26/10/2025
আচার্য্য-সান্নিধ্যে (17)
২৯শে ফাল্গুন, ১৪২৯, মঙ্গলবার (ইং ১৪-০৩-২০২৩)
প্রাতে প্রার্থনান্তে বড়নাটমণ্ডপে আচার্য্যদেব। আজকের পঠিত শাশ্বতী গ্রন্থের ২০১নম্বর বাণীর (কেউ সাঁতার শিখে জলে নেমেছে—সাঁতার দিতে?)প্রসঙ্গে বলছেন—একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল, ডাক্তার বিশুদার (ডাঃ বিশ্বরঞ্জন চৌধুরী) কথা, ওনাকে বড়দা (শ্রীশ্রীবড়দা) এখানে এসে থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু উনি আগে ক্যারিয়ার তৈরী করে টাকা জমিয়ে তারপর আসার মনস্থ করেন। আর আসা হয়নি ওনার। পরে তো ক্যান্সার হল, মারা গেলেন। এলে ঐ গ্রহ কেটেই যেত।
অপর প্রসঙ্গে বলছেন—অন্যের আচরণ আমার হাতে নেই, কিন্তু আমার আচরণ আমার হাতে, অন্যের আচরণ আমি গ্রহণ করব, কি ignore করব, সেটা নেব কি নেব না, আমার ইচ্ছা. স্বপনদার(কাছে ডাক্তার স্বপন বিশ্বাসদা)ইচ্ছা না. অথচ সাধারণতঃ একজন গালাগাল দিলে সাথে সাথে গালাগাল দিয়ে দেয়. সেই প্রেক্ষাপটে ঠাকুরের ব্যাপারে দেখেন, একজন গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে আর ঠাকুর বলছেন, অ্যাই! ওকে ডাক্ তো. সে এলে বলছেন, তুই এত innovative গালাগাল দিস্, তাহলে তুই পড়াশুনা করিস্ না কেন? তোর brain-টা অত ভাল! গালাগালের পরিবর্তে গালাগাল বেরোয়নি, তার গুণটাকে নিয়ে বলছেন, তুই এটাকে কাজে লাগাচ্ছিস্ না কেন? পড়াশুনা করালেন, বিদেশে পাঠালেন. সব করলেন. জিনিসটাকে বুঝতে হয়. Exactly, আমি আমিই থাকছি, ওর আচরণ আমাকে আমার জায়গা থেকে change করছে না. এইটা হচ্ছে ব্যক্তিত্ব, এইটা হচ্ছে personality, personality হচ্ছে সেটাই যেটা deviate করে না. Color হচ্ছে না. সেদিন একটা বাণী পাঠ হল, যারা অপরের নিন্দা করে তাদের ব্যক্তিত্ব দুর্বল. আবার ‘ইষ্টার্থপরায়ণতায় জেদী যারা তাদের ব্যক্তিত্ব অটুট থাকে’. ব্যক্তিত্ব গজায় ইষ্টার্থপরায়ণতা দিয়ে. তার মানে যে নিন্দুক সে ইষ্টার্থপরায়ণতায় দুর্বল. তার কোন তেজ নেই. কারো মন্দ আচরণ আমি accept-ই করছি না! তোমার মন্দ ব্যবহার আমাকে touch-ই করছে না. আমি যেই এটা করতে পারি, সে যখন আমাকে তার standard-এ নামাতে পারছে না, তখন সে ঘাবড়াবে.
প্রীতম(সিং)—তাকে handle-ও করা যায় সহজে.
আচার্য্যদেব—কালকে একটা বাচ্চা ছুটে বেড়াচ্ছে, পেছনে পেছনে দশাসই চেহারার মা ছুটছে। বলছে, বাচ্চাটা খুব চঞ্চল।
আমি বললাম—এই বয়সেই বাচ্চাটা তোমাকে লেজের মত পেছনে দৌঁড় করাচ্ছে, কোথায় বাচ্চাটা তোমার পেছনে-পেছনে ঘুরবে! এই বাচ্চা বড় হয়ে যদি তোমাকে লাথি না মারে আমি অবাক হব। বাচ্চাটা অবশ্যই ওর মাকে লাথি মারবে। গায়ে শক্তি যেই হবে, মা বলতে যাবে, ‘তুই এটা করিস্ নি!’ এই বললেই ধম্ করে মেরে দেবে. যখন এই মা বুড়ী হবে, তখন দুর্গতির চরম সীমায় পৌঁছাবে.
প্রীতম—বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে.
আচার্য্যদেব—রাস্তায় ফেলে দেবে! এই সব বাচ্চাকে বাবা-মা এমন training দেবে যে বাচ্চা তাদের পেছনে ঘুরবে। তারা বাচ্চার পেছনে ঘুরবে মানে খু-ব poor! বাচ্চা ছুটছে, ওকে ছেড়ে দাও, আর পড়তে দাও। পড়ে যখন কাঁদবে, তোমাকে খুঁজবে, তুমি দাঁড়িয়ে থাক তোমার জায়গায়, ওকে আসতে দাও, আর আসার পর ঠাঁঠিয়ে চড় মার, ‘তুই পড়লি কেন?’ এইটা হচ্ছে training, ‘তুই পড়লি কেন! দেখে চলতে শিখিস্ নি কেন?’ এইটা যেই training দিতে পারবে সে কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে চলতে হবে শিখে যাবে।
আমার মনে হয় যে-কোন জিনিস ignore করাটা সবচেয়ে বড় জয়। কথাটা হচ্ছে আমার মন যদি কোন-কিছুতে যুক্ত করে দিই, তাহলেই সহনশীলতা আসবে।
অপর এক প্রসঙ্গে বলছেন—একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, তার মা-বাবা-ভাই-বোন, জগাই-মাধাই বোঝাচ্ছে, কিন্তু সে সেখান থেকে বেরোবে না. বিল্বমঙ্গলের ঘটনা আছে, কোন ঘটনা তাকে টলাচ্ছে না, সে চিন্তামণির কাছে যাবেই, কারণ, মনটা তো তাতে যুক্ত। পিতার দাহ করার সময় তার কথা ভাবছে, কার্যকলাপ (পিতৃশ্রাদ্ধ) করছে, সেখানেও তার কথা ভাবছে। তখন চিন্তামণি বলছে, এ আমার জন্যে যদি এতটা বিভোর থাকে, তাহলে ঈশ্বরের জন্যে বিভোর হলে তো তাঁকে পেয়েই যাবে।
মানুষ যদি কোনকিছুতে বিভোর হয়ে থাকে, তাহলে সে কোন বিরূপ আচরণে deviate হবে না। এরা কিন্তু তাড়াতাড়ি সাধনায় এগোতে পারে. কেন না, সে এই adversity-র মধ্য দিয়েও মনকে যুক্ত করে দিচ্ছে। কেউ দিনের পর দিন meditate করে যা করবে, এ এক লাফে ওখানে পৌঁছে যাবে. কারণ, সে ঐ মন্দ আচরণের মধ্যেও নিজেকে কোন-কিছুতে যুক্ত করে রেখেছে, সে deviate করছে না।
আবার গল্প আছে, সাধু গাছের উপরে তাকাল, ডালে একটা বক বসেছিল, সেটা ভস্ম হয়ে গেল. এবার সেই সাধু এক গৃহস্থ বধূর কাছে ভিক্ষা চাইছে, তখন বধূটি তার স্বামী সেবায় রত, ভিক্ষা দিতে দেরি হচ্ছে দেখে শাপান্ত করতে গেলে বধূটি বলছে, আপনি কি আমাকে বক পেয়েছেন? যে এইরকম তাকাবেন, আর আমি ভস্ম হয়ে যাব! আমি আমার কর্ত্তব্যে রত আছি, আপনার ঐ তাকানোতে আমি ভস্ম হব না।
এরকম ঘটনাও আছে, শাণ্ডিলী নামে একজন নারী ছিলেন, তার অষ্টবক্র স্বামী। স্বামী পরনারীতে আসক্ত, সে পতিতালয়ে যাবেই, বারনারী ছাড়া থাকতে পারে না, নেশাখোর। শাণ্ডিলী সেই স্বামীকে রোজ নিয়ে যেতেন বারনারীদের দ্বারে। আর, সে এইসব করবে, পরে আবার নিয়ে আসবে। একদিন যেতে গিয়ে এক মুনির গায়ে পড়ল পা। সে বলল, তোর এত দেমাক! আমার গায়ে দিলি পা! যাকে নিয়ে এই দেমাকে চলছিস্, তার মৃত্যু হবে। তখন শাণ্ডিলী বলছেন, আমার স্বামীর মৃত্যু হবে! তাহলে সূর্য্যই উঠবে না। আমাকে সাধারণ মহিলা ভাবছ! সূর্য্য ওঠা বন্ধ হয়ে গেল। সব দেবতারা এসে ঐ নারীর কাছে বলছে, তুমি রক্ষা কর মা। সব শুনে দেবতারা বলছে, আমরা সব ঠিক করে দিচ্ছি। তখন তার স্বামী সুন্দর হয়ে গেল, তার মন-মেজাজ change হয়ে গেল।
ঘটনাটি ব্যক্ত করে আচার্য্যদেব বলছেন—এক নারীর এ-রকম তেজ!
সারদা মায়ের গল্প আছে, বিবেকানন্দ গঙ্গায় ডুব দিচ্ছেন, আর উঠছেন। বলছেন, পরিষ্কার হলাম না মনে হয়। মায়ের সামনে যাব! নিষ্কলুষ হইনি, মা-র কাছে নির্মল মন ছাড়া যাওয়া যাবে না।
পরে প্রসঙ্গ তুলে বলছেন—একজনের সম্পর্কে বদগুণের কথা বলে যাচ্ছে, আর ঠাকুর defend করছেন একা। শেষে বলছেন, যাই বলিস্, ও কিন্তু তামাকাটা ভাল সাজে।(সহাস্যে)তামাক খান তিনি, তিনি বলছেন ভাল সাজে। এবার আমি কী করে বলি, তামাক ভাল সাজে না। আমি তো খাচ্ছি না। তরকারি যদি হতো তাহলে আমি খেয়ে বলতাম ভাল কি খারাপ। কিন্তু তামাকটা তিনি খাচ্ছেন একা, তিনিই certify করছেন. বলতে পারছে না যে ঠাকুর আমি তামাক সাজিয়ে দেখেছি মোটেই ভাল সাজে না। এটা তো আমি বলতে পারব না। তার মানে human-কে defend করা। তার কোন-না-কোন গুণ বের করেই নিতে হয়। মন্দের মধ্যে কোন একটা ভাল বের করার বিষয় থাকে, এইটাই তিনি দেখাচ্ছেন। এটা আমাদের সার্বিকভাবে করা কর্ত্তব্য। এই মন্দটার মধ্যে কি আছে? এই পাঁকটার মধ্যে কোথায় সেই কমলটা রয়েছে? ঠাকুর কিন্তু এইগুলো সব act করে দেখিয়েছেন।
প্রীতম—হাউজারম্যানদা লিখছেন, আমি গেছি ঠাকুরের কাছে একজনের সম্বন্ধে মন্দ বলতে, নিন্দা করতে. ঠাকুর শুনলেন, তারপর বলছেন, তুমি যার সম্বন্ধে আমাকে বলতে এসেছ, তার সম্বন্ধে আমার ধারণাটা তুমি পাল্টাতে পারবে না, কিন্তু তোমার সম্বন্ধে আমার জানা হয়ে গেল। একজন ঠাকুরকে বলছে, গাঁয়ের ঐ লোক আপনাকে গাল পাড়ছে. ঠাকুর বলছেন, সে বলছে, সেটা তো শুনিনি, কিন্তু তুই যে বললি, সেটা শুনলাম।
আচার্য্যদেব—এইরকম শুনে আমার কিন্তু মন deviate হয় না, যেটা আমি মনে ভেবে রেখেছি সেটাতেই আমি fixed থাকি. আমি যতক্ষণ না নিজে sanguine হচ্ছি, আমি কারো সম্বন্ধে ধারণা change করি না. Deviate করাটা হচ্ছে আমার দুর্বলতা. আমার ধারণার উপর দাঁড়িয়েই আমার জীবনটা চলা উচিত। আমাদের যখন বিয়ে হয়, প্রথম দিকে, তখন বৌ জিজ্ঞেস করছে, কে কি রকম বাড়িতে? আমি বললাম, সেটা আমার ধারণা আমি তোমাকে চাপাব না, তুমি দেখ, শোন, বোঝ, সবার সাথে মেশ, তাতে দেখবে তুমি নিজে শিখে যাচ্ছ। পরে বলছে, তুমি এর সম্বন্ধে বলনি তো! আমি বলি, কেন আমি বলতে যাব? তোমার এখন যেটা হয়েছে এটা তোমার জ্ঞান। তখন বলছে, আমার তো সময় লাগল! আমি বললাম, সময় লাগুক, কিন্তু সেটা নির্ভেজাল জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে গেল। আমার কথা শুনে তুমি যদি আরেকজনের সাথে কোন আচরণ কর, তাহলে সেটা তুমি আমার জ্ঞানের দ্বারা অভিভূত হলে। আমি এটা কাউকে করতে চাই না। তোমার জ্ঞানটা তোমার সম্পদ। আমি তোমার color-এ colored হব না।
আমি সব সময় এটাই করে এসেছি। আমি কখনও আমার বাড়ির কারো সম্বন্ধে কাউকে বলিনি। আমার কি মতামত জানাইনি।
আমার যে শাশুড়ী, সে আমার সামনে বেশীক্ষণ থাকতে চান না, কোন অছিলায় সরে যান। তো, আমার খাওয়ার সময় কেউ থাকলে ভাল লাগে। আমি বৌকে বললাম, তুমি বসে থাক। বলে, কেন মা তো থাকছেন। বলি, তুমি থাক না! তো, এটা তো আমার চাহিদা। এটা আমি বলছি না, তোমার মা এখনি উড়নচণ্ডীর মতন অছিলা করে চলে যাবেন। পরে যখন কথাটা বলতে পারি, তখন আমি normally বলি। ‘অ্যাই! তোমার মা খেতে দিলে আমার মোটেই ভাল লাগে না.’ বলতে পারি, যখন accept করার মতন প্রেম হয় তখন। সংকলক—সুভাষ মুসিব।