14/10/2024
সর্বতোভদ্র মন্ডল কি?
সামনেই মহাপূজা দুর্গা পূজা আসছে , এই পূজার একটি মূল অঙ্গ হলো " সর্বতোভদ্র মন্ডল " যার উপর মায়ের ঘট স্থাপন করা হয় । এই সর্বতোভদ্র মন্ডল কি আসুন সকলে জেনে নিই।।
শ্রীনাথ মন্দিরের সুদর্শন চক্র , জগন্নাথ পুরীর মধ্যে ভৈরবী যন্ত্র , তিরুপতি মন্দির আর শৃঙ্গেরী মঠের মধ্যে শ্রীযন্ত্র এবং মহাকালেশ্বর মন্দিরে মহামৃত্যুঞ্জয় যন্ত্রের প্রভাব এবং চমৎকার শ্রদ্ধালুদের মধ্যে সর্ববিদিত । মন্ডল এবং যন্ত্র কে দেবদ্বার বলা হয় । সর্বতোভদ্রমন্ডল কে সর্বোচ্চ কল্যানকারী মন্ডল মানা হয় । যজ্ঞ যাগাদি , দেব প্রতিষ্ঠা , মাঙ্গলিক পূজা মহোৎসব , অনুষ্ঠান ইত্যাদি শুভ কার্যে সর্বতোভদ্রমন্ডলের সর্বাধিক ব্যবহার বৈদিক কাল থেকেই হয়ে আসছে । দুর্গা পূজার মতো মহাপূজাতেও সেই কারণেই এই মন্ডলের ব্যবহারের বিধান বিভিন্ন শাস্ত্রে পাওয়া যায় ।
সর্বতোভদ্রমন্ডলের সাধারনত অনেক অর্থ প্রাপ্ত হয় । মঙ্গলপ্রদানকারী এবং কল্যানকারী সর্বতোভদ্রমন্ডল এবং চক্রের মধ্যে সবদিকেই " ভদ্র " নামক কোষ্ঠ বা ঘর থাকে যার ফলে এটি সর্বতোভদ্রমন্ডল নামে পরিচিত । এই মন্ডলের প্রত্যেক দিশায় দুটো করে ভদ্র তৈরি করা হয় এই রুপে এই মঙ্গলকারী বিগ্রহ নিজের নামকে সর্বদা সার্থক করে ।
ভদ্র মন্ডলের বাইরে তিনটি পরিধি থাকে যার মধ্যে সাদা সত্য গুন , লাল রজো গুন আর কালো তমো গুনের প্রতীক যা ভগবতীর প্রসন্নতার জন্য নির্মিত করা হয় ।
সর্বতোভদ্রমন্ডল এর ভিতরে মোট ৩২৪ টি কোষ্ঠের মধ্যে নিম্নলিখিত ৫৭ জন দেবতাকে স্থাপন করা হয় । ১. দূর্গা ( প্রধান) ,
( অষ্টমাতৃকা )
২. মাহেশ্বরী ,
৩. বৈষ্ণবী ,
৪. ব্রাহ্মী ,
৫. ঐন্দ্রী ,
৬. বারাহী ,
৭. নরসিংহী ,
৮. কৌমারী ,
৯. চামুন্ডা ,
দেবস্থান ও যজ্ঞভাগ রাক্ষার জন্য অষ্টমাতৃকার আবির্ভাব ঘটেছে ।
১০. গনপতি ,
১১. ব্রহ্মা ,
১২. বিষ্ণু ,
১৩. মহাকাল ,
১৪. কার্তিক ,
১৫. ইন্দ্র ,
১৬. অগ্নি ,
১৭. বরুন ,
১৮. একাদশ রুদ্র ,
১৯. দ্বাদশ আদিত্য ,
২০. যম ,
২১. বায়ু ,
২২. অষ্টবসু ,
২৩. সোম ,
২৪. ঈশান ,
২৫. আশ্বিনীদ্বয় ,
২৬. নির্ঋতি ,
২৭. সপৈতৃক- বিশ্বদেব ,
২৮. নন্দী ,
২৯. দক্ষ আদি সপ্তগন ( ভগবান শঙ্করের মুখ্য সাতজন গন যথাক্রমে দক্ষ , কীর্তিমুখ , শৃঙ্গী , ভৃঙ্গী , রিটি , বান , তথা চন্ডীশ ) ,
৩০. সপ্তযক্ষ -( মনিভদ্র , সিদ্ধার্থ , সূর্যতেজা , সুমনা , নন্দন , মনিমন্ত , আর চন্দ্রপ্রভ ) এই সাতজন যক্ষ ,যজমানের কল্যান করার জন্য সর্বদা তৎপর থাকে ,
৩১. অষ্টকুলনাগ ,
(সপ্ত ঋষি)
৩২. গৌতম ,
৩৩. ভারদ্বাজ ,
৩৪. বিশ্বামিত্র ,
৩৫. কশ্যপ ,
৩৬. জমদগ্নি ,
৩৭. বসিষ্ঠ ,
৩৮. অত্রি ,
৩৯. অপ ,
৪০. মরুৎগন ,
৪১. পৃথিবী ,
৪২. সপ্তগঙ্গা ( গঙ্গা , যমুনা , নর্মদা , গোদাবরী , সরস্বতী , সিন্ধু , কাবেরী )
৪৩. সপ্তসাগর ,
৪৪. মেরু ,
৪৫. অরুন্ধতী - ব্রহ্মার মানসপুত্রী ,
৪৬. গন্ধর্ব ও অপ্সরা( দক্ষ কন্যা প্রাধা এবং প্রজাপতি কশ্যপ এর দ্বারা দশজন গন্ধর্বের সৃষ্টি হয় এনারা যথাক্রমে - সিদ্ধ , পূর্ণ , বর্হি , পূর্নায়ু , ব্রহ্মচারী , রতিগুন , সুপর্ন , বিশ্ববসু , ভানু , আর সুচন্দ্র ,
অপ্সরা ( কিছু অপ্সরা সমুদ্র মন্থন এর সময় জল থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন আর কিছু প্রজাপতি কশ্যপ এবং তার পত্নী প্রধার দ্বারা উৎপন্ন হয় যথাক্রমে - অলম্বুশা , মিত্রকেশী , বিদ্যুৎপর্না , তিলোত্তমা , অরুনা , রক্ষিতা , রম্ভা , মনোরমা , কেশিনী , সুবাহু , সুরতা , সুরজা , এবং সুপ্রিয়া , প্রত্যেক বৈদিক যজ্ঞে গন্ধর্ব এবং অপ্সরাও সমান পূজনীয় )
(অষ্ট আয়ুধ)এই অষ্ট আয়ুধের প্রত্যেকেই দেবস্বরুপ আর মানব কল্যাণের জন্য বিভিন্ন দেবী দেবতাদের হাতে সুশোভিত থাকে সর্বদা এবং এই অষ্ট আয়ুধ প্রকৃত পক্ষে উত্তর, ঈশান , পূর্ব আদি আট দিশার সোম , ঈশান , ইন্দ্র আদি দেবতার স্বরুপ মনে করা হয় ,
৪৭. ত্রিশুল ,
৪৮. সুদর্শন ,
৪৯. বজ্র ,
৫০. গদা,
৫১. দন্ড ,
৫২. খড়গ ,
৫৩. পাশ ,
৫৪. অঙ্কুশ ,
৫৫. মৃত্যুরোগ ,
৫৬. স্বাহা,
৫৭. স্বধা ,
এই ৫৭ জন দেবতাকে স্থাপন করা হয় ভদ্রমন্ডলে ।
যজ্ঞ এবং মাঙ্গলিক কার্যে , মাঙ্গলিক মহোৎসব , প্রতিষ্ঠা কর্ম , ইত্যাদি বিভিন্ন শুভ কার্যে সর্বতোভদ্রমন্ডল নির্মাণ করার রিতি বৈদিক যুগ থেকেই চলে আসছে । মন্ডলের স্থাপনা এবং উপযুক্ত দেবী দেবতার বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা প্রতিষ্ঠা এবং পূজা - অর্চনা করা হয় । এই মন্ডলের প্রভাবে সাধক , উপাসক এবং পূজক এর সর্ববিধ কল্যাণ এবং মঙ্গল হয় ।
ভদ্র মার্তন্ডাদি গ্রন্থের মধ্যে সর্বতোভদ্রমন্ডলের প্রমুখতা এবং উপযোগিতা বর্নিত রয়েছে ।
সর্বতোভদ্রমন্ডলের রচনা করার পদ্ধতি অদ্ভুত।এই মন্ডল নির্মানের জন্য প্রথমে এক-হস্ত প্রমাণ সম-চতুষ্কোন মন্ডল অঙ্কন করে তার মধ্যে দক্ষিণ থেকে উত্তরে তথা পশ্চিম থেকে পূর্বে সমান রুপে দুটো রেখা অঙ্কিত করার বিধান রয়েছে । তারপর উক্ত চারটি কোষ্ঠ এর কোনাকুনি দুটি রেখা অঙ্কিত করতে হবে । এই রুপে বারবার কোনাকুনি রেখা এবং মধ্যরেখা অঙ্কন করে মোট ৪৫৬ টি কোষ্ঠে( ঘরে) ভাগ করতে হবে । তারপর মাঝখানের ৩৬ টি ঘর নিয়ে একটি পদ্ম অঙ্কন করে তার বাইরের পঙ্কতিতে বীথি, তার বাইরের দ্বারের শোভা( লাল রঙ ) এবং কোন রচনা করতে হবে । এবার পদ্মের বাইরের দ্বাদশাংশ ত্যাগ করে অবশিষ্ট অংশকে সমান তিনভাগে বৃত্ত দ্বারা ভাগ করতে হবে । প্রথম ভাগে কর্নিকা( হলুদ রঙ) , দ্বিতীয় ভাগে কেশর (লাল রঙ)এবং তৃতীয় ভাগে পদ্মের পাপড়ি আঁকতে হবে । এইভাবে মোট আটটি পাপড়ি আঁকতে হবে । প্রতিটি পত্রের( সাদা রঙ) মূলভাগে দুটি করে ১৬টি কেশর(লাল রঙ) তৈরি করতে হবে।পরে চারকোনে তিনটি করে কোষ্ঠায় পীঠকোন আঁকতে হবে । তারপর পীঠক্ষেত্রের অবশিষ্ট কোষ্ঠে পীঠপত্র( সাদা রঙ) আঁকতে হবে । বাইরের পঙক্তি দুটিতে বীথিস্থান রচনা করতে হবে । এবার চারদিকে বাইরের পঙ্কতি দুটির মাঝখানের চারটি কোষ্ঠা ও তার উপরের পঙক্তির দুটি কোষ্ঠা ও ছয়টি কোষ্ঠা দিয়ে দ্বার আঁকতে হবে । তারপর তিন ও এক , চারি কোষ্ঠায় শোভা( লাল রঙ) , আবার তিন ও এক , চারি কোষ্ঠায় উপশোভা ( হলুদ রঙ) অাঁকতে হবে । অবশেষে ছয় কোষ্ঠায় চারটি কোন আঁকতে হবে । এইভাবে চারদিকে চারটি দ্বার , দ্বারের উভয় পাশে দুটি করে শোভা( লাল রঙ) , শোভা দুটির পাশে আবার দুটি করে উপশোভা ( হলুদ রঙ) আঁকতে হবে । তাহলে চার চারটি দ্বার, আটটি শোভা , আটটি উপশোভা , নির্মান হবে । সবশেষে বাইরে তিনটি রেখা আঁকতে হবে , তাহার একটি সাদা , দ্বিতীয়টি লাল , ও তৃতীয়টি কালো হবে । এর মধ্যে সবমিলিয়ে মোট ১০৮ টি সাদা রঙের কোষ্ঠ , ৮৮ টি লাল রঙের কোষ্ঠ , ২০ টি হলুদ রঙের কোষ্ঠ ,২০ টি কালো রঙের কোষ্ঠ রয়েছে ।
এই কোষ্ঠের মধ্যে ইন্দ্রাদি দেবতা , মাতৃ শক্তি তথা অরুন্ধতী সমেত সপ্তঋষির স্থাপন এবং পূজা করা হয় ।
সর্বতোভদ্রমন্ডল কে দেবতাদের দরজা বলা হয় , প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি গনেশ যজ্ঞ, লক্ষী যজ্ঞ , সূর্য যজ্ঞ , গ্রহ শান্তি কর্ম , পুত্রেষ্টি যজ্ঞ , চন্ডী যজ্ঞ , নবচন্ডী যজ্ঞ , শতচন্ডী যজ্ঞ , সহস্রচন্ডী যজ্ঞ , লক্ষচন্ডী যজ্ঞ, অযুতচন্ডী যজ্ঞ , কোটিচন্ডী যজ্ঞ প্রভৃতি যজ্ঞে ভদ্র মন্ডলের প্রমুখতা রয়েছে । সনাতন সংস্কৃতিতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ষোড়শ সংস্কার যজ্ঞ থেকেই শুরু হয় আবার যজ্ঞের দ্বারাই সমাপ্ত হয়। অতঃ ভদ্র মন্ডল ছাড়া যজ্ঞ কর্ম অসম্পূর্ণ। সনাতন সংস্কৃতিতে যজ্ঞের মহিমা অসীম ,এই কারণে শাস্ত্রে একে শ্রেষ্ঠ কর্ম বলা হয়েছে " যজ্ঞোবৈ শ্রেষ্ঠকর্মঃ " । তাই কলিযুগের অশ্বমেধ যজ্ঞ এই দুর্গা পূজাতে এই ভদ্রমন্ডলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ।।