10/08/2025
যজ্ঞ অহিংস,যজ্ঞ অধ্বরং- পর্ব ১
বৈদিক সনাতন ধর্মের যদি একটি ধর্মীয় আচারের নাম নেয়া হয় তবেই যজ্ঞ শব্দটি চলে আসবে।যজ্ঞ বৈদিক সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পবিত্র ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রেই আছে যজ্ঞ শব্দটি।
নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে যজ্ঞ বৈদিক ধর্মের একটা অত্যাবশ্যক অঙ্গ। বেদের বহুস্থলে যজ্ঞের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এমনও বলা হয়েছে যে যজ্ঞের দ্বারাই ঈশ্বরের আরাধনা ও মোক্ষ প্রাপ্তি হয়। আর সেই যজ্ঞকে বারবার অহিংস রাখতে বলা হয়েছে পবিত্র বেদে।অর্থাৎ যজ্ঞে পশুবলি বা কোন প্রকারের হিংসা করা যাবেনা।আজকের প্রথম পর্বে আমরা পবিত্র ঋগ্বেদ ও পবিত্র যজুর্বেদ থেকে দেখব যজ্ঞে পশুবলি বা হিংসা নিয়ে পবিত্র বেদের কী আদেশ।
যজ্ঞেন যজ্ঞময়জন্ত দেবাস্তানি ধর্মাণি প্রথমান্যাসন্।
তে হ নাকং মহিমানঃ সচন্ত য়ত্র পূর্ব সাধ্যাঃ সন্তিদেবাঃ।।
(ঋগ্বেদ ১০.৯০.১৬)
অর্থাৎ সত্যনিষ্ঠ বিদ্বানেরা যজ্ঞের দ্বারাই পরমেশ্বরের পূজা করেন। যজ্ঞে সব শ্রেষ্ঠ ধর্মের সমাবেশ হয়। মহান ব্যক্তিরা যজ্ঞ দ্বারা ঈশ্বরের আরাধনা করে দুঃখ রহিত হয়ে মােক্ষলাভ করেন। সাধনসম্পন্ন ও জ্ঞানসম্পন্ন বিদ্বানেরা যেখানে পূর্ব হতেই বাস করছেন ইত্যাদি এই মন্ত্রে উল্লেখযােগ্য বিষয়।
এখানে বুঝতে হবে যে য়জ্ঞ' শব্দ য়জ্ ধাতু থেকে তৈরি হয়েছে যার তিনটি অর্থ ধাতুপাঠ বর্ণিত- দেব পূজা, সঙ্গতিকরণ ও দান। এর মধ্যেই আমাদের সব কর্তব্য নিহিত আছে, এইজন্য উক্ত উল্লেখিত মন্ত্রের প্রথম চরণে 'যজ্ঞেন' এই একবচন প্রয়ােগ করেও 'তানি ধর্মাণি প্রথমান্যাসন্' এই রূপে পরে বহুবচনের প্রয়ােগ করা হয়েছে। অর্থাৎ যজ্ঞে ঈশ্বর আরাধনা,দান ও সঙ্গতিকরণ অর্থাৎ সকলকে একত্রে আনা,ঐক্য গড়ে তোলার কাজ করা হয়।
মুখ্যতঃ মনুষ্যের তিনটি কর্তব্য
(১) নিজের চেয়ে বড়দের প্রতি
(২) নিজের সমকক্ষ তাদের প্রতি
(৩) নিজের চেয়ে ছােটদের প্রতি।
দেবপূজা, সঙ্গতিকরণ ও দানের মাধ্যমে এই তিনটি কর্তব্যের নির্বাহ করার স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়।দেবপূজা বা ঈশ্বরের আরাধনা,দান অর্থাৎ দরিদ্র ও যাদের প্রয়োজন,যাদের প্রাপ্য তাদের দান করা ও সঙ্গতিকরণ অর্থাৎ সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা,এই তিনএি হলো যজ্ঞের উপকরণ। এই ৩টি উপকরণের দ্বারা উপরোক্ত ৩ টি দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এইজন্য, 'য়জ্ঞো বৈ শ্রেষ্ঠতমং কর্ম, (শতপথ ১.৭.৩.৫), " য়জ্ঞো হি শ্রেষ্ঠতমং কর্ম, তৈত্তরীয় সংহিতা ৩.২.১.৪) ইত্যাদি বাক্য প্রাচীন সাহিত্যে আমরা দেখতে পাই। এখানে যজ্ঞ শ্রেষ্ঠতম ধর্ম বলে অভিহিত করা হয়েছে।
যারা যজ্ঞ করে না, তাদের কী দুর্গতি হয় এবং কেমন তাদের অধঃপতন হয় তা ঋগ্বেদের (১০.৪৪.৬) ও
অথর্ববেদের (২০.৯৪.৬) এই মন্ত্রে বলা হয়েছে।
ন য়ে শেকুর্য়জ্ঞিয়াং নাবমারুহম ইর্মেব তে ন্যবিশন্ত কেপয়ঃ।
অর্থাৎ-(যে) যে ব্যক্তি (যজ্ঞিয়াং নামব্ আরুহম্ ন শেকুঃ) যজ্ঞময়ী নৌকায় আরােহণ করতে সক্ষম হয় না , (তে) তারা (কেপয়ঃ) কুৎসিৎ, অপবিত্র আচরণকারী হয়ে (ইর্মা এব) এখানে, এইলোকেই (ন্যবিশন্ত) ক্রমশঃ অধঃপতিত হতে থাকে।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বেদে যে যজ্ঞের মহিমা এতাে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং যাকে পরমেশ্বরের পূজা ও প্রাপ্তির সাধন বলা হয়েছে, সেই যজ্ঞ সম্পর্কে মধ্যযুগীয় কিছু আচার্য, পাশ্চাত্য বিদ্বান ও তাঁদের মতানুসারী কিছু হিন্দুরা না জেনেই জঘন্য সব মন্তব্য প্রকাশ করেন কেবল নিজেদের স্বার্থে যা পাঠ করে কোনো বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি লজ্জাবােধ না করে পারেন না। সেই সব বিদ্বানেরা তাঁদের গ্রন্থে অনেক স্থলে উল্লেখ করেছেন যে, বৈদিক যজ্ঞে মেষ, অজ (ছাগল), বৃষ, গাভীর বলির বিধান আছে।পরবর্তীতে তারা নরবলি,গোবলি এগুলোও চালু করেছেন নিজেদের বিকৃত মানসিকতা চরিতার্থ করার জন্য।
সব বেদেই যজ্ঞের পর্যায় শব্দ বা বিশেষণ রূপে 'অধ্বর' শব্দের প্রয়ােগ শতাধিক স্থলে পাওয়া যায় যার ব্যুৎপত্তি করার সময় " নিরুক্তকার যাস্কাচার্য " লিখেছেন --
অধ্বর ইতি য়জ্ঞনাম- ধ্বরতির্হিংসাকর্মা তৎপ্রতিষেধঃ। (নিরুক্ত ২.৭)
অর্থাৎ যজ্ঞের নাম অধ্বর যার অর্থ হিংসারহিত কর্ম।অর্থাৎ যজ্ঞ হবে সর্বদা অহিংস।পবিত্র বেদ হতে কয়েকটি প্রমাণ এখানে প্রদত্ত হলাে। ঋগ্বেদের কয়েকটি মন্ত্র দেখুন -
(ক) অগ্নে য়ে য়জ্ঞমধ্বরং বিশ্বতঃ পরিভূরসি। স ঈদ্ দেবেষু গচ্ছতি।।
(ঋগ্বেদ ০১.১.৪)
এই মন্ত্রে বলা হয়েছে সে, হে জ্ঞানস্বরূপ পরমেশ্বর, তুমি হিংসারহিত যজ্ঞে ব্যাপ্ত থাকো এবং এইরকম যজ্ঞ সত্যনিষ্ঠ বিদ্বানেরা স্বীকার করে থাকেন।
(খ) রাজন্তমধ্বরানাং গােপামৃচতস্য দীদিবিম্ । বর্ধমানং স্বে দমে।। -
(ঋগ্বেদ ১.১.৮)
এখানেও পরমাত্মাকে অধ্বর অর্থাৎ হিংসারহিত সব কর্মে বিরাজমান বলা হয়েছে। এর দ্বারা যজ্ঞে পশুবলি নিষেধ করা হয়।
(গ) ত্বং হােতা মনু্হিতােগ্নে য়জ্ঞেষু সীদসি। সেমং নাে অধ্বরং য়জ।।
(ঋগ্বেদ ১.১৪.২১)
এখানেও যজ্ঞের জন্য অধ্বর শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এবং হােতাকে বলা হয়েছে যে তুমি হিংসারহিত যজ্ঞ করাও।
( ঘ ) স সুক্রতুঃ পুরােহিতাে দমে দমেগ্নির্য়জ্ঞস্যাধ্বরস্য চেততি ক্রত্বা য়জ্ঞস্য চেততি ।
(ঋগ্বেদ ১.১২৮.৪)
এখানে বলা হয়েছে যে, পরমাত্মা ও বেদজ্ঞানী পুরোহিত হিংসারহিত যজ্ঞের সর্বদা উপদেশ দিয়ে থাকেন।
( ঙ ) প্রতিত্যং চারুমধ্বরং গােপীথায় প্রহয়সে। মরুদ্ভিরগ্ন আগহি ।। - ঋগ০ ১.১৯.১
জ্ঞান স্বরূপ পরমাত্মা ও পুরােহিতকে অগ্নি নামে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে পাপাদি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই চারু (সুন্দর), হিংসারহিত যজ্ঞরূপ শুভকর্মে আমরা তােমাকে আহ্বান করি। তুমি বিদ্বান ঋত্বিকদের অর্থাৎ প্রাণশক্তিদেরসহিত এখানে আগমন করাে।
( চ ) ঋগ্বেদের ৩.২০.১ মন্ত্রে যজ্ঞের জন্য অধ্বর অর্থাৎ হিংসারহিত বিশেষণের প্রয়ােগ করে বলা হয়েছে যে দেবগণ এইরকম হিংসারহিত যজ্ঞের কামনা করেন। মন্ত্রটির উত্তরার্ধ এরূপ --
সুজ্যোতিষাে নঃ শৃন্বন্ত দেবাঃ, সজোষসাে অধ্বরং বাবশানাঃ।।
ঋগ্বেদ ৩.২০.১ অর্থাৎ উত্তম জ্ঞানজ্যোতিসম্পন্ন, প্রেমযুক্ত, অহিংস যজ্ঞ দেব - সত্যনিষ্ঠ বিদ্বান্ কামনা করেন, তাঁরা আমাদের প্রার্থনা শ্রবণ করুন।
(ছ) অগ্ন ইলা সমিধ্যসে বীতিহােত্রো অমর্ত্যঃ। জুষস্ব সূ নো অধ্বরম্।। ঋগ০ ১.২৪.২
এখানে অধ্বর অর্থাৎ হিংসারহিত কর্ম এই যজ্ঞে প্রয়ােগ হােক এবং জ্ঞান স্বরূপ পরমাত্মাকে স্বীকার করার প্রার্থনা করা হয়েছে।
(জ) য়স্য ত্বমগ্নে অধ্বরং জুজোষাে দেবাে মর্তস্য সুধিতং ররাণঃ।
প্রীতেদসদ্ধোত্তা সা য়বিষ্টাসাম য়স্য বিধতাে বৃধাসঃ।।
(ঋগ্বেদ ৪.২.১০)
অর্থাৎ হে জ্ঞানময় পরমেশ্বর, যার হিংসারহিত যজ্ঞে তুমি প্রেমপূর্বক স্বীকার করাে তার বাণী অত্যন্তপ্রেমময়ী ও শক্তিশালিনী হয়ে যায়। এইরকম সত্য উপাসকদের সঙ্গতি লাভ করে আমরা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হই।
এইরূপ ঋগ্বেদের বহু মন্ত্রে "" অধ্বর "" শব্দের প্রয়ােগ পরিলক্ষিত হয়।
যথা - মন্ত্র ১.২৬.১; ১.৪৪.১৩; ১.৭৪.১; ১.৯৩.১২; ১.১০.৮; ১.১৩৫.৩; ১.৫১.৩; ২.২.৫; ৩.১৭.৫; ৩.২০১; ৩.২০.৫; ৩.৫৪.১২; ৪.৯.৬; ৪.১৫.২; ৪.৩৭.১; ৫.৪.৮; ৫.২৬.৩; ৫.২৮.৬; ৫.৪০.৫; ৬.২.৩; ৬.১৫.৭; ৬.১৬.২; ৮.৯৩.২৩; ৯.৬৭.১; ৮.৭২.৫; ৮.৬৬.১; ৮.৭১.১২; ৮.৯৩.২৩; ৯.৬৭.১; ৮.৭২.৫; ৮.৮২.৩; ৮.৯৮.৩; ৭.৩.১; ৭.৪.১৬; ৮.৩.৫; ৭; ৮.২৭.১; ৮.৩৫.২৩; ৮.৪৬.১৮; ৮.৫০.৫; ১০; ৮.৬০.২; ৮.৬৬.১; ৮.৭১.১২; ৮.১০২.৬; ৮; ১০.৮.৩; ৮.১১.৪; ৮.১৭.৭; ৮.২১.৬; ৮.৩০.১৫; ১০.৭৭.৮;১০.২২.৭ ইত্যাদি।অর্থাৎ এই মন্ত্রসমূহে যজ্ঞকে অহিংস বলা হয়েছে।
যজুর্বেদেও এরকম অজস্র মন্ত্র পাওয়া যায় যেখানে গাভী, অশ্ব, মেষাদি পশুদের প্রতিহিংসাকরা নিষেধ করা হয়েছে। অধ্বর শব্দ যজ্ঞের সমার্থক ও বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন যজুমন্ত্রের সংখ্যা কমপক্ষে ৪৩ টি।
ক) বীতিহােত্রং ত্বা কবে দ্যুমন্তং সমিধীমহি অগ্নে বৃহন্তমধ্বরে।।
(যজুর্বেদ ২.৪)
সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ পরমেশ্বর,অহিংস যজ্ঞে সমৃদ্ধি প্রাপ্তির তরে অগ্নিহোত্র যেন করি,সমস্ত বৃহৎ কার্য যেন সিদ্ধ করি,পদার্থের অনুক্রমে দৃষ্টিগোচর হওয়া ভৌতিক অগ্নিকে উত্তমরূপে প্রজ্জ্বলিত করি।
খ) মন্মানি ধীভিরুত যজ্ঞমৃন্ধন্ দেবত্রা চ কৃনুহ্যধ্বরং নঃ।।
(যজু ২৯.২৬)
অর্থাৎ বুদ্ধি ও যজ্ঞকে সম্যকরূপে সিদ্ধ করো,বিদ্বানগণের মাঝে ধর্মকে অহিংসরূপে স্থিত করো।
গ) উপ প্রয়ত্নো অধ্বরং মন্ত্রং বাচেমাগ্নয়ে আরে অস্মে চ শৃন্বতে।।
(যজু ৩.১১)
ক্রিয়ারূপ অহিংস যজ্ঞ কে উৎকৃষ্ট প্রকারে জেনেছি, আমাদের নিকটে ও দূরে সর্বত্র আমাদের চিন্তা শুনছেন সেই বিজ্ঞান স্বরূপ পরমেশ্বর।তাই জ্ঞানদায়ী এই বেদমন্ত্রের নিত্য উচ্চারণ করা কর্তব্য।
এভাবে যজুর্বেদের আরও অসংখ্য মন্ত্রে অধ্বরং বা অহিংস শব্দটি এসেছে।যেমন-
১) ভদ্রো নো অগ্নিরাহুতাে ভদ্রা রাতিঃ সুভগ ভদ্রো অধ্বরঃ। ভদ্রা উত প্রশস্তয়ঃ।।
(যজু ১৫.৩৮)
২) হবিস্মতীরিমা আপাে হবিষ্মাং২ আ বিবাসতি। হবিষ্মান্ দেবাে অধ্বরাে হবিষ্মাং ২অস্তসূর্যঃ।।
(যজু ৬.২৩)
৩) হৃদে ত্বা মনসে ত্বা দিবে ত্বা সূর্যায়ত্বা। উর্দ্ধমিমধ্বরং দিবি দেবেষুহােত্রায়চ্ছ।।
(যজু ৬.২৫)
তাই যজ্ঞে অহিংসভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করুন,দান করুন ও সকলের সাথে ভ্রাতৃরূপে মৈত্রী স্থাপন করুন,ঐক্যবদ্ধ হোন।
আগামী পর্বে আমরা পবিত্র সামবেদ ও অথর্ববেদে যজ্ঞকে অহিংস বলা হয়েছে এরকম অনেকগুলো মন্ত্র আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব।
পবিত্র বেদকে জানুন,একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধির আলোক জীবনকে সুগঠিত করুন।
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি
লেখাগুলো শেয়ার করে মানুষকে সচেতন করুন।।এটাও ধর্মের কাজ 🙏