25/03/2024
ধারাবাহিক "আমার গৌরাঙ্গসুন্দর",পর্ব ১৪৩,প্রসঙ্গে- শ্রীশ্রীগৌর পূর্ণিমা ও দোলপূর্ণিমা মহোৎসব l
আজ ২৫শে মার্চ-২০২৪ খ্রীস্টাব্দ, ১০ চৈত্র ১৪৩০ বাঙ্গাব্দ সোমবার,
শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর হলেন বিশেষ করে এই
কলিযুগের কলিহত পতিত জীবের উদ্ধারকর্তা এবং কৃষ্ণপ্রেম প্রদাতা l
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর" ৫৩৮ তম বার্ষিক শুভ আবির্ভাব তিথি এবং দোলপূর্ণিমা উৎসব l
২৬ মার্চ মঙ্গলবার ২০২৪ খ্রীস্টাব্দ হোলি উৎসব।
পূর্ণিমা তিথি শুরু :- ২৪ মার্চ সকাল ৯ টা ৫৪ মিনিট থেকে ।
পূর্ণিমা তিথি শেষ :- ২৫ মার্চ দুপুর ১২ টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত।
উক্ত গৌর পূণির্মার শুভ তিথিতে চন্দ্রোদয় পযর্ন্ত উপবাস থেকে অভিষেক পালনীয়।
শাস্ত্র মতে ফাল্গুন পূর্ণিমা তিথিতে হোলিকা দহন করা হয়। তার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে হোলি খেলা হয়। এবার ২৪ মার্চ সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে। যা সমাপ্ত হবে পরের দিন ২৫ মার্চ দুপুর ১২টা ২৯ মিনিটে।
শাস্ত্র মতে দুই দিন পূর্ণিমা তিথি থাকলে প্রথম দিন যদি প্রদোষ কালে ভদ্রা মুক্ত সময়ে পূর্ণিমা পাওয়া যায়, তা হলে সে দিন হোলিকা দহন করা হয়। তার পরের দিন ২৫ মার্চ হোলি খেলা হয়। পশ্চিমবঙ্গে ফাল্গুন চতুর্দশী তিথিতে ন্যাড়া পোড়ানো ও পূর্ণিমার দিনে দোল খেলা হয়। কিন্তু তিথি গোলযোগের কারণে উদয়া তিথি মেনে ভারতের অন্যান্য অংশের মতো ২৫ তারিখই দোল উৎসব পালিত হবে এবং ন্যাড়া পোড়ানো হবে ২৪ মার্চ।
আর এবছর হোলি উৎসব পড়েছে ২৬ মার্চ।
এদিকে, হোলির সময় ফাল্গুন পূর্ণিমায় হবে চন্দ্রগ্রহণ। চন্দ্রগ্রহণের উপচ্ছায়া সকাল ১০ টা ২৪ মিনিটে শুরু হবে। আর তা শেষ হবে দুপুর ৩.০১ মিনিটে। সেই দিন চন্দ্রোদয় হবে সন্ধ্যে ৬ টা ৪৪ মিনিটে। ফলে ২৫ মার্চ দোল উৎসবের পাশাপাশি রয়েছে চন্দ্রগ্রহণ।
কৃপা পূর্বক সকলেই এই ব্রত পালন করুন এবং অন্যকে উৎসাহিত করুন,এবং মহাপ্রভুর অশেষ কৃপাশিষ লাভ করে এই দুর্লব মনুষ্যজন্ম সার্থক করুন হরিনামকে আশ্রয় করে।
দোলযাত্রা
দোলযাত্রা একটি বৈষ্ণব উৎসব। দোল উৎসবের সঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় আবার চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাৰ তীথি তাই একে গৌরপূর্ণিমা বলা হয়।
বহির্বঙ্গে পালিত হোলি উৎসব টির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসব টি সম্পর্ক যুক্ত। এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব।
ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
দোল পূর্ণিমা সনাতন ধর্মাবলম্বী দের কাছে একটি অতি আনন্দের উৎসব। এই উৎসব টি স্থানভেদে হোলি উৎসব, দোল পূর্ণিমা উৎসব বা গৌর পূণির্মা উৎসব হিসেবে পালিত হয়। তবে হোলি ও গৌর পূর্ণিমা একই দিনে পালিত হলেও উৎসব দুটি মূলত আলাদা।
বর্তমানে হোলি উৎসবটি সারা পৃথিবী জুড়েই সনাতনীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আনুমানিক ৫৫০০ বছর আগে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে ব্রজবাসী গণ তাদের প্রাণ প্রিয় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা রাণীকে বৃন্দাবনে একত্রে পেয়ে সীমা হীন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে একটি উৎসবের আয়োজন করেন। সেই উৎসবে তারা রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণ কে ফুলের দোলনাতে বসিয়ে মহানন্দে দোল দেন এবং সেই আনন্দ বহু গুনে বর্ধিত হলে তারা রাধা-কৃষ্ণের চরণে বিভিন্ন বর্ণের আবির ঢেলে প্রেমানন্দের বহিঃপ্রকাশ করেন। সেই স্মৃতিকে স্মরণ করে আজও ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রঙ্গের উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে।
সেই লীলা থেকেই দোল বা হোলি খেলার উৎপত্তি হয়।
দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন সহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রং খেলেন। দোলযাত্রা উৎসবের দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়।
এছাড়াও কথিত আছে- অত্যাচারী দৈত্যরাজা হিরণ্যকশিপুর দানবী বোন হোরিকা বা হোলিকাকে এই দিনে হত্যা করা হয়েছিল। তাই অশুভনাশের আনন্দে ব্রজবাসীগণ আনন্দ উৎসব হিসেবে এই দিনটি পালন করেন।
💜 আজ আমাদের সবার প্রেমের ঠাকুর শ্রী গৌরাঙ্গসুন্দর অর্থাৎ চৈতন্য মহাপ্রভুর আর্বিভাব তিথি 💜
এবার আসি গৌর পূর্নিমার কথায়। শ্রী গৌর সুন্দর হলেন কলি যুগের সাক্ষাৎ রাধা ও শ্রী কৃষ্ণ মিলিত তনু । কলির অধঃপতিত জীবদের করুনা করতে তিনি আবির্ভূত হলেন শ্রীধাম নবদ্বীপে আজ থেকে ৫৩৭ বছর পূর্বে, ভারতের পশ্চিম বাংলার নদীয়া জেলায় নবদ্বীপের মায়াপুরে ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ, বাংলা ৮৯১ সালের ২৩ শে ফাল্গুন দোলপূর্ণিমা তিথিতে সন্ধ্যা বেলার পূণ্যলগ্নে চন্দ্রগ্রহণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রী জগন্নাথ মিশ্রের বাড়িতে প্রকট হোন l
এ যেন আনন্দ উৎসবে এক নতুন মাত্রা যোগ করলেন। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে ঐদিন সন্ধ্যায় মহাপ্রভুর আবির্ভাবের সময় হঠাৎ করে চন্দ্র গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ পূর্ণিমার মাঝে চন্দ্র গ্রহণ। যাকে বলা হয় eclipse of full moon যা জোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি সন্ধিক্ষণ। শত বছরে এক দুইবার খুবই অল্প সময়ের জন্য এই সন্ধিক্ষণ গুলো আসে। তাই আমাদের সবার প্রেমের ঠাকুর শ্রী গৌরাঙ্গসুন্দর অর্থাৎ চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মের এই রহস্যময় সময়েই দিক বিদিক আলো করে উলুধ্বনি , হরি বোল ও হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র উচ্চারণ আর শঙ্খনাদের গর্জনে শচীমাতা আর পিতা জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে আবির্ভূত হলেন আমাদের সবার প্রেমের ঠাকুর শ্রী গৌরাঙ্গসুন্দর অর্থাৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ।
চৈতন্যের জন্মযাত্রা ফাল্গুনী পূর্ণিমা l
ব্রহ্মাদি এই তিথির করে আরাধনা ll
পরম পবিত্র তিথি ভক্তি স্বরপেনি l
যহি অবতীর্ণ হইলেন দ্বিজমনি ll
(শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত)
তাই এই অতি পবিত্র তিথি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও অত্যন্তিক মঙ্গলের দিন । এই দিনই সকল কৃষ্ণভক্ত মানুষের নয়নের মনি শচীনন্দন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি।
সে কারনেই আজকের এই পূন্য তিথিটি সকল বৈষ্ণব তথা সকল কৃষ্ণ ভক্ত মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।
ভক্তদের হৃদয়ে চৈতন্যদেব- নিমাই, গৌরাঙ্গ, গৌররায়, গোরা, গৌর, গৌরহরি, শচীনন্দন প্রভৃতি নামে পরিচিত।
কলিযুগে বিপ্ররূপে ধরি পীতবর্ণ l
বুঝাবারে বেদগোপ্প্য সংকীর্তন ধর্ম ll
কলিযুগে সর্ব ধর্ম হরি সংকীর্তন l
সর্বপ্রকাশলেন চৈতন্য নারায়ণ ll
কলিযুগে সংকীর্তন ধর্মপালিবারে l
অবতীর্ণ হইল প্রভু সপরিকরে ll (শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত)
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু কৃত
সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্র যা
সমস্ত বেদ ,বেদান্ত ,উপনিষদ,পুরাণের নির্যাস তা শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম l শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের দ্বারা সারা বিশ্ব জগতে অশেষ কৃপা বর্ষণ করলেন l
‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং’, অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং, অনন্ত কোটি বিশ্ব ব্রহ্মান্ড যার ইচ্ছায় সৃষ্টি হয়েছে, প্রতিপালিত হচ্ছে। ‘গোবিন্দং আদি পুরুষং’- অর্থাৎ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের আদি পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর পূর্বে কোন কিছুই ছিল না। এই কলিযুগে হতভাগ্য জীবদেরকে উদ্ধার করে ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং ভক্তবেশ ধারণ করে মহাপ্রভু শ্রীচৈতণ্য রূপে আবির্ভুত হয়েছেন। শ্রীচৈতণ্য মহাপ্রভুই যে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তা শাস্ত্রে বহু প্রমাণ আছে।
🌿 শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র যে শচীসূতরূপে অবতীর্ণ হবেন তা ভবিষ্যৎ পুরাণেও উল্লেখ আছে-
অজায়ধ্বমজায়ধ্বজয়ধ্বং ন সংশয়ঃ।
কলৌ সংকীর্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ।
কলিযুগ সংকীর্তন আরম্ভে আমি শচীসূতরূপে জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, কলিাগে যা ধর্মনামের পাচার।
সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
🌿 সামবেদে বলা আছে,
‘তথাহং কৃতসন্ন্যাসো ভূগীর্বাণোহবতরিষ্যে,
তীরেহলকানন্দায়াঃ পুনঃ পুনরীশ্বরপ্রার্থিতঃ সপরিবারো, নিরালম্বো নির্ধূতঃ কলিকল্মষ-কবলিত-জনাবলম্বনায়’।
অর্থাৎ আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া, পুনঃপুনঃ ঈশ্বর শ্রীঅদ্বৈত- প্রবর্তিত হইয়া, ভূদেবতা ব্রাহ্মণরূপে, অন্যাশ্রয় নিরপেক্ষ এবং অবিচলিতভাবে কলি-কলুষ-কবলিত জীবের উদ্ধারার্থ সপরিকর অলকানন্দার তীরে অবতীর্ণ হইব।
🌿 মার্কন্ডেয় পুরাণে-
গোলোকঞ্চ পরিত্যজ্য লোকানাং ত্রাণকারণাৎ।
কলৌ গৌরাঙ্গরূপেণ লীলা-লাবণ্য-বিগ্রহঃ।।
অর্থাৎ শ্রীভগবান লোকসমূহের ত্রাণের নিমিত্ত গোলোক পর্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া কলিতে গৌরাঙ্গরূপে লীলা-বিগ্রহধারী করিবেন।
🌿 বরাহপুরাণে-
কলেঃ প্রথমসন্ধ্যায়াং লক্ষ্মীকান্তো ভবিষ্যতি।
ব্রহ্মরূপং সমাশ্রিত্য সম্ভবামি যুগে যুগে।।
অর্থাৎ কলির প্রথম সন্ধ্যায় লক্ষ্মীকান্ত ব্রাহ্মণরূপ আশ্রয় করিয়া আবির্ভূত হইবেন। শ্রীভগবান বললেন, আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারানির ভাবকান তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্য রূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে।
“ভগবান তপ্তকাঞ্চনের মতো অঙ্গকান্তি ধারণ করে (গৌরসুন্দর রূপে) অবতীর্ণ হবেন। তাঁর সুন্দর রূপ তপ্ত কাঞ্চনের মতো এবং চন্দনে চর্চিত। তিনি সন্ন্যাস-আশ্রম অবলম্বন করে কঠোরভাবে আত্মসংযমী হবেন এবং মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের মতো নির্বিশেষ বাদী না হয়ে তিনি ভগবৎ-ভক্তিতে নিষ্ঠাপরায়ণ হবেন এবং সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা করবেন।"
পরে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে সাতদিন ধরে বেদান্ত-দর্শন শ্রব করিয়েছিলেন। মহাপ্রভু তার ভ্রান্ত নির্বিশেষপর মায়াবাদী ব্যাখ্যা খণ্ডন করে বেদান্তের নির্ভুল সবিশেষ তত্ত ব্যাখ্যা করলেন এবং পরিশেষে তাঁকে ষড়ভুজরূপে দর্শন দান করে এক মহান ভক্তরূপে পরিণত করলেন।
সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়ে তাঁকে একশো শ্লোকদ্বারা বন্দনা করেছিলেন।
সার্বভৌম ভট্টাচার্যের মতো অনেকেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা জানতে পারেননি। কারণ ভগবানের কৃপা ছাড়া ভগবানকে জানা যায় না।
🌿 শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র যে শচীসূতরূপে অবতীর্ণ হবেন তা ভবিষ্যৎ পুরাণেও উল্লেখ আছে-
অজায়ধ্বমজায়ধ্বজয়ধ্বং ন সংশয়ঃ।
কলৌ সংকীর্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ।
কলিযুগ সংকীর্তন আরম্ভে আমি শচীসূতরূপে জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, জন্মগ্রহণ করব, কলিাগে যা ধর্মনামের পাচার।
সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
🌿 শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে (আদি ৩/৪০ ) উল্লেখ আছে...
কলিযুগে যুগধর্মনামের প্রচার।
তথি লাগি' পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার।।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখনই অবতীর্ণ হন, তখনই তিনি নবদ্বীপের অন্তদ্বীপে অন্তর্গত এই শ্ৰীধাম মায়াপুরে শচীমায়ের গর্ভে অবতীর্ণ হন।
তবে শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও প্রতি কলিযুগে অবতীর্ণ হন না।
তিনি ব্রহ্মার দিবসে অর্থাৎ এক হাজার চতুর্যুগের মধ্যে একবার মাত্র অবতীর্ণ হন।
সেই সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৩/১০) উল্লেখ করা হয়েছে-
অষ্টাবিংশ চতুর্যুগে দ্বাপরের শেষে।
ব্রজের সহিত হয় কৃষ্ণের প্রকাশে।।
”বৈবস্বত মন্বন্তরের অষ্টাবিংশ চতুর্যুগের দ্বাপরের শেষভাগে কৃষ্ণ নিজে ব্রজতত্তের সমস্ত উপকরণ সহ প্রকাশ পান।"
সেই প্রকার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও দ্বাপরের পরেই কলিতেই অবতীর্ণ হন। তিনি এসে কি করেন? অনর্পিত বস্তু প্রদান করেন, যা ভগবানের অন্য কোন অবতার ইতিপূর্বে প্রদান করেননি। চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম গৌরাঙ্গ বা নিমাই। তাঁর গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাঁকে গৌরাঙ্গ বা গৌর নামে অভিহিত করা হত।
অন্যদিকে নিম বৃক্ষের নিচে জন্ম বলে তাঁর নামকরণ হয়েছিল নিমাই।
ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন বৈপ্লবিক
যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সেযুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীরচৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত, এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল l
যুগ ধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রবর্তক এবং হরিনাম মহামন্ত্র দাতা শ্রী আমাদের গৌরাঙ্গসুন্দর চৈতন্য মহাপ্রভু ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার অন্তর্ভুক্ত মায়াপুরে অতি উচ্চ ব্রাহ্মন পরিবারে আবির্ভূত হন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। গৌরাঙ্গসুন্দর চৈতন্য মহাপ্রভু পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ওড়িশার জাজপুরের আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতামহ মধুকর মিশ্র ওড়িশা থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। গৌরাঙ্গসুন্দর চৈতন্য মহাপ্রভুর পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত l
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর ভবিষ্যৎবাণী :-
পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম l
সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম ll
এই ভবিষ্যৎবাণীকে বর্তমান গৌড়ীয় বৈষ্ণব জগতের আচার্য ভাস্কর ও সমগ্র জগতের
শ্রী চৈতন্য মঠ গৌড়ীয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য সিংহ গুরু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর জগত গুরু প্রভুপাদ তার সমস্ত শিষ্য বর্গের দ্বারা বাস্তবায়িত করেছেন l এবং তার সমস্ত শিষ্য বর্গের মধ্যে অন্যতম হলেন ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য এবং সারা বিশ্বব্যাপী গৌরবানী প্রচারক
শ্রীল অভয়চরণাবৃন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ l অতএব শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর চৈতন্য মহাপ্রভুকে সঠিকভাবে বুঝতে গেলে ও তাঁর কৃপা পেতে হলে তারই কৃপাধন্য সমস্ত গৌড়ীয় গুরুবর্গ বা আচার্য বর্গের থেকে সঠিকভাবে আচারিত এবং অপ্রচারিত কথা শ্রবণ করতে হবে l
ও তাদের সেবা করতে হবে l
চৈতন্য সিংহের নবদ্বীপে অবতার l
সিংহগ্রীব,সিংহ বীর্য , সিংহের হুংকার ll
সেই সিংহ বসুক জীবের হৃদয় কি কন্দরে l
কল্মষ-দ্বীরোদ নাশে যাহার হুংকারে ll
(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত)
আসুন আমরা সবাই মিলেমিশে বলি --
জয় শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ l
সবাই এই মহামন্ত্র জপ ও কীর্তন করি --
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ll
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ll
জয় পতিতপাবন শচীনন্দন ও জগন্নাথসূতো গৌরাঙ্গসুন্দর ভগবান কি! হরে কৃষ্ণ!
ক্রমশঃ...