23/09/2026
যখন ছোট ছিলাম, দেশি-বিদেশী বিভিন্ন আবিষ্কারকদের কথা বইয়ে পড়ে ভাবতাম, বড় হয়ে কিছু একটা আবিষ্কার করতে হবে। নতুন কিছু, আক্ষরিক অর্থে আবিষ্কার যাকে বলে। কিন্তু কি আবিষ্কার করব? ততদিনে সবাই তো সবকিছু আবিষ্কার করেই ফেলেছে। আমেরিকা মহাদেশ থেকে আলপিন, কোনও কিছুই বাদ নেই। মহা মুশকিল। আবিষ্কারকদের উপর তখন একটু একটু রাগও হত, পাজি বুড়োগুলো, সবাই কোন আক্কেলে সবকিছু আবিষ্কার করে ফেলল? 😠 ছোটরা তাহলে এখন কি আবিষ্কার করবে?
বেশ কথা, সমস্যা নেই। নতুন কিছু নাই আবিষ্কার করা হল, যা অলরেডি আবিষ্কার হয়ে গিয়েছে সেগুলোকে নিয়েই কিছু অ্যাডভান্স চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। মা কিছুদিন ধরেই কমপ্লেইন করছিল, বাড়িতে পিঁপড়ে মারার কি একটা লিক্যুইড কিনেছে, সেটায় নাকি কোনও কাজই হচ্ছে না, অনেকবার স্প্রে করার পরেও পিঁপড়েরা যেমন কে তেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ মাথায় খেলে গেল, ইউরেকা! এই বিষয়ে কিছু আবিষ্কার করে মাকে চমকে দেওয়া যেতে পারে। একটা পোকা-মাকড় মারা বিষাক্ত তেল আবিষ্কার করব। সে এমন ভয়ঙ্কর তেল হবে যে কৌটোর ঢাকনা খুললেই পোকা-মাকড়ের দল বাঁচাও বাঁচাও করে চারিদিকে ছুটে পালাবে।
বাড়িতে আমার গোপন আড্ডায় একটা কেমিক্যাল এক্সপেরিমেন্টের ল্যাব বানিয়ে ফেললাম। আবিষ্কারের সাবজেক্ট ঠিক হয়ে গিয়েছে, ল্যাব রেডি, এবারে দরকার ইনগ্রেডিয়েন্টস্ বা উপকরণ। প্রধান উপকরণ ঠিক করে নিয়েছিলাম কেরোসিন হবে। তার সঙ্গে এটা-ওটা মিশিয়ে তৈরী হবে সেই ভয়ঙ্কর মারন তেল। মায়ের চোখ এড়িয়ে কেরোসিন তেলের ড্রাম থেকে মূল উপকরণ সংগ্রহ করা হল, দিদির সাজের বাক্স থেকে গোপনে নেলপালিশ রিমুভারের শিশি, বাথরুমের তাক থেকে টাটা নিহারের বোতল, বাড়িতে কাঠের কাজ হওয়ায় একটা কৌটোয় অর্ধেক তারপিন তেল বেঁচে ছিল, সেটা, কিছুটা সর্ষের তেল, কিছুটা লুচি ভাজার তেল, ঠাকুমার ঘর থেকে নিলাম বিছে-বোলতায় কামড়ালে ক্ষতস্থানে লাগানোর বিষহরি।
মোটামুটি বাড়িতে লিক্যুইড ফর্মে যা যা ছিল সবকিছু সংগ্রহ করে প্রবল উৎসাহে ল্যাবে সেগুলির মিশ্রন করতে বসলাম। প্রতিটা নতুন উপকরন কেরোসিনে মেশাই আর ভাবি এমন তেজস্ক্রিয় কেমিক্যাল তৈরি হচ্ছে, এইবার নিশ্চয়ই "ছ্যাঁক" করে উঠবে বা ধোঁয়াটোয়া বেরোবে। কিন্তু হতাশার চূড়ান্ত, নব্য আবিষ্কৃত মারন কেমিক্যালে তেজস্ক্রিয়তার লক্ষন বিশেষ দেখা যায় না, এদিকে উপকরনও সব মিশ্রন করা সম্পন্ন হয়েছে, আর কিছু বাকি নেই। ভাবলাম, দেখতে এমন নিস্তেজ মনে হলেও, কেমিক্যাল যে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত হয়েছে তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই, এর এক ফোঁটা গায়ে পড়লেই পিঁপড়ের দল মরে কাঠ হয়ে যাবে। এবারে প্রাকটিক্যালি পরীক্ষা করে দেখা যাক।
বাড়িতে পিঁপড়ের বাসার অভাব নেই, একটা বাসা টার্গেট করলাম। পিঁপড়ের দলকে বললাম, ভাইসকল, তোমাদের বাসা ভাঙার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু মানবজাতির ইতিহাসের এই আশ্চর্যকর গবেষনার স্বার্থে তোমাদের বলিদান দিতে হচ্ছে, ক্ষমা করে দিও বন্ধুরা আমার। ফিচিক্ ফিচিক্ করে ড্রপার দিয়ে পিঁপড়ের বাসায় ছিটিয়ে দিলাম সদ্য আবিষ্কৃত মারন কেমিক্যাল।
বাসার মাটি গলে গলে পড়ছে, পিঁপড়ের দল বিভ্রান্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে, কিন্তু তাদের কাউকে দেখেই যেন মনে হচ্ছে না তারা খুব কষ্ট পাচ্ছে। বরং যেন মনে হচ্ছে সব মহা আনন্দে ছোটাছুটি করছে। মাথাটা গরম হল। মিশ্রনটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে তলার দিকের ঘন বিষাক্ত মাল-মশলা ড্রপারে ভরলাম। একটা কেঁদো সাইজের পিঁপড়ে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল, তার ওপরে এক ড্রপ মারন কেমিক্যাল ফেললাম। বেচারা এক ড্রপের চাপেই দেখি চিঁড়েচ্যাপ্টা, হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। উৎফুল্ল হয়ে ভাবছি এই তো! আবিষ্কার সফল! মা এখন দেখে খুব খুশি হবে, সবাই ধন্যধন্য করবে, কত পুরষ্কার, নোবেল-টোবেল... উফ্!!!
সাফল্যের আনন্দটা মনে মনে সদ্য উপভোগ করতে শুরু করেছি, ইতিমধ্যে দেখি সেই হতচ্ছাড়া পিঁপড়ে কিভাবে যেন মারন কেমিক্যালের ড্রপটা পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে, সামনের পা দিয়ে শুঁড়টা পরিষ্কার নিয়ে আবার হন্তদন্ত হয়ে যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকেই রওনা দিয়েছে, যেন তার কিছুই হয়নি। চোখের সামনে নোবেলের বুদ্বুদটা ফুট্ করে ফেটে গেল, পিঁপড়েটার উপরে এমন রাগ হল, হাতে বন্দুক থাকলে ব্যাটাকে কনফার্ম গুলি করে মারতাম। মনটা ভেঙে গেল। হাতের মারন কেমিক্যালের পাত্রটা টান মেরে ফেলে দিলাম সামনের কোমর সমান উঁচু ভাঁটফুল গাছের জঙ্গলের মধ্যে। আবিষ্কারক আর বোধহয় হওয়া হল না।
একে মন খারাপ, তাতে দিদি আবার রাত্রিবেলায় ধরে ফেলল যে তার সাজের বাক্স থেকে নেলপালিশ রিমুভার মিসিং। উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমান ছাড়াই আমাকে প্রধান অভিযুক্ত করে সে মায়ের কাছে নালিশ করে এল। মা-ও পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকের মত পিঁজরাপোলের আসামীকে ধরে উত্তম-মধ্যম কয়েক ঘা দিয়ে দিলেন। রাতে আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ভাবলাম, আবিষ্কারকদের জীবনে এমন কত দুঃখ-কষ্ট আসে। ক্ষুদ্রবুদ্ধি মনুষ্য যদি এরকম বড় কিছু ভাবতে পারত, তবে তো সবাই আবিষ্কারক হয়ে যেত। যাক গিয়ে, এবারে এমন কিছু একটা আবিষ্কার করতে হবে, যাতে বাড়ির কোনও জিনিষে হাত দিতে না হয়। আর বড় হয়ে গেলে তো ঐরকম নেলপালিশ রিমুভার এক বাক্স এনে দিদির চোখের সামনে রেখে দেব, একটাও দেব না। তখন ভাই-ভাই করতে এলে...
তো যাইহোক, সে বহুকাল আগের ঘটনা। পোস্টের সঙ্গে দেওয়া ছবির সাথে এই ঘটনার কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগও নেই। কিন্তু তবুও আজ হাজার বছরের প্রাচীন এক বিস্মৃত বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসস্তূপে ভগবান বুদ্ধের এই মূর্তিটি খুঁজে পেয়ে কেন জানিনা সেই কোন ছোটবেলার কথাই মনে পড়ল। মনে হল, আজ আমি সত্যি সত্যিই এমন কিছু "আবিষ্কার" করেছি, যার খবর এই পৃথিবীর আর কেউ এখনও পর্যন্ত জানে না। একদম রিয়েল আবিষ্কার। যদিও এর মধ্যে আমার বিশেষ কৃতিত্ব নেই, ভগবান নিজেই এখানে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন, আমি তাঁকে অনুসরণ করেছি মাত্র। কিন্তু তাঁর ভরসার পাত্র যে হতে পেরেছি, এটা ভেবেই আমি আনন্দিত। আর তাঁর ভরসার পাত্র হবার জন্য যে নিজস্ব পন্থা আমি অনুসরণ করি, সেটা অবশ্যই আমার নিজের আবিষ্কার। তো সেই হিসাবে আমিও তো একজন আবিষ্কারকই হলাম, না কি? 😊