17/08/2025
জয়রাম
🌹শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার ২৯৫তম আবির্ভাব তিথিতে তাঁর শ্রীচরণে শ্রদ্ধার্ঘ 🌹
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমীতে ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট (১৮ ভাদ্র, ১১৩৭ বঙ্গাব্দ) আবির্ভূত হন শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা। কলিকাতা থেকে কিছু দূরে তৎকালীন যশোহর জেলা আর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার বসিরহাটের অন্তর্গত কচুয়া গ্রামে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে।
বাবা ধর্মপ্রাণ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ রামকানাই ঘোষাল ছিলেন বড় সরল প্রকৃতির লোক, কিন্তু বিষয়বুদ্ধিতে বড় কাঁচা। সংসারে অভাব অনটন ও অস্বচ্ছলতা থাকলেও সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাঁর। দিনের বেশীর ভাগ সময় কেটে যেত তাঁর ইষ্টদেবের পূজা অর্চনায়। স্ত্রী কমলা-দেবীরও কোন বিষয় বুদ্ধি ছিল না। স্বামীর মত তিনিও ছিলেন ধর্মপ্রাণা। স্বামীর মত তাঁর অন্তরে ছিল গরীব দুঃখীদের প্রতি অসীম দয়া আর মায়ামমতা। এইভাবে তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে দিন কাটছিল রামকানাইয়ের।
সহসা একদিন রাত্রিতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলেন রামকানাই। দেখলেন, তুষারধবল দিব্যকান্তি এক জ্যোর্তিময় পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর সামনে। তাঁর অঙ্গ-বিচ্ছুরিত জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে অন্ধকার ঘরখানি। তাঁকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তিভরে তাঁর পাদ-বন্দনা করতে শুরু করে দিলেন রামকানাই। তখন সেই দিব্য-পুরুষ বললেন, আমি তোমার ভক্তিতে তুষ্ট হয়েছি। তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। অবিলম্বে আমি তোমার পুত্র হয়ে জন্মাব। এই কথা বলেই অন্তর্হিত হলেন সেই দিব্য-পুরুষ।
তাঁর একটি পুত্র সন্ন্যাসী হোক, রামকানাই এর মনের এই গোপন বাসনার কথা জেনেই যেন তাঁকে অভয় দিয়ে গেলেন সেই অন্তর্যামী মহাপুরুষ। ঘুম ভেঙে গেলেও মন থেকে গেল না সে স্বপনের আবেশ। এক অপার অপার্থিব আনন্দের আবেগে ভরে উঠল তাঁর সমস্ত মনঃপ্রাণ। কিন্তু সে স্বপ্নের কথাটা কাউকে বললেন না রামকানাই।
এ দিকে দিন-কতকের মধ্যেই আর একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল স্ত্রী কমলা-দেবীর জীবনে। বাড়ির গৃহদেবতা শিবলিঙ্গের একটি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল বাড়িতে। একদিন সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরঘরে শীতল বা সায়ংকালীন ভোগারতির জন্য পূজোর যোগাড় করছিলেন কমলাদেবী। এমন সময় আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, তাঁর সামনে শিবলিঙ্গের গা থেকে এক দিব্যব্জ্যোতি বার হয়ে দুর্বারবেগে ছুটে এসে প্রবেশ করল তাঁর শরীরে। এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন কমলাদেবী। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলে দেখলেন, স্বামীর কাছে শুয়ে আছেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে সব কথা বললেন স্বামী রামকানাইকে। রামকানাইও তখন সেই স্বপ্নের কথাটা খুলে বললেন স্ত্রীকে।
এই ঘটনার তিন চার মাস পর আবার সন্তানসম্ভবা হলেন কমলাদেবী। রামকানাই বুঝতে পারলেন, এবার মহাযোগী মহেশ্বর পুত্ররূপে ঘরে আসছেন তাঁর। একথা ভাবতেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তাঁর সর্বাঙ্গ। এক পরমানন্দে বিভোর হয়ে উঠল তাঁর অন্তরাত্মা। এর আগেও কয়েকবার গর্ভধারণ করেছেন কমলাদেবী। কিন্তু এবার গর্ভধারণের পর থেকে অনেক গুনে বেড়ে গেল তাঁর রূপ-লাবণ্য। এক দিব্য ভাবের দীপ্তি ফুটে উঠল তাঁর সর্বাঙ্গে। চোখ বন্ধ করলেই দিব্যদর্শন হয় অনেক সময়। হর্ষ, বিষাদ, শঙ্কা, উদ্বেগ প্রভৃতি ভাব-বিকার দেখা যায় মাঝে মাঝে। একদিন ঘরের মাঝে শুয়ে থাকতে থাকতে দেবাদিদেব মহাদেবকে দর্শন করলেন কমলাদেবী। পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম, সর্বাঙ্গে বিভূতি, নাগভূষণ, ত্রিলোচন, জটাজুটমন্ডিত মস্তক; ধুমর, পীত, শ্বেত, রক্ত ও অরুণ-এই পঞ্চবর্ণের পঞ্চমুখ। শিরে গঙ্গা, ললাটে অর্ধচন্দ্র। বৃষপৃষ্টে আরোহণ করে আছেন। একদিন শেষরাতের দিকে প্রসববেদনা উঠল কমলাদেবীর।আঁতুর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। গ্রামের ধাত্রীকে ডেকে আনা হলো প্রসব করানোর জন্য। শেষরাতে ব্রাহ্মমুহূর্তে দেবশিশুর মত অনিন্দ্যসুন্দর এক পুত্র সন্তান প্রসব করলেন কমলাদেবী। আবির্ভূত হলেন শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা।
বাংলা ১১৪৮ সালে একই দিনে লোকনাথ ও তাঁর বাল্য বন্ধু বেণীমাধবের উপনয়ন হয় কচুয়া গ্রামের বাড়ীতে। তখন তাঁর বয়স ছিল এগার এবং বেণীমাধবের তের। উভয়ের আচার্য্য গুরু ছিলেন দেশ বিখ্যাত মহা-পণ্ডিত, মহান জ্ঞানযোগী ও কর্মযোগী ভগবান গাঙ্গুলী।
ক্রমশঃ
জয় শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা।