Temples with Atanu

Temples with Atanu Exploring the World's Most Spectacular Temples!
(3)

এই যে ধ্বংসস্তূপ দেখছেন, এটি হল যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দির। প্রতাপাদিত্য পুরী থেকে অতি সুন্...
22/05/2026

এই যে ধ্বংসস্তূপ দেখছেন, এটি হল যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দির। প্রতাপাদিত্য পুরী থেকে অতি সুন্দর গোবিন্দদেবের বিগ্রহ এই বাংলায় নিয়ে এসে যশোরের গোপালপুর গ্রামে দ্বিতলবিশিষ্ট এই বিশাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমি নিজে এই মন্দিরের সামনে কখনও যাইনি, কিন্তু আমি ৯৯% নিশ্চিত যে আমার এই অনুমান সত্য। এখন আমি কিভাবে এই মন্দিরটিকে ট্রেস্ করে খুঁজে বের করলাম, এবং কিভাবেই বা এতটা কনফিডেন্সের সঙ্গে এই মন্দির প্রতাপাদিত্যেরই প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করছি, সেই গল্পটিই আজ আপনাদের শোনাব। আর আমি এটাও জানি, এই গল্প শোনার পরে আপনিও আমার মতোই শিওর হয়ে যাবেন যে, এই মন্দির আসলেই রাজা প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তো আপনি গোয়েন্দাগিরি করবার জন্য প্রস্তুত তো? চলুন তবে শুরু করা যাক।

১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গ রেলপথের প্রচার বিভাগ থেকে "বাংলায় ভ্রমণ" নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছিল। এটি আসলে ছিল অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সম্পর্কিত রেলের একধরণের প্রচার পুস্তিকা। তবে প্রচার পুস্তিকা হলেও পাতলা, না খেতে পাওয়া টাইপের কিন্তু নয়, রীতিমতো দুই খন্ডের কেঁদো সাইজের বই। রেলের উদ্দেশ্য ছিল, এই বইয়ে তৎকালীন বাংলার ভ্রমণপিপাসু পাঠক পড়বেন পূর্ববঙ্গ রেলপথের কোন স্টেশনের আশেপাশে দেখার মতো জায়গা কি আছে, আর তারপরে হোল্ডঅল বেঁধে, ছানাপোনা নিয়ে, ট্রেনের টিকিট কেটে পাঠক বেরিয়ে পড়বেন সেইসব ঐতিহাসিক জায়গাগুলি দেখতে। সেই জায়গা দেখে পাঠক খুশ্, ট্রেনের টিকিট বেচে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে খুশ্। এই ছিল রেলের ইউনিক্ বিজনেস স্ট্র্যাটেজি। এখন রেলের সেই স্ট্র্যাটেজি কতটা ফলপ্রসূ হয়েছিল, বলতে পারি না, কারণ, এই বই প্রকাশের ৭ বছরের মধ্যেই ভারত থেকে পূর্ববঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয় এবং পূর্ববঙ্গ রেলপথের গৌরবময় অধ্যায়েরও অচিরেই পরিসমাপ্তি ঘটে।

তো যাইহোক, রেলের অ্যাকচুয়াল উদ্দেশ্যটি মাঠেই মারা গেলেও, পরবর্তীতে "বাংলায় ভ্রমণ" বইটি কিন্তু দুই বাংলার ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের কাছে রীতিমতো গবেষণার আকর গ্রন্থে পরিণত হয়। আমি যখন প্রথমবার অনলাইনে এই বইয়ের পিডিএফ ভার্সন পড়ি, তখন তো রীতিমতো অসাধারণ লেগেছিল, মুগ্ধ হয়েছিলাম। শুধু একটাই আক্ষেপ ছিল যে, অনলাইনের পিডিএফ স্ক্যানে ছবির কোয়ালিটি এত খারাপ, যে তা পাতে দেওয়া যায় না। ধরুন দেখছেন, একটি ছবির নীচে ক্যাপশন লেখা আছে "চাঁদরায়ের মন্দিরের কারুকার্য, ব্রহ্মশাসন" অথচ পিডিএফে ধ্যাবড়া কালো কালির ছবিতে সেই মন্দিরের একফোঁটা কারুকার্য বুঝতে পারে কার বাপের সাধ্যি। নদীয়া জেলার শান্তিপুরের নিকটবর্তী ব্রহ্মশাসন গ্রামের চাঁদরায়ের সেই মন্দির বর্তমানে বিলুপ্ত, আমি নিজে সেখানে গিয়ে দেখে এসেছি। অতএব, এই বইয়ের ছবিটিই সেই মন্দিরের অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ, অথচ অনলাইনের ফ্রি পিডিএফে সেই মন্দিরের ছবি আপনি কিছুই বুঝতে পারবেন না, হাত কামড়াতে ইচ্ছা করবে। আর শুধু এই মন্দিরটিই নয়, বইয়ের সব ছবিগুলিই অনলাইনের পিডিএফ ভার্সনে একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

বইটির হার্ড কপি কিনলে ছবিগুলি পরিষ্কার দেখতে পারব, এই ভেবে কলকাতার বইয়ের বাজারে খোঁজা শুরু করলাম সেই বই, সে যাকে বলে গরু খোঁজা। কলেজ স্ট্রিটের ধ্বসে পড়া বইয়ের দোকানের ধুলোমাখা তাক থেকে শুরু করে বড়বাজারের মসলার দোকানের বস্তা তুলে তার নীচে পর্যন্ত খুঁজে দেখে বুঝলাম, এই বই অন্যতম দুষ্প্রাপ্য, মেলানোই মুশকিল। বইয়ের বাজারে এই বইয়ের পুনঃমুদ্রিত দুটি আলাদা প্রকাশনার আধুনিক সংস্করণ আছে বটে, তবে তার ছবির কোয়ালিটি দেখে আমি রীতিমতো ডিসঅ্যাপয়েন্টেড্। ছবির ক্ল্যারিটি, শার্পনেস কিছুই নেই। অরিজিনাল বইটি থেকে ছবি স্ক্যান করে এই দুটি বই ছাপানো হয়েছে, একারণে প্রিন্ট কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজড্ হয়ে গিয়েছে। বইয়ে যা লেখা আছে, তা তো পড়া হয়েই গিয়েছে, আমার দরকার হাই রিজল্যুশন ছবি, নইলে আমিই বা কি দেখব আর আপনাদেরই বা কি দেখাব। এই সময়ে মনে হল, যেনতেনপ্রকারেণ এই বাংলায় ভ্রমণ বইটির অরিজিনাল কপি আমাকে যোগাড় করতেই হবে, এ্যাট এনি কস্ট্।

মন থেকে কিছু খুঁজলে তা অবশ্যই পাওয়া যায় বলেই আমি বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজির পর পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রি করেন এমন একজন বিক্রেতার মাধ্যমে হাতে পেয়ে যাই "বাংলায় ভ্রমণ" বইটির একদম অরিজিনাল লেদার বাইন্ডিং করা ১৯৪০ সালের প্রথম সংস্করণ। চড়া মূল্যে বইটি কিনলেও সেদিন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো মনের অবস্থা হয়েছিল। হ্যাঁ, এখন আমি হাতে ধরা বইয়ের পাতায় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম যে, ব্রহ্মশাসন গ্রামের চাঁদরায়ের সেই অধুনাবিলুপ্ত মন্দিরটি আসলেই কেমন দেখতে ছিল। আর সেই অদৃষ্টকে দেখতে পাওয়ার আনন্দের কাছে চড়া দামে বই কেনার বেদনা তো নিতান্তই তুচ্ছ।

যাইহোক, বইটিতে অবিভক্ত বাংলার অসংখ্য বিলুপ্ত, অজানা মন্দিরের সন্ধান পেলেও, আজ আমরা আলোচনা করব শুধুমাত্র যশোর জেলায় প্রতাপাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দিরটি নিয়ে। বাংলায় ভ্রমণ বইটির প্রথম খন্ডের ২২৯ পৃষ্ঠায় এই মন্দির সম্পর্কে লেখা রয়েছে:

"ঈশ্বরীপুর হইতে ৩ মাইল দূরে গোপালপুর গ্রামে প্রতাপাদিত্য ৪টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন বলে কথিত; ইহাদের ৩টি একেবারে পড়িয়া গিয়াছে এবং চতুর্থটির নীচের তলা কিছু দাঁড়াইয়া আছে; এই মন্দিরের উপর তলায় প্রতাপাদিত্য পুরী হইতে অতি সুন্দর গোবিন্দ বিগ্রহ আনিয়া স্থাপন করিয়াছিলেন। বল্লভাচার্য্য নামক একজন ওড়িয়া ব্রাহ্মণকে এই বিগ্রহের সেবার জন্য তিনি সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলেন। বিগ্রহটি এখন ঈশ্বরীপুর হইতে ৫ মাইল পশ্চিমে কাটুনিয়া গ্রামে আছে। এই গ্রামে প্রতাপাদিত্যের খুল্লতাত বংশীয় কয়েক ঘরের বাস আছে।

উপরিউক্ত তথ্যটি জানতে পেরে মনটা উৎসুক হল এই মন্দির ও গোবিন্দদেবের বিগ্রহ সম্পর্কে আরও জানতে। খুলে বসলাম সতীশচন্দ্র মিত্রের "যশোহর খুলনার ইতিহাস" বইটি। ইন্টারেস্টিংলি এই বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডের চতুর্ব্বিংশ পরিচ্ছেদের নামই হল "প্রতাপাদিত্যের উড়িষ্যাভিযান ও বিগ্রহ-প্রতিষ্ঠা"। এই পরিচ্ছেদে ১৫৯০ সালে প্রতাপাদিত্যের ওড়িশায় গমন ও পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধ, সেখান থেকে বলপূর্ব্বক গোবিন্দদেবের বিগ্রহ সংগ্রহ, বাংলায় ফিরে যশোরে গোবিন্দদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ডিটেইল ইতিহাস, গোবিন্দদেবের অপূর্ব বিগ্রহের ছবি মায় উৎকল দেশ থেকে আসা সেই ওড়িয়া পূজারীর বংশতালিকা পর্যন্ত পেয়ে গেলাম। এই পর্যায়ে এসে মনে হল, গোবিন্দদেবের মন্দিরের নাড়িনক্ষত্রও এখন আমি জেনে ফেলেছি। আর সে কি ইতিহাস রে বাবা! গোবিন্দদেবের বিগ্রহ কার জিম্মায় থাকবে তাই নিয়ে মনে হয় কয়েকশো বছর ধরে নানা রাজপরিবার, জমিদার বংশ আর সেই ওড়িয়া পূজারী ব্রাহ্মণের বংশধরদের মধ্যে লড়াই চলেছে। সেই লড়াই আইন-আদালত থেকে শুরু করে লাঠালাঠি পর্যন্তও গিয়েছে।

তো যাইহোক, এই বইয়ের লেখক সতীশচন্দ্র যখন গোবিন্দদেবের মন্দির দেখতে যান (১৯১০ সাল নাগাদ), ততদিনে মন্দির প্রাঙ্গনের চারটি মন্দিরের মধ্যে তিনটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাঁর দেখা সেই মন্দিরের বর্ণনা নিম্নরূপ:

"ধুমঘাট দূর্গ হইতে তিন মাইল উত্তরে দক্ষিন-বাহিনী যমুনার পশ্চিম কূলে গোপালপুর নামক স্থানে গোবিন্দদেব বিগ্রহের জন্য মন্দির নির্মিত হয়। মন্দির একটি নহে, চত্বরের চারিধারে চারিটি উচ্চ মন্দির নির্মিত হইয়াছিল; উহার মধ্যে কেবল মাত্র পূর্ব পোতার মন্দিরটি ভগ্নাবস্থায় দন্ডায়মান আছে, অপর তিন পোতার মন্দিরগুলি ভাঙিয়া পড়িয়া প্রাঙ্গন জুড়িয়া স্তূপীকৃত হইয়া রহিয়াছে। সে তিনটি মন্দিরে অন্য কোন বিগ্রহ ছিল কি না, বা তাহা কি কার্যে ব্যবহৃত হইত, তাহা জানিবার উপায় নাই। যে মন্দিরটি দন্ডায়মান আছে, তাহার চূড়া নাই; উহার গুম্বজ বা চূড়া ছিল কি না, তাহাও বলা যায় না। তবে মন্দিরটি দোতালা; নিম্ন তালায় পূজাগৃহ ও তাহার পার্শ্ব দিয়া সিঁড়ি আছে; উপর তালায় ঠাকুরের শয়নগৃহ ছিল। এখনও মন্দিরের যতটুকু খাড়া আছে, তাহার উচ্চতা ৩০ ফুট হইবে। মন্দিরের গায়ে দেবদেবীর মূর্তি ও কারুকার্যের পরিচয় এখন ও আছে। কোন শিলা বা ইষ্টক লিপি নাই; হয়ত যাহা ছিল, তাহা নষ্ট বা অপহৃত হইয়াছে।"

সতীশচন্দ্রের লেখায় যে ইন্টারেস্টিং বিষয়গুলি জানলাম, তা হল; প্রতাপাদিত্য মোগলদের সমর্থনে উড়িষ্যায় গিয়েছিলেন পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। সেই সময়ে পাঠানেরা ওড়িশা দখল করে জগন্নাথ মন্দির কব্জা করে ফেলেছিল, মন্দিরের পূজাপাঠ সব বন্ধ করে দিয়েছিল। ওড়িশা দখলের পর পাঠান বাহিনী কটক, জলেশ্বর হয়ে বিষ্ণুপুরের রাজা বীর হাম্বীরের রাজ্য আক্রমন করলে, হাম্বীর বিপদ বুঝে মানসিং ও প্রতাপাদিত্যের কাছে সাহায্য চান। প্রতাপাদিত্য তাঁর জ্যেঠু বসন্ত রায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে, হাম্বীরকে বিপদমুক্ত করতে ও জগন্নাথ মন্দির পাঠানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বাছা বাছা সৈন্য নিয়ে ওড়িশায় অভিযান চালান। প্রতাপাদিত্যর ওড়িশা গমনকালে বসন্ত রায় তাঁর কাছে উৎকল দেশ থেকে একটি গোবিন্দ বিগ্রহ নিয়ে আসবার জন্য আবদার করেন। প্রতাপাদিত্য ওড়িশা থেকে ফিরে আসবার সময় সম্ভবত সেখানকার কোনও রাজা বা জমিদার বংশের পূজিত গোবিন্দদেবের বিগ্রহটি বলপূর্ব্বক সংগ্রহ করেন ও সেই বিগ্রহের সেবায়েতকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নিজের সঙ্গে যশোরে নিয়ে আসেন। বসন্ত রায় গোবিন্দদেবের দিব্যোজ্জ্বল শ্রীবিগ্রহ দেখে আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। যশোরের গোপালপুরে মহা ধুমধামের সঙ্গে গোবিন্দদেবের মন্দির-সহ মোট চারটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হল। গোবিন্দদেবের দ্বিতল মন্দিরের নীচের তলায় ছিল পূজার আয়োজন, দোতলায় দেবতার শয়নের ব্যবস্থা। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে লক্ষাধিক সাধু-সন্তদের সমাগম ঘটে এই অঞ্চলে, দশদিনব্যাপী সেই আনন্দ-অনুষ্ঠান চলে। সেই সময়ে গোবিন্দদেবকে নিয়ে যশোরবাসী এমন মেতে উঠেছিল যে, ওড়িশার মোগল-পাঠান চলমান যুদ্ধের কথা সকলে যেন ভুলেই গিয়েছিল।

"যশোর খুলনার ইতিহাস" বইয়ে গোবিন্দদেবের মন্দির সম্পর্কিত অংশগুলি তারিয়ে তারিয়ে পড়া শেষ হলে ইন্টারনেটে খুঁজতে থাকলাম, যদি এই মন্দির সম্পর্কে আর কিছু তথ্য পাওয়া যায়। উইকিপিডিয়ার বাংলা ভার্সনে একটি ছোট আর্টিকেল পেলাম "গোবিন্দদেবের মন্দির ঢিবি" নামে। সেখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে লেখা হয়েছে "গোবিন্দদেবের মন্দির ঢিবি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একটি পুরাকীর্তি। শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে গোপালপুর ঘোষপাড়ায় এই মন্দির ঢিবি অবস্থিত। রাজা প্রতাপাদিত্য উড়িষ্যা বিজয়ের সময় গোবিন্দদেবের বিগ্রহটি এনেছিলেন এবং তাঁর কাকা বসন্ত রায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে মোট চারটি মন্দির ছিল। মন্দিরগুলি ১৫৭৭ থেকে ১৫৯৫ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে জঙ্গলাকীর্ণ এই স্থানে চারটি মন্দিরের মধ্যে একটি ছাদহীন অবস্থায় মাটির ঢিবির মত দাঁড়িয়ে আছে।"

এই আর্টিকেলটি পড়ে বুঝতে অসুবিধা‌ হল না যে, বইয়ে আমি যা পড়ছি, এখানে প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের সেই মন্দিরের কথাই বলা হচ্ছে। এখান থেকে মন্দিরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও মোটামুটি একটি ধারণা পেলাম। যা বোঝা যাচ্ছে, সাতক্ষীরা জেলার ঈশ্বরীপুরের ৪ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ডের কাছে, যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ের গোপালপুর-ঘোষপাড়া গ্রামের কোথাও এই মন্দির অবস্থিত। এবারে গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে খুঁজে বের করলাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে যমুনা নদী খুঁজে না পেলেও, দেখলাম গোপালপুর ঘোষপাড়া নামের একটি গ্রাম সেখানে রয়েছে। সেই গ্রামের আশেপাশে জুম্ করে খুঁজতেই, বিঙ্গো! গোবিন্দদেবের মন্দির ভিটা নামে একটি জায়গা সেখানে মার্ক করা রয়েছে। বিভিন্ন মানুষেরা সেখানে সেই ভগ্ন মন্দিরের ছবি-ভিডিও আপলোড করে রেখেছেন। ভাল করে সেইসব ছবি-ভিডিও খুঁটিয়ে দেখে বুঝলাম, এই সেই যশোহররাজ প্রতাপাদিত্য প্রতিষ্ঠিত গোবিন্দদেবের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। সেই আপলোডেড ছবির মধ্যে থেকে একটি ছবি, যেটি জনৈক শাজ্জাদুর রশিদ মহাশয় ২০২৪ সালে আপলোড করেছেন, সেই ছবিটি আপনাদের দেখার জন্য এখানে শেয়ার করলাম।

এই যে দেখছেন, এই হল প্রতাপাদিত্যের সেই মন্দির, যার গল্প আপনাদের এতক্ষন ধরে শোনালাম। এই ধ্বসে পড়ে মন্দিরের প্রতিটি ইঁটে জড়িয়ে রয়েছে বিক্রমাদিত্য, প্রতাপাদিত্য, বসন্ত রায়, চাঁদ রায়ের ইতিহাস। দেখুন নিজের চোখে, আমাদের গর্বের ইতিহাসের কি করুণ পরিনতি। হায়রে প্রতাপাদিত্য আর তার সাধের মন্দির! আমি ভাবি, জীবদ্দশায় সে কি কখনও দুঃস্বপ্নেও এমনটা ভাবতে পেরেছিল? আর গোবিন্দদেবকেও বলিহারি! তোমার মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে এত আনন্দ-উৎসব, উচ্ছাস, তোমার দখল নিয়ে এত মারামারি, কাটাকাটি, আর তার শেষ পরিণতি এই? দোতলা মন্দিরের নীচের তলায় পূজা নিয়ে, রাজার হালে ওপর তলায় গিয়ে শয়ন গ্রহণ করা ঠাকুর তুমি, আজ একবার চোখ মেলে দেখেছ তোমার সেই মন্দিরের দশাটা কি হয়েছে? একবারও ভেবেছ, যারা তোমায় নিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করত, ভক্তির আতিশয্যে তোমায় মাতিয়ে রাখত, তাঁদের অবস্থাটা শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল? দেশভাগ হওয়ার পরে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে তাঁরা কোন চুলোয় গিয়ে মরেছিল? জানি ভাবনি। মাঝেমাঝে তোমার ওপর খুব রাগ হয়, বুঝলে?

বিহারের বোধগয়া থেকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুব্বাগড় নামক এক গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে আজ দুপুরে ...
18/05/2026

বিহারের বোধগয়া থেকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুব্বাগড় নামক এক গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে আজ দুপুরে পাওয়া গেল বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তিসহ একটি বহু প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। দুব্বাগড় নামটি অনেকে বলেন বুদ্ধগড় থেকে অপভ্রংশ হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া অনেকদিন আগে থেকেই এখানে খননকার্য পরিচালনা করছে। এর আগেও এখান থেকে অনেক মাটি চাপা পড়ে থাকা মূর্তি, ভোটিভ স্তূপ ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সেই তালিকায় সংযোজিত হল এই তিনটি মূর্তি।

17/05/2026

গৌড় বাংলার হাবসি শাসক ফিরোজ শাহের বিজয়স্তম্ভ (ফিরোজ মিনার), গৌড়, মালদা।
এই ২৫.৬ মিটার (৮৪ ফুট) উঁচু এবং পাঁচটি তলাবিশিষ্ট মিনারটি ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনীয় শাসক সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। কুতুব মিনারের মতোই এই মিনারটিও একটি বিজয়স্তম্ভ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। মিনারটির সংলগ্ন একটি মসজিদ ছিল, যা বর্তমানে আর অক্ষত নেই।

গতকাল, অর্থাৎ ১২ই মে মঙ্গলবার, বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের চেংটিয়া মধ্যপাড়ার "বড় আন্...
13/05/2026

গতকাল, অর্থাৎ ১২ই মে মঙ্গলবার, বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের চেংটিয়া মধ্যপাড়ার "বড় আন্ধার" নামক এক বহু প্রাচীন পুষ্করিণী সংস্কারের সময় উদ্ধার করা হয় মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার এই প্রাচীন মূর্তিটি। পুকুর সংস্কারের কাজে নিযুক্ত শ্রমিক ফজলুল হক্ জেসিবি মেশিন দিয়ে পুকুরের মাটি খোঁড়ার সময় মাটির নীচ থেকে উঠে আসে আনুমানিক আড়াই ফুট উচ্চতার কালো পাথরের মূর্তিটি। তিনি স্থানীয়দের বিষয়টি জানালে মুহূর্তেই চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মূর্তিটি একঝলক দেখতে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। খবর পেয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং মূর্তিটি তাদের হেফাজতে নেন। পুকুরের মালিক রুহুল আমীন জানান, ১৬ বিঘা আয়তনের এই প্রাচীন পুকুর থেকে এর আগেও একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। এবার একই পুকুর থেকে এই দুর্গামূর্তি পাওয়া গেল। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কারো কারোর মতে, সম্ভবত এখানে প্রাচীন কোনও মন্দির ছিল। দেবী দুর্গার এই মূর্তি ও আগে পাওয়া বিষ্ণুমূর্তিটি হয়তো সেই মন্দিরেই পূজিত হত। সেই প্রাচীন মন্দির কোনওভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে মূর্তিগুলি মাটি চাপা পড়ে।

** আমার দুঃখ একটাই যে, বাঙালী জাতির আসল গৌরবের ইতিহাস চাপা পড়ে রইল এমন এক শত্রুভাবাপন্ন দেশে, যেখানে আমার সাধ্য থাকলেও হয়তো প্রতিকূল পরিবেশের কারণে আর কোনওদিনও সেখানে গিয়ে স্বাধীনভাবে সেই ইতিহাসের চর্চা করতে পারব না। ঠিক যেমনভাবে ইচ্ছা হলেই যেতে পারব না পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বা আফগানিস্তানের প্রাচীনতম মেস আয়নাক্ বৌদ্ধবিহারের সামনে, ঠিক তেমনি। আমাদের বাপ-ঠাকুরদা, চৌদ্দ পুরুষের ইতিহাস, আমাদের ভগবান বুদ্ধের ইতিহাস, এই সবকিছুই আজ দখল হয়ে গিয়েছে। নিরীহ আমরা কিছুই বলিনি, অথচ সেই দখলদারেরাই আজকে আমাদের দু'চক্ষু পেড়ে দেখতে পারে না। ভাবতেই অবাক লাগে যে, এই সব দেশগুলি এককালে অখন্ড ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এনিওয়ে, প্রণাম নিও মা দুর্গা। তোমায় নিজের চোখে দেখতে না পারার দুঃখে বেচারাদের দুটো কটুকথা বলে ফেললাম, আপন সন্তান ভেবে ক্ষমা করে দিও মা 🙏

মহারাষ্ট্রের অজন্তা-ইলোরার মতো পূর্ব ভারতের সবচাইতে প্রাচীন ফ্রেসকো পেইন্টিং রয়েছে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সীতাবিঞ্জি গ...
09/05/2026

মহারাষ্ট্রের অজন্তা-ইলোরার মতো পূর্ব ভারতের সবচাইতে প্রাচীন ফ্রেসকো পেইন্টিং রয়েছে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সীতাবিঞ্জি গ্রামের এক পাহাড়ে। একটি সূত্র থেকে তথ্যটি জানতে পেরে ভীষনরকমই অবাক হয়েছিলাম। ফ্রেসকো পেইন্টিং হল একধরনের প্রাচীন অঙ্কন কৌশল যেখানে পাথরের দেওয়ালে ভেজা চুনের স্তরের ওপরে বিভিন্ন খনিজ রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করে ছবি আঁকা হত। এই পদ্ধতিতে আঁকা ছবির রঙ শুকিয়ে গেলে পাথরের দেওয়ালের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হত, যার ফলে দীর্ঘকাল এই ছবি পাথরের গায়ে টিঁকে থাকতে পারত। অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রগুলি হল ভারতবর্ষের মোটামুটি অক্ষত থাকা ফ্রেসকো পেইন্টিংয়ের অন্যতম উদাহরণ।

অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্র বিখ্যাত এবং সর্ব্বজনবিদিত। কিন্তু বাড়ির পাশেই যে ঠিক অজন্তার মতোই ১৪০০-১৫০০ বছরের প্রাচীন ফ্রেসকো পেইন্টিং রয়েছে, এই খবরটি এতদিন অজানা ছিল ভেবে নিজেই নিজের ওপর আশ্চর্য হই। তদন্ত করে দেখলাম, কথা সত্য বটে। ওড়িশার কেওনঝড়ের কাছে সত্যিই এরকম এক অতি প্রাচীন গুহাচিত্র রয়েছে। এখন জানতে যখন পেরেছি, নিজের চোখে একবার না দেখলে কি হয়? অতএব, বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়লাম সেই অজানা সীতাবিঞ্জি গ্রামের উদ্দেশ্যে। কি দেখলাম সেখানে পৌঁছে? সেই গল্পই বলব আজ। সঙ্গের ছবিটি আমার দেখা সেই ফ্রসকো পেইন্টিংয়ের। এখানে যে ছবিটি দেওয়া হল, তা দেখে আপাতদৃষ্টিতে আপনি হয়তো কিছুই ভালোভাবে বুঝতে পারবেন না, কিন্তু আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, তাই যদি আপনাকে ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারি, তবে আপনিও এই অতি প্রাচীন অস্পষ্ট চিত্রটির মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারবেন বলেই আমি বিশ্বাস করি।

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সীতাবিঞ্জি একটি জঙ্গলাকীর্ণ আদিবাসী অধ্যুসিত আধা-পাহাড়ি জনপদ। কেওনঝড় থেকে আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত সীতাবিঞ্জি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে "সীতা" নামক একটি সুন্দর নদী। এই নদীর দুইপাশে অসংখ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত টেরাকোটা ইঁটের স্থাপত্য দেখা যায়। কিছু ঐতিহাসিক দাবী করেন, এখানেই ছিল চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং বর্ণিত "পুষ্পগিরি" বৌদ্ধবিহার। যদিও এই দাবীর স্বপক্ষে তেমন পোক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে এই স্থান যে গুপ্তযুগেরও আগে থেকে উন্নত মনুষ্যজাতির আবাসস্থল রূপে পরিচিত ছিল, তার বহু নিদর্শন এই সীতাবিঞ্জি গ্রামের আশেপাশে আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটাই উঁচুতে হওয়ায়, খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে গিয়ে বারবার কান ব্লক হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছিল কানে কিছু শুনতে পারছি না। বাতাসের চাপের পরিবর্তন হলে এমনটা হয়। দেখবেন, প্লেন যখন টেক-অফ করে তখন এরকম কান বন্ধ হয়ে যায়। হাত দিয়ে নাক বন্ধ করে ভিতর থেকে জোরে কানের ওপরে উল্টো বায়ুর চাপ সৃষ্টি করলে ফট্ করে আবার কান খুলে যায়। হাস্যকর মনে হলেও এভাবেই কান খুলতে খুলতে উঠতে থাকলাম পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। দুপাশের দৃশ্যপট অতীব মনোরম। বিশাল বিশাল শালগাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চড়াইয়ে উঠে গিয়েছে রাস্তা। এত ঘন সেই জঙ্গল যে ভরদুপুরেও নীচে সূর্যের আলো ঠিকঠাক এসে পৌঁছয় না। নীচের দিকে সবসময় রোদহীন থাকায় হঠাৎ ওপরের দিকে তাকালে মনে হয় উঁচু শালগাছের জঙ্গলের মাথায় কে যেন গলিত সোনা ঢেলে দিয়েছে। অপূর্ব মায়াবী সেই দৃশ্য। প্রকৃতিও যে এত সুন্দর হতে পারে, সীতাবিঞ্জির এই পাহাড়ি পথে না এলে বোধকরি তা আমার কাছে অজানাই রয়ে যেত। চারিদিকের এই সৌন্দর্যের মধ্যে আবার একটু আপদও রয়েছে। দশ হাত পরপর দেখি বোর্ড লাগানো "সাবধান! জংলী হাতি চলাচলের পথ, গাড়ি আস্তে চালান"। মানে, একদিকে হেব্বি আনন্দ হচ্ছে প্রকৃতি দেখে, আবার অন্যদিকে ভয়ে ভয়ে দুদিকে তাকাচ্ছি, শুঁড় উঁচিয়ে দু-একটা দাঁতাল বুনো হাতি এদিকে তেড়ে এলেই তো হয়েছে কম্ম সারা। জঙ্গলের মাথার গলিত সোনা তখন স্বর্গের কার্ণিশ থেকে উঁকি দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতে হবে 😁

যাইহোক, ম্যাপ অনুসরন করে লোকেশনে পৌঁছে দেখলাম, শুনশান একটি জায়গায় একটি অদ্ভুতদর্শন পাহাড়কে ঘিরে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পাঁচিল। গেটের পাশে একটি বোর্ডে লেখা রয়েছে "ফ্রেসকো পেইন্টিং, সীতাবিঞ্জি"। গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে অদ্ভুত পাহাড়টির দিকে এগোলাম। পাহাড় বলছি বটে, কিন্তু এটি আসলে একটি সিঙ্গেল মোনোলিথিক্ পাথর। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন একটি ১০০ ফুট উঁচু ডাইনোসরের ডিম কিভাবে জানি জমে পাথর হয়ে গিয়েছে। এমনই মসৃণ তার গা যে, তা বেয়ে ওপরে ওঠা প্রায় অসম্ভব। জায়গাটিতে কেমন যেন একটি আদিম ভাব রয়েছে। এখানে দুপুরবেলাতেই একধরণের ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছিল যেমনটি আমি আগে কখনও শুনিনি। এত তীব্র আর জোরালো ঝিঁঝিঁর ডাক আমাদের এদিকে শোনা যায় না। কখনও কখনও সেই শব্দতরঙ্গ এত জোরালো যে রীতিমতো ভয় লেগে যায়। ভালো করে শুনে মনে হল, ঝিঁঝিঁপোকাগুলি যেন গাছের ওপর থেকে ডাকছে। এটিও অদ্ভুত লাগল, কারণ আমাদের এদিকে ঝিঁঝিঁপোকা ঝোপে-মাটিতে থাকে, উঁচু-উঁচু শালগাছের মাথায় আবার কোন্ ঝিঁঝিঁপোকা থাকে এমন তো কস্মিনকালেও দেখিনি! আর সেই আওয়াজের ডেপথ্ শুনলে মনে হয় পোকাগুলি নিশ্চয়ই কেঁদো-কেঁদো সাইজের হবে, নইলে এত জোরে ডাকে কি করে? আমি যদি হৈঃ করে জোরে চিৎকার করি, সবাই একসাথে চুপ করে যায়। আবার ধীরে ধীরে একটি-দুটি করে, সবাই মিলে একসাথে গগনবিদারী শব্দে ঝিঁ-ঝিঁ করতে থাকে। সেই আওয়াজের ঠেলায় কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় যেন মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে।

তো যাইহোক, সেই ডাইনোসরের ডিমের মতো আকৃতির পাথরটির চারপাশে অনেক খুঁজেও পেইন্টিংটি না পেয়ে, এমন কাউকে খুঁজতে লাগলাম যার কাছে পথের হদিশ জিজ্ঞাসা করা যায়। কিন্তু সেই পান্ডববর্জিত জায়গায় কাউকেই চোখে পড়ে না। অগত্যা নিরুপায় হয়ে ঘন জঙ্গল আর উঁচু উঁচু পাথরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। কিছুটা পথ এগোতেই চোখে পড়ল একটি ছোট ঘর, তার সামনে আমার দিকে পিছন করে একজন লোক বসে রয়েছে। লোকটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা, এখানে সেই পাথরের গায়ে আঁকা ছবিটি কোথায় রয়েছে? তিনি পিছন ঘুরে তাকাতে লক্ষ্য করলাম তাঁর গলায় আই.ডি কার্ড ঝুলছে। বুঝলাম, ইনি ASI-এর কর্মী আর এই ঘরটি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের সাইট অফিস। ভদ্রলোক অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন সেই পেইন্টিং কোথায় রয়েছে। সেইসঙ্গে এখানে দেখার মত আর কি কি রয়েছে সেগুলিও জানালেন এবং সেই জায়গাগুলিতে পৌঁছনোর সঠিক পথনির্দেশও তিনি বলে দিলেন।

এবারে বুঝলাম, এখানে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার জায়গা ASI-দ্বারা সংরক্ষিত। এই বিশাল ঘেরা জায়গাটিতে সেই ফ্রেসকো পেইন্টিং ছাড়াও আরও বেশকিছু ইন্টারেস্টিং জিনিষ রয়েছে। যেমন, একটি গুপ্তযুগের জটাজুটধারী চতুর্মুখ শিবলিঙ্গ, সেই শিবলিঙ্গের সামনে রয়েছে দারুণ একটি পাথরের হাতি, যেটি আবার দেখতে অনেকটি উদয়গিরি-খন্ডগিরি পাহাড়ের যেখানে অশোকের শিলালিপি রয়েছে, তার পাশে থাকা বিখ্যাত হাতিটির মতো। একটি জায়গায় ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলি পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন শিলালিপি। গবেষণায় জানা গিয়েছে, এগুলি আসলে প্রাচীনকালের শৈবভক্তদের নাম। সম্ভবত এই স্থান গুপ্তযুগ থেকে শৈবতীর্থরূপে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সময়কালে সেই তীর্থস্থানে আসা প্রাচীন শৈবভক্তেরা তাঁদের নাম এইসব পাথরে খোদাই করে রেখেছিলেন।

ভদ্রলোকের কাছে পথনির্দেশ পেয়ে সেই ডাইনোসরের ডিম পিছনে ফেলে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। আন্দাজ প্রায় ৭০০ মিটার এগিয়ে চোখে পড়ল আরেকটি অদ্ভুতদর্শন প্রস্তরখন্ড। একটি নয়, আসলে দুটি পাথর। একটির ওপরে আরেকটি পাথর এমনভাবে রয়েছে, যেন মনে হয় একটি ছাতা কেউ অর্ধেক খুলে রেখেছে। এই পাথরটির স্থানীয় নাম হল "রাবনছায়া" বা রাবণের ছাতা। রাবণ আবার এখানে কোথা থেকে এল! তাই তো? এখানেই ট্যুইস্ট। এই সীতাবিঞ্জি জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের একটি কাহিনী, বলা ভাল, রামায়ণের কাহিনীর ওড়িয়া আদিবাসী ভার্সন। সেই ভার্সন অনুযায়ী, দেবী সীতা যখন বনবাসে গিয়েছিলেন, তখন তিনি এই অঞ্চলে এসে বসবাস করেছিলেন এবং এখানেই না কি লব-কুশের জন্ম হয়েছিল। সেই থেকে এই জায়গার নাম হয়েছে সীতাবিঞ্জি বা সীতার আবাসস্থল। দেবী সীতার স্মৃতিতেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম হয়েছে "সীতা"। এই ASI সাইট থেকে সামান্য দূরত্বে সীতাদেবীর একটি মন্দির রয়েছে, স্থানীয়রা সেই স্থানটিকে লব-কুশের জন্মস্থান বলে দাবী করেন। তবে এই দাবীর সত্যতা নিয়ে অবশ্যই সংশয় রয়েছে। সীতাদেবী এখানে বসবাস করেছিলেন কি না তার ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও, গুপ্তযুগ থেকে এই স্থান যে শৈবতীর্থরূপে প্রসিদ্ধ ছিল, জটাধারী চতুর্মুখ শিবলিঙ্গের উপস্থিতি ও আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা পাথরে শৈবভক্তদের প্রাচীন নামের অসংখ্য শিলালিপি থেকে তা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়।

রাবনছায়া নামক আধখোলা ছাতার মত পাথরটির নীচের অংশে রয়েছে একটি সুপ্রাচীন ফ্রেসকো পেইন্টিং। পেইন্টিং এমন জায়গায় যে, নীচে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে ওপরের দিকে তাকালে তবেই সেটি দেখা যায়। ASI এখানে একটি লোহার সিঁড়ি দেওয়া প্লাটফর্ম এমনভাবে, এমন ডিসট্যান্সে বানিয়ে রেখেছে, যার ওপরে উঠলে আপনি পেইন্টিংটি ভালোভাবে দেখতে পারবেন, তবে হাত দিয়ে ছুঁতে পারবেন না। অসাধারণ শিল্পকর্মটির অধিকাংশই সময়ের নিষ্ঠুর আঘাতে নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তবুও যেটুকু অক্ষত রয়েছে তার থেকেই এখনও সবকিছু বুঝে নেওয়া যায়। এটি আসলে একটি রাজকীয় শোভাযাত্রার দৃশ্য। এখানে দেখা যাচ্ছে একজন রাজা সুসজ্জিত হাতির পিঠে বসে রাজপথ দিয়ে চলেছেন। রাজামশাইয়ের মাথায় একজন নীচ থেকে রাজছত্র ধরে রেখেছে। যে ছাতা ধরে রয়েছে, তার পিছনে একজন রমণীকে দেখা যায়, যে অনেকটা আগেকার দিনের মেয়েরা যেরকম স্টাইলে পুকুরঘাটে বাসন নিয়ে যেত, সেরকমভাবে দুই হাত একদিকে দিয়ে একটি বরণডালা ধরে রয়েছে (উইকিপিডিয়া বলছে মেয়েটি চামর ধরে রয়েছে, কিন্তু আমার তো ডালাই মনে হয়েছে, যদিও এইধরণের অন্যান্য ছবির সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয় চামর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী)। রাজার হাতির সামনে রয়েছে একজন অশ্বারোহী সৈনিক। অশ্বটি স্পষ্ট বোঝা গেলেও বেচারা আরোহী মহাকালের কোপে পড়ে কবে জানি উধাও হয়েছেন। অশ্বারোহীর সামনে দেখা যায় কয়েকজন পদাতিক সৈন্য। পায়ের সংখ্যা গুনে আমার মনে হয়েছে এখানে ছয়জন পদাতিক সৈন্য রয়েছে। চিত্রের ওপরের দিকে সংস্কৃতে না কি লেখা আছে "মহারাজা শ্রীদিশাভঞ্জ"। যদিও এই লিপিটি আমি চিত্রের মধ্যে কোথাও খুঁজে পাইনি, তবে ব্রিটিশ আমল থেকে গবেষকেরা একথা বলছেন যখন, তখন তাঁরা ঠিকই বলছেন ধরে নেওয়া যেতে পারে। হয়তো আগে আরও স্পষ্ট ছিল এখন অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। গবেষকেরা অনুমান করেন মহারাজা দিশা ভঞ্জ হলেন ময়ূরভঞ্জের বিখ্যাত ভঞ্জ রাজবংশের আদিপুরুষ, যিনি চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। এই ফ্রেসকো পেইন্টিংয়ও সেই সময়কালেই, অর্থাৎ আজ থেকে ১৪০০-১৫০০ বছর আগে আঁকা হয়েছিল।

তো মোটামুটি এই হল সীতাবিঞ্জির সেই ফ্রেসকো পেইন্টিংয়ের বর্ণনা। ছবি দেখে জানি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, তবুও ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখলে হয়তো কিছুটা বুঝতে পারবেন। এইধরণের নির্জন রিমোট জায়গায় এত প্রাচীন অসাধারণ একটি চিত্র এত বছর আগে যে শিল্পী এঁকেছিলেন তাঁর শিল্পদক্ষতা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। চিত্রটির সঙ্গে অজন্তার গুহাচিত্রের আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য রয়েছে। ছবিটি ছাদের মধ্যে আঁকা, তার মানে সেই অজ্ঞাত শিল্পী এই ছাদের নীচে একটি প্লাটফর্ম বানিয়ে তার ওপরে শুয়ে এই ছবিটি এঁকেছিলেন। ASI-এর তৈরী আজকের এই জং ধরা, সিঁড়ির রেলিংয়ের হাতল ভাঙা উঁচু প্লাটফর্মটির ওপরে দাঁড়িয়ে ছবিটি এত কাছে থেকে এত ভালোভাবে দেখা যায় যে, বহু প্রাচীন সেই রাজকীয় শোভাযাত্রার দৃশ্যের প্রতিটি চরিত্র যেন জীবন্ত মনে হয়। হাতির পিঠে বসা রাজা তো মনে হয় যেন হাসিমুখে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। মনোযোগ দিয়ে শুনলে, জঙ্গলের ঝিঁঝিঁর আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা যায় বহু মানুষের পদশব্দ, রাজহস্তির বৃংহন, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহনকারী নর-নারীদের কলধ্বনি। হঠাৎ মনে হয়, সবকিছু যেন আমার সামনে এই মুহুর্তেই ঘটছে। আর আমি টাইম ট্রাভেল করে ২০২৬ সাল থেকে কিভাবে যেন চলে এসেছি সুদূর অতীতের এক রাজকীয় শোভাযাত্রার সামনে। অদ্ভুত প্রাচীন মানুষদের দেখছি। বিচিত্র তাঁদের ভাষা, ততোধিক বিচিত্র তাঁদের বেশভূষা। আমি তাঁদের হাঁ করে দেখছি, তাঁরাও আমাকে আশ্চর্য হয়ে দেখছে। শোভাযাত্রার একেবারে শেষের দিকে থাকা বরণডালা হাতে মেয়েটির সঙ্গে চোখাচোখি হতে সে তো লজ্জাই পেয়ে গেল, আমার অবস্থাও তথৈবচ। সেই অনুভূতি এতটিই রিয়্যালিস্টিক যে মনে হয়, একটু অসতর্ক হলেই শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লোকেদের সঙ্গে আমার ধাক্কা লেগে যাবে নয়তো রাজহস্তি হুড়মুড় করে আমার ওপর দিয়েই চলে যাবে।

যদিও কালের প্রকোপে চিত্রের বেশীরভাগটিই অস্পষ্ট, তবে কল্পনার রঙ মেশাতে পারলে সেখানে আপনি সম্পূর্ণ দৃশ্যটিই কিন্তু পরিষ্কার দেখতে পারবেন। আমি রিকমেন্ড করব, অন্তত একটিবার এখানে এসে নিজের চোখে দেখে যাবেন এই প্রাচীন শোভাযাত্রার দৃশ্যটি। এই চিত্রের সামনে দাঁড়ালে অতীতের সেই মহান শিল্পীদের শিল্পকুশলতা আপনাকে যে বিস্ময়াভিভূত করবে, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই।

(বাই দ্য ওয়ে, ছবিটি ঠিকভাবে দেখতে হলে মোবাইল ক্লকওয়াইজ ৯০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে দেখুন। ছবিতে শোভাযাত্রা আমার সামনের দিক থেকে আসছে।)

03/05/2026

ঝাড়খন্ড রাজ্যের পশ্চিম সিংভূম জেলার সদর শহর চাঁইবাসা থেকে আনুমানিক ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে বেণীসাগর নামক এক বিশাল জলাশয়। কথিত আছে রাজা বেণু এই জলাশয় খনন করিয়ে সেখানে অনেকগুলি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে অনেক আশ্চর্য জিনিষ দেখে এসেছি আজ। এখানে দেখুন সপ্তসুর সৃষ্টিকারী একটি প্রস্তরখন্ড। ঠিকমতো বাজাতে পারলে সম্পূর্ণ সা-রে-গা-মা বাজানো যায়।

আজ সকালে মালদহ জেলার গাজোলের শাহজাদপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ভালুকডাঙা গ্রামে চামারদীঘি নামক এক প্রাচীন পুকুর সংস্কারের সময়...
29/04/2026

আজ সকালে মালদহ জেলার গাজোলের শাহজাদপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ভালুকডাঙা গ্রামে চামারদীঘি নামক এক প্রাচীন পুকুর সংস্কারের সময় মাটির নীচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। মূর্তিটি একটি পচে যাওয়া কাঠের বাক্সের মধ্যে ছিল। মূর্তির পাশে আরও কয়েকটি চৌকোনো প্রস্তরফলক পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে ধ্যানমগ্ন কোনও দেবতার মূর্তিও খোদাই করা রয়েছে। পুকুরের মালিক জয়দেব রায় ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা মূর্তিটির পূজা শুরু করবার উদ্যোগ নিলে, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মূর্তিটি থানায় নিয়ে যায়।

আদর্শ হিন্দু হোটেলের হাজারী ঠাকুর রানাঘাটের পালচৌধুরীদের এই জোড়া শিবমন্দিরের পিছনের রাস্তা দিয়ে চূর্ণী নদীর ধারে বিড়ি...
24/04/2026

আদর্শ হিন্দু হোটেলের হাজারী ঠাকুর রানাঘাটের পালচৌধুরীদের এই জোড়া শিবমন্দিরের পিছনের রাস্তা দিয়ে চূর্ণী নদীর ধারে বিড়ি খেতে আসতেন।
😁
হাস্যকর মনে হচ্ছে? কিন্তু হাস্যকর মনে হওয়াটা উচিত নয়। হাজারী ঠাকুর কাল্পনিক চরিত্র হলেও রানাঘাট শহরটা তো বাস্তব। বিভূতিভূষণ কিন্তু এই বাস্তবিক রানাঘাট শহরটিকে চাক্ষুষ করেই তাঁর কালজয়ী গল্পটি লিখেছিলেন। গল্পে আমরা পড়ি, হাজারী ঠাকুর চূর্ণী নদীর ধারে বিড়ি খেতে আসতেন, এদিকে রানাঘাটের জমিদার পালচৌধুরীদের এই জোড়ামন্দিরও চূর্ণীর ধারে। আবার মোটামুটি রানাঘাট রেল-বাজারের দিক থেকে চূর্ণী নদীর দিকে আসার রাস্তার পাশে, ঘাটের কাছেই এই মন্দিরের অবস্থান। সুতরাং ভেবে নিতে অসুবিধা কোথায় যে বেচু চক্কত্তির হোটেল থেকে বেরিয়ে হাজারী ঠাকুর এই পথ ধরেই চূর্ণীর ধারে বিড়ি টানতে আসতেন। তাহলেই বরং হাজারী ঠাকুর চরিত্রটিকে আরও বেশী রিয়্যালিস্টিক মনে হয়।

রানাঘাটের জমিদার পালচৌধুরীদের চূর্ণী নদীর দিকে মুখ করা ভগ্ন প্রাসাদের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কল্পনা করতে পারছিলাম, ওই যেন লাল গামছা কাঁধে হাজারী ঠাকুর আনমনে হেঁটে গেলেন নদীর দিকে। জোড়ামন্দিরের পিছনের রাস্তা দিয়ে এসে বাঁদিকে ঘুরে পালচৌধুরীদের নহবৎখানার পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি নদীর ঘাটের দিকে গিয়েছে, সেই রাস্তার মোড়ে বাঁক নিয়ে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। আমি জানি, এখন যদি নদীর ঘাটে যাই, দেখতে পারব পালচৌধুরীদের বাঁধাঘাটের পাশে নদীর যে বাঁকটিতে ঝুপসি হয়ে থাকা বুনো কুল আর অমলতাসের জঙ্গলে জড়াজড়ি করে রয়েছে, সেই নির্জন বাঁকটির মুখে জলের ওপর ঝুঁকে পড়া নিমগাছের ছায়ায় বসে হাজারী ঠাকুর উদাস মুখে চূর্ণীর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ওপারে শান্তিপুর যাবার কাঁচা সড়ক, ব্যস্ত যাত্রীরা খেয়াঘাটে নদী পারাপার করছে (যদিও সেই কাঁচা সড়ক এখন চার লেনের NH 12 এবং চূর্ণীর ওপরে ব্রীজ হয়ে যাওয়ায় খেয়া পারাপারের পালাও বহুকাল পূর্ব্বেই ঘুচেছে)। এই জায়গাটিতে বসতে হাজারী ঠাকুরের বেশ লাগে। এখানে বসে সে নিজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে যায়। সে নিজে একটা হোটেল খুলবে। হোটেলের বাইরে লেখা থাকবে-
হাজারি চক্রবর্তীর হিন্দু-হোটেল, রানাঘাট
ভদ্রলোকদের সস্তায় আহার ও বিশ্রামের স্থান।
আসুন ! দেখুন ! পরীক্ষা করুন !!!

আসলে বিভূতিভূষণের লেখা পড়লে হাজারী ঠাকুরের আমলের রানাঘাটের একটি ছবি মনশ্চক্ষে ভেসে ওঠে, আর সেখানে আমি আজও সবকিছু যেন ইনট্যাক্ট খুঁজে পাই। সেই রানাঘাট স্টেশন, সেই আদর্শ হিন্দু হোটেল, চূর্ণী নদীর ধারের ঠাকুরবাড়ি, রাধাবল্লভ-তলার নাটমন্দির, চূর্ণীর ওপারে শান্তিপুর যাবার কাঁচা সড়ক, খেয়া নৌকায় লোকজন পারাপার করছে, গ্রামের বাঁশবন, শিমুলগাছ, মাঠ, কলাই ক্ষেত, গাবভেরেন্ডার বেড়াঘেরা গৃহস্থ-বাড়ী, স-ব-কি-ছু।

রানাঘাট শহর কিন্তু খুব প্রাচীন নয়। অতি প্রাচীনকালে এখানে অনেকগুলি খরস্রোতা নদীর প্রবাহ ছিল। সেগুলি এখনও রানাঘাটের আশেপাশে বাচকোর খাল, হাঙরের খাল ইত্যাদি নামে প্রায় নালা-নর্দমার মতো হয়ে বেঁচে রয়েছে। একটি উদাহরণ দিচ্ছি, শিয়ালদহের দিক থেকে কৃষ্ণনগরের দিকে যেতে ট্রেন রানাঘাট রথতলা রেলগেট পার করলেই দেখবেন ঝমঝম শব্দ করে একটি খুব ছোট ব্রীজ পার করছে। ঐ ব্রীজের নীচে যে নর্দমার মতো জলের ধারা দেখা যায়, তা হল এককালের খরস্রোতা বাচকো নদীর মরা খাত। এর ঠিক পাশেই রয়েছে রানাঘাট ফরেস্ট। অর্থাৎ বোঝা যায়, বাচকো নদীর তীরে এককালে ছিল গহীন অরণ্য। সেই অরণ্যবেষ্টিত নদীর বাঁকে বাঁকে ডাকাতেরা ওঁত পেতে থাকত, নিরীহ নৌকাযাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সবকিছু লুটে নেবার উদ্দেশ্যে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, নদীয়ার রাজা রঘুরামের আমলে (১৬৫০-১৭২৮) এখানে রণা নামের এক কুখ্যাত ডাকাতের ঘাঁটি ছিল। সেই রণা ডাকাতের ঘাঁটি থেকেই রানাঘাট নামের উৎপত্তি। আবার আরেকটি মত অনুযায়ী, নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে তাঁর ছোটরাণীর নামে এই জায়গার নাম হয় রাণীঘাট, অপভ্রংশে রানাঘাট। রানাঘাটের কাছে নোকাড়ি নামে একটি জায়গা আছে। নোকাড়ি কথাটি আসলে হল নৌকাড়ি বা নৌকার আড়ি। বর্তমানে নোকাড়িতে নদীর "ন" খুঁজে না পাওয়া গেলেও ইতিহাস বলে, এককালে এই নোকাড়ি অনেক বড় গঞ্জ ছিল। নদীপারের গঞ্জ অনেকটা রেলওয়ের জংশন স্টেশনের মতো। বিভিন্ন দিকের কানেক্টিং ট্রেন যে স্টেশনে এসে থামে, রেলের ক্ষেত্রে সেটা জংশন। আর বিভিন্ন দিকের নৌকা যে ঘাটে এসে থামে, নদীর ক্ষেত্রে সেটা গঞ্জ। নোকাড়িও এককালে এরকম অনেকগুলি বড় নদীর কানেক্টিং পয়েন্ট ছিল। কথিত আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার নদীপথে কৃষ্ণনগর থেকে শ্রীনগর যাচ্ছিলেন (একে আবার কাশ্মীরের শ্রীনগর ভাববেন না, এই শ্রীনগর নদীয়ার চাকদহের কাছে, নদীয়ার রাজাদের এককালের রাজধানী)। পথে নোকাড়িতে এক অতীব সুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যাকে নদীতে স্নান করতে দেখে কৃষ্ণচন্দ্র মুগ্ধ হন এবং তাঁকে বিবাহ করে কনিষ্ঠা রাণীর মর্যাদা দেন। সেই কনিষ্ঠা রাণীর ঘাট বা রাণীঘাট নাম থেকেই না কি আজকের রানাঘাট নামের উৎপত্তি।

তো যাইহোক, ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের আঁকা পুরোনো মানচিত্রে রানাঘাটের অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ১৭৫৭ সালে জেমস রেনেলের আঁকা মানচিত্রে দেখা যায় রানাঘাটের নাম খুব ছোট অক্ষরে লেখা, তুলনায়, শিবনিবাস, কৃষ্ণনগর, শ্রীনগর ইত্যাদি জায়গাগুলির নাম বড় অক্ষরে। অর্থাৎ, সেই সময় রানাঘাটের তুলনায় নদীয়া জেলার এই স্থানগুলি অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে রানাঘাট বিখ্যাত হয় এখানকার বাসিন্দা জনৈক কৃষ্ণপান্তির কারণে। এই কৃষ্ণপান্তি ছিলেন রানাঘাটের বিখ্যাত পালচৌধুরী জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। রানাঘাট শহর নির্ম্মাণে পালচৌধুরীদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। শোনা যায়, অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান কৃষ্ণপান্তি মাত্র একটি আধুলী সম্বল করে ব্যবসা শুরু করেন ও ভাগ্যলক্ষীর কৃপায় অচিরেই তৎকালীন বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ ধনী হয়ে ওঠেন।

মার্কুইস হেস্টিংস একবার রানাঘাটে এসে কৃষ্ণপান্তির বিশাল প্রাসাদ, অগনিত ঘোড়সওয়ার বাহিনী, অতুল ঐশ্বর্য্য দেখে মোহিত হন। হেস্টিংস কৃষ্ণপান্তিকে রাজা উপাধি প্রদান করতে চাইলে, তিনি তা স্বাভাবিক সরলতায় প্রত্যাখ্যান করেন এবং নদীয়ার রাজাদের দেওয়া চৌধুরী উপাধি গভর্নমেন্টকে দিয়ে অনুমোদিত করিয়ে নেন। সেই সময় থেকে তাঁরা পালচৌধুরী নামে পরিচিত হন। কৃষ্ণপান্তিরা তিনভাই ছিলেন; কৃষ্ণচন্দ্র, শম্ভুচন্দ্র ও নিধিরাম। ছোটভাই নিধিরাম সারাজীবন নানারকম রোগে ভুগে কর্মে অক্ষম হয়ে গিয়েছিলেন। নিধিরামের বড়দা কৃষ্ণচন্দ্র ও মেজদা শম্ভুচন্দ্রই মূলত ব্যবসা, জমিদারী ইত্যাদির দেখভাল করতেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর মৃত্যুকালে ভাই শম্ভুচন্দ্রের পরামর্শে সব সম্পত্তি দুই ভাগ করে নিয়ে, ছোট ভাই নিধিরামকে সেই সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত করেন। এইখান থেকে শুরু হয় পালচৌধুরী এস্টেটের পতন। কৃষ্ণচন্দ্রের মৃত্যু হলে, নিধিরামের পুত্র বৈদ্যনাথ সম্পত্তির ভাগ দাবী করে সুপ্রীম কোর্টে মামলা করেন। ১৮২১ সালে শুরু হওয়া সেই সর্ব্বধ্বংসী মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে পালচৌধুরীদের বিরাট জমিদারীর অধিকাংশই বিক্রি হয়ে যায়। পালচৌধুরী ভাইদের সম্পত্তির বন্টনজনিত এই গোলমাল রানাঘাটে "বৈদ্যনাথী হাঙ্গামা" নামে পরিচিত ছিল।

রানাঘাটের চূর্ণী নদীর তীরে পালচৌধুরীদের বিরাট জমিদারবাড়ি ছিল। মার্কুইস হেস্টিংস এই রাজপ্রাসাদসম ভবন দেখেই বিমোহিত হয়েছিলেন। যদিও এখন সেই বাড়ির সামান্য অংশই অক্ষত রয়েছে। ছবিতে যে দেওয়ালটিতে হেলান দিয়ে রয়েছি, সেটি হল পালচৌধুরীদের জমিদারবাড়ির প্রবেশপথের দেওয়াল। আমার সামনের দিকে রয়েছে কিছুটা ফাঁকা জায়গা, তারপরে চূর্ণী নদী। ফাঁকা জায়গাটি এখন একটি ক্লাবের মাঠ। ক্লাবের নাম হ্যাপি ক্লাব। আপনি যদি কখনও পালচৌধুরীদের জমিদারবাড়ি ও মন্দির দেখতে আসেন, তবে স্টেশন থেকে টোটোওয়ালাকে বলতে হবে, হ্যাপি ক্লাবের মাঠে যাব। পালচৌধুরীদের মন্দির বললে কতজন টোটোওয়ালা চিনবেন, সন্দেহ আছে। আশেপাশে উঁচু উঁচু বাড়ি হয়ে যাওয়ায় মেইন রাস্তা থেকে এই জমিদারবাড়ি বা মন্দির কোনওটিই এখন আর দেখা যায় না। যাইহোক, আমার ডানদিকে যে মন্দিরদুটি দেখা যাচ্ছে, কৃষ্ণপান্তির মেজভাই শম্ভুচন্দ্র ১৮১৮ সালে সেগুলি প্রতিষ্ঠা করেন বলে শোনা যায়। মন্দিরদুটিতে বড় সাইজের দুটি কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ রয়েছে। মন্দিরের সামনের দেওয়ালে সুদৃশ্য টেরাকোটা অলঙ্করণ দেখা যায়।

পালচৌধুরীদের রাজপ্রাসাদসম ভবনের ধ্বংসাবশেষ, নহবৎখানা, মন্দির ইত্যাদি দেখলে আজও সেই অতুল ঐশ্বর্য্যের কিছুটা অনুভব করা যায়। জমিদারবাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এখানেই এককালে হেস্টিংস এসে দাঁড়িয়েছিলেন, মুগ্ধ হয়েছিলেন পালচৌধুরীদের সাদর অভ্যর্থনায়। সময় আজ সেই স্মৃতি জনমানস থেকে মুছে ফেলেছে, কিন্তু যারা জানেন, তাঁরা আজও পালচৌধুরীদের ভেঙে পড়া সেই প্রাসাদের দেওয়াল হাত দিয়ে ছুঁলে অনুভব করতে পারবেন সেই অতীত বৈভবের জৌলুস, অনুভব করতে পারবেন সেখানে কৃষ্ণপান্তির অশরীরি উপস্থিতি। ছোটভাই অসুস্থ নিধিরামকে বিপুল সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত করে তিনি যে অপরাধ করেছিলেন, বোধকরি কৃষ্ণচন্দ্রের আত্মা আজও সেই দুঃখে মরমী হয়ে ভেঙে পড়া প্রাসাদের অলিতে-গলিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে মরে। ছাদ থেকে খসে পড়া ইঁটের পাঁজার ভেতর দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করে যে বাতাস বয়ে চলে, কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শুনলে মনে হয় তা যেন ভাগ্যলক্ষীর বিপর্যয়ে পর্যদুস্ত এক দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদারের আত্মবিলাপ। নির্জন ভগ্ন প্রাসাদে দাঁড়িয়ে সেই বিলাপ শুনলে মন কেমন যেন করে। এক অদ্ভুত মন খারাপের অনুভূতি আচ্ছন্ন করে ফেলে।

যাবেন একদিন রানাঘাটে, নিজের চোখে দেখে আসবেন পালচৌধুরীদের স্মৃতি। একমাত্র তাহলেই বুঝতে পারবেন আমি যা লিখলাম তা অতিরঞ্জিত কি না।

Address

Kolkata

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Temples with Atanu posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Temples with Atanu:

Share

Category