22/03/2026
** শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দীক্ষানুচলন **
।। সিদ্ধ নয় মন্ত্র দেয়/মরে, মারে করেই ক্ষয় ।।
**************************
আমাদের আর্য্যকৃষ্টি অনুযায়ী যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও দান আর্য্য হিন্দুদের সর্ববর্ণের স্বাভাবিক ধর্ম বা নিত্যকর্ম। বিপ্রবর্গের জন্য প্রতিগ্রহ বিশেষ ধর্ম। বর্তমান পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আর্য্য হিন্দুদের বিশুদ্ধ নিত্যকর্ম বা পালনীয় পূজা বা ধর্মের, যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়ণী ও সদাচার নামের পঞ্চনীতিতে সর্বজনীন নবীকরণ করলেন।
এবং আর্য্যকৃষ্টির ষটকর্মের বাস্তব অনুচলন প্রসঙ্গে বললেন,---
"যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, দান, প্রতিগ্রহ-
এই ষট্ কর্ম
তোমার স্বভাবে যেন পূত হয়ে বসবাস করে---
যজন মানে নিজে অভ্যাস করা,
যাজন মানে
অন্যকে অভ্যাস করতে উদ্বুদ্ধ করে তোলা,
অধ্যয়ন মানে আয়ত্ত করার পথে চলা
অধ্যাপনা মানে মানুষ যাতে আয়ত্ত করতে পারে,
তাতে তা'দিকে প্রবুদ্ধ ও ক্রিয়াশীল করে তোলা
দান মানে সদুপায়ে যেমন করে পার
লোকের বেদনাপ্রদ না হয়ে
মানুষের জীবনীয় পূরণ-পোষণী যা কিছু
তা দিতে প্রস্তুত থাকা---
নিজের অস্তিত্বকে সলীল-সম্বেগী রেখে,
প্রতিগ্রহ মানে---
মানুষ শ্রদ্ধাবনত অন্তঃকরণে যা তোমাকে দেয়
প্রসন্নচিত্তে তা গ্রহণ করা।"
(আর্য্য প্রাতিমোক্ষ ১১)
এই বাণীর মধ্যে কোথাও কি অধমাধম বাহ্যপূজায় পৌরহিত্য করার কথা বলা হয়েছে? যিনি আচরণ দ্বারা জানান, তিনি যদি আচার্য্য হন, সেই আচার্য্যরূপী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কি কখনো আচরণ দ্বারা বাহ্যপূজা অনুষ্ঠিত করেছেন, না করার নিদেশ দিয়েছেন ? যদি দিয়ে থাকেন, কোন্ শ্রুতিবাণীতে দিয়েছেন কোন ভক্তজন জানালে বাধিত হবো।
আমার জানা মতে, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের আবশ্যিক পালনীয় প্রাথমিক বিষয়সমূহ বা পূজার অর্ঘ্য বা পূজার উপাচার--- অভক্ষ্যভোজী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনাদি তামসিক আহার করা যাবে না। যারা করেন, আর্য্য হিন্দুমতে তাদের অভক্ষ্যভোজী বলা হয়েছে। অগম্যাগামী হওয়া যাবে না। অর্থাৎ যারা প্রতিলোম, সগোত্র এবং সপিণ্ড সম্বন্ধীয়দের সাথে অবিধি পূর্বক ধর্মবিরুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে কামাচার করে, হিন্দুমতে তাদের অগম্যাগামী বলা হয়েছে। এরা কদাচারী, এদের প্রদত্ত আহার ও পানীয় অশুদ্ধ। (দ্রঃ সম্বিতী)
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য হতে হলে, তাঁর পূজার অধিকারী হতে হলে,---
"ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন
চলাফেরায় জপ
যথাসময়ে ইষ্ট নিদেশ
মূর্ত্ত করাই তপ।"-এর অনুশাসন মেনে চলতে হবে।
এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন---ঊষানিশায় মন্ত্রসাধন চলাফেরায় জপ, যথাসময় ইষ্টনিদেশ মূর্ত করাই তপ। এই এতটুকু যদি অভ্যাসের মধ্যে আসে, তাতেই অনেকখানি হয়। ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান কিছুই বিশ্বমনের অগোচর নয়। ইষ্টের সঙ্গে যার চলা, বলা, ভাবার tuning (সমতানতা) হয়, তার মনের উপর বিশ্বমনের আলো অল্পবিস্তর প্রতিফলিত হয়। আর, সেই আলোর ঝলকে সে অনেক-কিছু দেখতে পায়। তাছাড়া, পশ্চাদপসারিণী চিন্তা করতে-করতে পূর্বের অনেক জিনিস প্রতিভাত হয়।
(আঃ প্রঃ একাদশ খণ্ড, পৃঃ ৯৩)
আর চলাফেরায়, কাজকর্মের সময়েও অহর্নিশ নাম জপ করতে হবে। এই হচ্ছে এই যুগের জন্য সহজ সাধনার পদ্ধতি।
দীক্ষিত জীবনকে সার্থক করতে হলে ঊষা-নিশায় কমপক্ষে ৪৫ মিনিট করে মন্ত্রসাধন করতে হবে। তবে পরিতাপের বিষয়, উৎসব অঙ্গনগুলোতে ওই মন্ত্রসাধন অভ্যাসের অনুশীলন উপেক্ষিত হয়। ব্রাহ্মমুহূর্ত শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত অনাহত নাদ-সাধন বা মন্ত্র সাধনের নির্ধারিত সময় হওয়া সত্বেও ঊষা-মাঙ্গলিকী নামের উচ্চগ্রামের শব্দের
আহত নাদে ব্যাহত হয় শ্রীশ্রীঠাকুর নিদেশিত দৈনন্দিন সাধনার প্রধান পর্ব।
ব্রাহ্ম মুহূর্তে মন্ত্র সাধনের পর
আহ্বানীসহ সন্ধ্যা ও প্রার্থনা করতে হবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের 'চলার সাথী' গ্রন্থের ৯৯ সংখ্যক বাণীতে বলা আছে---
"সন্ধ্যা ও প্রার্থনা হইতে বিরত হইও না,
আর, ইহা ভাবমধুর করিয়া বোধের সহিত আকুল সম্বেগে যতই করিতে পার,
ততই তোমার মনকে উদ্দীপ্ত ও পবিত্র করিয়া,
স্বাস্থ্য ও চরিত্রকে উন্নত করিয়া তুলিবে;---
ফলে সেবা, ঐশ্বর্য্য---
ব্যবহার ও কর্ম্মপটুতায়
অনুষিক্ত হইয়া তোমাকে অভিনন্দিত
করিবে---সন্দেহ নাই।''
(এই বাণীতে বিনতীর কথা উল্লেখ নেই, অথচ আমরা প্রার্থনার নামে অন্য সংগঠনের বিনতি করে চলেছি। যা পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আদর্শের পরিপন্থী!)
আমাদের সন্ধ্যামন্ত্র (দ্রঃ 'প্রার্থনা' নামাঙ্কিত পুস্তক, সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউস, দেওঘর।) যা' আছে গায়ত্রী, প্রাণায়াম বাদ দিয়ে---সেগুলি congregational (সমবেত) প্রার্থনা-হিসাবে চলতে পারে। ভাবের প্রতি নজর রেখে অর্থবোধ নিয়ে ঐগুলি পাঠ বা আবৃত্তিতে এবং একটা পাঠের পর চোখ বুজে একটু চিন্তায়, মন---এমন-কি শরীর পর্য্যন্ত কেমনতর হ'য়ে ওঠে, কিছুদিন একটু করলেই হাতে-হাতে বোধ করতে পারা যায়। ভাবের সহিত ঐ শব্দগুলি উচ্চারণে এতই তীব্রতা ও enlightenment এনে দেয় যা'তে নাকি পারিপার্শ্বিক-সহ সমস্ত জীবনটাই কেমনতর জীবনে মুহূর্তে যেন উদ্বুদ্ধ হ'য়ে ওঠে। গায়ত্রী ও প্রাণায়াম বাদ এই জন্য বললাম---ইহা জপ চিন্তার সহিত meditation-এর জন্য, তাই উহা নিরিবিলি হ'য়ে করতে পারলেই ভাল। (নানা প্রসঙ্গে ৩য় খণ্ড, প্রার্থনা)
নানা প্রসঙ্গে গ্রন্থ পাবনায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রার্থনার ক্রম-এর অজুহাতে ওই নিদেশ আমরা উপেক্ষা করে চলেছি। যিনি পাবনাতে সর্বজনীন সমবেত বিধান দিয়েছেন, সেই তিনি কি দেওঘরে এসে সেই বিধান পরিবর্তন করতে পারেন? যিনি সত্যানুসরণে বলেছেন, " ইতর জন্তুরাও আজ যা' বোঝে, কাল তা' ভোলে না......"---!---- আর একটা বিষয়, পুরুষোত্তম হলেন বিশ্ব শিক্ষক। তিনি বিধান প্রণেতা যদি হয়েই থাকেন, সেই তিনি, অন্য কোন সাধকের রচিত উপাসনা পদ্ধতি নিজের শিষ্যদের মধ্যে প্রচলন করবেন? অথচ, আমরা তাই করে চলেছি, তাঁর রচিত সন্ধ্যা ও প্রার্থনা মন্ত্র পরিহার করে আগ্রা সৎসঙ্গের বিনতীকে নিত্য উপাসনায় স্থান দিয়েছি!
* * *
তারপর নিয়ম মেনে ইষ্টভৃতি (দিন গুজরানি আয়ের মাধ্যমে ইষ্টনীতির ভরণ) করতে হয়। নিয়ম করে কমপক্ষে ৩ বার শবাসন (অধিবেশন বা উৎসবে যার অনুশীলন উপেক্ষিত।) প্রভৃতির নিত্য-সাধন করতে হবে। সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হবে। শারিরীক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ভাবে সদাচারী হতে হবে। বর্ণাশ্রম ধর্ম মেনে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। কারো বৃত্তিহরণ করা চলবে না। ‘পঞ্চবর্হিঃ’ এবং ‘সপ্তার্চ্চিঃ’-র বিধান মেনে চলতে হবে, সকলকেই।---তাহলেই সে একজন আর্য্যহিন্দু রূপে পরিগণিত হবেন। ওই নিয়মাবলী, ওই বিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমের নাম দীক্ষা গ্রহণ করা।
যাঁরা এস. পি. আর., পি. আর. উপাধির বলে দীক্ষা সঞ্চারণা করেন, তাঁরা যজমানদের দিয়ে ‘‘এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়া আমি সর্বান্তকরণে শপথ করিতেছি যে---মানুষের জীবন ও বৃদ্ধির পরম উদ্ধাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করাই এইক্ষণ হইতেই আমার জীবনের যজ্ঞ হউক। ......’’ ইত্যাদি উচ্চারণ করিয়ে সংকল্প-শপথ গ্রহণ করান। এবং দীক্ষাপত্রের ২টি স্তবকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এর উদ্দেশ্য যজমান যা’তে শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শ মেনে চলে তারজন্য একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাপত্র স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর প্রদত্ত। দীক্ষাদাতার কর্তব্য, দীক্ষা গ্রহিতাকে শ্রীশ্রীঠাকুরের উপরোক্ত আদর্শের বিষয়ে সম্যকভাবে অবগত করিয়ে দীক্ষা দান করা। তা’ না করিয়ে দীক্ষাদাতা যদি তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারেণ মন্ত্র দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেয়, তাহলেই মুশকিল। কপটাচার এবং দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে। সেই প্রবহমানতা চলছে। যারফলে বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করেন, সকালবেলা উঠে ঠাকুরের নামে পয়সা রাখলে, শুক্রবার নিরামিষ খেলে, মন্দিরে গিয়ে (যদিও শ্রীশ্রীঠাকুর তথাকথিত মন্দির নির্মাণের কথা বলেন নি, অধিবেশন কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলেছেন। শরীরটাকে পবিত্র রাখতে হবে শ্রীবিগ্রহ মন্দির মনে করে।)
আমরা, বেশিরভাগ দীক্ষিতগণ মনে করি, কিছু ফল, ফুল, মিষ্টি, ধূপহীন ধূপকাঠি, মোমবাতি, কিছু দক্ষিণা পূজারী মহাশয়ের হাতে দিয়ে, কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে ঠাকুরের কাছে সব সমস্যার সমাধানের আর্জি জানিয়ে তথাকথিত প্রসাদ খেলে শ্রীশ্রীঠাকুরের শিষ্যত্বকে বজায় রাখা যায়!
অথচ, সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি অর্থ, মান ও যশ বিষয়ে সাবধান বাণী দিয়ে রেখেছেন। আমার মধ্যে যদি তাঁর আদর্শের প্রকাশ না হয়, অর্থাৎ ঠাকুরত্ব না জাগাতে পারি, তাহলে তিনি আমার ঠাকুর নন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। সেই হিসেবে বিচার করে দেখলে দেখা যাবে, তাঁর আদর্শ মেনে চলেন যাঁরা, যজনসিদ্ধ যাঁরা, একমাত্র তাঁদেরই অধিকার রয়েছে, যাজন করার, প্রচার করার। অথচ, আমরা এসব মূল বিষয়টিকে উপেক্ষা করে, অনেক কিছুতে, যথা, সত্তাপোষণী নিরামিষ আহার, সদাচার, বর্ণাশ্রম, বিবাহ নীতি, ঠাকুরের বলা পরিচ্ছদ ..... ইত্যাদি নিয়মকে শিথিল করে, ছাড় দিয়ে, নিয়মের শিথিল করে দীক্ষা দান ও অধিবেশন করে চলেছি। এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হবে, নচেৎ দ্বন্দ্বীবৃত্তি দোষে দুষ্ট হতে হবে।
সবাইকে জয়গুরু ও প্রণাম। বন্দে পুরুষোত্তমম্!