22/05/2026
এই যে ধ্বংসস্তূপ দেখছেন, এটি হল যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দির। প্রতাপাদিত্য পুরী থেকে অতি সুন্দর গোবিন্দদেবের বিগ্রহ এই বাংলায় নিয়ে এসে যশোরের গোপালপুর গ্রামে দ্বিতলবিশিষ্ট এই বিশাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আমি নিজে এই মন্দিরের সামনে কখনও যাইনি, কিন্তু আমি ৯৯% নিশ্চিত যে আমার এই অনুমান সত্য। এখন আমি কিভাবে এই মন্দিরটিকে ট্রেস্ করে খুঁজে বের করলাম, এবং কিভাবেই বা এতটা কনফিডেন্সের সঙ্গে এই মন্দির প্রতাপাদিত্যেরই প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করছি, সেই গল্পটিই আজ আপনাদের শোনাব। আর আমি এটাও জানি, এই গল্প শোনার পরে আপনিও আমার মতোই শিওর হয়ে যাবেন যে, এই মন্দির আসলেই রাজা প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তো আপনি গোয়েন্দাগিরি করবার জন্য প্রস্তুত তো? চলুন তবে শুরু করা যাক।
১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গ রেলপথের প্রচার বিভাগ থেকে "বাংলায় ভ্রমণ" নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছিল। এটি আসলে ছিল অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সম্পর্কিত রেলের একধরণের প্রচার পুস্তিকা। তবে প্রচার পুস্তিকা হলেও পাতলা, না খেতে পাওয়া টাইপের কিন্তু নয়, রীতিমতো দুই খন্ডের কেঁদো সাইজের বই। রেলের উদ্দেশ্য ছিল, এই বইয়ে তৎকালীন বাংলার ভ্রমণপিপাসু পাঠক পড়বেন পূর্ববঙ্গ রেলপথের কোন স্টেশনের আশেপাশে দেখার মতো জায়গা কি আছে, আর তারপরে হোল্ডঅল বেঁধে, ছানাপোনা নিয়ে, ট্রেনের টিকিট কেটে পাঠক বেরিয়ে পড়বেন সেইসব ঐতিহাসিক জায়গাগুলি দেখতে। সেই জায়গা দেখে পাঠক খুশ্, ট্রেনের টিকিট বেচে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে খুশ্। এই ছিল রেলের ইউনিক্ বিজনেস স্ট্র্যাটেজি। এখন রেলের সেই স্ট্র্যাটেজি কতটা ফলপ্রসূ হয়েছিল, বলতে পারি না, কারণ, এই বই প্রকাশের ৭ বছরের মধ্যেই ভারত থেকে পূর্ববঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয় এবং পূর্ববঙ্গ রেলপথের গৌরবময় অধ্যায়েরও অচিরেই পরিসমাপ্তি ঘটে।
তো যাইহোক, রেলের অ্যাকচুয়াল উদ্দেশ্যটি মাঠেই মারা গেলেও, পরবর্তীতে "বাংলায় ভ্রমণ" বইটি কিন্তু দুই বাংলার ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের কাছে রীতিমতো গবেষণার আকর গ্রন্থে পরিণত হয়। আমি যখন প্রথমবার অনলাইনে এই বইয়ের পিডিএফ ভার্সন পড়ি, তখন তো রীতিমতো অসাধারণ লেগেছিল, মুগ্ধ হয়েছিলাম। শুধু একটাই আক্ষেপ ছিল যে, অনলাইনের পিডিএফ স্ক্যানে ছবির কোয়ালিটি এত খারাপ, যে তা পাতে দেওয়া যায় না। ধরুন দেখছেন, একটি ছবির নীচে ক্যাপশন লেখা আছে "চাঁদরায়ের মন্দিরের কারুকার্য, ব্রহ্মশাসন" অথচ পিডিএফে ধ্যাবড়া কালো কালির ছবিতে সেই মন্দিরের একফোঁটা কারুকার্য বুঝতে পারে কার বাপের সাধ্যি। নদীয়া জেলার শান্তিপুরের নিকটবর্তী ব্রহ্মশাসন গ্রামের চাঁদরায়ের সেই মন্দির বর্তমানে বিলুপ্ত, আমি নিজে সেখানে গিয়ে দেখে এসেছি। অতএব, এই বইয়ের ছবিটিই সেই মন্দিরের অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ, অথচ অনলাইনের ফ্রি পিডিএফে সেই মন্দিরের ছবি আপনি কিছুই বুঝতে পারবেন না, হাত কামড়াতে ইচ্ছা করবে। আর শুধু এই মন্দিরটিই নয়, বইয়ের সব ছবিগুলিই অনলাইনের পিডিএফ ভার্সনে একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
বইটির হার্ড কপি কিনলে ছবিগুলি পরিষ্কার দেখতে পারব, এই ভেবে কলকাতার বইয়ের বাজারে খোঁজা শুরু করলাম সেই বই, সে যাকে বলে গরু খোঁজা। কলেজ স্ট্রিটের ধ্বসে পড়া বইয়ের দোকানের ধুলোমাখা তাক থেকে শুরু করে বড়বাজারের মসলার দোকানের বস্তা তুলে তার নীচে পর্যন্ত খুঁজে দেখে বুঝলাম, এই বই অন্যতম দুষ্প্রাপ্য, মেলানোই মুশকিল। বইয়ের বাজারে এই বইয়ের পুনঃমুদ্রিত দুটি আলাদা প্রকাশনার আধুনিক সংস্করণ আছে বটে, তবে তার ছবির কোয়ালিটি দেখে আমি রীতিমতো ডিসঅ্যাপয়েন্টেড্। ছবির ক্ল্যারিটি, শার্পনেস কিছুই নেই। অরিজিনাল বইটি থেকে ছবি স্ক্যান করে এই দুটি বই ছাপানো হয়েছে, একারণে প্রিন্ট কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজড্ হয়ে গিয়েছে। বইয়ে যা লেখা আছে, তা তো পড়া হয়েই গিয়েছে, আমার দরকার হাই রিজল্যুশন ছবি, নইলে আমিই বা কি দেখব আর আপনাদেরই বা কি দেখাব। এই সময়ে মনে হল, যেনতেনপ্রকারেণ এই বাংলায় ভ্রমণ বইটির অরিজিনাল কপি আমাকে যোগাড় করতেই হবে, এ্যাট এনি কস্ট্।
মন থেকে কিছু খুঁজলে তা অবশ্যই পাওয়া যায় বলেই আমি বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজির পর পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রি করেন এমন একজন বিক্রেতার মাধ্যমে হাতে পেয়ে যাই "বাংলায় ভ্রমণ" বইটির একদম অরিজিনাল লেদার বাইন্ডিং করা ১৯৪০ সালের প্রথম সংস্করণ। চড়া মূল্যে বইটি কিনলেও সেদিন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো মনের অবস্থা হয়েছিল। হ্যাঁ, এখন আমি হাতে ধরা বইয়ের পাতায় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম যে, ব্রহ্মশাসন গ্রামের চাঁদরায়ের সেই অধুনাবিলুপ্ত মন্দিরটি আসলেই কেমন দেখতে ছিল। আর সেই অদৃষ্টকে দেখতে পাওয়ার আনন্দের কাছে চড়া দামে বই কেনার বেদনা তো নিতান্তই তুচ্ছ।
যাইহোক, বইটিতে অবিভক্ত বাংলার অসংখ্য বিলুপ্ত, অজানা মন্দিরের সন্ধান পেলেও, আজ আমরা আলোচনা করব শুধুমাত্র যশোর জেলায় প্রতাপাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দিরটি নিয়ে। বাংলায় ভ্রমণ বইটির প্রথম খন্ডের ২২৯ পৃষ্ঠায় এই মন্দির সম্পর্কে লেখা রয়েছে:
"ঈশ্বরীপুর হইতে ৩ মাইল দূরে গোপালপুর গ্রামে প্রতাপাদিত্য ৪টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন বলে কথিত; ইহাদের ৩টি একেবারে পড়িয়া গিয়াছে এবং চতুর্থটির নীচের তলা কিছু দাঁড়াইয়া আছে; এই মন্দিরের উপর তলায় প্রতাপাদিত্য পুরী হইতে অতি সুন্দর গোবিন্দ বিগ্রহ আনিয়া স্থাপন করিয়াছিলেন। বল্লভাচার্য্য নামক একজন ওড়িয়া ব্রাহ্মণকে এই বিগ্রহের সেবার জন্য তিনি সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলেন। বিগ্রহটি এখন ঈশ্বরীপুর হইতে ৫ মাইল পশ্চিমে কাটুনিয়া গ্রামে আছে। এই গ্রামে প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত বংশীয় কয়েক ঘরের বাস আছে।
উপরিউক্ত তথ্যটি জানতে পেরে মনটা উৎসুক হল এই মন্দির ও গোবিন্দদেবের বিগ্রহ সম্পর্কে আরও জানতে। খুলে বসলাম সতীশচন্দ্র মিত্রের "যশোহর খুলনার ইতিহাস" বইটি। ইন্টারেস্টিংলি এই বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডের চতুর্ব্বিংশ পরিচ্ছেদের নামই হল "প্রতাপাদিত্যের উড়িষ্যাভিযান ও বিগ্রহ-প্রতিষ্ঠা"। এই পরিচ্ছেদে ১৫৯০ সালে প্রতাপাদিত্যের ওড়িশায় গমন ও পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধ, সেখান থেকে বলপূর্ব্বক গোবিন্দদেবের বিগ্রহ সংগ্রহ, বাংলায় ফিরে যশোরে গোবিন্দদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ডিটেইল ইতিহাস, গোবিন্দদেবের অপূর্ব বিগ্রহের ছবি মায় উৎকল দেশ থেকে আসা সেই ওড়িয়া পূজারীর বংশতালিকা পর্যন্ত পেয়ে গেলাম। এই পর্যায়ে এসে মনে হল, গোবিন্দদেবের মন্দিরের নাড়িনক্ষত্রও এখন আমি জেনে ফেলেছি। আর সে কি ইতিহাস রে বাবা! গোবিন্দদেবের বিগ্রহ কার জিম্মায় থাকবে তাই নিয়ে মনে হয় কয়েকশো বছর ধরে নানা রাজপরিবার, জমিদার বংশ আর সেই ওড়িয়া পূজারী ব্রাহ্মণের বংশধরদের মধ্যে লড়াই চলেছে। সেই লড়াই আইন-আদালত থেকে শুরু করে লাঠালাঠি পর্যন্তও গিয়েছে।
তো যাইহোক, এই বইয়ের লেখক সতীশচন্দ্র যখন গোবিন্দদেবের মন্দির দেখতে যান (১৯১০ সাল নাগাদ), ততদিনে মন্দির প্রাঙ্গনের চারটি মন্দিরের মধ্যে তিনটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাঁর দেখা সেই মন্দিরের বর্ণনা নিম্নরূপ:
"ধুমঘাট দূর্গ হইতে তিন মাইল উত্তরে দক্ষিন-বাহিনী যমুনার পশ্চিম কূলে গোপালপুর নামক স্থানে গোবিন্দদেব বিগ্রহের জন্য মন্দির নির্মিত হয়। মন্দির একটি নহে, চত্বরের চারিধারে চারিটি উচ্চ মন্দির নির্মিত হইয়াছিল; উহার মধ্যে কেবল মাত্র পূর্ব পোতার মন্দিরটি ভগ্নাবস্থায় দন্ডায়মান আছে, অপর তিন পোতার মন্দিরগুলি ভাঙিয়া পড়িয়া প্রাঙ্গন জুড়িয়া স্তূপীকৃত হইয়া রহিয়াছে। সে তিনটি মন্দিরে অন্য কোন বিগ্রহ ছিল কি না, বা তাহা কি কার্যে ব্যবহৃত হইত, তাহা জানিবার উপায় নাই। যে মন্দিরটি দন্ডায়মান আছে, তাহার চূড়া নাই; উহার গুম্বজ বা চূড়া ছিল কি না, তাহাও বলা যায় না। তবে মন্দিরটি দোতালা; নিম্ন তালায় পূজাগৃহ ও তাহার পার্শ্ব দিয়া সিঁড়ি আছে; উপর তালায় ঠাকুরের শয়নগৃহ ছিল। এখনও মন্দিরের যতটুকু খাড়া আছে, তাহার উচ্চতা ৩০ ফুট হইবে। মন্দিরের গায়ে দেবদেবীর মূর্তি ও কারুকার্যের পরিচয় এখন ও আছে। কোন শিলা বা ইষ্টক লিপি নাই; হয়ত যাহা ছিল, তাহা নষ্ট বা অপহৃত হইয়াছে।"
সতীশচন্দ্রের লেখায় যে ইন্টারেস্টিং বিষয়গুলি জানলাম, তা হল; প্রতাপাদিত্য মোগলদের সমর্থনে উড়িষ্যায় গিয়েছিলেন পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। সেই সময়ে পাঠানেরা ওড়িশা দখল করে জগন্নাথ মন্দির কব্জা করে ফেলেছিল, মন্দিরের পূজাপাঠ সব বন্ধ করে দিয়েছিল। ওড়িশা দখলের পর পাঠান বাহিনী কটক, জলেশ্বর হয়ে বিষ্ণুপুরের রাজা বীর হাম্বীরের রাজ্য আক্রমন করলে, হাম্বীর বিপদ বুঝে মানসিং ও প্রতাপাদিত্যের কাছে সাহায্য চান। প্রতাপাদিত্য তাঁর জ্যেঠু বসন্ত রায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে, হাম্বীরকে বিপদমুক্ত করতে ও জগন্নাথ মন্দির পাঠানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বাছা বাছা সৈন্য নিয়ে ওড়িশায় অভিযান চালান। প্রতাপাদিত্যর ওড়িশা গমনকালে বসন্ত রায় তাঁর কাছে উৎকল দেশ থেকে একটি গোবিন্দ বিগ্রহ নিয়ে আসবার জন্য আবদার করেন। প্রতাপাদিত্য ওড়িশা থেকে ফিরে আসবার সময় সম্ভবত সেখানকার কোনও রাজা বা জমিদার বংশের পূজিত গোবিন্দদেবের বিগ্রহটি বলপূর্ব্বক সংগ্রহ করেন ও সেই বিগ্রহের সেবায়েতকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নিজের সঙ্গে যশোরে নিয়ে আসেন। বসন্ত রায় গোবিন্দদেবের দিব্যোজ্জ্বল শ্রীবিগ্রহ দেখে আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। যশোরের গোপালপুরে মহা ধুমধামের সঙ্গে গোবিন্দদেবের মন্দির-সহ মোট চারটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হল। গোবিন্দদেবের দ্বিতল মন্দিরের নীচের তলায় ছিল পূজার আয়োজন, দোতলায় দেবতার শয়নের ব্যবস্থা। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে লক্ষাধিক সাধু-সন্তদের সমাগম ঘটে এই অঞ্চলে, দশদিনব্যাপী সেই আনন্দ-অনুষ্ঠান চলে। সেই সময়ে গোবিন্দদেবকে নিয়ে যশোরবাসী এমন মেতে উঠেছিল যে, ওড়িশার মোগল-পাঠান চলমান যুদ্ধের কথা সকলে যেন ভুলেই গিয়েছিল।
"যশোর খুলনার ইতিহাস" বইয়ে গোবিন্দদেবের মন্দির সম্পর্কিত অংশগুলি তারিয়ে তারিয়ে পড়া শেষ হলে ইন্টারনেটে খুঁজতে থাকলাম, যদি এই মন্দির সম্পর্কে আর কিছু তথ্য পাওয়া যায়। উইকিপিডিয়ার বাংলা ভার্সনে একটি ছোট আর্টিকেল পেলাম "গোবিন্দদেবের মন্দির ঢিবি" নামে। সেখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে লেখা হয়েছে "গোবিন্দদেবের মন্দির ঢিবি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একটি পুরাকীর্তি। শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গোপালপুর ঘোষপাড়ায় এই মন্দির ঢিবি অবস্থিত। রাজা প্রতাপাদিত্য উড়িষ্যা বিজয়ের সময় গোবিন্দদেবের বিগ্রহটি এনেছিলেন এবং তাঁর কাকা বসন্ত রায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে মোট চারটি মন্দির ছিল। মন্দিরগুলি ১৫৭৭ থেকে ১৫৯৫ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে জঙ্গলাকীর্ণ এই স্থানে চারটি মন্দিরের মধ্যে একটি ছাদহীন অবস্থায় মাটির ঢিবির মত দাঁড়িয়ে আছে।"
এই আর্টিকেলটি পড়ে বুঝতে অসুবিধা হল না যে, বইয়ে আমি যা পড়ছি, এখানে প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের সেই মন্দিরের কথাই বলা হচ্ছে। এখান থেকে মন্দিরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও মোটামুটি একটি ধারণা পেলাম। যা বোঝা যাচ্ছে, সাতক্ষীরা জেলার ঈশ্বরীপুরের ৪ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ডের কাছে, যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ের গোপালপুর-ঘোষপাড়া গ্রামের কোথাও এই মন্দির অবস্থিত। এবারে গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে খুঁজে বের করলাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে যমুনা নদী খুঁজে না পেলেও, দেখলাম গোপালপুর ঘোষপাড়া নামের একটি গ্রাম সেখানে রয়েছে। সেই গ্রামের আশেপাশে জুম্ করে খুঁজতেই, বিঙ্গো! গোবিন্দদেবের মন্দির ভিটা নামে একটি জায়গা সেখানে মার্ক করা রয়েছে। বিভিন্ন মানুষেরা সেখানে সেই ভগ্ন মন্দিরের ছবি-ভিডিও আপলোড করে রেখেছেন। ভাল করে সেইসব ছবি-ভিডিও খুঁটিয়ে দেখে বুঝলাম, এই সেই যশোহররাজ প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। সেই আপলোডেড ছবির মধ্যে থেকে একটি ছবি, যেটি জনৈক শাজ্জাদুর রশিদ মহাশয় ২০২৪ সালে আপলোড করেছেন, সেই ছবিটি আপনাদের দেখার জন্য এখানে শেয়ার করলাম।
এই যে দেখছেন, এই হল প্রতাপাদিত্যের সেই মন্দির, যার গল্প আপনাদের এতক্ষন ধরে শোনালাম। এই ধ্বসে পড়ে মন্দিরের প্রতিটি ইঁটে জড়িয়ে রয়েছে বিক্রমাদিত্য, প্রতাপাদিত্য, বসন্ত রায়, চাঁদ রায়ের ইতিহাস। দেখুন নিজের চোখে, আমাদের গর্বের ইতিহাসের কি করুণ পরিনতি। হায়রে প্রতাপাদিত্য আর তার সাধের মন্দির! আমি ভাবি, জীবদ্দশায় সে কি কখনও দুঃস্বপ্নেও এমনটা ভাবতে পেরেছিল? আর গোবিন্দদেবকেও বলিহারি! তোমার মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে এত আনন্দ-উৎসব, উচ্ছাস, তোমার দখল নিয়ে এত মারামারি, কাটাকাটি, আর তার শেষ পরিণতি এই? দোতলা মন্দিরের নীচের তলায় পূজা নিয়ে, রাজার হালে ওপর তলায় গিয়ে শয়ন গ্রহণ করা ঠাকুর তুমি, আজ একবার চোখ মেলে দেখেছ তোমার সেই মন্দিরের দশাটা কি হয়েছে? একবারও ভেবেছ, যারা তোমায় নিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করত, ভক্তির আতিশয্যে তোমায় মাতিয়ে রাখত, তাঁদের অবস্থাটা শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল? দেশভাগ হওয়ার পরে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে তাঁরা কোন চুলোয় গিয়ে মরেছিল? জানি ভাবনি। মাঝেমাঝে তোমার ওপর খুব রাগ হয়, বুঝলে?