14/08/2026
ইনি হলেন বাঁকা বাবা। ভাল নাম কখনও জিজ্ঞাসা করবার সুযোগই পাইনি। আর কখনও জিজ্ঞাসা করা হবেও না 🥲 কেন জানেন?
কটকের খুব কাছে, মহানদীর তীরে নারাজ নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে নির্জন, অনুচ্চ এবং প্রায় অগম্য একটি পাহাড়ের চূড়ায় "আড়েই অক্ষর" নামে এক প্রত্নক্ষেত্রের অবস্থান। সেখানে একটি বিশাল প্রস্তরখন্ডে কিছু অদ্ভুত ভাষ্কর্য খোদাই করা আছে, আর রয়েছে একটি অসমাপ্ত শিলালিপি। ভাষ্কর্যটি দেখে আমার মনে হয়েছে, এক ব্যক্তি হাতে খুন্তি নিয়ে একটি বিশাল কড়াইয়ে কিছু রান্না করছে, আর তার পাশে আরেকজন দাঁড়িয়ে উল্টোদিকে তাকিয়ে রয়েছে। রাঁধুনী এবং উল্টোদিকে তাকিয়ে থাকা ব্যক্তির মুখ এবং শরীরের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে, যেন তারা কাউকে বলছে "আরে, জলদি চাল-ডাল নিয়ে এসো, কড়াই পুড়ে গেল তো!"। এই ভাস্কর্য এখনও সেভাবে সরকারি নজরে আসেনি, তাই এর সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য বিবরণও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
তো যাইহোক, এই পাহাড়ের নীচে থেকে শুরু করে ওপর পর্যন্ত অনেক সাধু-সন্তদের সমাধি রয়েছে। এক-একটি সমাধি এক-এক রকম। কোথাও সমাধির ওপরে সুন্দর একটি তুলসিমঞ্চ, কোথাও সেই সমাধিতে শায়িত সাধুবাবার পাথরের মূর্তি, কোথাও ওবেলিস্কের মত একটি লম্বাটে পাথর বসিয়ে রাখা, কোথাও আবার সাধারণ একটি চৌকোনো বেদি।
এইসব সমাধি দেখতে দেখতে নির্জন পাহাড়ের ওপরে উঠে দেখি, সেখানে একটি মন্দির ও সাধুদের একটি ছোট্ট আশ্রম রয়েছে। "আশ্রম" বলতে আমরা যে কোটিপতি সাধুদের বিলাসবহুল থাকার জায়গা ভাবি, এই আশ্রম কিন্তু সেই আশ্রম নয়। এখানে দেখি ছোট খুপচি দুই কামরার আশ্রমে দু'জন সাধু, একটি ষাঁড় আর একটি কুকুর থাকে। সাধুবাবাদের সঙ্গে পরিচয় হলে জানলাম, তাঁদের গুরুদেব এই পাহাড়ে তপস্যারত অবস্থায় অমৃতলোকে গমন করলে, তাঁর অনুগামীরা গুরুদেবকে সেখানেই সমাধিস্থ করে, তার ওপরে একটি সমাধিমন্দির বানিয়ে দেন। আর এই দুইজন সাধু তাঁদের গুরুদেব জীবিত থাকাকালীন এখানে থেকে তাঁর সেবা করতেন, তিনি মারা যাবার পর গুরুদেবের সমাধিমন্দিরের সেবাকার্যকেই গুরুসেবা জ্ঞানে এখনও পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। গুরুদেবের শিষ্যরা পালা করে এই দুইজন সাধুর জন্য যৎসামান্য চাল-আটা-শাকসব্জী দিয়ে যান। তাই দিয়ে এই নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় দুই বৃদ্ধ সাধুর ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। আর কটকের এত কাছে হয়েও সেই জায়গা এমনই অগম্য যা ভাবলেই আশ্চর্য হতে হয়। শুকনো সময়েই সেখানে পৌঁছতে আমার অবস্থা খারাপ, বর্ষাকালে ঐ পথে গেলে যে কনফার্ম পা পিছলে মহানদীতে গিয়ে পড়তে হবে, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মোটকথা ঐ দূর্গম স্থানে শিষ্যদের রেশন না আসলে সাধু দুজনের অনাহার ছাড়া গত্যন্তর নেই সেটা বোঝাই যায়।
দু'জন সাধুই খুব ভাল। তাঁদের মধ্যে একজন আবার একটু বস্ টাইপের। বুঝলাম, ইনিই মেইন সবকিছু দেখভাল করেন আশ্রমের। কথায় কথায় জানলাম তাঁর নাম "বাঁকে বাবা"। বাঁকে বাবার সঙ্গে কিছুক্ষনের মধ্যেই আলাপ জমে উঠল। বাঁকে বাবা আশ্রমের সবকিছু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। পাহাড় দিয়ে ঘেরা তাঁদের যজ্ঞ করবার জায়গা, তাঁর গুরুদেবের সমাধিমন্দির, পাহাড়ের খোঁদলে তাঁদের প্রাকৃতিক জলাধার ইত্যাদি।
সব ঘুরে দেখা শেষ হলে বাঁকে বাবা ঘরে গিয়ে বসলেন। আমি দরজার চৌকাঠে বসাতে, তিনি ইশারায় বললেন চৌকাঠে বোসো না, ঘরে এসে বসো। ইতস্তত করে ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, এই পাহাড়ে এত সাধু-সন্তদের সমাধি কেন? তিনি বললেন, এই পাহাড় অত্যন্ত পবিত্র স্থান, তপস্যার উপযুক্ত, তাই। বললাম, কেন পবিত্র? কি বৈশিষ্ট্য এই পাহাড়ের? বাঁকা বাবা হেসে বললেন, সবকিছু আজকেই জেনে ফেলতে চাও? ডিসেম্বর মাসে আমাদের উৎসব আছে, তখন এসো। সারারাত যজ্ঞ হবে, প্রসাদ খাওয়া হবে, তোমার ভাল লাগবে, আর তখন তুমি আসলে আমাদেরও ভাল লাগবে। উৎসাহিত হয়ে বললাম, নিশ্চয়ই আসব। তাঁর ফোন নাম্বারও নিয়ে রাখলাম। আরও অনেক গল্পগুজব শেষে বাঁকা বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মনে খুব উৎসাহ ছিল যে ডিসেম্বর মাসে পাক্কা যাব বাঁকা বাবার আশ্রমে।
এগুলো হল চার-পাঁচ মাসের আগের ঘটনা। রিসেন্টলি কি মনে হল, বাঁকা বাবাকে ফোন করেছিলাম। বাঁকা বাবা ফোন ধরেননি, অন্যজন ধরেছিলেন। তিনি যে কথাটা বললেন, শুনে হৃৎস্পন্দন যেন ক্ষনিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বাঁকা বাবা নাকি আর নেই। তিনি সপ্তাহখানেক আগে রাতের বেলা ঘুমের মধ্যেই মারা গিয়েছেন। সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন, রাতে খেয়ে শুয়েছিলেন, সকালে অনেক বেলাতেও না ওঠায় দ্বিতীয়জন ডাকতে গিয়ে দেখে বাঁকা বাবা তাঁর অজান্তেই রাতের বেলায় কখন জানি অমৃতলোকের পথে পাড়ি দিয়েছেন।
মনটা এত খারাপ হল এই দুঃসংবাদ শুনে, যা বলবার মত নয়। বাঁকা বাবার সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি-ভিডিওগুলি দেখে চোখে জল চলে এল। মনে হল, মানুষের জীবন সত্যিই এত ঠুনকো? ডিসেম্বর আসতে আর মাত্র তিনমাস বাকি ছিল, কিন্তু বাঁকা বাবা সেই সময়টুকুও পেলেন না! তাঁর সঙ্গে আমার মাত্র কয়েকঘন্টার পরিচয়, অথচ সেই সংক্ষিপ্ত পরিচয় মনে এত গভীর প্রভাব ফেলে গিয়েছিল, যা মানুষের সঙ্গে বহুকালের পরিচয়েও হয় না। আসলেই তাঁকে আমার খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। আর আমি জানি, ভাল মানুষেরা বেশিদিন বাঁচে না 😔
ঠিক করেছি, ডিসেম্বরে বাঁকা বাবার আশ্রমে যাব। বাঁকা বাবাকে কোথায় সমাধি দিয়েছে, দেখে আসব। আর আমার তোলা বাঁকা বাবার একটি ছবি সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে আশ্রমে দিয়ে আসব। গুরুর সমাধিমন্দিরের এককোনে শিষ্যও না হয় থাকবেন স্মৃতি হয়ে। আর আমি জানি বাঁকা বাবা যেখানেই থাকুন না কেন, আমি সেখানে গেলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন এবং খুব-খুব খুশি হবেন।