19/08/2025
**গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস** (Great Calcutta Killings) বা “Direct Action Day Riots” ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়।
---
# # 🟥 কী হয়েছিল?
* **তারিখ:** ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬
* **স্থান:** কলকাতা (তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী নয়, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ শহর)
* **ঘটনা:** হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা, যা পরে “Great Calcutta Killings” নামে কুখ্যাত হয়।
---
# # 🟥 প্রেক্ষাপট
1. **পাকিস্তান দাবী:**
* মুসলিম লীগ (মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ নেতৃত্বে) পাকিস্তান নামক আলাদা দেশ চাইছিল।
* তারা বলেছিল, মুসলমানরা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে নিরাপদ নয়।
2. **Direct Action Day ঘোষণা:**
* ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে মুসলিম লীগ ঘোষণা করে—“আমরা পাকিস্তান চাই, না দিলে Direct Action হবে।”
* ১৬ আগস্ট দিনটিকে তারা **"Direct Action Day"** হিসেবে ডাকে।
3. **ব্রিটিশ ভূমিকা:**
* তখন ব্রিটিশরা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেনি।
* "Divide and Rule" নীতি কাজ করেছিল, যাতে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে।
---
# # 🟥 দাঙ্গা কীভাবে শুরু হয়?
* ওই দিন সকালে মুসলিম লীগের সমর্থনে লাখ লাখ মুসলমান ময়দানে সমাবেশ করে।
* উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়া হয়।
* মিছিল থেকে ধীরে ধীরে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে—প্রথমে দোকান ভাঙচুর, তারপর অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও খুনোখুনি।
* হিন্দুরা প্রতিশোধ নেয়, ফলে শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
---
# # 🟥 নিহত ও ক্ষয়ক্ষতি
* নিহতের সংখ্যা ইতিহাসবিদরা ভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন:
* সরকারি হিসাব: প্রায় **৪,০০০ জন**।
* অন্যদের মতে: **১০,০০০ জনেরও বেশি**।
* হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছিল।
* অন্তত **১,০০,০০০ মানুষ গৃহহীন** হয়ে পড়ে।
* পুরো কলকাতা শহর একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
---
# # 🟥 প্রভাব
1. **হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তীব্র হয়।**
2. ভারতের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিভাজনের পথও পাকা হয়ে যায়।
3. পরের বছর ১৯৪৭-এ দেশভাগ হয়—ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।
4. Direct Action Day এর এই দাঙ্গা ছিল **Partition-এর (দেশভাগ) সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা ঘটনাগুলোর একটি।**
# # 🟥 মূল সত্য
* **এটি ছিল পরিকল্পিত দাঙ্গা।** মুসলিম লীগ হিন্দুদের ভয় দেখাতে এবং পাকিস্তানের দাবী জোরদার করতে Direct Action Day ঘোষণা করেছিল।
* ব্রিটিশ প্রশাসন ইচ্ছা করেও যথাসময়ে দমন করেনি।
* উভয় পক্ষের মানুষের উপর দিয়ে ভয়ঙ্কর হত্যালীলা চলে।
---
🟨 প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
১. বিদেশি সাংবাদিকদের রিপোর্ট
আমেরিকান সাংবাদিক আইয়ন স্টিফেন্স (“Statesman” পত্রিকার সম্পাদক) লিখেছিলেন:
“কলকাতার রাস্তায় যেখানে দাঁড়াই, সেখানেই দেখি মানুষের লাশ। কুকুর আর শকুন লাশ টেনে খাচ্ছে। বস্তি পুড়িয়ে ছাই, শহরের মানুষ আতঙ্কে পালাচ্ছে।”
লন্ডনের The Times সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়:
“এমন ভয়াবহ গণহত্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপেও আমরা দেখিনি।”
২. প্রত্যক্ষদর্শী বাঙালি লেখক
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন:
“রাস্তার পাশে একসাথে কতগুলো লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি, গন্ধে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। মানুষ মানুষের ওপর এমন পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, এটা ভাবিনি।”
৩. পুলিশ ও ব্রিটিশ প্রশাসকরা
ব্রিটিশ অফিসারদের নথি অনুযায়ী:
দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা পুলিশ অ্যাকশন নেয়নি। শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিল। ফলে দাঙ্গা ভয়ঙ্কর আকার নেয়।
গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজ নিজেই স্বীকার করেন:
“যদি আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেনা নামাতাম, এত মানুষের মৃত্যু হত না।”
🟨 হিংসার রূপ (সরাসরি কাহিনি)
অগ্নিসংযোগ: পুরো বাজার, দোকানপাট, ঘরবাড়ি আগুনে জ্বলছিল। অনেক পরিবার জীবন্ত পুড়ে মারা যায়।
মহিলাদের ওপর নির্যাতন: অনেক মহিলাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল—যা সংবাদপত্রে তখন পুরোটা প্রকাশ করা হয়নি।
হিন্দু-মুসলমান প্রতিশোধ: প্রথমে মুসলিম লীগের সমর্থকেরা আক্রমণ শুরু করে, পরে হিন্দুরা একজোট হয়ে মুসলমানদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। ফলে দাঙ্গা রূপ নেয় “full-scale civil war”-এ।
🟨 অজানা তথ্য
দাঙ্গার সময় কলকাতার কবরস্থান ও শ্মশান ভরে গিয়েছিল—লাশ পোড়ানো ও কবর দেওয়ার জায়গা ফুরিয়ে যায়।
অনেক ট্রাম-বাস লাশ বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
গঙ্গার ঘাটে হাজার হাজার লাশ ভেসে উঠেছিল।
মুসলিম লীগ এই দাঙ্গাকে “জয়” বলে প্রচার করেছিল—কারণ তারা দেখাতে চেয়েছিল পাকিস্তান ছাড়া মুসলমানরা নিরাপদ নয়।
এই ঘটনার পর হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস—দুটো দলই মানতে শুরু করে, দেশ ভাগ ছাড়া উপায় নেই।
🟨 সারসংক্ষেপ
“Great Calcutta Killings” ছিল কেবল একটা দাঙ্গা নয়—এটা ছিল ভারত ভাগের ট্রায়াল রান।
এখানে প্রথমবার দেখা গিয়েছিল, হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।
এর পরপরই নোয়াখালি, বিহার, পাঞ্জাবে ধারাবাহিক দাঙ্গা শুরু হয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর মূল সূচনা হয়েছিল এখান থেকেই।