31/10/2022
◾◾ || #সমবেত_প্রণাম_ও_বিনতি_প্রার্থনা || ◾◾
১৭ই জুলাই, ১৯৬৪। পরমদয়াল সকালে নিরালা-নিবেশে বসে আছেন। ৬টা বেজে ২৫ মিনিটের সময় পরমপূজ্যপাদ বড়দার উপস্থিতিতে সমবেত প্রণাম হয়ে গেল।
১৯৫৬ সালের ২১শে মে ঠাকুর-বাংলার জামতলার ঘরে (ঐ ঘরের বর্তমান নাম জামতলা শ্রীঅঙ্গন) শ্রীশ্রীঠাকুরের ষ্ট্রোক হয়। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে তাঁর শরীরের ডানদিকের স্বাভাবিক সঞ্চালন ক্ষমতা অনেকটা রহিত হয়ে যায়। কিছুদিন চিকিৎসার পর তিনি ক্রমশঃ সুস্থ হয়ে উঠতে থাকেন। কিন্তু তাঁর ডান হাতটি তখনও সম্পূর্ণ নিরাময় হয়নি। স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করা বা উঁচু-নিচু করার একটু অসুবিধা রয়েই গিয়েছিল। ঐ হাতের আঙ্গুলগুলিতে তিনি কম জোর অনুভব করতেন। আশ্রমবাসী দাদা ও মায়েরা সকাল-বিকেল-সন্ধ্যায় যার যার মত করে এসে শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্রণাম করতেন। সমবেত প্রণামের বর্তমান রকমটা তখন ছিল না। কিন্তু যখনই কেউ এসে তাঁকে প্রণাম করতেন, ঠাকুর সাধারণতঃ তাঁর হাত দু'টি জোড়ে কপালে ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে প্রণাম গ্রহণ করতেন (তিনি এইভাবে পরমপিতার উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করতেন নাকি আমাদের আশীর্বাদ করতেন তা দয়াল নিজেই জানেন। আমার ধারণার বাইরে প্রণাম গ্রহণের সেই অপরূপ ভঙ্গিমার ব্যাখ্যা)। কিন্তু এভাবে বারে বারে তাঁকে তা করতে হত, ভক্তেরা প্রণাম করলেই। অসুস্থতার সময়ও (যখন ডান হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত) এইভাবে কষ্ট করে তা তিনি করতেন। তাঁর এই শারীরিক অসুবিধার কথা চিন্তা করে, পূজনীয় বড়দা পরবর্তী সময়ে একদিন (তারিখটা স্মরণে নেই) সকালবেলা শ্রীশ্রীঠাকুরের ঘরের কাছে যাঁদের পেলেন তাঁদের সবাইকে নিয়ে---'চল্, আমরা সবাই একসাথে বাবাকে প্রণাম করি’—এই বলে শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্রণাম করলেন। তারপর থেকে ক্রমে সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলাতেই তাঁরা পূজ্যপাদ বড়দার সাথে সমবেত ভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্রণাম করতে লাগলেন। তারপর বড়দা শ্রীশ্রীবড়মাকে প্রণাম করতেন। আমরা সবশেষে পূজ্যপাদ বড়দাকেও প্রণাম করতাম (প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ঐ সময় সমবেত বিনতি-প্রার্থনা বহুদিন বন্ধ ছিল)। এভাবেই আশ্রমে সমবেত প্রণাম নিত্য-নৈমিত্তিকভাবে শুরু হল। সমবেত প্রণাম দু'তিন মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও ঠাকুরের নিমীলিত চক্ষে দু’হাত জোড়ে মাথায় ঠেকিয়ে রাখার সময়টা কিন্তু দিনের পর দিন বাড়তেই থাকল।
কিছুদিন পর পূজ্যপাদ বড়দা ঠাকুরঘরে একদিন মায়েদের বলেন—সমবেত প্রণামের সময় শ্রীশ্রীঠাকুরের সামনে ধূপ-দীপ দিলে এবং শঙ্খে ফুঁ দিলে কেমন হয়? সুশীলামা (বিশ্বাস) সাথে সাথে বলে উঠলেন, খুব ভাল হয়। পূজ্যপাদ বড়দা তাঁকে পিতলের থালা, প্রদীপ, শঙ্খ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিলেন। সেগুলি দিয়েই প্রথমদিকে ধূপ-দীপ, শঙ্খধ্বনি সহযোগে সমবেত প্রণাম হত। পরবর্তীকালে সুশীলামা ভিক্ষা করে রূপোর থালা, সোনার প্রদীপ স্বীয় প্রচেষ্টায় সংগ্রহ করেন।
আগেই বলেছি, সমবেত প্রণামের সময় শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর হাতদু'টি জোড় করে কপালে স্পর্শ করে রাখতেন। প্রথমে তিনি ৫-৭ মিনিট ঐভাবে মাথায় দু'হাত ঠেকিয়ে রাখতেন, কোন অবলম্বন ছাড়াই। কোন কোন দিন তিনি ১০-১৫ মিনিট অবধি একইভাবে মাথায় দু'হাত জোড়ে (প্রতি-নমস্কারের ভঙ্গিতে) ঠেকিয়ে ঐভাবে থাকতেন। পরে তা বেড়ে ২০-২৫ মিনিট পর্য্যন্ত চলতে থাকে। একেকদিন ৩৫-৪০ মিনিটও পার হয়ে গেছে, এমনও দেখেছি।
সেই সময়ে কাশি এলেও তাঁর হাত দু'টি তিনি কখনাে কপাল থেকে নামাননি। কোন কোনদিন কাশি এমন হত যে প্রশ্বাস নিতেও ঠাকুরের কষ্ট হত। এইভাবে একদিন ঘড়িতে দেখলাম যে ৪২ মিনিট অতিক্রান্ত! সেই ভাব ও রূপকে বর্ণনা করা কঠিন। নীরব নিস্তব্ধ থাকত গােটা পরিবেশ। জগৎ-সংসারের মধ্যে থেকেও ঠাকুর যেন সেই সময় পরম- কারণে বিলীন। একি তাঁর নীরব ভাব-সমাধি? সেই দীর্ঘ সময় বড়দা (এবং আমরা) হাঁটু গেঁড়ে ঠাকুরের মুখােমুখি বসে, তাঁর দু’হাত (জোড়া করে) বুকে ঠেকিয়ে রাখতেন। স্বীকার করতে বাধা নেই যে সেই দীর্ঘ সময় আমরা ঐভাবে থাকতে না পেরে হাঁটু সামনের দিকে রেখে বসে পড়তাম। অথচ ঠাকুর তখনও একই ভঙ্গিমায় সমাসীন।
সমবেত-প্রণামের দরুন এই সুদীর্ঘ সময় অবধি শ্রীশ্রীঠাকুরের এইভাবে থাকার (তদুপরি ঐ সময়ে কাশি আরম্ভ হলে তাঁর যে অসহনীয় কষ্ট ও অস্বস্তি হত) শারীরিক কষ্টের কথা চিন্তা করে বড়দা ১৭ই জুলাই ১৯৬৪ সকালে ঠাকুরকে অনুরােধ করে বললেন---বাবা! আমরা সকলে মিলে বিনতি করলে কেমন হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন—ভালই হয়। করলেই হয়। সেদিন বিকেলবেলায় বড়দার উপস্থিতিতে সৎসঙ্গী দাদা এবং মায়েরা সমবেত প্রণামের পরিবর্তে সবাই মিলে বিনতি প্রার্থনা ('বার বার কঁরু বিনতি’ এবং 'বার বার কর জোড় কর’) করলেন। এর ফলে সমবেত প্রণামের দরুন ঠাকুরের দীর্ঘক্ষণ মাথায় জোড়হাত ঠেকিয়ে রাখার কষ্টকে থামানো গেল।
প্রথমদিনের (১৭ই জুলাই, ১৯৬৪) সন্ধ্যাবেলার বিনতি-প্রার্থনার পর পরই ঠাকুর সেবামাকে জিজ্ঞাসা করলেন--- 'গুরুব্রহ্মা, গুরুবিষ্ণু' করল না? সেবামা সেই কথা বড়দাকে জানালে 'গুরুব্রহ্মা, গুরুবিষ্ণু' সকাল-সন্ধ্যের বিনতি-প্রার্থনার (সকালে 'রাধাস্বামী নাম যো গাওয়ে’, 'বার বার কর জোড় কর’, সন্ধ্যায় 'বার বার কঁরু বিনতি’ এবং 'বার বার কর জোড় কর’) সাথে (শেষে) গাওয়া হতে লাগল। এভাবেই ঠাকুরের তিরােধান অবধি সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সামনে দেওঘরে বিনতি-প্রার্থনা হত। ক্ষেত্রবিশেষে (ব্যতিক্রম হিসেবেই বলা যায়) আবাহনী সহযােগেও প্রার্থনা সম্পূর্ণ হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, অসুস্থতার কারণে ঠাকুর সকালবেলা বিশ্রাম নিলে বিনতি-প্রার্থনা করা হত দেরিতে। ব্যতিক্রম হিসেবে, আমি সকাল ৯টাতেও সকালের বিনতি হতে দেখেছি। মনে পড়ে, ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের দিনও পবিত্র দাহস্থলে (দাহকার্য্যের সময়) সন্ধ্যা বিনতি-প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিরোধানের পরবর্তী সময়ে, বড়দার ইচ্ছাতে শ্রীশ্রীঠাকুর বিরচিত 'জয় রাধে রাধে' সমবেতভাবে পূর্বোক্ত বিনতি-প্রার্থনার শেষে গাওয়া হতে লাগল। ঘড়িতে মিলিয়ে দেখেছি, 'জয় রাধে রাধে'-সহ সকালের কিংবা সন্ধ্যার বিনতি-প্রার্থনা সমাধা হতে (এখন যেভাবে ঠাকুরবাড়িতে গাওয়া হয়) সময় লাগে প্রায় ১৪ মিনিট। ‘জয় রাধে রাধে' কীর্তন-সঙ্গীতে লাগে মোটামুটি ৭ মিনিট। 'বার বার কঁরু বিনতি', 'রাধাস্বামী নাম যো গাওয়ে', 'বার বার কর জোড় কর', বিনতি প্রার্থনার এই অংশগুলি আগ্রা সৎসঙ্গ থেকে (এই আগ্রা সৎসঙ্গের একদা প্রধান সন্ত-সদগুরু হুজুর মহারাজের কাছে ঠাকুরের মা, স্বয়ং মনােমােহিনী দেবী দীক্ষা নিয়েছিলেন) গৃহীত। 'গুরুব্রহ্মা, গুরুবিষ্ণু'র রচয়িতা স্বয়ং শংকরাচার্য্য। এবং বলাই বাহুল্য 'জয় রাধে রাধে' গানটি লিখেছিলেন স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, যার সুরারোপ করেছিলেন প্রখ্যাত সুরকার অপরেশ লাহিড়ী (তাঁরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ঠাকুরের সৎমন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন)।
আমি যখন দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রমে আসি, ১৯৪৯ সালে, সেই সময় সন্ধ্যায় বিনতি প্রার্থনায় যােগদান করতাম। তখন বড়াল-বাংলার বড়দালানের ঘরের (এখন যেখানে মেমোরিয়া', সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে (যা বাঁধানাে ছিল না, কোথায়ও ঘাস, কোথাও কাঁকর মাটিতে ঢাকা ছিল) ঠাকুর একটি চৌকীর ওপর শ্বেতশুভ্র বিছানায় বসে থাকতেন। আর, আমরা তাঁর মুখােমুখি বসে সমবেত সন্ধ্যা-প্রার্থনায় ভাগ নিতাম। আমরা অনেকে মাটিতে বা ঘাসের ওপরে বসে প্রার্থনা করতাম। 'আবাহনী' দিয়ে প্রার্থনা শুরু হত। প্রার্থনা শুরু হওয়ার আগে তখন ঘণ্টা বাজানাে হত, যাতে সবাই প্রার্থনাতে সময়মত এসে যােগদান করে। তারপর 'বার বার কঁরু বিনতি’ এবং 'বার বার কর জোড় কর’ অংশগুলি সমবেতভাবে গাওয়ার পর ‘হে পরমকারুণিক !’ (ঠাকুরের রচিত) সবাই মিলে হাঁটু গেড়ে বসে (কোলের উপর হাত জোড় করে) বলতাম। তারপর কেষ্টদার রচিত ‘পুরুষোত্তম বন্দনা' পাঠ হত এবং তারপর ঠাকুর বিরচিত ‘যিনি সব যাহা কিছুতেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া দেদীপ্যমান’ অংশটি সমবেতভাবে পাঠের সময় আমরা কখনাে দাঁড়িয়ে, কখনও হাঁটু গেঁড়ে, কখনােও বীরাসনে, কখনও সুখাসনে, কখনাে ভূমিষ্ঠ হয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করতাম। তারপর 'গুরুব্রহ্মা, গুরুবিষ্ণু', 'পঞ্চবর্হি', 'সপ্তার্চ্চি' একসাথে বিশেষ সুরে গাইতাম (এবং বলতাম)। এভাবেই পুরাে সন্ধ্যা-প্রার্থনা সমাধা হতে মােটামুটি ২৮-৩০ মিনিট সময় লাগত।
[সংগৃহীত:- "কত কথা মনে পড়ে"
(মণিলাল চক্রবর্তী)]