20/07/2025
তুমি কি ভগবানের সাথে তোমার অপহৃত সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত করতে চাও? তা করতে হলে তোমাকে তাঁকে জানতে হবে। সুতরাং কৃষ্ণভক্তদের নিকট গভীরভাবে ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করতে হবে। সেটিই হচ্ছে আমাদের অপহৃত সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।
শ্রী শ্রীমদ্ ভক্তিচারু স্বামী গুরুমহারাজ
রবিবাসরীয় অনুষ্ঠান, মালাগা, ১৭ই জুলাই ২০১১
শ্রী শ্রীমদ্ ভক্তিচারু স্বামী গুরুমহারাজ তাঁর উক্ত উক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমরা আমাদের মূল পরিচয় বা ভগবানের সাথে আমাদের যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, তা ভুলে গেছি বা হারিয়ে ফেলেছি। এই হারানো সম্পর্ককে পুনঃস্থাপন করতে হলে, আমাদের ভগবানকে জানতে হবে। আর ভগবানকে জানার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে কৃষ্ণভক্তদের সান্নিধ্যে থেকে গভীরভাবে ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করা।
অপহৃত সম্পর্ক (Lost Relationship):
আমাদের বর্তমান অবস্থা অনেকটা এমন, যেন আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান ধন, আমাদের পিতার (ভগবানের) সাথে সম্পর্ক চুরি হয়ে গেছে বা আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি।
উপমা: যেমন কোনো ধনী ব্যক্তি তার পিতার পরিচয় ভুলে গিয়ে পথের ভিখারীর মতো জীবন যাপন করে, তেমনি আমরাও আমাদের আধ্যাত্মিক পরিচয় ভুলে গিয়ে এই জাগতিক দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হচ্ছি।
পুনঃস্থাপনের আকাঙ্ক্ষা (Desire for Re-establishment):
স্বাভাবিকভাবেই, আমরা আমাদের সেই হারানো সম্পর্ক ফিরে পেতে চাই। আমাদের অন্তরে সেই পরম পিতার জন্য একটি গভীর টান অনুভব হয়।
উপমা: একজন সন্তান যেমন তার হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে ফেরে, তেমনি প্রতিটি জীবাত্মা ভগবানের সাথে তার সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাকুল।
জানার প্রয়োজনীয়তা (The Need to Know):
হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক ফিরে পেতে হলে, আমাদের জানতে হবে সেই ব্যক্তি কে যার সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল। ভগবানকে না জানলে, তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়।
উপমা: যদি কেউ তার হারানো বন্ধুকে খুঁজে পেতে চায়, তবে তাকে বন্ধুর নাম, ঠিকানা, স্বভাব ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে হবে। তেমনি ভগবানকে জানতে হলে তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে।
কৃষ্ণভক্তদের সান্নিধ্য (Association of Krishna Devotees):
ভগবানকে জানার সঠিক পথ দেখানোর জন্য আমাদের প্রয়োজন কৃষ্ণভক্তদের সঙ্গ। যারা ইতিমধ্যেই ভগবানের সাথে যুক্ত আছেন, তারা আমাদের সেই পথে চালিত করতে পারেন।
উপমা: একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক যেমন অজানা রাস্তায় চলতে সাহায্য করে, তেমনি কৃষ্ণভক্তরা আমাদের আধ্যাত্মিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন।
গভীরভাবে শাস্ত্র অধ্যয়ন (Deep Study of Scriptures):
ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবত হলো ভগবানের বাণী এবং তাঁর ভক্তদের জীবন ও কর্মের বিস্তারিত বিবরণ। এই শাস্ত্রগুলি গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে আমরা ভগবান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারব এবং তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্কের স্বরূপ বুঝতে পারব।
উপমা: কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে যেমন তার লেখা চিঠি বা ডায়েরি পড়া প্রয়োজন, তেমনি ভগবানকে জানতে হলে আমাদের অবশ্যই ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করতে হবে।
সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় (The Best Way):
গুরুমহারাজ বলছেন, এই শাস্ত্রগুলির গভীর অধ্যয়নই হচ্ছে আমাদের হারানো সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সর্বোত্তম উপায়। অন্য কোনো পথে এই জ্ঞান লাভ করা বা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা সহজ নয়।
উপমা: যেমন কোনো জটিল রোগের সঠিক চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ এবং উপযুক্ত ঔষধ প্রয়োজন, তেমনি আধ্যাত্মিক জীবনের জটিলতা দূর করে ভগবানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য শাস্ত্রজ্ঞান অপরিহার্য।
শ্রী শ্রীমদ্ ভক্তিচারু স্বামী গুরুমহারাজের আজকের বাণীর মূল বিষয়বস্তু হলো ভগবানের সাথে আমাদের চিন্তন সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা। এর শাস্ত্রীয় প্রমাণস্বরূপ আমরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি আলোচনা করতে পারি:
জীবের স্বরূপ: শ্রীমদ্ভাগবতে (২.৯.৩) বলা হয়েছে –
"অহং হরেঃ সেবকো সর্ব্বেষাং চ সেবক-সেবকঃ"।
অর্থাৎ, প্রতিটি জীব ভগবানের নিত্য দাস। আমরা ভুলে গেছি যে আমরা ভগবানের অংশ এবং তাঁর সেবা করাই আমাদের স্বাভাবিক ধর্ম।
ভগবদ্গীতার জ্ঞান: ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৫ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন –
"বেদৈশ্চ সর্ব্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্।"
অর্থাৎ, সকল বেদের দ্বারা আমিই জ্ঞাতব্য। আমিই বেদান্তের প্রণেতা এবং আমিই বেদজ্ঞ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, বেদান্ত সহ সকল শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ভগবানকে জানা।
শ্রীমদ্ভাগবতের তাৎপর্য: শ্রীমদ্ভাগবতকে "সকল শাস্ত্রের সার" বলা হয়। এটি ভগবান এবং তাঁর ভক্তদের লীলা-মাহাত্ম্য বর্ণনার মাধ্যমে আমাদের ভক্তি পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ নং শ্লোকে বলা হয়েছে
"স বৈ পুংসাং পরো ধর্ম্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে। অহেতুহ্যপ্রতিহতা যয়াঽঽত্মা সম্প্রসীদতি।"
অর্থাৎ, মানুষের পরম ধর্ম সেটিই, যার মাধ্যমে অব্যহত ও অপ্রতিহত ভক্তি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অর্পিত হয় এবং যার দ্বারা আত্মা সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন হয়।
শ্রী শ্রীমদ্ ভক্তিচারু স্বামী গুরুমহারাজ তাঁর বাণীতে ভগবানের সাথে আমাদের যে স্বাভাবিক এবং হারানো সম্পর্ক রয়েছে, তা পুনরুদ্ধারের জন্য কৃষ্ণভক্তদের সান্নিধ্যে শাস্ত্র অধ্যয়নের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতের জ্ঞান আমাদের সেই পথে আলো দেখায় এবং পরম পিতার সাথে আমাদের চিরন্তন সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।🙏❤️🙏