15/02/2025
গোকুলে শ্রীকৃষ্ণের শৈশব লীলা নন্দলালের মধুর ক্রীড়ার মহিমা।
শ্রীকৃষ্ণের গোকুলের শৈশব লীলা এক অপূর্ব মহিমার অধ্যায়। ভগবান স্বয়ং যখন নন্দগৃহে শ্রীযশোদার কোলে কিশোররূপে প্রতিপালিত হলেন, তখন গোকুল যেন স্বর্গের থেকেও আনন্দময় হয়ে উঠল। এই লীলার মাহাত্ম্য শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও অন্যান্য বৈষ্ণব গ্রন্থে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ যে শুধুমাত্র নন্দ-যশোদার সন্তান ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন ব্রজের সকলের প্রাণপ্রিয়, যাঁর এক একটি ক্রীড়া সবার হৃদয়ে অপরিসীম আনন্দের সঞ্চার করত।
যখন কৃষ্ণ প্রথমবার হামাগুড়ি দিতে শুরু করলেন, তখন গোটা গোকুল যেন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। নন্দভবনে সবার মনে হয়েছিল, এই ছোট্ট শিশু যেন স্বয়ং মাধুর্যের আধার। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে যে কৃষ্ণের কোমল পদক্ষেপ দেখে ব্রজের গোপিনীরা মোহিত হয়ে যেতেন। তাঁর ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার দৃশ্য দেখে যশোদার মনে অদ্ভুত এক মাতৃত্বের আবেগ জাগত। কৃষ্ণ যখন হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন, তখন তাঁর কোমরে বাঁধা ঘণ্টাগুলি এক অপূর্ব সঙ্গীত সৃষ্টি করত, যেন মৃদঙ্গের মৃদু নিনাদ। গোপিনীরা একে অপরকে ডেকে বলতেন, "দেখো, আমাদের নন্দলাল হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে, তাঁর কোমরের ঘণ্টাধ্বনি যেন বৃন্দাবনের সুরম্য বাতাসে মিশে এক অপূর্ব সঙ্গীত তৈরি করছে।"
যশোদা মাঝে মাঝে দেখতেন, কৃষ্ণ হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন, আর গোপালেরা তাঁকে ঘিরে খেলা করছে। কেউ তাঁকে কোলে তুলে নিচ্ছে, কেউ তাঁর ছোট্ট নরম হাত ধরে টানছে, কেউ আবার তাঁর গোপনীয় মৃদু হাসির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছে। যশোদা কৃষ্ণকে ডাক দিতেন, "লালা, ফিরে এসো, তুমি বাইরে গেলে আমি ভয় পাই।" কৃষ্ণ তখন ফিরে তাকিয়ে যশোদার দিকে এমন এক মিষ্টি হাসি দিতেন, যাতে তাঁর মা সমস্ত ভীতি ভুলে যেতেন।
একদিন গোপিনীরা যশোদার কাছে এসে অভিযোগ করলেন, "তোমার ছেলে খুব দুষ্টু হয়ে উঠেছে! সে হামাগুড়ি দিয়ে আমাদের ঘরে ঢুকে হাঁড়ি থেকে দই চেটে খেয়ে নেয়, আর আমাদের বাঁদরদের সাথে নিয়ে মাখন চুরি করে!" যশোদা অবাক হয়ে বললেন, "আমার ছেলে এতটুকু, সে কীভাবে হাঁড়ি থেকে দই-মাখন নামাবে?" গোপিনীরা হাসলেন, "তুমি বুঝতে পারছো না মা! সে এত চালাক যে আমাদের ঘরের গরুর দড়ি ধরে টেনে হাঁড়িগুলো নামিয়ে নেয়, তারপর বাঁদরদের সাথে ভাগ করে খায়!" যশোদা শুনে মৃদু হেসে বললেন, "আচ্ছা, আমি দেখে নেবো।"
পরের দিন যশোদা দেখলেন, কৃষ্ণ সত্যিই গোপিনীদের ঘরে গিয়ে হাঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাঁর চারপাশে বাঁদরের দল ভিড় করে আছে। কৃষ্ণ হাঁড়ি থেকে মাখন নামিয়ে নিজের হাতে খাচ্ছেন, আর মাঝে মাঝে বাঁদরদেরও দিচ্ছেন। যশোদা দেখেই বুঝলেন, এই ছেলে কিছুতেই ধরা দেবে না। তিনি চুপিচুপি পেছন থেকে গিয়ে কৃষ্ণকে ধরতে গেলেন, কিন্তু কৃষ্ণ তাঁর মিষ্টি হাসি দিয়ে দৌড়ে পালালেন। যশোদা তাঁর পেছনে ছুটলেন, কিন্তু কৃষ্ণ তো মহাবলশালী! তিনি সারা বাড়ি দৌড়ালেন, আর যশোদা তাঁকে ধরতে পারলেন না।
অবশেষে যশোদা যখন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেন, তখন কৃষ্ণ নিজে ধরা দিলেন, এবং কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললেন, "মা, আমি আর কখনো দুষ্টুমি করবো না!" যশোদা কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিলেন এবং গভীর ভালোবাসায় বললেন, "আমার লালা, তুমিই আমার জীবন। তুমি যদি চাও, তাহলে পুরো গোকুলের সমস্ত মাখন তোমাকে দেবো, কিন্তু আমাকে এভাবে দৌড়াতে বোলো না!" কৃষ্ণ তখন যশোদার গলায় জড়িয়ে ধরে হাসলেন, আর যশোদার হৃদয় এক অপূর্ব প্রেমে ভরে উঠল।
কৃষ্ণ যখন একটু বড় হলেন, তখন তিনি তাঁর সখাদের নিয়ে গোকুলের পথে পথে খেলতে বেরোতেন। সকাল হতেই তিনি বলরামের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন, আর তাঁর পিছু পিছু আসত ব্রজের সমস্ত গোপবালক। গোকুলের গরুগুলি তাঁদের চারপাশে ঘুরে বেড়াত, আর কৃষ্ণ মাঝেমাঝেই গরুর বাছুরদের পিছনে ছুটতেন। তিনি কখনো নদীর ধারে বসে নুড়ি কুড়িয়ে খেলতেন, কখনো বা গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন। বাঁশির সুর শুনে গোপিনীরা তাদের কাজ ফেলে রেখে একে অপরকে বলতেন, "শোনো, কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছে! এই সুর যেন স্বর্গের গান!"
একদিন গোপবালকদের সঙ্গে কৃষ্ণ খেলা করছিলেন, তখন হঠাৎ একদল গরু ভয় পেয়ে ছুটে পালাতে লাগল। গোপবালকরা আতঙ্কে চিৎকার করে বললেন, "কৃষ্ণ! আমাদের গরুগুলো ভয় পেয়েছে, তারা পালিয়ে যাচ্ছে!" কৃষ্ণ মৃদু হাসলেন এবং বললেন, "ভয় পেও না!" তিনি শুধু তাঁর কোমল কণ্ঠে ডাক দিলেন, "হে গাভীরা, ফিরে এসো!" সেই মুহূর্তেই সমস্ত গরু থেমে দাঁড়াল এবং ধীরে ধীরে কৃষ্ণের দিকে ফিরে এল। গোপবালকরা বিস্মিত হয়ে গেলেন, তাঁরা ভাবলেন, "কৃষ্ণ তো সত্যিই অসাধারণ!"
এইভাবে শ্রীকৃষ্ণের গোকুলের শৈশব লীলা একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করছিল। তিনি কখনো দুষ্টুমিতে মাতিয়ে রাখতেন, কখনো তাঁর মায়াবী হাসিতে সকলের হৃদয় জয় করতেন, কখনো বা তাঁর গভীর প্রেমে সকলকে আকৃষ্ট করতেন। ব্রজের প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি নদী, প্রতিটি গোপ-গোপিনী, এমনকি পশুপাখিরাও কৃষ্ণের এই মধুর শৈশব লীলায় মোহিত হয়ে থাকত। শ্রীমদ্ভাগবত বলে যে, যখন ভগবান শিশু রূপে লীলায় প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর প্রতিটি আচরণই মহাযোগীদের ধ্যানের বিষয় হয়ে ওঠে।
এই গোপাল লীলার মাহাত্ম্য অসীম। কৃষ্ণের প্রতিটি শৈশব লীলা কেবল আনন্দ ও কৌতুক নয়, এতে নিহিত রয়েছে পরম তত্ত্ব। ভক্তরা যখন এই লীলাগুলোর স্মরণ করেন, তখন তাঁদের হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেমের অনুরাগ জন্ম নেয়। গোকুলের সেই আনন্দময় দিনগুলো আজও ব্রজভূমির বায়ুতে প্রতিধ্বনিত হয়, আর ভক্তদের হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের শৈশব লীলা চিরকালীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।
゚ ゚ ゚ #সবাই