26/06/2026
সবার জীবন সমানভাবে চলে না | চড়াই উতরাইয়ের পথে পথে চলতে গিয়ে অনেককেই ক্ষতবিক্ষত হ'তে হয় | পরিবারের কাছ থেকে সঠিক শিক্ষা আর পোষন না পাওয়ার ফলে অনেকের জীবনই ছন্নছাড়া হয়ে ওঠে| জীবনের উত্তম সময় যৌবনকালেই জীবন বিষাক্ত হয়ে ওঠে| আবার অনেকে চেষ্টা করেন নিজের ভুলকে শুধরে নিয়ে অমৃতের পথে যাওয়ার জন্য |
সেদিন নাটমণ্ডপে এমনই এক ভাল - মন্দ, দ্বিধাদ্বন্দময় পথের পথিকের জীবন - কাহিনীর উন্মেচন হ'ল | ২৫/২৬ বছরের একটি মেয়ে জীবন - সংগ্রামে পরাজিত হয়ে আচার্য্যদেবের কাছে দিশা - প্রার্থনায় এসেছে | বর্ণগত দিক থেকে সে উচ্চ, কিন্তু গত দু'বছর ধরে নিম্ন বর্ণের একটি ছেলেকে ভালোবেসে এসেছে | এখন ছেলেটা তার জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে | সে এটা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না মনে কিছুটা অনুতপ্ত | তারপরেও কষ্টকে বুকে চাপা দিয়ে সে ঠাকুরের কাজে যুক্ত রাখতে চায় | আচার্য্যদেবের কাছে প্রার্থনা করছে ----- এখন কী করা যায় ?
আচার্য্যদেব সব শুনে সেই মেয়েটিকে বললেন ----- এটা তো তোর জীবনের পক্ষেও আশীর্বাদ, ছেলেটার জীবনের পক্ষেও আশীর্বাদ | ঠাকুরের কাজ করতে চাইছিস, খুব ভালো | সব সময় ঠাকুরের কথা ভাববি, ছেলেটার কথা ভাববি না | ভালবাসা মানে কি শুধু আমার মত করে পাওয়া ? ভালোবাসাতে যদি ছেড়ে ভালো থাকতে পারে, তাকেই যদি ভালবাসি তো সে যাক চলে |
বেদনাহত মেয়েটি জানায়, তার পরিবার তাকে আর বাড়িতে রাখতে চাইছে না, বিয়ে দিতে চাইছে |
আচার্য্যদেব বললেন ----- বাড়িতে বলবে, আমার এখন আর বিয়ে করার অবস্থা নেই |
একটু থেমে মেয়েটিকে বললেন ---- আসলে তুই ছয় বছর ধরে বাড়ির লোককে জ্বালিয়েছিস্ | তুই চিনি হয়ে যা দেখি | দুধে মিশে যাবি, তোর চাহিদা থাকবে | তা না করে তুই লঙ্কার গুঁড়ো, নুনের গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিস | চিনি ছাড়া দুধ কেউ খেতে চায় না | সেই ভাবে বাড়ির লোককে বলতে হবে
শুরু থেকেই মেয়েটির মুখাবয়বে বিষাদের ঘন ছায়া | আচাৰ্য্যদেব মেয়েটিকে বললেন ----- তুই হাসতে পারিস্ না ? একটু হাস্ তো দেখি | মেয়েটির মুখে কোনরকম হাসির অভিব্যক্তি দেখা গেল না | তখন তিনি তাকে বললেন ----- তাহলে তুই একটু কাঁদতো দেখি |
মেয়েটি নিজেকে আর সংবরন করতে পারল না | দু' হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠল | পরিবেশ মূহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় | বেশ কিছু সময় ধরে কান্নার মধ্য দিয়ে মনের মধ্যে জমে থাকা চাপা কষ্ট যেন গলে পড়তে থাকে | একসময় মেয়েটির কান্না থামে , চোখের জল মোছে |
আচার্য্যদেব বললেন ------- দেখলি, মনটা একটু হালকা হ'ল না! আমাদের যখন কোন প্রিয়জন বিয়োগ হয়, তখন আমরা হাউ হাউ করে কাঁদি, ফলে তার প্রতি আমাদের মায়া - মোহ কিছুটা বাস্তবতায় ফিরে আসে | ছেলেটা কেন পালালো, সেটাও তো ভাবতে হয় | মনে হয় তোর হাসিটা নিশ্চয়ই ভালো নয়, হাসতো একটু দেখি |
মেয়েটি হাসতে চেষ্টা করে, মুখে তার সমান্য হাসির রেখা ফুটে ওঠে মাত্র | আচাৰ্য্যদেব তা দেখেই বলে উঠলেন ------- যাই হোক, একটু কাষ্ঠহাসি তো অন্তত দিলি | এ হাসিটা মোনালিসার মত |
যারা এতক্ষন ধরে আমাদের সংসারে নিত্য ঘটে চলা এই অতিবাস্তব খন্ডচিত্র দেখছিলেন, তারা এবার সকলেই আচার্য্যদেরের মিষ্টিমধুর রসিকতায় হাসতে থাকেন | কিছুক্ষন আগের থমথমে পরিবেশ অবার মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর হয়ে উঠে | মেয়েটি জনায় ছ' বছর ধরে এতদূর এগিয়েছে, এখন সে কিভাবে পিছোবে | আচার্য্যদেব তাকে বললেন ---- দেখ এগোনো, পিছনো কিছু না | পৃথিবীতে যদি জাগতিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে দেখি, দেখা যায় সেখানে দুটো জিনিস আছে ----- টাইম আর স্পেস | সময় হচ্ছে তুমি যে সময়টাতে যেখানে ছিলে, সেটাই সময় | তুমি যদি বলো ২০১১ - ১২, সেটা শুধুমাত্র কল্পনা | উত্তর - দক্ষিণ এসব আমাদের কল্পনা মাত্র | বিশ্বে না আছে কোন উত্তর - দক্ষিণ, না আছে কোন পূর্ব - পশ্চিম | একটি গোলাকার বলের কি দিক আছে ? আমরা নিজেদের সুবিধার জন্য একটা নির্ধারণ করে থাকি | ব্রহ্মাণ্ডের এই অখন্ডস্পেস আর টাইমই আমাদের উপস্থিতি নির্ধারণ করে | তুই আর আমি হযে আছি, তা টাইম আর স্পেসই নির্ধারন করে | আর যেদিন শরীরটা থাকবে না, সেদিন টাইম আর স্পেস- এরও কোন ভূমিকা থাকবে না |
আচার্য্যদেব বিভিন্নভাবে মেয়েটিকে জীবন আর এই ভৌতিক পরিবেশ সম্পর্কে নানান অমিয় উপদেশ দিতে লাগলেন, যা' উপস্থিত সকলের কাছে অমূল্য সম্পদ | তিনি বলে চলেছেন ---- তোর্ থেকে আমরা জন্মাই, তোর একটা শক্তি | তুই পিঁপড়ের মত জীবন বেছে নিয়েছিস, তাই পিঁপড়ে হয়েছিস্ | তুই যদি ভাবিস্ যে আমি মা দুর্গা হয়ে যাব, তুই হবি | যেটা হতে চাইবি হতে পারবি| আমরা হতে গিয়ে ভয় পাই যে, আমি এটা হয়ে গেলে তো অন্যরকম হয়ে যাব! আমরা নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি না | ভগবানের বিশ্বাস অনেক বড়, ঠাকুরের বিশ্বাস অনেক | আমি যে পারি এই ভাবনাটাই আমার কাছে থাকে না | সেই জন্য আমরা পারি না, হেরে যাই | আর, তুই যদি মনে করিস্ দূর! কোন ছেলে , কে কার! আমি আমার জীবনের, আমি আমার ঠাকুরের , তখন দেখবি যে তোর্ জীবনটা অনেক এগিয়ে গেছে | ছেড়ে দে ওকে ওর মত | বলবি তুই যেখানে আছিস, ভালো থাক | তোর জন্য আমার অশির্বাদ রইল | এইরকম করে ভাব, তুই যখনই এরকম করে ভাবতে পারবি, দেখবি যে তোর মনটা বড় হয়ে গেছে | তুই ওকে একদম ক্ষমা করে দে | ক্ষমতাশীল হয়ে ওঠ, মনে মনে ভাববি যে, আমি তোর দ্বারা আর আহত হই না, অভিভূত হই না | এতটা সময় আমার কাছে নেই তোকে ভাববার | আমার সময় আছে যাতে আমি ঠাকুরকে নিয়ে পাগলপারা হতে পারি |' আমি অসীমের আধিকারী' ---- এটা যেদিন তুই ভাবতে পারবি, সেদিন তুই বিশ্বাস করবি ভেতর থেকে, সেদিন তোর মধ্য দিয়েই তিনি প্রকাশিত হবেন, এটাই নিয়ম |
এগিয়ে যেতে হবে | আমি তো ঠিক পথে আছি ঠাকুরকে ধরে | তুই কি পারবি না ? নতুন সাইকেল চালালে প্রথমে একটু টালমাটাল করে | এগিয়ে যা, ভয় পাবি না | আর ভাববি না যে আমি হেরে যাব | সব সময় মনে করবি আমি জিতব |
বহুদিনের চাপা বেদনার ভারাক্রান্ত মনের ক্ষতে আচার্য্যদেব পরম স্নেহে শান্তির প্রলেপে দেন | তিনি মেয়েটিকে আবার বলেন ----- মহাভারতে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হচ্ছে , তাতে তুই যদি অর্জুন হবি, তাহলে তোর সাথে কৃষ্ণ আছে | এগিয়ে চল্ |
মেয়েটির মুখে এতক্ষনে সত্যিই হাসির রেখা ফুটে উঠেছে | সে প্রনাম করে বিদায় নেয় | সে পিছন ফিরে তাকালে দেখতে পেল এতক্ষন বসে যারা তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবকিছু শুনছিল, তাদের মুখেও স্বস্তিপূর্ণ হাসির রেখা |
~শ্রীশ্রী আচার্য্যদেব।