21/04/2026
#সংহতিবিনষ্টকরা এক_মহাপাপ
ঠাকুরের জগতে সবকিছু একটা নিয়মের মধ্য দিয়েই চলে। আমাদের সাধনা শ্রীশ্রীঠাকুর এবং শ্রীশ্রীআচার্য্যদেবের নির্দেশিত পথেই চলে। এর বাইরে অতিরিক্ত আমরা করিনা,- করলে তা বিকৃতিকে আমন্ত্রন করতে পারে ভবিষ্যতে। আমার ব্যাক্তিগত ভাব বা ধ্যানধারণা অনুযায়ী চলা,- এই ভাব অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করার কোন সুযোগ এখানে নেই।
ইষ্টভৃতি কাঁটায় কাঁটায় ত্রিশদিনেই গুরুগৃহে পাঠাতে হয়৷ আমার হঠাৎ ভাব হল,- আমি ত্রিশদিনে নয়,- পয়ত্রিশ দিনে ইষ্টভৃতি পাঠাব এবং বাকীদেরকেও এইভাবে পাঠাতে বলব,- তা কিন্তু হবেনা। আমি যতই ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী হই,- নিজের ব্যাক্তিগত ধ্যানধারণা বা ভাব প্রয়োগ করার কোন উপায় নেই।
সকাল সন্ধ্যা প্রার্থনার একটা নির্দিষ্ট মুহুর্ত আছে। সারা বিশ্বে সকল গুরুভাই ও মায়েরা প্রতি মাসে এই নির্দিষ্ট মুহুর্তেই প্রার্থনা করে থাকে।
হঠাৎ যদি আমার মনে হয় যে - আমি সেই নির্দিষ্ট মুহুর্তে প্রার্থনা না করে,- প্রতিদিন সকাল সাতটায় প্রার্থনা করব এবং আশেপাশে সব্বাইকে এই সময়েই প্রার্থনা করতে অনুপ্রাণিত করব,- তাহলে কিন্তু আমি তা পারব না। আচার্য্যদেবের নির্দিষ্ট করে দেওয়া মুহুর্তেই আমাকে এবং সব্বাইকে প্রার্থনা করতে হবে।
প্রার্থনার সুর কেমন হবে, কোন ক্রমানুসারে হবে, কতটুকু সময় ধরে করতে হবে তা এক্কেবারে নির্দিষ্ট করা আছে। গুরুবন্দনার পর পরই আমরা " জয় রাধে" কীর্তন করি। সারা পৃথিবীতে একই রকমে প্রার্থনা করা হয়।
আমার যদি হঠাৎ ভাব হয় যে,- আমি " জয় রাধে" কীর্তনটা আগে করে গুরু বন্দনাটা সবার শেষে করব,- তা কিন্তু হবেনা। অথবা,- আমার মনে হল রোজ প্রার্থনার পর অমর সংগীত গাব,- তা আমি গাইতেই পারি সময় থাকলে। কিন্তু তাই বলে আমি অন্যান্য গুরুভাই ও মায়েদের এই কথা বলতে পারিনা যে,- তোমরাও প্রার্থনার পর রোজ অমর সংগীত গাইবে। এই অধিকার আমার নেই।
সৎসঙ্গ কতক্ষন হবে, সৎসঙ্গের অনুষ্ঠান কোন ক্রমানুসারে হবে- সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হয়। আমরা সবাই এই নিয়ম মেনেই চলি।
আমার হয়ত দেড় ঘন্টা নয়,- তিন ঘন্টা সৎসঙ্গ করতে ভাল লাগে। আমার ভাল লাগে বলেই আমি তা করতে পারব না,- এবং অন্যকেও এইরকম করার জন্য কখনো বলতে পারব না। করলে তা অপরাধ হবে,- তা সৎসঙ্গের সংহতি ভাঙ্গনের কারন হবে।
দীক্ষার সময় শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্রফটো সামনে রেখে ধ্যান করার বিধি শেখানো হয়। এই বিধান শ্রীশ্রীঠাকুরেরই বলে দেওয়া।
হঠাৎ আমার মনে হল,- আমি শ্রীশ্রীঠাকুরের চক্রফটো নয়,- শ্রীশ্রীআচার্য্যদেবের ফটো সামনে রেখে ধ্যান করার কথা দীক্ষার্থীদের শেখাব,- তা কিন্তু সম্ভব নয়। যদি তা করি,- তবে তা মহাপাতকের কাজ হবে।
তেমনি,- আসনে শ্রীশ্রীঠাকুরের কোন বয়সের, কোন ভঙ্গীতে বসা প্রতিকৃতি রেখে পূজা করব,- তাও নির্দিষ্ট করা আছে। আমি চাইলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের যেকোনো বয়সের যেকোন ফটো আসনে রাখার কথা অন্যান্যদের বলতে পারিনা। এটা সৎসঙ্গের প্রথা নয়।
আমার শ্রীশ্রীঠাকুরের একুশ বছরের বয়সের ছবিটা খুব ভাল লাগে,- তাই বলে এই ছবিটা বসিয়ে সৎসঙ্গ করার কথা সবার মধ্যে চাড়িয়ে দিতে পারিনা৷ আমার ভাল লাগে বলেই আমি নিয়ম ও প্রথার বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারিনা। আমার ব্যাক্তিগত ভাব অনুযায়ী চললেই তা ব্যত্যয় ডেকে আনবে। একটা সামান্য ব্যত্যয় ভবিষ্যতে আরো অনেক বড় বিকৃতিকে আমন্ত্রন জানাতে পারে।
মোদ্দাকথা,- সৎসঙ্গের মূল মন্ত্র হল,-" এক আদেশে চলে যারা, তাদের নিয়েই সমাজ গড়া। "
এই " এক আদেশ" আমরা বিনা প্রশ্নে মাথা পেতে পালন করি বলেই,- আজ সৎসঙ্গের এই ব্যাপ্তি, এত সংহতি লক্ষ করা যায়।
এই " এক আদেশ" টা কার আদেশ? অবশ্যই শ্রীশ্রীঠাকুরের আদেশ, শ্রীশ্রীআচার্য্যদেবের আদেশ অথবা শ্রীশ্রীঠাকুরের ফিলানথ্রপী থেকে প্রকাশিত নির্দিষ্ট কোন করনীয় আদেশ।
এই আদেশ হুবুহ পালন করাটাই আমাদের একমাত্র ধর্ম নয়কি? এই আদেশের অতিরিক্ত কিছু করাটা কি অনুচিত নয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর একবার এক ভক্তকে এক গ্লাস পানীয় জল আনতে বললেন। সেই ভক্তদাদা ভাবলেন,-" যা গরম পড়েছে!! জল নয়,- শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্য এক গ্লাস লেবু সরবত নিয়ে যাই৷ তাতে ঠাকুর খুব খুশী হবেন। "
সেই ভাব অনুযায়ী দাদাটি শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্য এক গ্লাস লেবু সরবত নিয়ে গেলেন। কিন্তু,- শ্রীশ্রীঠাকুর তার এই আচরনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। বললেন,-" আমি যা বলি এর অতিরিক্ত কিছু নিজের বুদ্ধি লাগিয়ে করতে যেও না। "
শ্রীশ্রীবড়দা একবার এক দাদাকে দশ আনার মুড়ি আনতে বললেন,- সামনে বসে থাকা কুকুরগুলির জন্য। সেই দাদা ভাবলেন,- " শুধু দশ আনার মুড়ি নেব? বিশ আনার মুড়ি নিয়ে যাই। " এই ভেবে তিনি বিশ আনার মুড়ি নিয়ে আসলেন।
শ্রীশ্রীবড়দা তা দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। বললেন-" আমি রোজ কুকুরগুলোকে দশ আনার মুড়ি খাওয়াই। তুই যে আজকে তাদের বিশ আনার মুড়ি খাওয়ালি,- তাতে তাদের লোভ বেড়ে গেল। কাল থেকে তারা বিশ আনার মুড়ির আশা করবে? আমি দশ আনার মুড়ি দিলে আমার উপর ক্রুদ্ধ হবে। "
ভক্ত দাদাটি নিজের বুদ্ধি ও ভাব প্রয়োগ করে শ্রীশ্রীবড়দার আদেশ পালন করতে গিয়ে তাঁর বিরক্তির কারন হলেন।
শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব একজন দাদাকে দায়ীত্ব দিয়েছেন, - রোজ সন্ধায় উনার সামনের বক্সের প্রনামীগুলি তুলে রাখার জন্য। দাদাটি ভক্তির আতিশয্যে শুধু প্রনামীগুলি তুলে রেখে ক্ষান্ত হননি। তিনি সেগুলো ভাল করে গুনে একদম গুছিয়ে সুন্দর করে রেখে দিলেন।
আচার্য্যদেব তা জানতে পেরে দাদাটির উপর ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন,-" আমি তোকে প্রনামীগুলি তুলে রাখতে বলেছি,- গুনে গুছিয়ে রাখতে বলিনি। আমি প্রতিদিন সন্ধায় কয়েকজন মা'কে এই প্রনামীগুলি গুনে গুছিয়ে রাখার কাজ দেই৷ আজ তাদের কি কাজ দেব? কাজ না পেয়ে তাদের মন খারাপ হবে। "
তাই ভাবের আতিশয্য দেখানোর কোন সুযোগ এখানে নেই। নিজের মনগড়া ভাব অন্যের উপর চাড়িয়ে দেওয়া অপরাধ।
"খামখেয়ালি ভাবে যা-ইচ্ছে করলে, যেমন-তেমন ভাবে করলে, বিশেষ করে সমষ্টিগত ভাবে যখন আমরা তাঁকে নিয়ে চলি, তখন কিন্তু খেয়াল-খুশি মতো চললে তা ব্যত্যয় ডেকে আনে। খামখেয়ালে চলার কোন অধিকার আমাদের নেই। নিজেদের মনগড়া রকমের সাধন-ভজন করা, যা ইচ্ছে করা, বা সেই করাতে অন্যকে সামিল করা, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করার কোন অধিকার আমাদের নেই। যারা এমন করেন, যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করেন নিজেদের মনগড়া রকমে চলার জন্য, তাদের বিভ্রান্তির মায়াজালে কেউ জড়িয়ে পড়বেন না।
প্রত্যেকটা করার পিছনে একটা তাৎপর্য রয়েছে, প্রত্যেকটা কাজেরই তাৎপর্য রয়েছে। সেই তাৎপর্য অনুযায়ী চলতে হয়, সেই ভাব অনুযায়ী চলতে হয়। ভাবের স্খলন হলে তখন কিন্তু প্রাপ্তির ভাঁড়ার শূন্য থেকে যায়। কিছুই পাওয়া হয় না। কেন না ভাবটাই তো নেই, ভাবহারা রকমে চললে কিছু হয় না।" ( সূত্র: আলোচনা'
জানুয়ারি ২০২২,পৃষ্ঠা : ৬৫২ এবং ৬৫৩)
সৎসঙ্গ কোন বারোয়ারী বিষয় নয়,- যে যেভাবে খুশী নিয়ম বানাতে লাগল। আচার্য্যদেব যে নির্দেশ দেন,- ফিলানথ্রপী থেকে সমগ্র সৎসঙ্গীদের উদ্দেশ্যে যে অফিসিয়াল বার্তা দেওয়া হয়,- হুবুহু তা পালন করাই আমাদের সকলের কর্তব্য।
যত বড় প্রভাবশালী লোকই হোকনা কেন,- যত ভারী দলই হোকনা কেন,- নিজেদের ভাব অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ভাল নয়। তা নিজেদের সংহতি ভাঙ্গনের কারন হয়ে দাড়াতে পারে। আর,- সংহতি নষ্ট করা মহাপাপ।
゚