31/03/2024
লাইলাতুল ক্বদরের মর্যাদা:-
(The Night Of Destiny)
আরবীতে "লাইল" মনে "রাত্রি" এবং "ক্বদর" এর একাধিক অর্থ পাওয়া যায় যেমন - ফরমান,ভাগ্য, ক্ষমতা,উচ্চসম্মান,মহিমা,আশীর্বাদ,পরিমাপ,সঙ্গতি,মূল্য ইত্যাদি।অতএব "লাইলাতুল ক্বদর" এর অর্থ "ফরমানের রাত্রি","ভাগ্যের রাত্রি","আশীর্বাদের রাত্রি", "মূল্যের রাত্রি"," মহিমার রাত্রি" এবং আরও অন্যান্য।
হাদীস এ বলা আছে যে আল্লাহতাআলা এই পৃথিবী সৃষ্টির ৫০,০০০ বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে জন্মানো সমস্ত জীবের ভাগ্য(Destiny) নির্ধারণ করে রেখেছেন।এই লাইলাতুল ক্বদরে আল্লাহতাআলা সমস্ত প্রাণীর আগামী এক বছরের জীবনে কি কি ঘটবে অর্থাৎ আগামী এক বছরে তার ভাগ্যে কি কি আছে তার ফরমান(Decree) পেশ করেন।বলা আছে যে এই রাত্রি তে সমস্ত ফেরেশতাগণ(Angels) নিম্নগমন করেন এই সব ফরমান নিয়ে আর রহমতের অফুরন্ত ভান্ডার নিয়ে। কোরআন শরীফ( সূরা আলাক এর কিছু অংশ) প্রথম এই রাত্রিতে অবতীর্ণ হয়েছিল।তাই এই রাত্রির মহত্ব সুবিশাল।
কোরআন শরীফ এ বলা আছে যে "ইন্না আনযালনাহু ফী লাইলাতিল কাদরি" অর্থাৎ "নিশ্চয়ই আমি(আল্লাহ) তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে","ওয়ামা আদরাকা মা লাইলাতুল কাদরি" অর্থাৎ "আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো?","লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর" অর্থাৎ "কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ","তানাযযালুল মালাইকাতু ওয়াররূহ, ফিহা বিইযনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমরিন" অর্থাৎ "সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ(Spirits) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে", "সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলাইল ফাজর" অর্থাৎ "শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত"। তাহলে একবার ভাবুন যে এই রাত্রি ১০০০ মাসের থেকে অধিক মহিমান্বিত।আমরা যদি হিসেব করি তাহলে দেখা যাবে যে এই এক রাত্রির ইবাদত(Adoration) ৮৩.৩৩ চন্দ্র বৎসর(Lunar Year) এর ইবাদত এর সমান বা ২৯৫০০ দিনের ইবাদত এর সমান।আর যদি সৌর বৎসর( Solar Year) ধরা হয় তাহলে ৮০.৭৭ বছর ইবাদত এর সমান।আমাদের গড় আয়ু যদি ৭০ বৎসর ধরি তাহলে পুরো জীবনকালের ইবাদত এর থেকেও বেশি। এই রাতের মর্যাদা কত সে তো বোঝাই যাচ্ছে।তাই এই রাতের এক সেকেন্ড ও নষ্ট করা উচিত নয় আমাদের।
বলা আছে যে এই রাত্রি তে সমস্ত ফেরেশতাগণ ও সব রুহ আকাশ থেকে পৃথিবীতে পদার্পণ করেন।যদি আমরা ফেরেশতার সংখ্যা কল্পনা করতে শুরু করি তাহলে শেষ হবে না।একটা ছোট্ট হিসেব দেওয়া যাক।বলা আছে যে আল্লাহর যে আরশ আছে যাকে "বাইতুল মামুর" বলা হয় সেখানে প্রত্যেক দিন ৭০,০০০ ফেরেশতা তাওয়াফ করে এবং একবার যে ফেরেশতা তাওয়াফ করে নেবে কেয়ামত(Resurrection) পর্যন্ত তার আর সুযোগ আসবে না।তাহলে বুঝতেই পারছেন যে কত ফেরেশতা এই রাত্রিতে পৃথিবীতে আল্লাহর ফরমান নিয়ে আসেন।সূরা দুখান এ আল্লাহ বলেছেন "ইন্না আন জলনা হু ফিল লাইলাতুল মুবারকা" অর্থাৎ "স্পষ্টতই আমি কোরআন কে বরকতময়(Blessings) রাতে নাজিল করেছি"।তাই এই রাত কে "বরকতের রাত"( Night of Blessings) ও বলা হয়।তাই এই রাত্রিতে আমরা যে পরিমাণ আল্লাহতালার আশীর্বাদ পায়,তা অকল্পনীয়।হাদীস এ বলা আছে, এই রাত্রিতে যে ব্যক্তি ভালো নিয়তে আল্লাহর উপরে পূর্ণ বিশ্বাস রেখে নামাজের জন্য শুধুমাত্র দাঁড়ায় তৎক্ষণাৎ তার পূর্বের সমস্ত গুণহা মাফ হয় যায়।তাই এই রাত্রি কে "ক্ষমার রাত্রি" (Night of Forgiveness) ও বলা হয়।একবার হজরত আয়েশা(র: আ) আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে লাইলাতুল কদর এ আমাদের কি করা উচিত? তিনি বলেছিলেন পুরো রাত্রি এই দুআ টি পড়ো "আল্লাহুমা ইন্নাকা আফ উন তু হিব্বুল আফ ওয়া ফা আফ ওয়ান্নি" অর্থাৎ "আল্লাহ আপনিই একমাত্র যিনি ক্ষমা করেন ও আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন,তাই আমাকে ক্ষমা করেন"।
তাহলে লাইলাতুল ক্বদরের প্রতীক বা লক্ষণ কি???হাদীস এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের কথা বলা আছে। যথা:-
১)রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না ও মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
২)নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।
৩)সকালে হাল্কা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত।
লাইলাতুল ক্বদর কে সন্ধান করবো কি ভাবে?
হাদীস থেকে যে সমস্ত তথ্য গুলো পাওয়া গেছে তা পর্যায়ক্রমে এই যে:-
১)লাইলাতুল ক্বদর অবশ্যই রমজানের শেষ দশটি রোজার যে কোনো একটি রাত্রিতে অবস্থান করে।
২)একটি হাদীস এ আছে লাইলাতুল ক্বদর শেষ সাতটি রমজানের মধ্যেই পড়ে।
৩)রমজানের শেষ দশটি রোজার মধ্যে বিজোড় দিনগুলিতে অর্থাৎ ২১,২৩,২৫,২৭,২৯ এর মধ্যে পড়ার সম্ভবনা বেশী।
৪)২৯,২৭ অথবা ২৫তম রমজানের রাত্রিতে পড়তে পারে লাইলাতুল ক্বদর।
৫)২৭ তম রোজার রাত্রি ই লাইলাতুল ক্বদর।
৬)২২ তম রমজানে লাইলাতুল কদর পড়ার সম্ভাবনা সবথেকে কম।
তাই আমরা যারা ভাবি যে ২৭ সে রমজানের রাত্রি ই লাইলাতুল ক্বদর সেটি পুরোপরিভাবে ভুল।সেদিন হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক কিন্ত সেদিনই হবে সেরকম কোনো কথা নেই।
এখন ভাবুন তো! কোনো মানুষ যদি দুনিয়ার জীবনে একাধিক পরিমাণ লাইলাতুল ক্বদর পায়; তবে কি উম্মাতে মুহাম্মাদীর আফসোসের কোনো কারণ থাকতে পারে? অথচ মানুষ শুধুমাত্র রমজানের ২৭ তম রাতেই লাইলাতুল ক্বদর তালাশে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; শুধু কি তাই, ইবাদত-বন্দেগী বাদ দিয়ে নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ লাইলাতুল ক্বদর আল্লাহ তাআলার বিরাট হিকমত ও রহস্য।ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি দার্শনিকগণ লাইলাতুল কদরের বিষয়টি গোপনীয় রাখার আরেকটি রহস্য ব্যক্ত করেন এভাবে যে,লাইলাতুল ক্বদর যদি নির্দিষ্ট রাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং মানুষ তা জেনে ফেলে; তবে অনেক অলস, অজ্ঞ, দিকহারা হতভাগ্য ব্যক্তি মর্যাদাপূর্ণ মহান রাতের মর্যাদা না দিয়ে আল্লাহর অভিশাপে পতিত হয়ে যাবে। তাইতো আমাদের উচিত রমজানের শেষ দশকের প্রতি রাত(বিশেষ করে বিজোড় রাত্রি গুলো) জাগ্রত থেকে কুরআন তিলাওয়াত, তসবীহ-তাহলীল, জিকির-আজকার, নফল নামাজসহ অন্যান্য উত্তম আমলের মাধ্যমে লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করা।। লাইলাতুল ক্বদর যে পেয়ে যায় সে পৃথিবীর সেরা সৌভাগ্যবান। আল্লাহ আমাদের লাইলাতুল ক্বদর পাওয়ার কিসমত ও তাওফিক দান করুন।
©️মহম্মদ আকিল খান