03/02/2025
|| মনসা হলেন আরেক সরস্বতী ||
আমরা হয়তো খেয়াল করি না যে পদ্ম ও হংসের সাথে সরস্বতীর মতো মনসারও সম্পর্ক আছে। তাছাড়া গবেষকদের দাবী অনুযায়ী সরস্বতী ও মনসার সম্পর্ক বহু আগে থেকেই ছিল। বৃহৎ বঙ্গের ভাবচর্চার পরিপ্রেক্ষিতে একথা আরও বেশি করে সত্য। শুধু আমরা আমাদের দার্শনিক বয়ান ভুলে গেছি। সরস্বতী যেমন আমাদের কাছে নিছক শাস্ত্রের দেবী নন, তেমনই মনসাও ।
সরস্বতী যেমন জ্ঞানদা, তেমনি মনসার দ্বাদশ নামে বলা হয়েছে " মহাজ্ঞানযুতা চৈব সা দেবী বিশ্বপূজিতা"।
এর অর্থ দুজনই কিন্তু জ্ঞানদা। আমাদের জ্ঞান দান করে থাকেন।
আবার মনসার সাথে পদ্ম ও হাঁসের ও এক নিবিড় সম্পর্ক আছে। মনসার সাথে পদ্ম ও হাঁসের সম্পর্ক বিচার কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে গেলে পদ্ম ও হাঁসের অর্থ জানতে হবে।
পদ্ম হল অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হবার প্রতীক। শক্তির লীলা পদ্মের মতো করেই বিকশিত হয়। পদ্ম উপর থেকে দেখতে চক্রাকার। চক্র বা বৃত্তের শেষ বা শুরু দেখানো যায় না। শক্তিকেও শেষ বা শুরু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আবার শক্তির ক্রিয়াকেও আদি বা অন্ত দিয়ে বিচার করা যায় না। একইসাথে আদি ও একইসাথে অন্ত হল চক্র বা বৃত্ত। তাই মানবদেহেও চক্রকে বলা হয় পদ্ম। আর এই পদ্মের সাথেও শক্তিরই সম্পর্ক। পদ্ম পাঁকে জন্মালেও এর প্রকাশ কিন্তু দ্যুতিময়। তাই পদ্মকে পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। পদ্ম জীবন, বিকাশ, উর্বরতা, পবিত্রতা ও নির্লিপ্ততার প্রতীক। তাছাড়া পদ্মের দ্যুতিময়তা সুর্যকেও নির্দেশ করে। পদ্ম এমন এক উদ্ভিদ যাতে ফুল ও ফল একত্রে হাজির থাকে। ফুল-ফলকে কার্য-কারণ মানলেই বিশাল দার্শনিক তত্ত্ব খুব সহজেই বুঝে যেতে পারি। অর্থাৎ কার্য ও কারণ একইসাথে বিরাজ করে সেই তত্ত্ব খুব সহজেই পদ্ম দিয়ে প্রকাশ করা যায়। পদ্মের পাপড়ি ফলকে বেষ্টিত করে থাকে এবং পদ্ম ফলকে বহন করে। পরমজ্ঞান লাভ করতে হলেও এই জগতে পদ্মের ম্তো হতে হবে । শত-সহস্র আবর্জনার মধ্যে বাস করেও নিজেকে তার থেকে আলাদা রাখতে হবে, দৃঢ়তার সাথে নিজের সত্তাকে বিকশিত করতে হবে এবং নিজের সারবস্তুকে পদ্মের পাপড়ির মতো কোমলতার সাথে আগলে রাখতে হবে। অর্থাৎ পদ্মকে বুঝলে আমরা সরলভাবে অনেক গূঢ় রহস্য বুঝে যেতে পারি।
হংসের প্রজনন শক্তি অসাধারণ। হংস শব্দের সাথে হং ও স-এর সম্পর্ক ব্যাপক। আবার সোহং ও ওং এর সাথেও হংসের সম্পর্ক আছে। আবার অহং সঃ এর তত্ত্ব হল হংস। আমিই যে তুমি অর্থাৎ পরমই যে বহু হয়ে জীবরূপে হাজির হয়েছেন সেই তত্ত্বও হংস। তাছাড়া হংসে হরূপী পুরুষ ও সরূপী প্রকৃতি দুজনই আছে। তাছাড়া হংসকে ধরা হয় বিবেকের প্রতীক। দুধ ও জল মিশিয়ে দিলে হংস দুধ বেছে খায় আর জলে থাকলেও গায়ে জল লাগে না। অর্থাৎ হংসও পদ্মের মতো অনেক গূঢ় রহস্য প্রকাশ করে।
আরেকটা ব্যাপার আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, হাঁস ও পদ্মের সাথে জলের সম্পর্ক বিদ্যমান । জলকে প্রাণ সঞ্চারের প্রতীক ধরা হয়। আবার সরস্বতী নিজেই জল। সরস্বতী ভৌতিক দৃষ্টিতে জল, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে প্রাণ আর দৈবিক দৃষ্টিতে হয় চিন্ময় প্রকাশ। অর্থাৎ কোথাও না কোথাও মনসার সাথে সরস্বতী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক থেকেই যাচ্ছে। আমরা এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত টেনে বলতে পারি, মনসা বঙ্গের আরেক সরস্বতী৷ পদ্ম ও হংসে তাঁদের আসন তা যে পর্যন্ত জীব ও ব্রহ্মের মিলন ঘটিয়ে দেয়। আর যে জলে তাঁদের লীলা সেই জল অমর্ত্যলোক থেকে মর্ত্যে আসে। যার ভবের খেলা থেকে মন উঠে যায় সে এই জলের ধারা ধরে উজান পথে চলতে শুরু করে।
Special thanks to আর্য সারথী। ❤️