19/01/2025
#পেট্রলের_ট্যাংকের_জন্য_নির্মিত_গাড়ি
একজন গুরুভাই এসে আচার্য্যদেবের কাছে তার পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের বহু সমস্যার কথা নিবেদন করছেন। মানুষটির এত সমস্যার কথা শুনে বুঝা গেল তিনি সংসার ও পেশা নিয়ে এতটাই ব্যাস্ত যে এর বাইরেও যে একটা জগৎ আছে,- ইষ্টের জন্যও যে সময় দিতে হয় তা তিনি বুঝতেই পারছেন না৷ শুধু পেশা ও নিজের সংসারেই জীবন সমর্পন করেছেন।
শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব উনাকে জিজ্ঞেস করলেন,-" গাড়ীর মধ্যে একটা পেট্রল ট্যাংক থাকে দেখেছেন তো?"
-" আজ্ঞে, দেখেছি। "
-" তো,- এই পেট্রল ট্যাংকের জন্য গাড়ীটা বানানো হয়েছে,- নাকি গাড়ীটার জন্য পেট্রল ট্যাংক লাগানো হয়েছে?"
-" আজ্ঞে,- গাড়িটা যাতে চলতে পারে সেই জন্যই পেট্রল ট্যাংক লাগানো থাকে।"
আচার্য্যদেব হেসে বললেন,-" ঠিক তাই। আপনার পেশার জন্য আপনার জীবন নয়। জীবন রক্ষার জন্যই পেশার প্রয়োজন। শুধু পেশাতেই জীবন সমর্পন করলে ঠাকুর ধরার আনন্দ পাবেন কিভাবে?"
আমাদের মধ্যেও বহু মানুষ দেখতে পাই,- শুধু পেশা ও সাংসারিক দায়বদ্ধতার মধ্যে এতটা সমর্পিত যে বছরে একবার গুরুবাড়ি যাওয়ার সময় নাকি হয়না। সপ্তাহে অন্তত একবার মন্দিরে যাওয়ার সময় হয়না। সৎসঙ্গে যাওয়ার সময় সারা মাসে একবারও হয়না৷ শুধু ব্যাস্ত!! এতটাই ব্যাস্ত যে তিনি ভাবেন উনি না থাকলে পৃথিবীর গতি থেমে যাবে, উনি কাজ না করলে অফিসের সব কাজ আটকে থাকবে, উনি একটু মনোযোগ না দিলে সংসার রসাতলে চলে যাবে।
বাস্তবে,- কারো জন্য কিছু থেমে থাকেনা। কেউ এতটা সাংঘাতিক গুরত্বপূর্ণ নন যে তিনি ছাড়া অফিসের বা সংসার স্তব্ধ হয়ে যাবে। আমরা নিজেদেরকে মিথ্যাই এত গুরত্বপূর্ণ ভাবি। এইরকম ভেবে আমরা অলীক সুখ পাই।
একজন গুরুভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,-" লাস্ট কবে দেওঘর গিয়েছেন?"
-" দাদা, আমি ডিপার্টমেন্টের এমন একটা গুরত্বপূর্ণ দায়ীত্বে আছি যে আমার পক্ষে একদিন ছুটি নেওয়া অসম্ভব। গত পাঁচ বছরে আমি একদিনও ছুটে নিতে পারিনি। "
আমি ভীষণ অবাক হলাম!! পাঁচ বছরে একদিনও ছুটি নেননি উনি!! উনি না থাকলে নাকি অফিসের গূরত্বপূর্ন কাজ আটকে যাবে!! কি এক illusion এ ভোগছেন!!
আমি জিজ্ঞেস করলাম,-" ঠাকুর না করুন,- যদি আপনার পায়ে ব্যাথা পেয়ে প্লাস্টার করে পনেরদিন ঘরে আটকে থাকতে হয়? অথবা যদি জ্বরটর হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়? তখন ডিপার্টমেন্ট ছুটি দেবেনা?"
তখন আমতা আমতা করছেন!! " হ্যা- তখন তো ছুটি দিতেই হবে। "
আমার বাবা কয়েকটা গরু পালন করতেন। উনি গরুগুলির প্রতি এত যত্নবান ও দায়ীত্বশীল যে দেওঘর ঠাকুরবাড়িতে যাওয়ার কথা বললেই বলতেন,-" আমি চার পাঁচদিনের জন্য দেওঘর চলে গেলে গরুগুলো কে দেখাশোনা করবে? এগুলো তো না খেয়ে থাকবে!!"
এই বলে বলে তিন চার বছর দেওঘর যাওয়া হয়নি। গত বছর ফুসফুসের সংক্রমন হয়ে প্রায় পনেরদিন বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। যখন সুস্থ হলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম,-" তুমি যে এই পনেরদিন গরুগুলোকে দেখাশোনা করনি, - গরুগুলো তো না খেয়ে মারা পড়েনি। গরুগুলো একদিনও মন খারাপ করে বসে থাকেনি৷ কিন্তু এতদিন দেওঘর যাওয়ার কথা বললেই তুমি গরুর দায়ীত্ব দেখাতে। "
বাবা চুপ!! এর কয়েক মাস পরেই বিনা অজুহাতে আমার সাথে ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসলেন।
এমন আমাদের মধ্যে অনেকেই সংসার ও পেশায় অযথা এত ব্যাস্ত হয়ে পড়ি যে,- জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভুলেই যাই। তখনই শুরু হয় মানসিক উদ্বেগ, দু:শ্চিন্তা, ভয়, অনিদ্রা, নানা ঝামেলা।
***********************
ডা: রাজেশ চৌধুরী
০৯-০১-২৫