31/01/2024
۩ হাদীসের নামে জালিয়াতি
▌মা-বাবার দিকে নেক নযরে তাকালে কি আসলেই কবুল হজ্জের সওয়াব পাওয়া যায়?
এ হাদীস কি বিশুদ্ধ?
▌একজন হক্কানী আলিমের দিকে তাকালে কি সগীরা গুনাহসমূহ মাফ হয়?
▣ হাদীস:
আব্দুল্লাহ্ ইবনে ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, “যে কোনো নেক ব্যক্তি/নেক সন্তান তার পিতা-মাতার প্রতি অথবা তার মায়ের দিকে রহমত বা দয়ার দৃষ্টিতে তাকাবে আল্লাহ্ ‘আযযা ওয়াজাল্লা তার প্রত্যেকটি দৃষ্টিতেই একটি কবুল হজ্জের সওয়াব লিখে দিবেন।" তারা বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল ﷺ যদি কেউ প্রতিদিন একশো বারও তাকায়?" তিনি বললেন, "আল্লাহ্ এর চেয়েও অনেক বড়। কোনো কোনো রিওয়াতে এসেছে আল্লাহ্ এর চেয়েও মহান ও পবিত্র।”
▣ হাদীসটির তাখরীজ ও গ্রহণযোগ্যতা পর্যালোচনা:
হাদীসটি আবু বকর আল ইসমাঈলী তার মু‘জাম আসামি আশ শুয়ূখের মধ্যে বর্ণনা করেছেন (নং ৪) তার সনদে ইমাম বাইহাকী বর্ণনা করেছেন, শু‘আবুল ঈমান (১০/২৬৫) ও (১০/২৬৬)। ইমাম রাফে‘ঈ তার তারিখে হাদীসটি (৩/৪২৩) বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে হাদীসটি দাইলামী তার মুসনাদুল ফিরদাউসে (৩/১২) উল্লেখ করেছেন।
হাদীসটি সনদের দিক থেকে মিথ্যা ও মতনের দিক থেকে منکر বা অগ্রহণযোগ্য। এর সনদে নাহশাল ইবনে সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনে হুমাইদ নামে দুজন মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারী রয়েছে। অথচ কোনো হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার জন্য একজন মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারীই যথেষ্ট।
ইসহাক ইবনে মানসুর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, "আমি আল্লাহ্ তা‘আলার সামনে সাক্ষ্য দিতে পারবো মুহাম্মাদ ইবনে হুমাইদ کذاب বা মিথ্যাবাদী।" আবু যুর‘আ আর রাযী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, "সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলত।"
নাহশাল ইবনে সাঈদ সম্পর্কে শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, "এ সুপরিচিত মিথ্যাবাদী।" [সিলসিলা - ৬২৭৩]
শাইখ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ্ হাদিসটিকে موضوع বা জাল বলেছেন।
আহাদিস মুশতাহারা-লা-তাসেহ-হাদীস নং-২১১ তে হাদীসটিকে মিথ্যা বা জাল বলা হয়েছে। হাদীসটির প্রত্যেকটি সনদে বিতর্কিত ও অপরিচিত বর্ণনাকারী রয়েছে।
▣ হাদীসটির মতন বা বক্তব্যের পর্যালোচনা:
হাদীসটির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বরং আহলুল হাদীসগণ এটিকে মুনকার বা অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। এর কারণ হচ্ছে, হাদীসে সুনির্দিষ্ট কোনো ‘ইবাদতের বা নেক ‘আমলের কথা উল্লেখ করা হয় নি যে ‘ইবাদত কুরআন ও হাদীসের দলিলের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। আমরা জানি কোনো ‘ইবাদত বা নেক ‘আমল সাব্যস্ত হতে হলে এর জন্য কুরআন অথবা হাদীসের সুস্পষ্ট দলিল থাকতে হবে। নবী ﷺ সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রত্যেকটি নেক ‘আমল ও ‘ইবাদতের ধরন ও বৈশিষ্ট্য সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন।
এসব ‘ইবাদত ও নেক ‘আমলের মধ্যে কোথাও কেবল দৃষ্টি দেয়া বা তাকানোর কথা উল্লেখ করা হয় নি। অথচ আমরা দেখতে পাই উপরিউক্ত হাদীসে শুধুমাত্র মা-বাবার বা মায়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া বা তাকানোকেই অনেক বড় ফযীলত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যে ‘ইবাদত বা নেক ‘আমলের কোনো দলিল নেই কিভাবে সে কাজের এতবড় ফযীলত সাব্যস্ত হতে পারে?
এ কথাও প্রমাণিত যে, ‘ইবাদত সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে এবং ‘ইবাদতের ফযীলত বর্ণনার ক্ষেত্রে ইজতিহাদের কোনো অবকাশ নেই। তাই কোনো ‘আলিম বা ফকীহ্ এ দাবী করতে পারবেন না যে ইজতিহাদের মাধ্যমে এ ‘ইবাদত বা এ ‘ইবাদতের দলিল সাব্যস্ত হয়েছে। তাই হাদীসে শুধুমাত্র দৃষ্টি দেয়া বা তাকানোকে যদি নেক ‘আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে এবং ফযীলত বলা হয়ে থাকে তাহলে এ বক্তব্যটি সঙ্গত হবে না।
কারণ প্রথমেই বিষয়টি ‘ইবাদত কিনা তা সাব্যস্ত করতে হবে, অতঃপর এর ফযীলত সাব্যস্ত হবে৷ এজন্য আহলুল হাদীসগণ এ বক্তব্যকে অসঙ্গত ও যথার্থ নয় বরং এটি মুনকার ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসের সনদে মিথ্যাবাদী থাকার কারণে এর বক্তব্যের অসঙ্গতি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তাই সালফে সালেহীনের নিকট থেকে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে এর স্বপক্ষে কোনো সমর্থনকারী বক্তব্যও পাওয়া যায় না।
▣ প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য আরেকটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রচলিত হাদীস যেটি আমরা বেশিরভাগ ওয়াজ মাহফিলে ওয়ায়েজদের কাছ থেকে শুনতে পাই; তারা বলে থাকেন একজন হযরত, মাওলানা, হুজুর বা হক্কানী ‘আলিমের দিকে তাকালেও সগীরা গুনাহ্সমূহ মাফ হয়ে যায়! এধরনের বক্তব্য একেবারেই বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর নামে জাল-জালিয়াতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদেরকে যেসমস্ত বন্ধুগণ এ বক্তব্য দিয়ে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করছেন তাদের এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত ও সতর্ক থাকতে হবে। শুধুমাত্র দৃষ্টি দেয়া বা তাকানোকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কোথাও ‘ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেন নি। কারণ এটি ‘ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে না। ফলে এ ধরনের বক্তব্য যদি কেউ দিয়ে থাকেন যে, কোনো হক্কানী ‘আলিমের দিকে তাকালে সগীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা হয়ে যায় অথবা অনেক অনেক নেকী বা ফযীলত পাওয়া যায় তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থে মিথ্যা বক্তব্য দিচ্ছেন এবং যদি কেউ এটিকে হাদীস হিসেবে বলে থাকেন তাহলে তিনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল ﷺ এর হাদীসের নামে জালিয়াতি করেছেন।
তাই আমাদেরকে এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে ও জানতে হবে যে এ ধরনের বক্তব্য যারা দিচ্ছেন তারা লোকদেরকে মিসগাইড করছেন, পথভ্রষ্ট করছেন।
এক বড় বুজুর্গের বক্তব্য সোশাল মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে! তিনি বলেন, একজন হযরত মাওলানার দিকে যদি কেউ তাকান তাহলে তার জীবনের সগীরা গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়, তিনি যদি গ্রামের উপর দিয়ে হেঁটে যান তাহলে ঐ গ্রামের কবরসমূহের আযাব মাফ হয়ে যায়, তার সাথে কেউ মুসাফা করলে নবীর সাথে মুসাফা করার মর্যাদা লাভ হয়, তার পিছনে সলাত আদায় করলে নবীর পিছনে সলাত আদায় করার মর্যাদা লাভ হয়, তার মজলিসে যদি কেউ বসেন তাহলে নবীর মজলিসে বসার মর্যাদা লাভ হয়!
এই বক্তব্যগুলো তিনি আসলে কোথা থেকে বলেছেন? কিভাবে বলেছেন? এগুলো কি তিনি কোনো হাদীসের মাধ্যমে পেয়েছেন নাকি ইজতিহাদ করে বলেছেন? গুনাহ্ মাফের বিষয়, কবরের আযাব মাফ হওয়ার বিষয় এবং নবী ﷺ এর সাহচর্য লাভ করার বিষয়ে কোনো ব্যক্তির ইজতিহাদ করে বক্তব্য দেয়া জায়েয নেই কারণ এটি ইজতিহাদি বিষয় নয়; এটি বড় সম্মান ও মর্যাদার বিষয় যার জন্য সুস্পষ্ট নস বা দলিলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এ সমস্ত বন্ধুগণ নিজেরাই ইজতিহাদ করে এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে দিচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে মূলত মানুষদেরকে এ কথা বুঝাচ্ছেন যে ‘আলিমদের সাথে উঠা-বসা, চলাফেরা করা অনেক মর্যাদার বিষয়, অনেক সওয়াবের বিষয় এবং এর মাধ্যমে গুনাহখাতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অথচ ‘আলিমদের মর্যাদার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হাদীসের মধ্যে যে বক্তব্যগুলো দিয়েছেন সেগুলোই প্রচার করার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
তাই আমি অনুরোধ করবো, যদি কোনো সুস্পষ্ট দলিল না থাকে তাহলে এ ধরনের বক্তব্য না দেয়াই বাঞ্ছনীয় এবং এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে লোকদেরকে বিভ্রান্ত করা কোনোভাবেই বৈধ নয়, জায়েয নেই। এ ধরনের বক্তব্য যে সমস্ত বন্ধুগণ দিচ্ছেন আমরা তাদেরকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করবো, আপনারা একটু তাহক্বীক করুন, যেকোনো বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার আগে, জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার আগে বা ভাইরাল করার আগে সেটি যথাযথ সঠিক কিনা বা বিষয়টি কতটুকু সঠিক সেটি জেনে নেয়ার জন্য চেষ্টা করুন, তারপর বক্তব্য দিন।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের সবাইকে উপরিউক্ত পর্যালোচনার আলোকে বিষয়গুলো উপলব্ধি করার, বুঝার এবং অন্যদেরকে বুঝানোর তাওফিক দান করুন। আমীন!
• লিখেছেন: শাইখ ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ
• কৃতজ্ঞতা: দাওয়াতুল হক মাল্টিমিডিয়া