18/08/2026
‘তাঁর ভালোবাসা থেকে যাবে’—চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লীর ৪৩তম দুর্গোৎসবে ‘অন্তরালে’ এক নীরব যোদ্ধার গল্প
নিজস্ব সংবাদদাতা , হাওড়া, ১৫ আগস্ট ২০২৬:
শারদোৎসব এখনও বেশ কিছুটা দূরে। কিন্তু ইতিমধ্যেই পুজোর প্রস্তুতি ও ভাবনার প্রকাশ শুরু হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন পুজো কমিটির। সেই তালিকায় এবার বিশেষ নজর কাড়ছে চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লী সাধারণ দুর্গোৎসব সমিতির ৪৩তম বর্ষের শারদীয় দুর্গোৎসব। এবারের পুজোর ভাবনা—‘অন্তরালে’। আর সেই ভাবনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটি আবেগঘন বার্তা—‘তাঁর ভালোবাসা থেকে যাবে’। পুজো কমিটির প্রকাশিত পোস্টারে এবারের থিমের যে উপস্থাপনা দেখা গিয়েছে, তাতে প্রথম দর্শনেই বোঝা যায়—এটি শুধুমাত্র চোখ ধাঁধানো মণ্ডপসজ্জার আয়োজন নয়; বরং একটি গল্প, একটি অনুভূতি এবং সমাজের আড়ালে থাকা মানুষের ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস। উন্মুক্ত পোস্টারের পটভূমিতে পুরনো দিনের আবহ, মানুষের ছায়ামূর্তি এবং একটি ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ির প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই দৃশ্যায়ন ‘অন্তরালে’ ভাবনার সঙ্গে একটি স্মৃতিমেদুর পরিবেশ তৈরি করেছে। মূল ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক মানুষের উপস্থিতি, যিনি হয়তো সামনে থেকে আলোচনায় থাকেন না, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও অবদান অন্যদের জীবনকে প্রভাবিত করে যায়। বর্তমান সময়ে দুর্গাপুজোর থিম বলতে অনেক সময় চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য, প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক বার্তার কথা সামনে আসে। চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লীর এবারের ভাবনা সেই জায়গায় কিছুটা আলাদা। এখানে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে দৃশ্যমানতার বাইরে থাকা মানুষকে।
‘অন্তরালে’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে আড়ালে থাকা, নেপথ্যে থাকা এবং নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়ার ইঙ্গিত। পোস্টারে লেখা ‘তাঁর ভালোবাসা থেকে যাবে’ বাক্যটি সেই ভাবনাকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে। অর্থাৎ, যাঁরা জীবনের মঞ্চে সবসময় সামনে থাকেন না, তাঁদের অবদান যে কখনও মুছে যায় না—এবারের পুজোয় সেই অনুভূতিকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার প্রয়াস থাকছে। আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিমা রূপায়ণের দায়িত্বে রয়েছেন ভাস্কর কালাচাঁদ রুদ্র পাল। পুজোর ভাবনা ও সৃজনে রয়েছেন দ্বিজেন। গোটা আয়োজন পরিচালনায় রয়েছে পল্লীবাসী। পুজোর আলোকসজ্জার দায়িত্বে রয়েছেন দেবব্রত মণ্ডল (রাজা) এবং আবহ পরিকল্পনায় রয়েছেন দেবব্রত চক্রবর্তী। ফলে প্রতিমা, মণ্ডপ, আলো এবং আবহ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘অন্তরালে’ ভাবনাটিকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
এবারের পোস্টারেই তার কিছুটা ইঙ্গিত মিলেছে। মাটির রঙের আবহ, পুরনো দিনের দৃশ্য, মানুষের ছায়া এবং ঘোড়ার গাড়ির প্রতিকৃতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নস্টালজিক পরিবেশ। এই ধরনের দৃশ্যায়ন দর্শককে শুধু মণ্ডপ দেখাবে না, বরং ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করবে। থিমের নামটি বিশাল অক্ষরে সামনে রেখে তার পেছনে মানুষের জীবনের নানা মুহূর্তের মতো দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ‘অন্তরালে’ যেন শুধু একটি শব্দ নয়, বরং গোটা পুজোর গল্পের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছে। চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লী সাধারণ দুর্গোৎসব সমিতির এবারের আয়োজন ৪৩তম বর্ষে পা দিয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় চলে আসা এই পুজো এবারও স্থানীয় ঐতিহ্যকে ধরে রেখে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে। পুজো কমিটির প্রকাশিত প্রচারপত্রে স্থানীয় সহযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার উল্লেখও রয়েছে। পোস্টারে হাওড়া সিটি পুলিশ-এর সৌজন্যের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সহযোগী সংগঠনের লোগোও স্থান পেয়েছে।
চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লী দুর্গা মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে এবারের দুর্গোৎসব। পুজো কমিটির তরফে ইতিমধ্যেই প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে। ৪৩তম বর্ষের পুজোর ভাবনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, চন্দ্রবাটি দক্ষিণপল্লীর এবারের দুর্গোৎসবের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে ‘অন্তরালে’। যে মানুষটি হয়তো প্রচারের আলোয় নেই, তাঁর ভালোবাসা ও অবদানই যে শেষ পর্যন্ত থেকে যায়—এই বার্তাকেই যদি মণ্ডপের শিল্পরূপে যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়, তাহলে পুজোটি দর্শনার্থীদের কাছে শুধু দর্শনের নয়, অনুভবেরও একটি জায়গা হয়ে উঠতে পারে। শারদীয়ার দিন যত এগিয়ে আসবে, ‘অন্তরালে’র সেই নেপথ্যের গল্প কতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুজোপ্রেমীরা। অনুষ্ঠানের মঞ্চে সাংস্কৃতিক আবহে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঙ্গীতশিল্পী দেবকুমার অধিকারী এবং বাড়তি পাওনা হিসাবে মনোজ্ঞ নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশন হয়।