10/12/2022
অপরাজিত মানিক
মৃত সন্তান জন্ম দেয়ায় মানিকের স্ত্রী ডলির অনুভূতি : "বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।"
বড় একটি ভাই ছিল মানিক বন্দোপাধ্যায়ের। যখন শুনেছেন ভাই গল্প লেখে, রাজনীতি করে, টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। মৃত্যুর আগে যখন চরম অর্থকষ্টে দিন যায় , বড়ভাইয়ের কাছে টাকা ধার চাওয়াতে উত্তর পেয়েছেন, "আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়, আমি কাউকে টাকা ধার দিই না।"
তবু সাহিত্য দিয়ে পেট চালানোর জেদ ছাড়েননি একরোখা মানিক। একবার পূর্বাশা পত্রিকায় চাকরির আবেদন করলেন। যখন শুনেছেন বন্ধুও একই পদে প্রত্যাশী, সম্পাদককে লিখলেন, "আমি অবগত আছি পরিমল গোস্বামী এই পদটির জন্য আবেদন করিবেন। আমার চেয়েও তাহার চাকুরির প্রয়োজন বেশি। মহাশয় যদি ইতিমধ্যে তাহার সম্পর্কে অনুকূল বিবেচনা করিয়া থাকেন, তবে অনুগ্রহপূর্বক আমার এই আবেদন প্রত্যাহার করা হইল বলিয়া ধরিয়া লইবেন।’’
সরকারি চাকরিও ছেড়ে দেন, ভালো লাগেনি বলে৷ আদতে মার্কস-ফ্রয়েডের বিষম ভূত চেপেছিল তাঁর মাথায়। মধ্যবিত্তের যুদ্ধ লিখতে গিয়ে নিজের জীবনের সাথেই মহাযুদ্ধ করা হয়ে গেছে গোটা জীবনে।
অথচ গণিতে বিএসসি তুখোড় ছাত্র প্রবোধ কুমারের সাহিত্যিক হওয়ার কথা ছিল না। একবার ক্যান্টিনে এসে এক বন্ধু বলল, " পত্রিকায় লেখা দিয়েছি, ছাপায়নি। নামী কেউ না হলে ছাপায় না। " তর্কাতর্কি করতে গিয়ে লেখা ছাপানোর চ্যালেঞ্জে নামলেন। সেই চ্যালেঞ্জই বাংলা সাহিত্যকে পাইয়ে দিল চালচুলোহীন মৃগীরোগী এক সাহিত্যিককে।
পদ্মানদীর মাঝি লিখেছিলেন জীবনের মোটামুটি ৬ ঘন্টার অভিজ্ঞতা থেকে, তখন তিনি কিশোর। একবার বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছেন, অনেক খুঁজে পাওয়া গেল নদীপারের জেলেদের নৌকায়। তাদের কাছে দুবেলা ভাত খেয়ে গল্প করে কাটিয়েছিলেন মানিক।
"প্রাগৈতিহাসিক" গল্পের শেষ লাইন কটা নিজেকেই উৎসর্গ করেছিলেন কি তিনি?
শেষবেলা যখন শয্যাশায়ী, তখন বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া না দেবার দায়ে মামলা ঠুকে দিয়েছেন। সে মামলা লড়ে ওঠার আগেই, বাড়ি ভাড়া না দিয়ে ৩ ডিসেম্বর মানিক ফেরত যান ওপারে।
সুভাষ মুখার্জি তাঁর স্ত্রী কে বলেছিলেন, "একটা টেলিফোন তো করবেন , বৌদি। " ডলি ম্লান হাসিতে উত্তর দেন,ফোন করলেও যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।"
মরার পর শত শত দেশনেতা এসে পায়ে মাথা ঠুকেছেন, হাজার হাজার মানুষ ফুলের তোড়া নিয়ে শব দেখতে এসেছেন। অথচ মৃত্যুর আগের দিনও ছিল কা কারোর খোঁজ। বিস্ময়কর হলেও, জীবনে একটাও পুরষ্কার -সম্মাননা পাননি আমাদের পদ্মানদীর মাঝি!
মরে গিয়ে প্রথমবার বেঁচে গেছেন মানিক বন্দোপাধ্যায়। আজকে ৩ ডিসেম্বর। প্রজন্মের অনেক "স্যার" লেখক এসেছে, আরো আসবে। কিন্তু এমন মৃগীরোগী ছন্নছাড়া জেদী মানিক একটাই, কেবল একটাই।
আপনাকে ভালোবাসি, মানিক।
©শাফায়াত স্বচ্ছ