় মুণ্ডমালা। এই মুণ্ডমালা আবার পঞ্চাশ্য বর্ণমালারও প্রতীক। নতুন সৃষ্টির বীজ কর্মানুযায়ী তিনি সংগ্রহ করে হাতের মালা করে কোমরে পরেন। হাত কর্মের প্রতীক, এই কারণে কর্মানুযায়ী নতুন সৃষ্টি করে ফল প্রদান করেন তিনি। খোলা চুল মুক্ত স্বভাবের প্রতীক। মা সর্বদা মুক্ত। যিনি সকলকে মুক্তি প্রদান করেন তিনিই মুক্ত কেশী। মহাকালকে যিনি গ্রাস করেন তিনি মহাকালী। চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নির প্রকাশ স্বরূপা এবং ভূত, ভবিষ্যত্ ও বর্তমানের প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা মা ত্রি নয়নী। ললাটের (মধ্যের) চক্ষুটি জ্ঞাননেত্র বা দিব্য চক্ষুর প্রতীক। শিব সাক্ষী স্বরূপ পর ব্রহ্মের প্রতীক। মা শিবতুল্য পরমেশ্বর (পরব্রহ্ম) শিবের বক্ষ স্থিতি শ্মশান বাসিনী এবং পরা শক্তির প্রতীক যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বলতেন আদ্য শক্তি লীলাময়ী সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন- তারই নাম কালী। কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী! একই বস্তু, যখন তিনি নিষ্ক্রিয় সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় কোনো কাজ করছেন না এই কথা যখন ভাবি তখন তাকে ব্রহ্মবলে কই/ যখন তিনি এসব কাজ করেন, তখন তাকে কালী বলি, শক্তি বলি/”
মায়ের রূপ কি কালো ? এ সম্পর্কে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বলেন, “কালীব্রহ্মা, কালী নির্গুণা ও সগুণা। কালী কী কালো? দূরে তাই কালো, জানতে পারলে আর কালো নয়। আকাশ দূর থেকে নীল বর্ণ। কাছে দেখ কোনো রঙ নেই। সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ। কোনো রং নেই।
শ্রী শ্রী কালী মাতা সম্পর্ক কথাগুলো বলে শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমোন্মও হয়ে গান করেছিলেন।
" মা কী আমার কালো রে
কালরূপ দিগম্বরী হূদ পদ্মে
করে আলোরে "
শ্রী শ্রী চণ্ডী শাস্ত্রের সপ্তম অধ্যায়ে চণ্ডমুণ্ড বুধ বর্ণনায় বলা আছে অশুভ শক্তির প্রতীক শুম্ভের নির্দেশে চণ্ডমুণ্ড প্রমুখ। দৈত্যগণ হস্তি, অশ্ব, রথ ও পদাতিক সমান্নিত সৈন্যবলসহ হিমাচল শৃঙ্গে সিংহের ওপর সমাসীন ও ঈষদ হাস্য বদনা অম্বিকা দেবীকে দর্শন করা মাত্র তাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল। দেবী আম্বিকা তখন শত্রুগণের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ভীষণ ক্রোধে তার মুখমণ্ডল কৃষ্ণবর্ণ হল। আবার তার ভ্রূকুটি কুটিল ললাট দেশ থেকে খড়গধরা ও পাক হস্তা, ভীষণবদনা ফণী বিবর্ণসুতা হলেন। এই দেবী চামুণ্ডা রহ্যবীজু নিস্তম্ভ এবং অন্যান্য অসুরদিগকে বধ করে ধরণীকে অসুরমুক্ত করেন। অশুভ শক্তির পরাজয় হল সুর শক্তির হল জয়। ইন্দ্রিয়দি দেবগণ বিজয়ে উত্সব করলেন। দীপাবলিতে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল স্বর্গ। মর্ত ও পাতাল।
অন্তর্গত মন চন্দ্র, মনচন্দ্র বিজানীয়াতে মনকে চন্দ্রের ন্যায় জানবে। চন্দ্রের যেমন ষোলকলা তেমনি মনের ষোলভাগ মন মেরু, দণ্ডের সর্বনিম্ন চন্দ্রগ্রহমেলের মূলাধাব চক্র থেকে ভ্রূমধ্যস্থ চন্দ্র পর্যন্ত বিরাজিত।
মহালয়া অমাবস্যায় মনরূপ চন্দ্রের সম্পূর্ণ ক্ষয়াবস্থা এই অবস্থায় সাধকের আলোক দর্শন হয় নিষ্কন্টকভাবে। জ্যোতি দর্শন হয়। সাধকের মন যখন কুটস্থের আরো গভীরে প্রবেশ করে অর্থাত্ মহালয়ে প্রবেশ করে সেটিই মহালয়া, অমাবস্যা। এই অবস্থায় সাধক বলতে পারেন অহং ব্রহ্মস্মি। সাধক কুণ্ডলিনী শক্তিকে মূলাধার থেকে জাগ্রত করে কুটস্থ প্রবেশ করালেই মহাশক্তি জাগ্রত হয়- এই শক্তিই দুর্গতিনাসিনী। দুর্গা। সাধকের সিদ্ধি লাভ করাটাই বিজয় উত্সব দীপান্বিতা উত্সব।
আমার শ্যামা মায়ের কোলে চ’ড়ে জপি আমি শ্যামের নাম
মা হলেন মোর মন্ত্র-গুরু ঠাকুর হলেন রাধা-শ্যাম।।
ডুবে শ্যামা-যমুনাতে মা খেলবো খেলা শ্যামের সাথে
শ্যাম যবে মোরে হানবে হেলা মা ফুরাবেন মনস্কাম।।
আমার মনের দোতারাতে শ্যাম ও শ্যামা দুটি তার,
সেই দোতারায় ঝঙ্কার দেয় ওঙ্কার রব অনিবার।
মহামায়া মায়ার ডোরে আনবে বেঁধে শ্যাম-কিশোরে
আমিকৈলাসে তাই মাকে ডাকি দেখবো সেথা ব্রজধাম।।
ত্রিপুরাসিদ্ধান্ত -
অদ্বৈত বেদান্ত'র মতই তন্ত্র দর্শনের মূল কথা হলো এক পরম সত্য বিরাজমান -তাকে আমরা পরম শিব নাম দিয়েছি। যিনি নিজেকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন - সকল ও নিস্কল। অর্থাৎ - অংশ সহ ও অংশ রহিত। যেমন অদ্বৈত দর্শন বলে এই জগত মায়ার প্রকাশ তেমনি তন্ত্র বলে এই জগত শক্তির প্রকাশ। কিন্তু মায়া অনির্বচনীয়া , আর শক্তি সগুণ শিবের সাথে সমরস। মানে একত্ব প্রাপ্ত। তাই তন্ত্র মতে জগত ও ঈশ্বর একই সত্যের প্রকাশ।
রামকৃষ্ণ দেব যেমন বললেন - "বিচি,শাস ও খোলা -সবটুকু নিয়েই বেল। আরেক দিক থেকে উভয়ের তফাত আছে -বেদের মতে ব্রহ্ম অপরিবর্তনীয় -
যার পরিবর্তন হয় , তা মিথ্যা।"
কিন্তু তন্ত্রমতে জগত ব্রহ্মেরই আর এক রূপ -
অর্থাৎ বিকার রহিত ব্রহ্ম আর বিকার সহিত,
ব্রহ্ম -নির্বিকার ব্রহ্ম ও সবিকার ব্রহ্ম। একে তন্ত্রের ভাষায় বলা হয় প্রকাশ ও বিমর্ষ। শিব প্রকাশ - তাতে শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে ,আর শক্তি বিমর্ষ -তার দ্বারা সৃষ্টি কার্য সম্পাদিত হয় ।
বিশ্ব সৃষ্টির বিষয়ে তন্ত্র সাংখ্যদর্শনের ২৪ তত্ত্ব কে গ্রহণ করেছে ,আর তার সাথে যোগ করেছে আরো ১২টি তত্ত্ব। যা শৈব সিদ্ধান্ত অনুসারী,এবং এইগুলিকে ৩টি ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ক) - ৫তত্ব
খ )-৭ আংশিক শুদ্ধ , আংশিক অশুদ্ধ তত্ত্ব
গ )-২৪ অ-শুদ্ধ তত্ত্ব যা সানখ্য মতানুসারী।
১ম ভাগে রয়েছে -শিব , শক্তি, নাদ ও বিন্দু এবং শুদ্ধ বিদ্যা। এটি তন্ত্রের নতুন ভাবনা কারণ শৈব দর্শন এ বলা হয়েছে মূল বস্তু ৪টি -শিব ,শক্তি ,সদাশিব ,ও ঈশ্বর।
তন্ত্রে প্রথম দুটি কে একই বলা হয় ,কারণ শিব তত্ত্ব কে স্থির বা স্থাবর এবং শক্তি তত্ত্ব কে জঙ্গম বা সচল স্বরূপ পরম ব্রহ্ম রূপে স্বীকার করা হয়ে থাকে। তারপর আসে নাদ ও বিন্দু। নাদ মানে শব্দ নয় আবার ও বিন্দু মানে ফোটা বা Drop নয়।
নাদ মানে সৃষ্টির প্রথম স্পন্দন আর বিন্দু হলো তার প্রথম প্রকাশ - যখন বিশ্ব তার বাহ্যিক রূপ লাভ করতে যাচ্ছে তার আগের মুহুর্ত। তন্ত্রে প্রায়ই একে চনক বা ছোলার সাথে তুলনা করা হয়েছে -
ছোলার যেমন ছালের ভিতরে দুটি দানা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে থাকে এও সেরূপ। দুটি দানা অবস্যই শিব ও শক্তি, এবং তাদের থেকে যে চারা গাছ টি বা অন্কুর-টি বের হয়-তা এই প্রকাশমান বিশ্ব। ত্রিপুরা সিদ্ধান্ত-এ নিস্ক্রিয় শিব কে প্রকাশ বলা হয়েছে, এবং সৃষ্টি শক্তি বিমর্ষ নামে অভিহিত ।
প্রকৃতপক্ষে প্রকাশ ও বিমর্ষ আলাদা কিছু নয় - একই তত্ত্বের দুটি দিক মাত্র। কালিমুর্তিতেই প্রথম এই তত্ত্বটিকে রূপ দেয়ার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন , কালির পায়ের নিচের শব্ শিব প্রকাশের প্রতিক -
মানে নিস্ক্রিয় ব্রহ্ম। লক্ষ্য করলে দেখা যায় কালির দুটি চরণ শিবের পুরুষাঙ্গ ও হৃদয এ রাখা-যা ইঙ্গিত করে সৃষ্টি তত্বের। আগে মানুষ নিজের সৃস্তিশক্তি সম্পর্কে সচেতন হয় তারপর সে সৃষ্টি কার্যে নিযুক্ত হয়, মানে আগে ভাবনার জন্ম হয় হৃদয়ে , তারপর তা শরীরকে কর্মে নিয়োগ করে।
কালীর কালো বর্ণ,খোলা কেশ ,খড়গ ও হস্ত ধৃত মুন্ড - এসবই হলো অব্যক্ত চেতনার প্রতীক।
আবার খড়গ,ত্রিনয়ন ,বরমুদ্রা - এগুলি জ্ঞানের প্রতীক। অমৃত লাভের পথে কালী হলেন ব্রহ্ম তত্ত্বের প্রথম জ্ঞান ধৃত রূপ। তাই তন্ত্রে কালিকেই প্রথম তত্ত্বের স্থান দেওয়া হয়েছে ,আর সাধকের দিক থেকে দেখলে কালী হলেন ব্রহ্মের প্রথম সাকার রূপ , মানে উন্নতির সোপানে কালী তত্ত্ব যার উপলব্ধি হয়েছে - তিনি চরম তত্ত্বের সাক্ষাত লাভ করেছেন। তাই গৌড় কুলে (যাকে তন্ত্রের জন্মস্থান বলা হয়) কালী সাধনাই শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। রামকৃষ্ণ দেব তাই বললেন - " যাকে বেদান্তে ব্রহ্ম বলেছে ,তাকেই তন্ত্রে কালী বলা হয়েছে।"
মাতৃকা শক্তির সাথে শিবের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আচার্য শংকর (আদি শংকরাচার্য) বলছেন :
'শিবঃ শক্ত্যা যুক্তো যদি ভবতি শক্তঃ প্রভবিতুম্।
নচেদেবং দেবো ন খলু কুশলং স্পন্দিতুমপি।।'
(সৌন্দর্যলহরী -- প্রথম শ্লোক)
অর্থাৎ , শিব শক্তিযুক্ত না হলে সৃষ্টি - স্থিতি - সংহার করতে পারেননা।শক্তি ছাড়া সেই দেব (শিব) স্পন্দিত হতেও পারেননা। এখানে শিব আর কেউ নন, তিনি বেদোক্ত নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক। নির্গুণ ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয়। অর্থাৎ সৃষ্টি - স্থিতি - প্রলয় কিছুই করেননা। এই নির্গুণ ব্রহ্মের সগুণরূপ হলেন শক্তি, যাঁকে কালী বা দুর্গা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্গুণ বা নিষ্ক্রিয় শিবের বুকের উপর নৃত্যরতা বা ক্রিয়াময়ীরূপে অধিষ্ঠিতা কালিকা মুর্তি তাই নির্গুণ ব্রহ্মের সগুণ অবস্থালাভের প্রতীক। এই সগুণ ব্রহ্ম বা মাতৃকাশক্তি ক্রিয়াত্মিকা। তিনিই স্বত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের সাহায্যে জগৎ সৃজন, পালন ও সংহার করছেন। ব্রহ্মের এই ক্রিয়াময় রূপই ঈশ্বর। আবার তিনিই মহামায়া। মায়া প্রভাবে নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্ম সগুণরূপ ধারণ করেছেন, তিনি স্পন্দিত বা ক্রিয়াশীল হচ্ছেন, একটি জগৎ চক্রের সূচনা ঘটছে। এই ব্রহ্ম ও শক্তিই সাংখ্য দর্শনের ভাষায় পুরুষ ও প্রকৃতি। এঁদের সংযোগে সৃষ্টিতত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা এভাবে মুর্তায়িত হয়েছে কালীরূপের মধ্যে দিয়ে। এই মাতৃকাশক্তি বা কালী নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্মেরই প্রকাশ। তিনি ব্রহ্মস্বরূপিণী।
অথর্ববেদের অন্তর্গত কালিকোপনিষদে কালীকে _'ব্রহ্মরন্ধ্রে ব্রহ্মস্বরুপিণী'_ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্লোকাংশটি হ'ল :
'অথ হৈনাং ব্রহ্মরন্ধ্রে ব্রহ্মস্বরুপিণীমাপ্নোতি
সুভগাম্।...'
দেব্যুপনিষদে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন দেবতাগণ এই মাতৃকাশক্তির বিভিন্ন রূপ দেখে জানতে চাইছেন : ইনি কে, কী এঁর স্বরূপ?
অবশেষে মাতৃকাশক্তি দেবতাদের সামনে আত্মস্বরূপ প্রসঙ্গে বলেছেন :
'অহং ব্রহ্মস্বরুপিণী
মত্তঃ প্রকৃতিপুরুষাত্মকং জগচ্ছৃন্যং চাশূন্যং চ।'
অর্থাৎ আমিই ব্রহ্মস্বরূপ প্রকৃতিপুরুষাত্মক এই জগতের কারণ।
শিব ও কালী বা ব্রহ্ম ও শক্তির এই অভেদ তত্ত্বটি বোঝাতে গিয়ে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, -
''ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ, এককে মানলেই আর-একটিকে মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তি; -- অগ্নি মানলেই দাহিকাশক্তি মানতে হয়, দাহিকাশক্তি ছাড়া অগ্নি ভাবা যায় না; আবার অগ্নিকে বাদ দিয়ে দাহিকাশক্তি ভাবা যায় না। সূর্যকে বাদ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ভাবা যায় না; সূর্যের রশ্মিকে ছেড়ে সূর্যকে ভাবা যায় না। দুধ কেমন? না, ধোবো ধোবো। দুধকে ছেড়ে দুধের ধবলত্ব ভাবা যায় না। আবার দুধের ধবলত্ব ছেড়ে দুধকে ভাবা যায় না। তাই ব্রহ্মকে ছেড়ে শক্তিকে, শক্তিকে ছেড়ে ব্রহ্মকে ভাবা যায় না। নিত্যকে ছেড়ে লীলা, লীলাকে ছেড়ে নিত্য ভাবা যায় না!
আদ্যাশক্তি লীলাময়ী; সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করছেন। তাঁরই নাম কালী। কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী! একই বস্তু, যখন তিনি নিষ্ক্রিয় -- সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় কোন কাজ করছেন না -- এই কথা যখন ভাবি, তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলে কই। যখন তিনি এই সব কার্য করেন, তখন তাঁকে কালী বলি, শক্তি বলি। একই ব্যক্তি নাম-রূপভেদ।''
( শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত)
ব্রহ্মের এই মাতৃরূপ বা শক্তিরূপ বিভিন্ন নাম ও রূপে আরাধিতা হন। মহাভারতে আছে যুদ্ধে বিজয়লাভের জন্যে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দুর্গা-স্তব করার উপদেশ দিয়ে বলছেন : 'পরাজয়ায় শত্রুণাং দুর্গাস্তোত্রম্ উদীরয়।'...
শ্রীকৃষ্ণের আদেশে অর্জুন স্তব করছেন ---
'ভদ্রকালী নমস্তুভ্যং মহাকালী নমহস্তু তে।
চন্ডি চন্ডে নমস্তুভ্যং তারিণি বরবর্ণিনি।।'_
(মহাভারত , ভীষ্মপর্ব, ২৩/৪/১৫)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে নিরাকার অব্যক্ত নির্গুণ ব্রহ্মের এই ব্যক্ত ও সগুণ প্রকাশ বা মাতৃকাশক্তির বিভিন্ন রূপ। কখনও তিনি মহাকালী, কখনও ভদ্রকালী, কখনও দুর্গা, আবার কখনও চন্ডী।
মা ব্রাহ্মময়ী। তিনি পরম ব্রহ্মের শক্তি আদ্যশক্তি বা মূল প্রকৃতি। ব্রহ্ম পুরুষ আর ব্রহ্মময়ী প্রকৃতি। এই দুয়ের মিলনে বিশ্ব সৃষ্টি। জড়তে যা কিছু সবাই এক কিন্তু সে "এক" একক নয়- দু'য়ে মিলে এক।
ব্রহ্মময়ী মহামায়া। তিনি দূর্গা, তিনি কালী, তিনি জগদ্ধাএী, তিনি যোগনিদ্রা,তিনি সর্ব বিদ্যা,তিনি কৈবল্যদায়িনী, জগৎ মায়ায় আবদ্ধ করেন তাই তিনি মহামায়া: সজীবের দুর্গতিনাশ করেন তাই তিনি দূর্গা। কালের সনে রমন করেন তাই তিনি কালী। জগৎ ধারন করে আছেন তাই তিনি জগদ্ধাএী। নিদ্রারুপে তিনি জীবন্ত তাই তার নাম যোগনিদ্রা। অবিদ্যার নাশ করেন তাই তিনি সর্ববিদ্যা। মুক্তি দান করেন তাই তিনি কৈবল্যদায়িনী। ব্রহ্মময়ী - ব্রহ্মের মায়া। তিনি অনাদি - অনন্ত, বিশ্বব্যাপী। অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের, অনন্ত কোটি জীবের আধার মায়া।
ব্রহ্মময়ী মায়া দ্বারা জীবে মোহিত করে রেখেছেন। জীবের নিকট তাই সত্য অপ্রকাশিত। মহামায়া অসীম শক্তি স্বরুপা। মানুষের সর্ব ইন্দ্রিয়ের সর্বব্যাপী। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈর্ঋত, ঊর্ধ্ব, অধঃ এই দশ দিকে তার দশহস্ত। তাই তাকে দশভূজা বলা হয়ে থাকে।
ভূতত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান এই তিনকাল তার এিনয়ন। তাই তিনি এিনয়না। আনন্দ তার আধারের হাসি, বিশ্বমাতা তাই আনন্দময়ী। বিশ্বের মনি মানিক্য রত্ন তার অলংকার, তাই তিনি সর্বালঙ্কারে ভূষিতা। চন্দ্র, সূর্য তার মুকুটমনি - নক্ষএ খচিত নীল আকাশ তার মনিময় কুন্তল। তিনি রূপযৌবনসম্পন্না। বিশ্বের যত রূপ তা তাতে বর্তমান, তাই তিনি সর্বারূপা, তার অম্লান নব যৌবন, সে যৌবন নিত্য বৃদ্ধি ক্ষয়হীন, পরিবর্তনহীন। জগতের সমস্ত বর্ন মিলিত হয়ে তার বর্ন বা আভা, তাই তিনি অতসী, পুষ্পবর্নাভা। মায়া বসনে তার দেহ আচ্ছাদিত তাই মানুষ তার স্বরূপ দর্শন করতে পারে না। দশভূজা "ভগ" সমন্বিতা তাই তিনি ভগবতী। তার পাশ্বে ষড়ানন অনিমা, লঘিমাদি- ষড়ৈশ্বর্য্যের প্রতীক। যশঃ ও শ্রী তার দু পাশে দেবীরূপে বিরাজিতা। গেয়ানী তার পুএ গনপতি। গেয়ানই সিদ্ধিলাভ হয় তাই গনপতি সিদ্ধি দাতা। বৈরাগ্য তার ঊর্ধ্ব শিবরূপে বিরাজিত। বীর্য্য সিংহরূপে তার বাহন। প্রভুত্ব ভোগলিপ্সা অনুসারের সঙ্গে মা যুদ্ধরতা। এই আমাদের মাতৃমূর্তি। আসক্তি অসুর ও কাম ক্রোধাদি অসুর সংহার করতে হলে মাতৃশক্তির আরোধনা করতে হয়।
কালী বিশ্বের জীবনিবহকে তিনি ধরে ধরে খাচ্ছেন, আবার নিম্নোদর পথে তাদিগকে প্রসব করছেন। অবিশ্রান্ত গিলছেন, তাই তিনি নিত্যব্যাদিত বদনা, আবার অবিশ্রান্ত প্রসব করছেন, তাই তিনি নিত্য উলঙ্গিনী। ভয়ংকরীর আগম নির্গমাত্মক উভয় মার্গই উন্মুক্ত। তিনি খাবার জন্যই প্রসব করেন, আবার প্রসব করার জন্যই খেয়ে ফেলন। সর্বগ্রাসিনি কালীকা আমাদিগকে তার তীক্ষ্ণোন্নত দন্তে দাবড়িয়ে মনের সুখে চিবিয়ে খাবেন বলেই যেন কিছুকাল বারবার সুযোগ দেন। ঘোররবা, ঘোরদ্রংষ্ট্রা, মহারৌদ্রী কালী মৃত মাংসলোলুপ ভীষন চিৎকার পরায়ন শিবাগণের দ্বারা পরিবেষ্টিতা হয়ে মৃত্যু ভয়ভীতি জীবের কাছে হয়েছেন অধিকতর ভীতিপ্রদা। দেবীর পদতলে শবরূপী শিব। শানিত খড়গের দ্বারা তিনি মানুষ কাটছেন, তাদের শোণিত মাংস অস্থি আস্বাদন করে খাচ্ছেন, আবার মানুষেরই মুণ্ড ও করসংঘ সহায়ে প্রসাধন যোগ্য মাল্য কাঞ্চী কুন্ডল গড়ে নিয়ে স্বীয় ভূষণ স্বরূপ শ্রীঅঙ্গে ধারণ করছেন। এই সংহার নাট্যের আসীন পদে দন্ডায়মানা দেবী তাথৈ তাথৈ নৃত্য পরায়না চুলগুলো দক্ষিণে লম্মিত হয়ে এলিয়ে গিয়েছে। পরিধেও বাস খসে পড়েছে। উন্মাদিনীর নাই কোন ভ্রূক্ষেপ। এই যে ভয় এবং মৃত্যুর ছবি দেখছো ওটি মায়াময়ীর মায়ামুখোশ মাত্র। অনন্ত মহাজীবনের প্রসাদ ঔদার্য্যৈই কলনকারিনী শ্রী শ্রী কালী বারংবার আমাদিগকে খাচ্ছেন, আবার বারংবার আমাদিগকে প্রসব করছেন। চিতানলে খপুড়িয়ে খাঁটি করে নিবেন বলেই তিনি বার বার সংসারে এসে আমাদিগকে মৃত্যুপাশে আবদ্ধ করেন। মুখে যার "কালী কালী" মহামন্ত্র, বিবর্জিত মৃত্যুপথ অতিক্রমন তার ক্ষেত্রে সহজ সাধ্য।
সত্ত্ব: রজ: এবং তম: এই তিনপ্রকার গুণের সমন্বয়ে জগৎ গঠিত। এই তিনটি গুণ আমাদেরকে বশীভূত করে রেখেছে বলে আমরা যে ব্রহ্মস্বরূপ তা জানতে পারছিনা।
ঈশ্বরের মধ্যে এই তিনটি গুণই আছে, কিন্তু ঈশ্বর স্বয়ং এই তিন গুণের দ্বারা বদ্ধ নন। শ্রীরামকৃষ্ণকথিত উপমার সাহায্যে বলা যায় : 'ঠিক যেমন সাপের মুখের মধ্যে বিষ থাকে কিন্তু সেই বিষ সাপের কোনও ক্ষতি করেনা। তেমনি তিনটি গুণ ঈশ্বরের হলেও ঈশ্বর এগুলির দ্বারা আবদ্ধ নন।
এই ত্রিবিধ গুণের মধ্যে ঈশ্বরের তমঃগুণাত্মিকা ভাবের প্রতীক হলেন কালী।
আবার এই ত্রিগুণের অতীত অনির্বচনীয়া রূপে তিনিই নিরাকারা পরব্রহ্মস্বরূপিণী।
জগদীশ্বরীর এই স্বরূপ আমাদের জ্ঞানের স্তর ভেদে বিভিন্নরকম ভাবে প্রতিভাত হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন সাধক নিজ নিজ সাধনার স্তর অনুযায়ী মাকে বিভিন্নভাবে অনুভব করেন।
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণকে একজন জিজ্ঞাসা করছেন , 'কালী কালো কেন?'
শ্রীরামকৃষ্ণদেব উত্তর দিচ্ছেন, 'দূরে তাই কালো, কাছে গেলে কোনও রং নেই। সমুদ্র দূর থেকে নীল-বর্ণ। কাছে গিয়ে সমুদ্রের জল হাতে তুলে দেখ কোনও রং নেই।'
অর্থাৎ মায়ার reference-frame এ দেখলে তিনি সগুণ-সাকার। অাবার মায়াতীত তুরীয় অবস্থায় নির্গুণ সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্ম-স্বরূপা। এই ভাবে তিনি রূপ ও গুণের অতীত।
দেবী ভাগবতে ব্যাস লিখছেন ,
সদৈকত্বং ন ভেদোহস্তি সর্বদৈব মমাস্য চ।
যোহসৌ সাহম্ অহং যাসৌ ভেদোহস্তি মতিবিভ্রমাৎ।।
অর্থাৎ আমি ( আদ্যা-শক্তি বা কালী) ও ব্রহ্ম এক। উভয়ের মধ্যে কোনও ভেদ নেই।
কালীর স্বরূপ অবাঙ্মনসোগোচরম্ ব্রহ্ম। তিনি বাক্য ও মনের অগোচর। - এ হল জ্ঞানযোগের শীর্ষে সমত্ববুদ্ধি-রূপ যোগে আরুঢ় সাধকের উপলব্ধি।
আবার দ্বৈতবাদী ভক্ত এই আদ্যা-শক্তি মহাকালীকে ব্রহ্মের 'শক্তি' হিসাবে জানেন।
কিন্তু স্বরূপতঃ ব্রহ্ম ও তাঁর শক্তি একই। ঠাকুর বলছেন : 'যেমন অগ্নি ও তার দাহিকাশক্তি।'
এই আদ্যাশক্তি তাঁর সত্ত্বঃ রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণের সমন্বয়ে উৎপন্ন মায়ার প্রভাবে আমাদেরকে অাচ্ছন্ন করে রেখেছেন। তাই আমরা আমাদের স্বরূপ জানতে পারছিনা। আমরা যে অনন্ত আত্মা তা উপলব্ধি করতে পারছিনা। তিনি কৃপা করে তাঁর এই মায়া সংবরণ করলে তবেই আমরা মুক্ত হই , আমাদের নিত্য-স্বরূপের জ্ঞান হয়। তখন জানা যায়, আমিই কালী, কালীই আমি, 'সো অহম্'।
তারার মতে তারার পথে।
তারার সাথে তারার মত।।
জয় মা তাঁরা।
জয় গুরু বামদেব।।
জয় গোবিন্দ।
জয় গোপাল।।