09/07/2019
পর্ব-৫
★
জেনেটিক্স, ইউজেনিক্স ও শ্রীশ্রীঠাকুর :: ডাঃ অনিমেষ পাল
⤵
উদাহরণস্বরূপ, বহু বিতর্কিত একটি বিষয় “অনূলোম-প্রতিলোম” নিয়েই আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। এই বিষয়টি আজকের সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আর্য সমাজব্যবস্থার নিয়মানুসারে, মানুষকে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্ৰ এই চার প্রকারের বর্ণে ভাগ করা হয়েছে। এই বিভাগ সম্পুর্ণতই সমাজ জীবনের সুন্দর ক্রমােন্নতির জন্য তৈরী করা। এই বিষয়টি কখনোই “কেউ বড়, বা কেউ ছোট্ট" এই মানসিকতার প্রতিফলনের জন্য তৈরী করা হয়নি। এক একটি বংশ, অনেক পুরুষ ধরে ক্রমাগত একই বিষয় অনুশীলনের জন্য, সেই বিষয়ে, স্বাভাবিক ভাবে পারদর্শী হয়ে ওঠে, তাই তাকে সেই ভাবে একটি বর্ণের মধ্যে গণ্য করা হয়। যেমন ব্রাহ্মণদের কাজ হলো পূজা অর্চনা করা; সমাজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। ক্ষত্রিয়দের কাজ হলো, দেশকে রক্ষা করা; অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে, রাজনীতি পরিচালনা করা। বৈশ্যর কাজ দেশের অর্থ সম্পদ, এককথায় দেশের অর্থনীতিকে পরিচালনা করা আর শূদ্রের কাজ হলো দেশের সকলের সেবা পরিচর্য্যা করা। সহজভাবে, একটি বাণীর মধ্য দিয়ে, শ্রীশ্রীঠাকুর এই চতুবর্ণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে গেছেন :
⤵
"শূদ্রই তো জাতির চাকা,
বৈশ্য জোগায় দেশের টাকা,
ক্ষত্রিয়েরা রাজার জাত
সবার পূরণ বিপ্র ধাত।"
⤵
এখন কোন উচ্চবর্ণের পুত্র যদি কোন নিম্নবর্ণের কন্যাকে বিবাহ করেন, তবে তাকে অনুলােম বিবাহ বলা হয়। আর যদি কোন নিম্নবর্ণের পুত্র উচ্চবর্ণের কোন কন্যার পাণিগ্রহণ করেন, তবে তাকে প্রতিলোম বিবাহ বলে। অনুলোমের সমর্থন সব শাস্ত্রেই আছে। প্রতিলোম চিরকালই কুফল প্রদায়ক৷ প্রতিলােম বিবাহ নিষিদ্ধ কেন, তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শ্ৰীশ্ৰীঠাকুর বলছেন, “আমার মনে হয়, স্বল্প বিবর্তিত শুক্রকীট যদি অধিকতর বিবর্তিত ডিম্বকোষ-এর উদ্গময়ক বা ফার্টিলাইজিং এজেন্ট হিসাবে কাজ করতে যায়, সেখানে জীব-বিজ্ঞান সম্মতভাবে বিধির উপর একটা অত্যাচার করা হয়৷ তাই ডিম্বকােষ সেখানে শুক্রকীটকে প্রতিরোধ করতে চায়, মিলনকালীন এই দ্বন্দের ফলে, মাতৃধাতূ ও পিতৃবীজের বৈশিষ্ট্য বিধ্বস্ত, বিকৃত ও বিপর্য্যস্ত হয়ে পড়ে। সন্তান না পায় মায়ের ভালটা, না পায় বাপের ভালটা। যে একটা কিম্ভুত-কিমাকার পদার্থে পরিণত হয়। তার প্রকৃতি হয় সাম্যহারা, দ্বন্দ্ব-প্ৰবণ, পরিধ্বংস প্রসূ। বিপর্য্যয়ী স্বভাবের দরুন যে নিজের সঙ্গেই নিজে পেরে ওঠে না। যা কিছু সুন্দর ও মহৎ, তার বিরুদ্ধেই হয় তার অভিযান। তার অন্তঃস্যুত বিলাস হয় মহতের বর্জ্য ৷ এককথায়, প্রয়াস তার হয় প্রেয় বিরােধী, অস্তিত্ব-বিলােপী। যে নীতি জাতির পক্ষে যত কল্যাণকর সেই নীতির পরিপন্থী সে ততখানি। সে যে কতখানি অব্যবস্থ, সে যে কখন কী করবে, তা’ সে নিজেই জানে না। এমন লোক আদৌ নির্ভরযোগ্য হতে পারে না, তারা বিশ্বাসঘাতক হবেই। বিরুদ্ধ সংযোগে রজােবীজের উপাদানের মধ্যে একটা বিস্ফোরণ ও ভাঙন সংঘটিত হয়, প্রতিলোম জাতকের মধ্যেও ঐ বৈশিষ্ট্য তাই ন্বভাবসিদ্ধ দেখা যায়৷ তারা যেখানে যাবে, সংহতিতে ভাঙন ধরাবেই৷ তারা যদি মহা প্রতিভাধরও হয়, তারও ফল হয়ে প্রায়শঃই বিধ্বংসী। ফলকথা, তারা অপকর্ষী, ব্যত্যয়ী চলনে না চ’লেই পারে না এবং ওতেই গৌরব বোধ করে, ঐ চলনে চলতে না পারলে অম্বস্তি বোধ করে। কিন্তু সদ্বংশজাত কোন লোক অন্যায় করলেও সাধারণতঃ তার অস্তরে সেজন্য একটা জ্বালা ও ব্যাথার কান্না লেগে থাকেই। তার পরিবর্তনও যে কোন মুহূর্তে হতে পারে। কিন্তু এদের পরিবর্তন সহজে হবার নয়। এরা সব সময় চরমে চলে। কোন সময় হয়তো অত্যন্ত বদরাগী, আবার কখনও হয়তো মাত্রাছাড়া ঠান্ডা মেজাজী। কখনও হয়তো উগ্র আসুরিক ভাবসম্পন্ন ও অতিমাত্রায় তেজী, আবার কখনও হয়তো ম্রিয়মান, বিষণ্ন ও কাপুরুষের মত ভীত ও দুর্বল। কারও কারও চরিত্রে আবার বিশেষ একটা চরম-ই প্রধান ও স্থায়ী দেখা যায় ৷ মােটপর, সাম্যসঙ্গত চলন এদের মধ্যে পাওয়াই দুর্লভ। আমার অনেক দেখা আছে। কয়েকটা মেয়ে আমার কাছে স্বীকার করেছে যে, প্ৰতিলোম কোন সংযোগ হবার সময় তাদের যেন জলে ভোবা মানুষের মত অবস্থা হয়। পূর্বপুরুষগণ একযোগে যেন ত্রাহি-ত্রাহি চিৎকার করতে থাকেন। আর্তস্বরে বলতে থাকেন-“বাচাও।' আমাদের বাচাও। আমাদের এমন করে সর্বনাশ করো না, এমন করে অধোগামী করো না। বুক ফেটে যেতে থাকে তাদের মৃত্যুযন্ত্রণার মত মনে হয়। মনে হয় “গেলাম, গেলাম।” অনেক সময় অজ্ঞাতসারে লাথি মেরে বসে পুরুষটাকে৷ এই যে লাথি মারে, যে তার সত্তা প্রতিঘাত করে ব'লে। পরে হয়তো ভোঁতা হ'য়ে যায়। কিন্তু খাঁটি জন্ম হলে প্রতিলোম সঙ্গতির বেলায় প্রথমটা সে কিছুতেই সায় দেবে না, আবার প্রতিলােম যৌন সংস্রবের ফলে প্রায়ই দেখা যায়, নাবী-পুরুষ রুগ্ণ ও বিকৃতগ্রস্ত হ’য়ে ওঠে ৷ পৃথিবীতে যদি কোন জিনিষ থাকে যা সর্ব্বৈব অকল্যাণকর, যার কোন দিক দিয়ে কােনরকম উদ্ধারণী লক্ষণ নেই সে হলো প্রতিলােম। এমনতর একটি পাপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না৷ সর্বনাশ এর সর্ব অঙ্গে৷” (আলাচনা প্রসঙ্গে 8র্থ খন্ড, পৃ:-২৭৭)
⤵
শ্ৰীশ্ৰীঠাকুর তাঁর দিব্য দৃষ্টিতে সহজে যা দেখেছিলেন, এক ভক্তের প্রশ্নের উত্তরে, সেই দর্শনকেই কেমন সুন্দরভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরলেন।
⤵