16/07/2026
চাতুর্মাস্য ব্রত
চাতুর্মাস্য ব্রত হলো আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী থেকে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী পর্যন্ত পালিত একটি পবিত্র সংযম ও উপবাস ব্রত।
এই শয়ন একাদশী থেকে উত্থান একাদশী পর্যন্ত মোট চার মাস। শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক। শয়ন একাদশী, কিংবা কর্কট সংক্রান্তি কিংবা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে চাতুর্মাস্য ব্রত শুরু হয় এবং যথাক্রমে উত্থান একাদশী, কিংবা বৃশ্চিক সংক্রান্তি কিংবা কার্তিকী পূর্ণিমাতে ব্রত সমাপ্ত হয় ।
চাতুর্মাস্য ব্রত হলো সনাতন ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র ও চার চান্দ্রমাস ব্যাপী পালিত একটি বিশেষ তপস্যা ও সংযমের সময়কাল।
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের 'শয়নী একাদশী' তিথিতে শ্রীভগবান বিষ্ণু ক্ষীর সাগরে শ্বেতদ্বীপে অনন্ত শেষনাগের শয্যায় নিদ্রিত হন --তারপর যেদিন তিনি পাশ ফিরে শয়ন করেন, সেদিন পার্শ্ব একাদশী (ভাদ্র শুক্লা একাদশী) এবং কার্তিক মাসের 'উত্থান একাদশী' তিথিতে চার মাস পর জাগ্রত হন।
ভগবানের এই নিদ্রাকালীন সময়টাকেই চাতুর্মাস্য বলা হয় এবং এই সময়ে ভক্তরা নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিশেষ কিছু নিয়ম ও ব্রত পালন করেন।
এই শয়ন একাদশী থেকে উত্থান একাদশী পর্যন্ত মোট চার মাস। শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক। শয়ন একাদশী, কিংবা কর্কট সংক্রান্তি কিংবা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে চাতুর্মাস্য ব্রত শুরু হয় এবং যথাক্রমে উত্থান একাদশী, কিংবা বৃশ্চিক সংক্রান্তি কিংবা কার্তিকী পূর্ণিমাতে ব্রত সমাপ্ত হয় ।
এই চাতুর্মাস্য ব্রতের ব্রতকারীরা কেউ শয়ন একাদশী থেকে উত্থান একাদশী পর্যন্ত, কেউ আষাঢ় মাসের গুরু পূর্ণিমা থেকে কার্তিক মাসের হৈমন্তী রাস পূর্ণিমা পর্যন্ত, আবার কেউ কর্কট সংক্রান্তি থেকে মকর সংক্রান্তি পর্যন্ত- এইভাবে পালন করে থাকেন। মোটামুটি যে দিন শুরু করবেন তার চার মাস পরে সমাপন করবেন।
বছরের এই চারি মাস প্রাকৃতিক কারণে মানুষের দেহ ও মনে রজো ও তমোগুণী প্রভাব অধিক দেখা যায়। ফলে আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায়, যত রকমের দুর্যোগ, অশান্তি, মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা বছরের সবসময় হলেও এ চার মাসে সর্বাধিক। পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গেরাও এ সময়ে বেশি উগ্র প্রকৃতির হয়। শরীর ও মনের উত্তেজনা অধিক থাকে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্যাদি প্রবল হয় । অর্থাৎ যারা লক্ষ্মীমন্ত হতে চায়, তারা অবশ্যই এ সময় ভক্তিযোগ সাধন করবে। সংযত থাকবে। সেজন্য দিনের বেলা ঘুমানো নিষেধ, শ্রীহরির বিগ্রহ অর্চনা করা, স্নান করা ও শুচি থাকা, হরিনাম জপ করা, গীতা-ভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত অধ্যয়ন করা, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার রাখা, সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করা, সংযতভাবে কথা বলা, শুভ কাজে যুক্ত থাকা দরকার।
চাতুর্মাস্য ব্রতের তারিখ ও তিথি 2026 সালে চাতুর্মাস 25শে জুলাই, শনিবার (দেবশয়নী একাদশি) থেকে শুরু হয়ে 21শে নভেম্বর, শনিবার (দেবউত্থানি একাদশি) পর্যন্ত চলবে।
এই চাতুর্মাস্য ব্রতের ব্রতকারীরা কেউ শয়ন একাদশী থেকে উত্থান একাদশী পর্যন্ত, কেউ আষাঢ় মাসের গুরু পূর্ণিমা থেকে কার্তিক মাসের হৈমন্তী রাস পূর্ণিমা পর্যন্ত, আবার কেউ কর্কট সংক্রান্তি থেকে মকর সংক্রান্তি পর্যন্ত- এইভাবে পালন করে থাকেন। মোটামুটি যে দিন শুরু করবেন তার চার মাস পরে সমাপন করবেন।
ভবিষ্য পুরাণে বলা হয়েছে:---
❝ যো বিনা নিয়মং মর্ত্যো ব্রতং বা জপ্যমেব বা।চাতুর্মাস্য নয়েন্ মূর্খো জীবন্নপি মৃতো হি সঃ ॥ ❞
অনুবাদ: যে ব্যক্তি নিয়ম, ব্রত বা হরিনাম জপ ছাড়া এ চার মাস অতিবাহিত করে, সে ব্যক্তি মূর্খ, সে বেঁচে থেকেও মরার মতো ।
এই ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো জাগতিক আসক্তি কমানো এবং ভগবানের আরাধনায় সময় কাটানো।
বিশেষ নিয়মাবলি: এই চার মাস নিরামিষ ভোজন করতে হয় এবং প্রতি মাসে একটি করে প্রিয় খাদ্য বর্জন করার নিয়ম রয়েছে।
পালনের নিয়ম ও মাসভিত্তিক বর্জনীয় বিষয়:------
এই চার মাসে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট খাবার বর্জন করতে হয়:
1. প্রথম মাস (আষাঢ়/শ্রাবণ): শাক বা পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি খাওয়া নিষেধ।
(বর্জনীয় ━ সকল প্রকার শাক, লাল ও সবুজ পালং শাক এড়িয়ে চলতে হবে & গ্রহণযোগ্য ━ ধনে পাতা, মেথি পাতা, পুদিনা পাতা, কারি পাতা, নিম পাতা, বাঁধাকপি, ফুলকপি শাক না হওয়ায় খাওয়া যেতে পারে।)
রাত্রে টক, তিতা ও শাক ভক্ষণে দরিদ্রতা।
2. দ্বিতীয় মাস (শ্রাবণ/ভাদ্র): দই বা ঘোল খাওয়া বর্জনীয়।
(বর্জনীয় ━ প্রধানত দই এবং দই দিয়ে তৈরি উপদান যেমন লস্যি, কারি, বাটার মিল্ক প্রভৃতি এড়িয়ে চলতে হবে & গ্রহণযোগ্য ━ চরণামৃতে দই থাকলেও সম্মানের সাথে গ্রহণ করা উচিৎ।)
3. তৃতীয় মাস (ভাদ্র/আশ্বিন): দুধ খাওয়া নিষেধ।
(বর্জনীয় ━ প্রধানত দুধ এবং দুধ দিয়ে তৈরি উপদান যেমন দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস, মিল্ক শেক, আইসক্রিম, কনডেন্সড মিল্ক প্রভৃতি এড়িয়ে চলতে হবে & গ্রহণযোগ্য ━ দুধের মিষ্টি যেমন রসগোল্লা, সন্দেশ; দুগ্ধজাত দ্রব্য যেমন ছানা, পনীর যেহেতু দুধ রূপান্তরিত এবং ব্যবহৃত। চরণামৃতে দই থাকলেও সম্মানের সাথে গ্রহণ করা উচিৎ।)
দুধের সঙ্গে লবণ ভক্ষণ গো-মাংস তুল্য।
4. চতুর্থ মাস (আশ্বিন/কার্তিক): মসুর ডাল বা দ্বিদলীয় শস্য বর্জন করতে হয়।
(বর্জনীয় ━ প্রধানত মসুর ডাল এবং বিউলির ডাল + মসুর ডাল এবং বিউলির ডাল দিয়ে তৈরি উপদান যেমন ইডলি, ধোসা, বিউলির ডালের বড়ি, অমৃতি প্রভৃতি এড়িয়ে চলতে হবে। তাছাড়া কার্তিক মাসে শিম, বেগুন, পটল, কলমি শাক, বটবটি, দেশী লাউ, মুলো ইত্যাদি খাওয়া যাবে না & গ্রহণযোগ্য ━ মসুর ডাল এবং বিউলির ডাল বাদে যে কোন ডালই খাওয়া যাবে।)
চাতুর্মাস্য ব্রত ও নিয়ম----তিথির ক্ষেত্রে নিয়ম:-----------
প্রতিপদ :- কুমড়ো ভক্ষণে অর্থহানি।
দ্বিতীয়া :- বেগুন ভক্ষণে হরিভজনে বিঘ্ন।
তৃতীয়া :- পটল ভক্ষণে শত্রু বৃদ্ধি।
চতুর্থী :- মূলা ভক্ষণে ধর্মহানি।
পঞ্চমী :- বেল ভক্ষণে কলঙ্ক ।
ষষ্ঠী :- নিমপাতা ভক্ষণে পক্ষীযোনি প্রাপ্ত।
সপ্তমী :- তাল ভক্ষণে শরীর বিনাশ।
অষ্টমী :- নারিকেল ভক্ষণে মূর্খতা প্রাপ্ত।
নবমী :- লাউ ভক্ষণে গো-মাংস তুল্য।
দশমী :- কলমিশাক ভক্ষণে গো-হত্যা পাপ ।
একাদশী :- শিম ভক্ষণে মহা-পাপ।
দ্বাদশী :- পুঁইশাক ভক্ষণে ব্রহ্মহত্যা পাপ।
ত্রয়োদশী :- বেগুন ভক্ষণে পুত্রহানি।
চতুর্দশী :- মাষকলাই ভক্ষণে চির রোগ।
অমাবস্যা ও পূর্ণিমা :- মাংস ভক্ষনে মহা-মহা পাপ।
ব্রতের মূল নিয়ম ও আচরণীয় কর্তব্য:------------
1. ভক্তি বৃদ্ধি: এই চার মাস অধিক মাত্রায় ভগবানের নাম জপ, কীর্তন ও ধর্মীয় গ্রন্থ (যেমন ভাগবত গীতা) পাঠ করা উচিত।
2. শুদ্ধাচার পালন: ব্রহ্মচর্য পালন করা এবং মাটিতে ঘুমানো অত্যন্ত পুণ্যদায়ক বলে মনে করা হয়।
3. শুভ কাজ নিষিদ্ধ: ভগবান বিষ্ণু নিদ্রিত থাকায় এই চার মাস বিবাহ, পৈতা (উপনয়ন), গৃহপ্রবেশ বা নতুন কোনো ব্যবসায়িক শুভ কাজ করা শাস্ত্র মতে নিষিদ্ধ।
4. সংযম ও দান: পরনিন্দা, পরচর্চা ও অহংকার ত্যাগ করে সাধু-সন্ন্যাসী ও দরিদ্রদের অন্ন বা বস্ত্র দান করা অত্যন্ত ফলদায়ী।
সংকল্প মন্ত্রব্রতের শুরুতে পবিত্র মনে নির্দিষ্ট নিয়মে সংকল্প করতে হয়। সাধারণত এই মন্ত্র পাঠ করা হয়:
"ওঁ বিষ্ণুর্দেবতা চাতুর্মাস্যব্রতং মম। কার্স্ন্যাদিভোজ্যপরিত্যাগাৎ সম্পন্নমস্তু মে সদা।।"
(অর্থ: হে বিষ্ণু, তুমিই আমার দেবতা। আমি আমার এই চাতুর্মাস্য ব্রতে নির্দিষ্ট ভোজ্য (যেমন শাক, দই, দুধ বা আমিষ) পরিত্যাগের সংকল্প করছি এবং এর মাধ্যমে ব্রতটি যেন সর্বদা সফল হয়।)
চাতুর্মাস্য ব্রতে কি করনীয়
◼️চাতুর্মাস্য ব্রতের নিয়ম ভবিষ্য পুরাণে, স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। নিয়মগুলি হলো :-
1. ভোরে উঠে বিশেষত ব্রহ্মমুহূর্তে প্রাতঃকৃত্য সেরে পবিত্র জলে স্নান করতে হবে। ভক্তগণ তো ভোর চারটায় স্নান সেরে মঙ্গল আরতিতে যোগ দেন। যত্ন নেন কোনও দিন যেন ফাঁকি না যায়। মঙ্গলময় শ্রীহরির কৃপাকটাক্ষ লাভের উপযুক্ত ব্রাহ্মমুহূর্তে শুচিশুদ্ধ হয়ে জেগে থাকা বাঞ্ছনীয়।
2. হরিনাম জপ করতে হবে। যাঁরা হরিনাম করেন, তাঁদের আরো বেশি করে হরিনাম জপ করা উচিত। যারা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করেন না, তাঁরা অবশ্যই শুরু করবেন। কলিবদ্ধ জীবের সদ্গতি লাভের একমাত্র উপায় হরিনাম। আমাদের মনকে সুরক্ষা দান করে মন্ত্র হরিনাম।
3. প্রতিদিন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ কিংবা আলোচনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভগবানের কথা, ভক্তের কথা আলোচনার মাধ্যমেই আমাদের হৃদয়ের কলুষতা দূর হয়ে আশা ও আনন্দ সঞ্চার হয়ে থাকে। যারা ভগবৎ কথায় সময় দিতে পারে না, তারা আজেবাজে কথায় সময় পেয়ে বসে।
4. প্রজল্প (তর্ক, গালগল্প, অনর্থক কাজ বা অলস সময়) এড়িয়ে চলতে হবে। কলিযুগের মানুষ আমরা তর্ক করতে, ঝগড়া বাধাতে, গালগল্পে খুবই উন্মুখ হয়ে থাকি। টিভি দেখা, নভেল পড়াও এর অন্তর্ভুক্ত। এসব অসৎসঙ্গ দোষ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
5. শ্রীহরিভক্তিবিলাসে (15/122) বলা হয়েছে:---
❝ জপ হোমাদ্যনুষ্ঠানং নামসংকীর্তনস্তথা ।স্বীকৃত্য প্রার্থয়েদ্দেব্য গৃহীত নিয়মোবুধঃ ॥ ❞
অনুবাদ: বিজ্ঞব্যাক্তিগণ জপযজ্ঞাদি অনুষ্ঠান ও শ্রীনামসংকীর্তন প্রভৃতি ব্রতনিয়ম স্বীকার করবেন।
6. শ্রীহরি অর্চন কিংবা শ্রীহরিভক্তিমূলক অন্য কোনও সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে। সবসময় জানতে হবে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। আচারে হোক, প্রচারে হোক যেকোনও সেবায় সবসময় সংযুক্ত থাকতে হবে, তাহলেই আমরা ভালো থাকবো।
সার্বিক ব্রতনিয়ম থাকা সত্ত্বেও কোনও কোনও ব্রতকারী ব্যক্তিগত কিছু কিছু ব্রতসংকল্প করে থাকেন। তবে সেই আচরণগুলিও শাস্ত্রসম্মত। যেমন-
1. অনেকে সারাদিনে একবার মাত্র হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন; আবার অনেকে ফলমূল প্রসাদ মাত্র গ্রহণ করেন। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে এই ব্রত ধারণ করেন । তবে, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে যারা তর্ক করে, কথা বাড়ায়, তারা ব্রত ভঙ্গ করছে বলে বুঝতে হবে।
2. শিম, বরবটি, বেগুন, পটল, আচার প্রভৃতি জিনিসও অনেকে বর্জন করে চলেন।
3. অনেকে মাটিতে শয়ন করেন।
4. অনেকে ক্ষৌরকর্ম বাদ দেন।
5. অনেকে কেবল হরিনাম ছাড়া অন্য কথা বলেন না, তাকে মৌন ভাব বলা হয়।
6. অনেকে থালা-বাটি ব্যবহার না করে কলাপাতা বা পদ্মপাতা ব্যবহার করেন।
7. আবার অনেকে শরীরে তেল মাখেন না।
এই সময়টিতে তুলসীতে জল দেওয়া, জপ করা, এবং ভগবানের নাম কীর্তন ও শাস্ত্র পাঠে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পুণ্যময় বলে মনে করা হয়।
এই ব্রত ফলে মন সুন্দর হয়, শরীর ও প্রাণ সুন্দর হয়। কারণ, শ্রীবিষ্ণু শয়ণ করলে লক্ষ্মীদেবী তাঁর পাদপদ্ম সেবা করতে থাকেন, আর সুন্দরভাবে ভগবান নিদ্রিত হন। সেই বিষ্ণু জনার্দন পরমাত্মারূপে জীব-হৃদয়ে বিদ্যমান। বিষ্ণু যখন সুন্দরভাবে নিদ্রা যান, তখন লক্ষ্মীদেবী চিন্তা করেন, পৃথিবীতে মানুষেরা খুব সুন্দরভাবে ধর্ম আচরণ করছে, তাই লক্ষ্মীদেবী তুষ্ট দৃষ্টিপাত করেন। সেই দৃষ্টিপাতে লক্ষ্মীমন্ত হয়। খাদ্য অভাব হয় না। অশান্তি বাড়ে না । আনন্দ বৃদ্ধি হয় । লোকে সুখে- শান্তিতে জীবনযাপন করে। কিন্তু, বিষ্ণুর নিদ্রা যখন ঠিক হয় না, সুন্দরভাবে বিশ্রাম নিতে পারেন না, তখন লক্ষ্মীদেবী চিন্তা করেন, পৃথিবীতে মানুষেরা উদ্ধৃত প্রকৃতির হয়েছে, অশিষ্ট-অনিষ্টাচারী হচ্ছে, অধর্ম আচরণ করছে, তাই লক্ষ্মী রুষ্ট দৃষ্টিপাত করেন। সেই দৃষ্টিপাতে মানুষ লক্ষ্মীছাড়া হয়। খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। অশান্তি বৃদ্ধি পায় । অসুখ বৃদ্ধি পায়। লোকে দুঃখে-কষ্টে জীবন কাটায়।
❝ এবং চ কুর্বতো মাসাংশ্চতুরো যান্তি বৈ সুখম্।অন্যথা প্রভবেদ্ দুঃখম্ অনাবৃষ্টিশ্চ জায়তে ॥ ❞
অনুবাদ: “এভাবে চারি মাস ব্রত পালন করলে সুখে যাপন হবে। নতুবা দুঃখের প্রভাব বৃদ্ধি হবে, অনাবৃষ্টি ও অন্যান্য দুর্বিপাক লেগে থাকবে।”
সীতাদেবী অপহৃত হলেও শ্রীরামচন্দ্র রাবণের লংকারাজ্য আক্রমণ করেননি। তিনি চার মাস পরে লংকা আক্রমণ করবেন মনস্থ করলে লক্ষ্মণ উদ্বিগ্ন হয়ে এ চারমাসে সীতাদেবীর কী দশা হবে জানতে চাইলে রামচন্দ্র বললেন, সীতা ব্রতপরায়ণা, তার ধর্ম তাঁকে সুরক্ষা প্রদান করবে।
মথুরার কংস গোকুলে নন্দপুত্রের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে অঘ, বক, পূতনা, শকট, তৃণাবর্ত প্রভৃতি ভয়ংকর মায়াবী অসুরদের পাঠিয়েছিল। কিন্তু যাকেই পাঠানো হলো, সেই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তাদের উৎপাতের ফলে গোকুলবাসীরা অহরহ ভগবৎ-স্মরণ করতে লাগল। এদিকে কংস প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলে। কেননা, তার বিশাল বিশাল মায়াবী অস্ত্র শেষ হয়ে গেল। তার শ্বশুর জরাসন্ধ যখন দেখা করতে আসে, তখন কংস বলল, আমি সর্বস্বান্ত, একটাও অস্ত্র দেখছি না, যাকে বৃন্দাবনে পাঠাব। কংসের অত্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখে জরাসন্ধ বলল, হুটপুটি করে কোনো লাভ নেই। এখানে একটামাত্র অস্ত্র নিয়ে বর্ষার চার মাস অপেক্ষা করতে হবে ━ তা হলো প্রতীক্ষা অস্ত্র। এখন কারো বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই প্রতিকূল পথে পতিত হতে হবে।
“অনেক লোক আছেন যাঁরা উন্নততর জীবন অথবা স্বর্গারোহণ করবার জন্য চান্দ্রায়ণ, চাতুর্মাস্য আদি স্বেচ্ছামূলক তপশ্চর্যার অনুশীলন করেন। এ সমস্ত পন্থায় বিশেষ বিশেষ বিধি-নিষেধের মাধ্যমে জীবনযাত্রাকে পরিচালিত করার জন্য কঠোর ব্রত পালন করতে হয়। যেমন, চাতুর্মাস্য ব্রত পালনকারী চার মাস দাড়ি কামান না, নিষিদ্ধ জিনিস আহার করেন না, দিনে একবারের বেশি দুবার আহার করেন না অথবা কখনও গৃহ পরিত্যাগ করেন না। এভাবেই সাংসারিক সুখ পরিত্যাগ করাকে বলা হয় তপোময় যজ্ঞ।” শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (৪/২৮, তাৎপর্য)
আমাদের দেশে অনেকেই আমিষপ্রিয় ও নেশাপ্রিয় মানুষ রয়েছেন। সেক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যদি কেউ চাতুর্মাস্যে মদ ও মাছ-মাংস বর্জন করতে পারে, তবে সে এক সুন্দর যোগী হতে পারবে, ওজস্বী ব্যক্তিত্ব হতে পারবে।
পরিশেষে, উল্লেখ্য এই যে, কর্মী, জ্ঞানী, যোগী ও ভক্ত প্রভৃতি সকলের মঙ্গলের জন্যই চাতুর্মাস্য পালন করা আবশ্যক। শ্রীহরির প্রতি একটু একটু ভক্তি অনুশীলন, একাদশী ব্রত পালন, আমাদের জীবনকে পবিত্র ও মহান করে তোলে। শ্রীব্রহ্মা নারদকে বললেন,” হে নারদ, যে মানুষ ভক্তি সহকারে চাতুর্মাস্য ব্রত পালন করবে, সে পরমা গতি বৈকুণ্ঠ জগতের বাসিন্দা হতে পারবে।”