27/01/2026
আজ পরমদয়াল পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুরের ৫৮তম মহাপ্রয়াণ তিথি।*
তিঁনি আজ লোকচক্ষুর অন্তরালে, রক্তমাংস সঙ্কুল দেহে আমাদের সম্মুখে নেই। কিন্তু তাঁর বিধি-নিদেশের ভিতর, তাঁর বাণীর ভিতর, আচার্য্যপরম্পরার ভিতর তিনি সতত জীবন্ত হয়ে রয়েছেন।
আজ এই বিষাদপূর্ন দিবসে অন্তরের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁর শ্রীপাদপদ্মে।
"মহাপ্রয়াণ'
অখিল ব্রহ্মাণ্ডের জীবনস্বরূপ পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুরের ত্রিলোকপাবনী জীবনদীপ গত ২৭শে জানুয়ারী ১৯৬৯, রবিবার শেষ রাত্রে ৪টা ৫৫ মিনিটে নির্ব্বাপিত হয়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হ’য়ে ৮১ বৎসর বয়সে তাঁর মর্ত্তলীলার অবসান ঘটে।আগে কিছুই তেমন বোঝা যায়নি।স্বাভাবিকভাবে নিদ্রা যাচ্ছিলেন। হঠাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট বোধ করেন। পূজ্যপাদ কাজলদা তা’ টের পাওয়া মাত্র চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী বিহিত ব্যবস্হাদি করেন। পরমপূজ্যপাদ বড়দা ও তৎক্ষণাৎ ছুটে আসেন। কিন্তু সকলের সকল চেষ্টাকে নিষ্ফল ক’রে দিয়ে কালের বিধান জয়ী হয়। পূজ্যপাদ ছোড়দা ছিলেন কলকাতায়। তাঁকে, পূজ্যপাদ বড়দার কলকাতার বাড়ীর সকলকে, পূজনীয়া সানুদি কে এবং অন্যান্য অনেক কে ট্রাঙ্ক টেলিফোনযোগে তাড়াতাড়ি দেওঘরে চলে আসতে বলা হয়। ভোর হতে-না-হতেই এই মর্ম্মান্তিক দুঃসংবাদ দেওঘরের ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। শোকাকুল আবালবৃদ্ধ নরনারী দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হ’য়ে ডুকরে কাঁদতে-কাঁদতে ছুটে আসেন ঠাকুর-বাংলোর পার্লারে— যেখানে তাদের প্রাণের জীয়নকাঠি, ইহপরকালের মালিক, স্রষ্টা, ঈশ্বর ও পরমপ্রভু লৌকিকতঃ শেষ শয়ানে আসীন। সকলে এসে দেখেন— তিনি যেন প্রশান্তভাবে ঘুমিয়ে আছেন। কে বলবে—তাঁর দেহে জীবন নেই?তাঁর শয্যাপার্শ্বে বসে আছেন শোকের প্রতিমূর্ত্তি ছোটমা, বড়দা, কাজলদা, বাদলদা, পিসিমা, ছোটবৌদি, রাঙ্গাবৌদি, বঙ্কিমদা প্রভৃতি। শ্রীশ্রীবড়মা পাশের একখানি শয্যায় শায়িত অবস্হায় স্তব্ধভাবে অঝোরে চোখের জল ফেলছেন। আত্মীয় ও ভক্তবৃন্দ অশ্রুপ্লুত চোখে তাকিয়ে আছেন প্রিয়পরমের মুখপানে। এই অমৃতমূর্ত্তি আরতো দু’চোখ দিয়ে দেখা যাবে না। তাই প্রাণের সবটুকু আকূতি নিয়ে শেষ দেখা দেখে নিচ্ছেন প্রতিপ্রত্যেকে। মাঝে-মাঝে বড়দা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন আর সহস্র-সহস্র পুরুষ, নারী, যুবা, বৃদ্ধ, শিশু শোকাবেগে উদ্বেল হ’য়ে উঠছেন।সে মর্ম্মন্তুদ, হৃদয়বিদারক দৃশ্য সহনাতীত। এরই মধ্যে বাইরে চলছে নামকীর্ত্তন। প্রায় তিনটের সময় ছোড়দা আসেন। তখন আর-একবার কান্নার রোল ওঠে।প্রায় পাঁচটার সময় শ্রীশ্রীঠাকুরের মরদেহ শেষকৃত্যের জন্য রচিত বিশেষস্হানে (রোহিনী রোডের পশ্চিম পার্শ্বে, শ্রীশ্রীঠাকুরের নিজস্ব জমিতে)নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানে পৌঁছাবার পর বড়দার কলকাতার বাড়ীর সবাই, সানুদি ও জামাইবাবুরা এবং অনেক ভক্ত এসে উপস্হিত হন! তখন আর-এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়।
সূর্যাস্তের পূর্ব্বেই শ্রীশ্রীঠাকুরের পূত নশ্বরদেহ বিশেষভাবে নির্ম্মিত একটি মঞ্চের উপরে চন্দনকাষ্ঠে রচিত চিতাশয্যায় শায়িত করার পর বড়দা শাস্ত্রীয় বিধান-অনুযায়ী মুখাগ্নিকৃত্য শেষকৃত্য সমাপ্ত হয় রাত্রি দশটার পর। তৎপর বিশেষভাবে আনীত গঙ্গাজলের দ্বারা চিতাভূমি প্রক্ষালিত করা হয়।বড়দা, ছোড়দা, কাজলদা, শ্রীশ্রীঠাকুর পরিবারের সবাই এবং সহস্র-সহস্র সৎসঙ্গী ও স্হানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং জনসাধারণ শেষমুহূর্ত্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্হান করেন।
আজ আমরা নিঃস্ব,পৃথিবী নিঃস্ব। তবু শোকস্তব্ধ হৃদয়ে বার-বার স্মরণ করি তাঁর কথা “আমি তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই”। তাঁর এই পুন্য-বাণী আমাদের মহাশোক কে মহতী সাধনায় পর্য্যবসিত করুক।
বন্দে পুরুষোত্তমম্
তথ্যসূত্রঃ -----আলোচনা পত্রিকা, # মাঘ,১৩৭৫