30/09/2025
হাযির-নাযির আকীদা সম্পর্কে কিছু কথা:
Mohammed Alamgir
আমি আমার লিখিত البرهان في ردالبهتان والعدوان বইটির একটি অধ্যায় হাযির-নাযির বিষয়ক আকীদা বিষয়ে হাযির-নাযির বলতে কী বুঝায় এবং এর মূল বিষয়টা কিরুপ সেটা নিয়ে আমার সাধ্যমতো যতটুকু জোনেছি, ততটুকুটর মধ্য থেকে বিষয়টাকে আমি উপস্থাপন করেছি।সেখান থেকে আপনাদের সামনে ও গুরুত্বপূর্ণ অংশটি শেয়ার করছি।
হাযির-নাযির এর আকীদা সম্পর্কে কিছু কথা:
আমরা হাযির-নাযির এর আকীদা রাখি এর এঅর্থ নয় যে,রাসুলুল্লাহ্ﷺ সব সময় সব জায়গায় হাকিকী শরীর সহকারে উপস্থিত থাকেন।এটাও নয় যে,তিনিﷺ উপস্থিত হনই।তাকে উপস্থিত হতেই হবে এমনও নয়।হ্যা!আল্লাহ্ পাক হুযুরﷺ-কে এই ক্ষমতা দিয়েছেন যে,তিনি ইচ্ছে করলে কোথাও হাযির হন,অথবা চাইলে উপস্থিত হওয়া ব্যতিরেখেই যথাস্থান থেকে নাযির হন।উসূলের কায়দা হলো আমাদের দৃষ্টি সীমার আওতায় যতদূর রয়েছে,দূরত্বটা যতদূরই হোক সে পর্যন্ত যদি আমরা কোথায় কে আছে বা কি আছে তা দেখি,চিনি এবং বুঝতে পারি; কারো আহবান শুনে তাকে দেখি এবং চিনি।মোট যতদূর আমরা দেখে পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে যদিওবা শারীরিকভাবে আমরা সেখান থেকে দূরে থাকিনা কেনো,হুকমান আমাদেরকে সেখান পর্যন্ত হাযির বলেই গণ্য করা হবে।রাসুল কারীমﷺ যেহেতু সমস্ত কায়িনাতের নাযির,তাই তিনি হুকমান হাযিরও।হাকিকী শরীর সহকারে তিনি রাওদ্বা পাকেই আছেন।কিন্তু তিনি জগতের সবখানে হাযিরও আছেন।তিনি জিসমে মিসালী সহকারে একই সময়ে একাধিক জায়গায় হাযির হতে পারেন।আবার যদি মর্জি হয় কোথাও জিসমে হাকীকি সহকারেও হাযির হতে পারেন।আর এটা আমাদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকাবির উলামা ইমামগণের কিতাবের মাধ্যমেই আমাদের কাছে পৌছেছে।যেমন ইমাম জালাল উদ্দীন সূয়ূতী রাহঃ ওনার কিতাব ‘তানভীরুল হালাক’, ‘ইম্বাহুল আযকিয়া’, ‘আল-খবরুদ্দা-ল’ ইত্যাদী কিতাবে উল্লেখ করেছেন। হাযির-নাযির, ইলমে গায়বও হায়াতুন্নবী এই তিনটি একটি অপরটির সাথে সম্পর্কযুক্ত।সুতরাং হুযুরﷺ রাওদ্বা পাক থেকে আমাদের সকলের উপর হাযির-নাযির। তেমনি চাইলে যে কোনো সময়, যে কোনো জায়গায় হাযিরও হতে পারেন।সেটা তাঁরই মর্জি।আমরা হাযির-নাযির এর আকীদা রাখি এর অর্থ এটা মোটেও নয় যে,তিনি সকল জায়গায় সব সময় অবশ্যই হাযির হন।বরং এর এটাই উদ্দেশ্য যে,মর্জি হলে তিনি কোথাও উপস্থিত অবশ্যই হতে পারেন।এই ক্ষমতা ওনাকে ওনার রব্বে যুলজালাল দিয়েছেন।অথবা তিনি আপন কবরে আনওয়ারে থেকেই পুরো কায়িনাতের নাযির হয়ে হুকমান হাযিরও থাকেন।মূলতঃ হাযির-নাযির কি সেটা নাজানার কারণেও কোনো কোনো লোক এটাকে অস্বীকার করে বসে।আবার কেউ শুধু এই কারণেই অস্বীকার করে বসে,যেহেতু শানে রিসালাতের ঝলওয়া তাদের দিল গ্রহণ করতে পারেনা।বর্তমানে কারো কারো উপর এই বিপদ বুযর্গানে দ্বীনের প্রতি দুষমণি রাখার কারণে নেমে এসেছে।
আমার সামনের আলোচনা থেকে এই কথারও খন্ডন হয়ে যাবে,যেমনটি বলা হয়েছে যে,হাযির-নাযিরকে আকীদা ফাযিলে বেরলভীই বানিয়েছেন।মূলতঃ এটাকে ওনার আগেই আমাদের আকাবির উলামাগণ আকীদা বানিয়েছেন।ইমাম সুলতান মোল্লা আলী কারী হানাফী রাহঃ (১০১৪হিজরী) মিরকাতে হাযির-নাযির এর আকীদা প্রকাশ করেছেন।আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রাহঃ (১০৫২হিজরী),ইমাম ইউসুফ নাবহানী রাহঃ (১৩৫০হিজরী) ইমাম বুরহান উদ্দীন হালাভী রাহঃ (১০৪৪হিজরী),ইমাম জালাল উদ্দীন আব্দুর রহমান সূয়ূতী রাহঃ (৯১১হিজরী)ইমাম সালিহ শামী রাহঃ সহ আরো অনেক ইমাম এই আকীদা প্রকাশ করেছেন।ইমাম বাইহাকী রাহঃ হায়াতুল আম্বিয়া রচনা করে এটাকে প্রতিষ্টিত করেছেন।কারণ যিনি জিবীত তিনি সবকিছু দেখেন,শুনেন,জানেন,সাহায্য করেন।
কুরআন কারীমে লফয شاهد দ্বারা হাযির-নাযির এর অর্থ দিয়েছে।কারণ شاهد শব্দটি প্রত্যক্ষদর্শনের অর্থে এসেছে।এর জন্য হাকীকাতান জিসমানী উপস্থিতি আমাদের বেলায় প্রয়োজন থাকলেও নবীগণ বিশেষ করে হুযুর মোস্তাফাﷺ’র বেলায় এর কোনো প্রয়োজন নেই।কুরআনে উম্মতের বেলায়ও شاهد শব্দ এলেও এর দ্বারা উম্মতের জন্য এটা অপরিহার্য নয় যে,তাকে হাযির থাকতে হবে।নবীর দেখাটাই উম্মতের شاهد হওয়ার জন্য যথেষ্ট।এর প্রমাণ কুরআনের আয়াত এবং হাদীস সমূহ, যা আমি সামনে উল্লেখ করবো।সহীহ্ বুখারীর ঐহাদীস যাতে সাহাবীয়ে রাসুল উটক্রয়কালীন অনুপস্থিত থাকা স্বত্বেও সাক্ষী দিয়েছেন হুযুরের পক্ষে।এবিষয়ে সবচেয়ে হৃদয়ের প্রশান্তির একটি হাদীস আমি সুনানু ইবনু মাজাহ্ থেকে উপস্থাপন করবো হাদীসের দলিলে।তাছাড়া কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ যখন প্রত্যেক নবীগণকেও নবীগণের জন্য প্রত্যেক উম্মত থেকে সাক্ষ্য নেবেন,তখন অন্যান্য নবীগণের উম্মত যারা নাফরমান কাফির ছিলো,তারা যখন নবীগণের হুকুমে ইলাহী পৌছানোকে অস্বীকার করবে,এবং নবীগণের সত্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তখন সকলের সাক্ষী হিসেবে আমাদের প্রিয় রাসুলকে আল্লাহ্ পাক সকল নবীগণের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে দাড় করাবেন।আর এসব ক্ষেত্রে শোনা সাক্ষী কাবেলে কবুল নয়,বরং প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সাক্ষীই গ্রহণযোগ্য।প্রত্যক্ষদর্শী না হওয়াকে সাক্ষী বানানো এমন জঠিল মুহুর্তে কিভাবে সঠিক হতে পারে?উম্মতের شاهد বা شهيد হওয়ার বিষয়কে সামনে এনে যারা নবী কারীমﷺ এর হাযির-নাযির হওয়াকে অস্বীকার করতে চায়, তারা জেনে নিক যে,ঐজঠিল মূহুর্তে কোনো বদবখতকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবেনা।বরং সেখানে উম্মতের ঐসব আফরাদকে ডাকা হবে,যারা আল্লহর দরবারে সাক্ষ্য দেয়ার উপযুক্ত।যেমন সিদ্দীকে আকবার,ফারুকে আযম,জুন্নুরাইন,শেরে খোদা মুরতাদা,হুযুর গাউসুস সাকলাইন,গরীবে নিওয়ায,মাহবুবে ইলাহী,আ'লা হযরত, দাতা গঞ্জে বখশ হাজভিরী,মেহের আলী শাহ্ গোলড়ী,ইমাম বুখারী,ইমাম মুসলিম,ইমাম তিরমিযী,ইমাম নাসায়ী,ইমাম আবু দাউদ,ইমাম ইবনু মাজাহ্,দাতা ফরিদ,বখতিয়ার কাকীসহ এক্যাটাগরীর আল্লাহ্ ও রাসুলের প্রেমিকগণকে।আলাইহিমুর রিদওয়ান।
এছাড়াও উম্মতের মধ্যে সাহাবায়েে কিরাম,তাবিঈন,তাব-তাবিঈনও আউলিয়ায়ি কামিলীন আলাইহিমর রিদ্বওয়ানগণের মধ্যেও আল্লাহ্ পাক মাহবুবে পাকের সদকায় হাযির-নাযির গুনের সমাবেশ ঘটিয়েছেন,তাই সাক্ষী হিসেবে ওনারা পরিপূর্ণ ও উপযুক্ত।
এখন কেউ যদি ধোকা দিতে গিয়ে বলে যে,شاهد শব্দটি রব্বে যুলজালালের শানেও রয়েছে তাহলে এর অর্থ কি হবে?এর জবাব হলো: বান্দার বেলায় যে অর্থ দেবে,আল্লাহর বেলায় সরাসরি সে অর্থে প্রয়োগ করা যাবেনা।কেউ যদি হাযির-নাযিরকে আমরা যে অর্থে মাখলুকের বেলায় আকীদা রাখি ঐ অর্থে আল্লাহর শানে প্রয়োগ করে,সে কাফির হয়ে যাবে।যেমন ‘মকর’ শব্দ আল্লাহর শানে কুরআনে এসেছে,আবার মাখলুকের জন্যও।কিন্তু এর সে অর্থ কখনও করা যাবেনা,যে অর্থ কাফির বা মুনাফিকের ক্ষেত্রে হবে।হাযির-নাযিরের ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি শারীরিক উপস্থিতিও।আর আল্লাহ্ পাক এসব থেকে পবিত্র।এজন্য আল্লাহর সিফাতী নাম সমূহে হাযির-নাযির কোনো নাম নেই।আল্লাহ্কে কেউ যদি এই অর্থে হাযির-নাযির বলে ডাকে যে,তিনি দেখেন,শুনেনও জানেন।তাহলে সেটা জায়িয হবে।কারণ এর অর্থ তখন এটাই হবে যে,আল্লাহ্ তাঁর ইলিমের দ্বারা এবং তাঁর দর্শন দ্বারা জগতের সকল কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।তাঁর জন্য উপস্থিত আর অনুপস্থিতির কোনো কিছু নেই।উপস্থিত আর অনুপস্থিতির বিষয়টি মাখলুকের জন্য প্রযোজ্য।
আমরা হাযির-নাযির এর আকীদা যারা অস্বীকার করে তাদেরকে কাফির কিংবা গোমরাহ্ বলিনা।এর কারণ হলো এটা ফুরু'ঈ আকীদা। আবার এটা কত'ঈও নয়।তবে এটাকে কেউ অস্বীকার করলে সে অবশ্যই ভুলের মধ্যে রয়েছে।কিন্তু তারা এই আকীদা পোষণকারীদেরকে কাফির কিংবা মুশরীক ফাতাওয়া দেয়ার অধিকার রাখেনা।এটা এমন এক সীমালঙ্ঘন যা এই কুফর,কিংবা শিরকের ফাতাওয়া দাতাকে শিরকে পৌছাতে পারে।কারণ শিরক বলতে বান্দার জন্য উলূহিয়াত সাব্যস্ত করাকে বোঝায়।অথবা বান্দার জন্য এমন গুন সাব্যস্ত করা যা বান্দা নিজে অর্জন করতে পারেনা।কিন্তু হাযির-নাযির আকীদা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতেরই আকীদা,যদিও বুনিয়াদী নয়।এখন শিরক যারা বলছে,তারা হয়তো সৃষ্টিকে খালিকের জায়গায় ধারণা করছে!নতুবা শিরকের সম্ভাবনা কোথা থেকে এলো?আল্লাহ্ পাক তাঁর বান্দাদের এমন অনেক গুনের অধিকারী বানিয়েছেন,যা আল্লাহর গুন।যেমন আল্লাহ্ রহীমও রউফও।আবার তিনিই তাঁর প্রিয় মাহবুবের নাম সূরা তাওবার শেষ দু'আয়াতের একটিতে ‘রউফুর রহীম’ রেখেছেন।
এভাবে আযীয,রহমান,সামি'ঈ,বাসীর, গফুর, সাত্তারসহ বহু গুন তার সৃষ্ট মাখলুককে দান করেছেন।এমনকি ইবলিস যে,রবের দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে,তাকে মানুষের শিরায় শিরায় চলার ক্ষমতা দিয়েছেন।মালাকুল মাউতকে একই সময় সমস্ত পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা হাযির হওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। মালাকুল মাউত একই সময়ে লক্ষ লক্ষ জায়গায় হাযির হন।এরপরও কেউ এগুলোকে শিরক বলেনা।কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মাহবুবে কিবরিয়া শাফিয়ে মাহশার মুহাম্মদ মোস্তাফাﷺ এর বেলায় যখনই কোনো শান সম্পৃক্ত করা হয়,তখনই এরা শিরকের ফাতাওয়া নাহয় কুফরের ফাতাওয়া আরোপ করে বসে।এর থেকে সহজে বোঝা যায় এদের অন্তরে ইবলিসের কিছু হিস্যা রয়েছে,যা তাদেরকে সবসময় বিদ্বেষপোষণ করতে অনুপ্রাণিত করে। অথচ আল্লাহর অনেক গুনের অধিকারী বান্দাগণকে করা হয়েছে।এখন শিরক ফাতাওয়া দাতারা কোন জায়গায় দাড়িয়ে আছে তারা নিজেরাই ফায়সালা করুক।