30/10/2025
I| জগদ্ধাত্রী পূজোর ইতিকথা ||
জগদ্ধাত্রী পূজো মানেই বাঙালির হৃদয়ে দুটি শহরের নাম প্রথমেই মাথাচাড়া দেয় এক কৃষ্ণনগর, দুই চন্দননগর। সাথে যে বিতর্ক উঠে আসে, কোথাকার পূজো প্রাচীনতর - কৃষ্ণনগরের নাকি চন্দননগরের..!
তবে দুটি শহরের পূজোর মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে, সেটা জেনে নেওয়া দরকার। প্রথমত, চন্দননগরে পূজো হয় চারটে দিন ধরে,সেখানে কৃষ্ণনগরে পূজো কেবল একদিনের। তবে ঐ একদিনের পূজার্চনার মধ্যেই ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর পূজো নিবেদিত।
অনেকের প্রশ্ন - কৃষ্ণচন্দ্র রাজাই কি বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজোর প্রবর্তক? উত্তর না। বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি অনুযায়ী, কৃষ্ণচন্দ্র রাজার বহু পূর্ব থেকেই এই পূজো বাংলায় প্রচলিত ছিল। দিগনগরের রাঘবেশ্বর শিবমন্দিরের দেওয়ালে জগদ্ধাত্রী মূর্তি উৎকীর্ণ, যা রাঘব রায়ের (কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ) সমসাময়িক। তবে একথা মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণচন্দ্রর হাত ধরেই এই পূজো এক বিস্মৃতি অধ্যায় অতিক্রম করে, গোটা বাংলায় এক নবরূপ লাভ করে। পাশাপাশি একথা বলতেও কোনো দ্বিধা নেই যে, কৃষ্ণচন্দ্রই ছিলেন একদিনের জগদ্ধাত্রী পূজোর প্রথম প্রবর্তক।
কৃষ্ণনাগরিকদের কাছে একটি স্বপ্নকাহিনী বহুল চর্চিত। দেখা যাচ্ছে, বকেয়া রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হলে, কৃষ্ণচন্দ্রকে নবাবের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। মুক্তি পেলে জানতে পারেন রাজরাজেশ্বরীর ( রাজবাড়ীর দুর্গা ) পূজো শেষ। এই সংবাদে ভীষণ মানসিকভাবে ব্যথিত হয়ে পড়েন, পরে স্বপ্নে তিনি দেখতে পান, এক মাতৃ শক্তি কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে তাকে পূজোর নির্দেশ দেন। এই কাহিনীটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক থাকলেও, কৃষ্ণনাগরিকরা একে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে।
‘ বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর..’🌸🌿
কৃষ্ণনগরে এই পূজোর জনপ্রিয়তার মূলে ছিল রাজবাড়ীর আন্তরিক উদ্যোগ, আনুকূল্য। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা প্রায় প্রতিটি পাড়ায় (যেমন - চকেরপাড়া, চাষাপাড়া, বাঘাডাঙ্গা প্রভৃতি) এই পূজো সেই প্রথম থেকে চলে আসছে। এক্ষেত্রে মালোপাড়ার কথা বিশেষ উল্লেখ্য। প্রথমদিকে এই পূজো আয়োজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মালোরা মূলত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের পূজোয় রাজবাড়ীর তরফ থেকে বিশেষ আর্থিক সহযোগিতা করা হত। আজকের দিনেও সেই ঐতিহ্য চলছে....
দেবী বিসর্জনের সময়ে শহরের সমস্ত প্রতিমা রাজবাড়ী ঘুরিয়ে, নিরঞ্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হত জলঙ্গি নদীতে। রাজবাড়ী নিয়ে যাওয়ার কারণ ছিল, রাণীমাকে ঠাকুর দর্শন করানো। তিনি খুশি হয়ে প্রিয় প্রতিমাশিল্পীকে উপহার দিতেন। আজকের দিনেও রাজবাড়ী ঘুরিয়ে ঠাকুর নিরঞ্জনের সেই ঐতিহ্য অক্ষুন্ন ।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী জগদ্ধাত্রী পূজোকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখছেন, “..এই কৃষ্ণনগরে এসে আমরা যে প্রথম জগদ্ধাত্রী প্রতিমা দেখলাম তাই নয়, দেখলাম সেই পূজোর জাঁক আর লোকপ্রিয়তা।....তবে সবচেয়ে জমকালো ছিল, সারারাত ধরে কারবাইড গ্যাসের আলো দিয়ে সাজিয়ে প্রতিমা বিসর্জন। যাকে বলত 'আড়ং'। আড়ংয়ের মিছিলে ঢাক বাজত, ডগর বাজত, কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং আমীষগন্ধী ছিল খেমটা গান আর ঢোল সানাই সহযোগে নাচ। সেটা দেখার জন্য আর বাহবা দিতে শহরের রাস্তার দুপাশে নাগরিক ও গ্রামীন জনসমাবেশ ছিল খুব ঘন। সারা শহরের বউঝি আর গেরস্থরা সারা রাত অতন্দ্র থাকত।”
শেষে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, চন্দননগরে তবে কিভাবে এই পূজোর সূত্রপাত। ফরাসি গভর্নর ডুপ্লের নাম সকলের পরিচিত, তাঁরই দেওয়ান ছিলেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। কৃষ্ণচন্দ্রর সাথে ছিল তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিপদকালে বহুবার ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী তাকে আর্থিক সাহায্য করেছেন। অন্নদামঙ্গলের রচয়িতা ভারতচন্দ্রকেও ইন্দ্রনারায়ণ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন, উচ্চ সমাদর লাভের জন্য। অতএব উভয়ের মধ্যে যখন সুসম্পর্ক ছিলই, তখন কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পূজো শুরু করলে, চন্দননগরেও পূজো শুরু হয়।
চন্দননগরে আরেকটি প্রচলিত মত রয়েছে,সেটি হল - কৃষ্ণনগরের চাল ব্যবসায়ীরা ( মতান্তরে নবদ্বীপের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা ) চন্দননগরে বাণিজ্যিক সূত্রে যাতায়াত করতেন। তবে সেবার তারা পূজোর সময় কৃষ্ণনগরে ফিরতে পারেনি। সেই থেকে চন্দননগরে শুরু হল জগদ্ধাত্রী পূজো।
তবে বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, কৃষ্ণনগর বা চন্দননগরের হাত ধরেই গোটা বাংলায় এই পূজো আজ বেশ আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়ে আসছে।মহামারী অতিক্রম করে আমাদের আবার সেই পুরোনো দিন ফিরে পাবার পালা..
জয় মা জগদ্ধাত্রী
ছবি টি তুলেছেন - Arusharko Sengupta