20/11/2021
🌺🌺🙏শক্তির মহাপীঠ🙏🌺🌺
🌼🏔🌺 কেদারনাথ🌼🏔🌺
বাসের জানলা দিয়ে ভোরের হরিদ্বার দেখতে দেখতে আমরা চলছি কেদারনাথের উদ্দেশ্য !আজকের বাস যাত্রা হরিদ্বার থেকে সোনপ্রয়াগ পযর্ন্ত 235 km ! তাই ভোরের আলো ফুটতে ফুটতেই আমরা বেড়িয়ে পরেছি!এই দীর্ঘ যাত্রাপথ হরিদ্বার হয়ে - ঋষিকেশ - ব্যাসি -দেবপ্রয়াগ-শ্রীনগর - রুদ্রপ্রয়াগ - অগস্তমুনি - উখিমঠ- ফাটা হয়ে -সোনপ্রয়াগ গিয়ে শেষ হবে!
হরিদ্বার থেকে ২৪ কিমি দূরে ঋষিকেশ"। ঋষিকেশ হল, যোগশিক্ষা আর তপস্যার ভূমি। এখানেই আছে বিখ্যাত সেতু "লক্ষ্মণ ঝোলা"। বাসে থাকার কারণে দূর থেকেই তার দর্শন করতে হলো! কিন্তু যদি আপনার প্রাইভেট গাড়ি আর হাতে সময় থাকে তো চোখবন্ধ করে ঋষিকেশ নেমে পড়তে পারেন ! এই শহর সংসারে সমস্ত ধরনের মানুষের জন্য তার প্রসার খুলে রেখেছে ! প্রকৃতিপ্রেমি, আধ্যাত্মিক মানুষ, সাধু - সন্ন্যাসি,রোমাঞ্চকর উৎসাহীদের জন্য
রিভার রেফটিং, কায়াকিং ও বাঞ্জি জাম্পিং কি নেই এখানে?
ঋষিকেশই হচ্ছে হিমালয়ের পাদতল এখান থেকেই পর্বত আরহণ শুরু !
আমাদের বাসও ধিরে ধিরে শহরের যানজট পেরিয়ে হিমালয়ের গভীরে প্রবেশ করা শুরু করলো! এই আমার জীবনের প্রথম হিমালয় যাত্রা ! তাই প্রত্যেকটি জিনিস দুই চোখের ক্যামেরাই বন্দি করে নিচ্ছিলাম! একদিকে মা গঙ্গার কুলকুল ধ্বনি আর আরেক দিকে হিমালয়ের বিশাল পার্বত্য প্রাচির ! এখানে আসলে অতি অহংকারী ব্যক্তিরও অহংকার চুণ হয়ে যেতে পারে একমহুত্বে ! কারণ সে দেখতে পারবে; সংসারে নিজেকে সে যত বড়ই মনে করুক না কেনো ! বাস্তবে এই বিশাল অস্তিত্বের সামনে সে একটি পিপীলিকার বরাবর!
ব্যাসি পেরিয়ে বাস দেবপ্রয়াগ ঠুকছে পরেছে বুঝতে পেরে নিজেকে জাগ্রত করলাম ! এটাই সেই সঙ্গম ! এই সঙ্গমেই উৎপত্তি পতিতপাবনী গঙ্গার। ভাগিরথী আর অলকানন্দা/ মন্দাকিনীর মিলিত ধারা অলকানন্দা নামে মিশে গঙ্গার সৃষ্টি করেছে এই দেবপ্রয়াগেই। এখানে ভাগীরথীর জল খানিক ঘোলা আর অলকানন্দার জল সবুজাআভা আর তারই মাঝে সবুজে সবুজে পাহাড়ে ঘেরে এই ছোট্ট শহর দেবপ্রয়াগ।
মন না চাইলেও এই সৌন্দর্যে ভরা ছোট্ট শহরটাকে পিছনে ছেড়ে আমাদের বাস আগিয়ে চললো কারণ তাকে যে এখনো অনেকটা পথ যাত্রা করতে হবে প্রায় 130 কিলোমিটার !
দেবপ্রয়াগের পর শ্রীনগর একে এখানকার বাণিজ্যিক নগরীও বলে! এখানে স্কুল,কলেজ, অ্যাকাডেমি, ট্রেনিং সেন্টার,মল,সপ,মার্কেট সব কিছুই আছে!
শ্রীনগর পেরিয়ে কিছুটা গেলে রাস্তার দুইধারে বড়ো বড়ো খাদ দেখা যায় ! লিখেতো দিলাম তবে অস্বীকার করবো না এই খাদ দেখে যে মনের ভিতরে একটু হলেও ভয়ের সঞ্চার হয়নি! কিন্তু হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতোই বেশি যে সেই ভয় পালিয়ে কখন যে সেখানে মুগ্ধতা স্থান নিয়ে নেই তা টেরও পাওয়া যায় না!
গাড়ি রুদ্রপ্রয়াগে এসে থামলে বাস প্রায় খালি হয়ে গেলো! কারণ এখন থেকেই অলকানন্দা আর মন্দাকিনীর সাথে সাথে রাস্তাও দুটোভাগে ভাগ হয়ে গেছে ! একটা কেদারনাথের দিকে আরেকটা বদ্রীনাথের দিকে ! রুদ্রপ্রয়াগ সঙ্গম বাস থেকে সেই ভাবে দেখা যায় না ! চাইলে নেমে গিয়ে দেখে আসা যেতে পারে!
এর পরের জনবিহুল স্থান অগস্ত্যমুনি ! হ্যাঁ এই সে পৌরাণিক গ্রন্থের মহান ঋষি !আর এটা তার তপভূমি!তার নাম অনুসারেই এই জায়গার নাম অগস্ত্যমুনি!
শীতকালে তুষারপাতের জন্য কেদারনাথ থেকে মূর্তি কে যে স্থানে নিয়ে গিয়ে পূজা করা হয় সেটা উখিমঠ !অগস্ত্যমুনি থেকে উখিমঠের দূরত্ব অল্পকিছু এর মাঝে বাস এক জায়গায় থামলে আমরা সেখান কিছু খেয়ে নেই ! উখিমঠ থেকে একটা রাস্তা চোপাতা, গোপেশ্বর হয়ে চামোলিতে মেশে এবং সেখান থেকে বদ্রীনাথ যায় ! আমরা বদ্রীনাথ থেকে ফেরার পথে চোপতা হয়ে তৃতীয় কেদার তুঙ্গানাথ গিয়েছিলাম ! চোপতার সৌন্দর্য এতই মনমুগ্ধকর যে একে অনেকে ভারতের সুইজারল্যান্ড বলেও ডাকে! তুঙ্গানাথ ট্রেকিং এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিলো ! সেই লেখাই পরে ধিরে ধিরে আসবো! তো খাবার সম্পূর্ণ হলে আমরা বাসে উঠে পরি ! কিছুটা যাবার পর বাসে দুই - একজনকে বমি করতে দেখলাম! এইরকম চড়াই - উত্তড়াই, গোলগোল ঘোরা পথে যাদের যাবার অভ্যাস নেই তাদের বমি হবা স্বাভাবিক ! তাই চাইলে সাথে বমির টেবলেট রাখতে পারেন !
এ যেনো এক অন্তুমুখি যাত্রা যার ভিতরে আমরা শুধু প্রবেশ করেই চলছি! গভীর থেকে আরও গভীরে!
যেদিকে তাকাও দেখা যায় দূরে আরও দূরে নীল রঙের সব পাহাড়চূড়া, একটার পর একটা অন্তহীন পাহাড়!
আমরা যখন সোনপ্রয়াগ পৌছায় তখন প্রায় বিকেল চারটে! এখানেই বাস যাত্রার শেষ ! এর পরে লোকাল জিপে গৌড়িকুন্ড পর্যন্ত যেতে হবে কিন্তু তার আগে
বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশান আর মেডিকেল চেক আপ করে ছাড়পত্র নিয়ে নেওয়া দরকার !কারণ ২০১৩র বন্যার পর থেকে কেদারনাথ যাত্রার সময় বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশান করা সরকার থেকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে!
তাই বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশান আগে করিয়ে নিলাম! কারন সন্ধ্যার পরেই অফিস নাকি বন্ধ হয়ে যায় !
প্রথমে ঠিক হয় সোনপ্রয়াগে এই আমরা রাত্রি যাপন করবো! কিন্তু পরে Google থেকে গৌরীকুন্ড GMVN গেস্ট হাউসে নাম্বার পেয়ে ওখানে ফোন করলে তারা জানায় যে তাদের রুম ফাকা আছে ! তাই আমরা গৌরীকুন্ডে চলে আসি! যথারীতি ভাবে সোনপ্রয়াগ থেকে লোকল জিপে ! ভাড়া মাত্র কুড়ি টাকা!জনবসতি খুবই অল্প হওয়াতে গৌরীকুন্ড এসে হোটেল খুজে পেতে অসুবিধা হলোনা ! সরকারি হোটেল রুম দেখে আমরা সত্যি বলতে সারপ্রাইজ হয়ে গেয়েছিলাম ! এতোদিন জানতাম সরকারি চাকরি ছাড়া সরকারি হাসপাতালে,সরকারি রুম,সরকারি স্কুল,সরকারি রাস্তা, সরকারি খাবার, সবই খারাপ হয় ! কিন্তু আজকে সেই ধারনা মিথ্যা প্রমাণিত হলো ! প্রথমবার আমাদের দেশের কোনো রাজ্যের কোনো সরকারকে এমন ভাবে কাজ করতে দেখে শুধু আমি না ভারতীয় হিসাবে আপনারও গর্ববোধ হতে বাধ্য ! এখান কার সরকারের কাজের পদ্ধতি সত্যি আপনাকে মুগ্ধ করবে! এসব জায়গায় প্রায় রোজ কোথাও না কোথাও ধস নামে! কিন্তু গোটা যাত্রাপথে অগুনতি ক্রেন, বুলডোজার, আর ঝাড়ু ও গাইতি হাতে অসংখ্য কর্মীদের দেখবেন দাড়িয়ে থাকতে । তারা চেষ্টা করে এই দীর্ঘ পথ যাত্রাই যাত্রীরা জেনো অসুবিধাই না পরে । রাস্তার ধারে তারা হোডিং লাগিয়েছে যেখানে লেখা রয়েছে এই পূর্ণভূমিতে আপনাকে স্বাগতম ! আপনার যেকোনো অসুবিধার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রাথি! কারণ আপনাদের উপযুক্ত পরিষেবা দেওয়া আমাদের কর্তব্য ! ভাবুন?এর থেকেই কি এখানকার সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা আন্দাজ করতে পারি না?
আমরা যে সরকারি হোটেল উঠেছি তার নাম GMVN (Garhwal Mandal Vikas Nigam)!এই গাড়য়াল মন্ডল বিকাশ নিগমের হাজারো হোটেল সমগ্র উওরাখন্ড জুড়ে ছড়িয়ে আছে! অল্প পয়সায় সাধারণ মানুষদের সুবিধার্থে সরকার এই হোটেলের নির্মাণ করেছে! আমাদের রুম ভাড়া ছিলো মাত্র তিনশো টাকা ! যদিও 750 আর 1300 টাকার ও রুম আছে ! কিন্তু এই টুকু বলতে পারি এখান কার তিনশো টাকার রুমটাও অন্য জায়গায় 1000 টাকার কমে হয় না! এই জন্য বেশিরভাগ সময় এই হোটেল খালি থাকে না! বেশিরভাগ লোকই আগের থেকে অনলাইন বুক করে রাখে! এখান কার স্টাফদের ব্যবহারও খুব ভালো সরকারি হোটেল বলে তাদের কাজে কোনো ফাকি নেই ! তারা পুরো হোটেলটাই পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে !
হোটেলে ঢুকে আমরা ব্যাগ আর জিনিস পত্র রেখেই প্রথমে আমরা গরমকুন্ডে স্নান করতে আসি অর্থাৎ সেই উষ্ণপ্রস্রবণ যার নামেই নাম গৌরীকুণ্ড!
পৌরাণিক কথা অনুসারে গৌরীকুণ্ডের উষ্ণ প্রস্রবণে স্নান করার সময় মাতা পার্বতী তাঁর গায়ে মাখার হলুদ থেকে কৌতূহল বশত একটি শিশুপুত্রের পুতুল বানান, এবং তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে গণেশের জন্ম দেন।
কিন্তু সেই কুন্ড এখন আর আগের অবস্থায় নেই 2013 বন্যায় কুণ্ডটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে পাথরের ফাঁক দিয়ে গরম জল এখনো বেড় হয় ! আর তার ফলে সেখানে একটা ছোটো পুকুরের মতো তৈরি হয়েছে ! হালকা হালকা ঠান্ডা এই দিকে গরম জলে স্নান করতে আর দেরি করিনি !দুই একজনকে দেখে আমরাও সেই জলের কাছে গিয়ে বসে পরি! জলে পা দিয়েই বুঝলাম জল বেশ গরম!এখানে ডুব দিলে গরমের সাথে সাথে গায়ের একটা ছাল আর বাকি থাকবে না হয়তো!তাই একটা মগ দেখতে পেয়ে তাই দিয়েই অল্প অল্প করে জল তুলে স্নান করা শুরু করে দেই! ঠান্ডার মধ্যে গরমজল অর্নত আরাম দায়ক লাগছিলো ! টানা বাস যাত্রার ক্লান্তিকে কাটিয়ে মন যে আবার চনমনে আর প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিলো তা বেশ অনুভব করতে পারছিলাম !
পাশদিয়ে হিমশিতল মন্দাকিনি গর্জন করতে করতে ছুটে যাচ্ছে আর তারই পাশে এই গরম কুন্ডে দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে,এই পাহাড় ঘেরা নিরিবিলি স্থানে ঠান্ডার মধ্যে, সন্ধ্যার সময় গরম জলে নিজেদের সিগ্ধ করছি ! না;এ সত্যি এক রোমাঞ্চকর আর অসাধারণ অভিজ্ঞতা !
কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে ফিরে এসেছিলাম হোটেল ! কিন্তু সাথে নিয়ে এসেছিলাম পরেরদিন সেই বিশাল কঠিন আর দূর্গম যাত্রার উদ্দাম ইচ্ছাশক্তি!
হোটেলে এসে চা এর জন্য বলে বেলকানিতে বসে কালকের যাত্রার পরিকল্পনা করছিলাম দুইজনে! তখন এক ভদ্রলোক এসে পরিচয় করলো! বয়স 50 এর আশেপাশে হবে! উনি প্রবাসী বাঙালি! ভদ্রলোক পুণেতে থাকে!
মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো তোমরা বাঙালি তাইনা?
আমি হ্যাঁ বলতেই; হাসতে হাসতে বললো তাহলে ঠিকই ধরেছিলাম ! মুখ দেখে মানুষ চেনাটা তাহলে এখনো ভুলিনি ! কি বলো তোমার ? বুঝলাম ভদ্রলোক বেশ রসিক মানুষ ! আড্ডা চলবে ! এই পাহাড় যা কিনা সমুদ্র লেভেল থেকে প্রায় 6502 ফিট উচুতে চারিদিক অন্ধকার ঘেরা ঝিঝিপোকার ডাকের সাথে সাথে
আমাদের গল্পের আসর চললো!
এর মধ্যে চা এসে গেলে তাকে এক কাপ নেবার অনুরোধ করে আমরা দুইজনও নিলাম ! শান বাড়ি থেকে চিড়া ভাজা নিয়ে এসেছিলো ! উনি তাই দেখে আনন্দসয়িত বললো আরে বা চায়ের সাথে দেখছি এতো সুন্দর টা এরও ব্যবস্থা আছে তোমাদের ! অতি উত্তম!
চা মুখে দিতেই উনি বললো দাড়াও দাড়াও ওই ভাবে না গ্লাস দুই হাতের ভিতরে ধরে পান করে দেখো এর মজাই আলাদা !
এই ভবে চা পান করতে করতে এই ঠাণ্ডায় সত্যিই খুব ভালো লাগছিল ! চায়ের পরে উনি ওঠার আগ্রহ করলে তাকে আর কিছুক্ষণ বসার অনুরোধ করি!সংসারে এই রকম অল্প কিছু মানুষই থাকে যারা কিনা এইরকম ভাবে অচেনা মানুষদেরও নিজের উপস্থিতিতে আনন্দ দিতে পারে!
জিজ্ঞাসা করলাম কেদারনাথের উদ্দেশ্যে সকলে কখন যাত্রা করলে উচিত হবে?
উনি বললো যদি ভোর 4-5 টার মধ্যে বেড়িয়ে পরো তাহলে সন্ধ্যার আগেই কেদারনাথ পৌঁছে যেতে পারবে ! বক্ষ্মমুরোতে আবহাওয়া অনেক ভালো থাকে বেশি কষ্টও হবে না !
তোমাদের সাথ দিতে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু দেখছোই তো আমার বয়স হয়েছে আর তাছাড়াও আমার সাথে আমার স্ত্রী আর ছেলে -মেয়ে ও আছে ! চারথাম যাত্রায় বেড়িয়েছে! গঙ্গত্রী আর যুমানাত্রী দর্শন করে এখন কেদারনাথ দর্শন ! কেদারনাথ হয়ে গেলে এখান থেকে বদ্রীনাথ গিয়ে সমাপ্ত করবো!
আর এই বয়সে তোমাদের সাথে হাটার সাহস আমার নেওয়া মনে হয় উচিত হবে না! এ অনেকে চড়াই !
তোমাদের সঙ্গ নিলে আমাকে আর তোমাদের কাকিমাকে তোমাদের এই কাধে করে নিয়ে যেতে হবে ! এই কথা শুনে সবাই একত্রে হেসে উঠলাম!
ভদ্রলোক আরও কিছুক্ষন ছিলো ! উনি যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একজন সমর্থক আর প্রধানমন্ত্রী কেদারনাথে আসার পর থেকেই যে এখানে পর্যটক অনেক মাত্রায় বেড়ে গেছে সে কথাও জানালো! ধিরে ধিরে তারা রাজনৈতিক আলোচনায় ঢুকে পরলে রাতের খাবার বলার জন্য আমাকেই উঠে পরতে হলো !
ম্যানেজারের খোঁজ করতে করতে তাকে রান্না ঘরে পেলাম ! দেখলাম এক ম্যানেজার সে কিনা রান্নার ঠাকুরকে সাহায্য করছে তার কাজে !
আমাকে দেখে আর আমার মুখেরভাব দেখে ম্যানেজার আমার পরিস্থিতি বুঝে বললো অবাক হবেন না !এখানে সবাই এইরকমই ! সবাই সবার কাজে সাহায্য করে ! আমরা তো একই পরিবারের এই!
সত্যি বলতে সম্মানে সেদিন তাদের প্রতি মাথাটা নিচু হয়ে গিয়েছিলো! আমাদের তথাকথিত শিক্ষিতো সমাজের মানুষ একে কিভাবে নেবে জানি না ! যেখানে সর্বদা ওটা আমার কাজ না তোমার কাজ ! ওটা তোমার জায়গা এটা আমার !কে বড়ো কে ছোটো ? এই চলে সর্বদা ! সেখানে এরা?
বুঝলাম কেনো একে এখনও দেবভূমিই বলে ; শুধু প্রকৃতির বৈচিত্র্যয়ের জন্যই নয়? এখানকার মানুষের জন্যও বটে!তাদের বিচার এতো উত্তম যে মনে হয় তারা দেবতাকে শুধু মন্দিরে না তাদের হৃদয়ে স্থাপন করে রেখেছে !
🙏🙏🙏🌱ওম নমঃ শিবায়🌱🙏🙏🙏
হাটা পথে কেদারনাথ!
গৌরিকুন্ড হোটেল থেকে সকাল সকাল স্নান সেরে ব্যাগ হাতে লাঠি কে সম্বল করে দুই বন্ধু বেড়িয়ে পরলাম কেদারানাথের উদ্দেশ্যে ! পুরোনো রাস্তা অনুসারে এখান থেকে কেদারনাথ 16 কিমি তবে 2013 বন্যার পর এখন নতুন রাস্তা দিয়ে কিছুটা বেশি যেতে হয় !
প্রথমে অনেকটা সিড়ি ভাঙ্গা পথ !সেটা উঠতে উঠতেই নিশ্বাস দ্রত হয় যায় ! পেরায় সাত - আটতলা উচু বাড়ির সমান সিড়ি ভেঙে;পাথরে চলা মসৃন আগাবাকা পথ পাওয়া যায় !
যাত্রীদের সুবিধার্থে ঘোড়া আর ডান্ডিও আছে ! অন্য জায়গার মতো দাম কষাকষির প্রয়োজন নেই !ভাড়া সরকার থেকে বেধে দেবা হয়েছে ! তাই বেশিরভাগ লোক খুশি মনে ঘোড়াতেই যায় !
চড়াই উঠতে উঠতেই সিকিউরিটি চেকিং হলো! দুই-একজন বায়ওমেট্রিক কার্ড না করিয়ে এসেছে তাদের পুনরায় অনুরোধ করে ফেরত পাঠানো হলো! যাতে তারা বায়ওমেট্রিক করিয়ে তারপর যাত্রা শুরু করে ! এটা তাদেরই সুরক্ষার জন্যই !
যাত্রায় প্রথম হনুমান চটি! এখানে একটা ছোটো মন্দির আছে! পাশেই এক সাধুবাবার আস্তানা !তবে দোকান বা বিশ্রামের স্থান নেই ! রাস্তার পাশে ছোটো-বড়ো গাছের ছায়া দিয়ে আমরা হেটে চলছিলাম! রাস্তায় অনেকও ঝর্না অজানা পাখিদের ডাক আর মন্দাকিনী কে সাথে নিয়ে আগিয়ে চলছি!
সকালের দিকে হালকা ঠাণ্ডা অনুভব করলেও এখন পিঠে ব্যাগ নিয়ে এতোটা চড়াই ওঠার পর আর ঠান্ডা না; গরমের আভাসা শুরু হয়েছে ! এতোপথ;বসলে পা ধরে যাবে বলে মাঝে মাঝে একটু দাড়িয়ে আবার চলা শুরু করছিলাম ! এই রকম ভাবে দেড়ঘন্টা হাটার পর জঙ্গল চটি এসে একটু বিশ্রাম না নিলে আর হচ্ছিলো না! গৌরিকুন্ড থেকে এটা চার কিলোমিটার ! এখানে দোকান, মেডিকেল কেম্প, থাকার জায়গা সবই আছে! একদল যাত্রী দেখলাম নিচে নেমে আসছে!তারা হয়তো কালকে ওখানে পৌছেছিলো! রাতে ওখানে বিশ্রাম নিয়ে সকালে পূজা দিয়ে নেমে এসেছে!
আমরাও বেশি দেরি করলাম না এক পেকেট বিস্কুট আর জলপান করে উঠে পরলাম! ডানদিকে মন্দাকিনী কে সাথে নিয়ে উৎসাহের সহিত চলতে লাগলাম! ঘোড়ার মলের দরুন রাস্তায় যে আর্বজনার সৃষ্টি হচ্ছে তাও কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে দিচ্ছে ! যাতে যাত্রীদের পিছলে পরার ভয় না থাকে!
কিছুটা আসার পর দূরে দেখতে পেলাম বরফে ঢাকা কেদারনাথ উপত্যককে ! যা আমাদের গন্তব্য ! সাদা বরফের সূর্যের আলো পরে সে নিজের মতো করে রঙের খেলা শুরু করেছে! অপরুপ সেই সৌন্দর্য ! কিছুক্ষণ সেই দিকে একনজরে চেয়ে রইলাম! আশেপাশে অজানা সব পাখিদের ডাক, ঝর্নার প্রবাহ,মন্দাকিনী গর্জন আমাদের কিছুক্ষণের জন্য সম্মোহন করে রেখেছিলো! ঘোড়ার ঢংঢং ঘন্টির আওয়াজে বাস্তবে ফিরে তাকে যাওয়ার রাস্তা করে দিলাম!ছোটো রাস্তা এখানে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করে চলে! কখনও ঘোড়া রাস্তা ছেড়ে দেয় তো কখনও মানুষ ! এর মধ্যে রাস্তায় লোক সংখ্যাও কিছু বেড়েছে! একে -বেকে,ছোটো,বড়ো,মাঝারি চড়াই বেয়ে আমরা আগিয়ে চলছি!
পথ এখনো অনেক, অনেক বেশি চড়াই এখনো পার করার! শুনেছি রামবাড়া থেকে আপার লিঞ্চোলি খাড়া চড়াই উঠতে হয়! অধিকাংশ মানুষই হয় এখান থেকে ফিরে আসে আর না হলে ঘোড়া কিংবা ডান্ডি নিয়ে নেই ! তবে আমরা ঠিক করেছিলাম মহাদেব কে ডাকতে ডাকতে যে ভাবেই হোক চলে যাবো! এই জন্যই পূর্বকল্পিত হিসাবে একটু জোরে পাঁ চালিয়ে আমার ভীমবলি পার করে সোজা রামবাড়াতে এসে বিশ্রাম নেই ! ভীমবলি থেকে যাবার দুটি রাস্তা আছে নতুন আর পুরোনো ! তবে দুটি রাস্তায় আবার রামবাড়ার উপরে লোয়ার লিঞ্চোলিতে মিলিতো হয় ! আমরা পুরোনো রাস্তা ধরেই গিয়েছিলাম ! এতো বছর পরেও 2013 বন্যরা প্রবল তান্ডবের স্মৃতি রামবাড়া এখনো তার মধ্যে ধরে রেখেছে! বন্যার সময় উপর থেকে পরা বিশাল বিশাল বোল্ডারে ভরা মন্দাকিনীর নদীখাত । শুনেছি এখানে এক সময় অনেক হোটেল ছিলো,লোকের বসতি ছিলো! অনেক যাত্রী এখানে রাত্রিযাপন করে সকালে কেদারনাথের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করতো! এখন এই জায়গায় কেবল একটা চায়ের দোকান এই অবশিষ্ট !
সেতু পেরিয়ে একটা বড়ো বোল্ডারের উপর দুইজন বসে পরলাম এখন থেকে হিমালয়ের সুমেরু পর্বতের তুষারাবৃত শৃঙ্গ স্পষ্ট দেখা যায় ! মন্দাকিনীর নদীগর্ভ এখানে একদম কাছাকাছি। উপর থেকে ঝর্নার প্রবাহ এসে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে মন্দাকিনীর কাছে!প্রবল স্রোতের মধ্যেও তাই কিছু ছেলে-মেয়ে তাকে ছুয়ে দেখার অপ্রাণ চেষ্টা করছে! কেউ কেউ তাদের মোবাইল ক্যামেরাই এই স্মৃতি কে বন্দি করে আগিয়ে চলছে!
ভরা পেটে পাহাড় চড়া কঠিন হয় তাই আমরা কিছু হালকা খাবার খেয়ে নিলাম! শান প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্য মুগ্ধ করা দৃশ্যের কিছু ফোটো তুলে নিলো! বসেছিলাম অনেকক্ষন !এখানে মন্দাকিনীকে অনেক কাছে থেকে অনুভব করা যায় !সে কি তেজ আর গর্জন তার,কাউকে সে পরোয়া করচ্ছে না ! যে তার গতিরোধের চেষ্টা করছে হয়তো তাকে ভাঙতে হচ্ছে আর না হয় সম্মান পূর্বক রাস্তা ছেড়ে দিতে হচ্ছে ! আমাদের সমাজের মাতৃিশক্তিকেও এই রুপ দেখিয়ে দেবার সময় এসেছে বিশ্বকে; যে তারা সমাজের অন্য জাতির নারী বা পুরুষের থেকে কোনো অংশে কম নয়! সম্মানের সহিত তার রাস্তা ছেড়ে দাও! আর অসম্মানের সহিত ধরতে আসলে সে তোমাকে ভেঙে গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে তার পথ করে নেবে!
11 টা বেজে গেলে শান ওঠার কথা বললো !গৌরিকুন্ড থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম ছয়টার সময় ! এখন যদি লিঞ্চোলিতে চড়াইের জন্য গতি কিছুটা কমও হয় তাহলেও সন্ধ্যার আগেই কেদারনাথ কেম্পে পৌঁছে যাবার কথা! কারণ রামবাড়া থেকে কেদারনাথ 7 কিমির দূরত্ব !
শান চলার জন্য প্রস্তুত দেখে উঠে পরলাম !
নীচ থেকে সামনের পথের চেহারা দেখে মনে মনে নিজেকে তৈরি করে নিলাম! এই চড়াই যে ভাবেই হোক উঠতেই হবে ! যদি যাইতো হেটেই যাবো! নাতো ঘোড়া; আর নাতো ডান্ডিতে!
কিছুটা হাটার পর এই রাস্তার সাথে ভীমবলি থেকে যে রাস্তাটা আলাদা হয়েছিলো তা আবার মিশে যায় ! লাঠি ভর করে উঠে চলছি ! এখন লাঠির মাহর্ত্তটা অনুভব করলাম! নিচে লোহা লাগানো থাকার জন্য যা চলার পথে অনেক সাহায্য করে! ধিরে ধিরে একে বেকে উঠেচলছি ! এখন মন্দাকিনী আমাদের বামদিকে ! যদিও তার শব্দ ব্যতিত এখন আর সেই ভাবে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না ! এখানের রাস্তা অনেকটা খারা ! কিছুটা চড়াই ওঠার পরেই পেশিতে হালকা হালকা টান অনুভব করায় দাড়িয়ে পরলাম ! শান পাকদন্ডির রাস্তা নেবাতে তাকে আর ডাকা হলো না!
নিজেই পায়ে হালকা একটু মাসাজ করে; ভালো অনুভব করাই হর হর মহাদেব বলে হাটা শুরু করে দিলাম !
সামনে ঝকঝক করা কেদারডোম শৃঙ্গ আর মোবাইল মহাদেবের গান দুইয়ের আনন্দ নিতে নিতে হেটে চললাম!
কিছু দূর আসার পর সামনেই পাহাড়ের উপর থেকে নেমে মন্দাকিনী পযর্ন্ত বরফের গ্লেসিয়ার চোখে পরলো ! যেনো বরফের একটা নদী! এই সবুজ, ধুসর বিশাল পাহাড়ে ঘেরে স্থানের মধ্যে চিত্র শিল্পী তার তুলির টানে বরফের একটা সাদা লাইন টেনে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে!
ওখানে বসে পরার ইচ্ছা হচ্ছিলো কিন্তু নিজেকে সংযোত করে সেই নদী কে পিছনে ফেলে আগিয়ে চললাম ! আপার লিঞ্চোলিতে এসে দেখলাম শান আমার অপেক্ষা করছে!
দুইজন এক কাপ করে চা খেয়ে উঠতে যাবো দুই - একফোঁটা করে বৃষ্টি পরা শুরু হলো!
তবে ভাগ্য ভালো ওই দুই- একফোঁটাই হয়েই থেমে গেলো! কিন্তু দেখলাম আকাশে মেঘ জমে আছে যেকোনো সময় ঝাপিয়ে বৃষ্টি আসতে পারে! যদি আমাদের সাথে রেনকোট আছে ! তবে এই চড়াই আর যদি রাস্তা বৃষ্টির জন্য পিছল হয়ে যায় তবে এই রাস্তায় চলা আরও বেশি কষ্ট কর হয়ে উঠবে! আমার তাই জোরে পাঁ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম ! কিন্তু একি আর সমতল ! যে জোরে পাঁ চালালাম আর পৌঁছে গেলাম? যারা হেটে উঠছে তাদের অনেকেই দেখলাম কাহিল হয়ে পরেছে! সত্যিই বলতে আমাদের অবস্থাও যে খুব ভালো ছিলো তা নয়! শুধু মনেরজর কে সম্বল করে চলছিলাম! যেখানে রাস্তা একটু সমতল পাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিলো এর থেকে ভালো বুঝি সংসারে আর কিছুই হতে পারে না! এখন আমরা প্রায় সমুদ্র লেভেল থেকে 9000 ফুট উচুতে !এরপরে অক্সিজেনর মাত্রা আরও কম হয়ে যাবে! যার ফলে চড়াই উঠতে হয়তো আরও সমস্যা হবে! একটাই মন্ত্র ঔম নমঃ শিবায় বলে একটা একটা করে পাঁ ফেলে উপরে উঠছিলাম ! শুধু মানুষ না ঘোড়াদেরও দেখলাম এই পর্যায় এসে তারাও কিছুটা ক্লান্ত ! চারদিকে মেঘও আরও ঘনো করে আসছিলো !
মনও তার লাগাম ছেড়ে দিয়েছে ! শরীরও এক পাঁও আর বাড়ানোর অনুমতি দিচ্ছিলো না এই ভারি ব্যাগ নিয়ে ! তাই পাশেই এক পাথরের উপর বসে পরলাম ! শানও দেখলাম ক্লান্ত ! দুপুরও হয়ে গেছে! দুইজন দুইজন কে ভরসা দিলাম যে ঠিকই আমরা যেতে পারবো! যদি দরকার হয় সামনের দোকানে দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে ওখানেই এখন 1/2 ঘন্টা বিশ্রাম করে পরে দরকার হয় হাটা শুরু করবো! সেই মতোই কোনোরকম ভাবে নিজেদের টানতে টানতে দোকানে নিয়ে ফেলাম! এক পেলেট নুডলস খেয়ে খাদ্য গহ্বরকে সন্তুষ্ট করে দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম বেস কেম্প আর কতটা দূর !উনি বললো তোমরা চলেই এসেছো প্রায়! আর একটু গেলেই পেয়ে যাবে!
সত্যি বলতে তখন দোকানদারের এই একটা কথায় আমাদের মনের জোর অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলো! এখানে আশেপাশে পাহাড়ের গায়ে দেখলাম অজস্র নাম না জানা ফুল ফুটে আছে ! পাহাড়ের গায়ে খুব সুন্দর শোভা ছড়াচ্ছিলো তারা!
1 ঘন্টা মতো বসেছিলাম ওখানে তারপর উঠে পরলাম ! ব্যাগ কাধে আবার চলা শুরু ! এর মধ্যে কিভাবে জেনো লাঠিটা হারিয়ে ফেলি! এই রস্তায় লাঠির থেকে বড়ো সম্বল আর কিছুই নেই ! আপনাকে সবাই সব কিছু দিতে পারে কিন্তু এই রাস্তায় লাঠি কেউ দেবে না!
কিছু করার নেই নিয়তি কে উচিত মনে করে চলতে লাগলাম! রেলিং ধরে ধরে একটু যায় একটু বসি! এই ভাবেই চলছিলাম! ঠাণ্ডাও হালকা হালকা পরা শুরু করতে জেকেট, টুপি জরিয়ে নেই ! এখনে চড়াই এমনই যে দেখলেই মনে হচ্ছিলো পাড়বো তো উঠতে ! লাঠি ছাড়া ওঠা যে কি কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না ! একটা সময় চড়াই শেষ হয় আমরা সমতল রাস্তায় উঠে আসি! কিন্তু এখন সত্যি বলতে আর একটা পাঁ বাড়ানোর ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই আমার মধ্যে !
আমরা প্রায় সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে 10500 ফিট উচুতে উঠে এসেছি! অক্সিজেন মাত্রা এখানে অনেক কম!নিশ্বাসের বড়ো কষ্ট ! তার মধ্যে আবার দুই একফোঁটা বৃষ্টি দেখে খোড়াতে খোড়াতে একটা ছাউনির নিচে আশ্রয় নেই !
উত্তরপ্রদেশের এক যুবকের সাথে ছাউনিতে পরিচয় হয়! সে লিঞ্চোলি পযর্ন্ত হেটে এসে তারপর ঘোড়ায় চড়ে এখন এখানে দলের অন্য সদস্যদের জন্য অপেক্ষা করছে! কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বলে বৃষ্টি কমতে আমরা আবার উঠে পরলাম ! কিন্তু কিছুতেই আর কতটা যেতে হবে তা আন্দাজ করতে পারছিলাম না! তথ্য বলছে আমরা প্রায় চলে এসেছি! তাছাড়া যাকেই জিজ্ঞাসা করছি সেও বলছে আর একটুখানি ! তাই মনে সাহস নিয়ে কোনোরকম ভাবে দশ পাঁ যাই দশ মিনিট বসি এই করছিলাম!এখন সত্যি সত্যি মনের জোর একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে! তার মধ্যে ভারি ব্যাগের জন্য হয়তো শরীরেরও প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে! জ্বর আসতে পারে বুঝে আমাদের কাছে থাকা ঔষধ থেকে একটা পেনকিলার খেয়ে নিলাম ! এখানে আসার আগে ইউটিউব ভিডিও দেখে পাহাড়ি রাস্তায় কি কি অসুবিধা হয় সেই অনুসারে মেডিসিন আমরা নিয়ে এসেছিলাম! পাশে এক জায়গায় ওখানকার কিছু লোক আর মহিলাদের কাঠ জ্বালিয়ে আগুন পোয়াতে দেখে আমি তাদের পাশে গিয়ে বসেপরি!
না আর কিছুতে উঠার ইচ্ছে হচ্ছিলো না !ঠাণ্ডার মধ্যে আগুনের স্পর্শ যে এতো ভালো লাগছিলো কি বলবো !
কিন্তু উঠতে তো হবে !তিরিশ মিনিট মতো বসার পর উঠতে গিয়ে দেখি ! পাঁ এমন ভাবে ধরে এসেছে যে আর পাঁ নাড়াতে পারছি না! শান কে বললাম এতো অবস্থা খুব খারাপ মনে হচ্ছে ! যদি বেশি দূর হয় আমি আর যেতে পারবো না! একবার বাইরে বেড়িয়ে দেখো বেস ক্যাম্প দেখা যায় কিনা! আমাদের কথা শুনে ওখানের একটা লোক বলো বেসক্যাম্প এই পরের মোড়টাতেই পাঁচ মিনিট ও লাগবে না! শান ও বাইরে গিয়ে দেখতে পেলো বেসক্যাম্পের তাবু! মনে মনে মহাদেবকে অনেক ধন্যবাদ দিলাম ! আমি জানি পায়ের যে অবস্থা বেস ক্যাম্প যদি এখান থেকে আর তিরিশ মিনিটের দূরত্বেও হতো তাহলেও তা আমার দ্বারা আর কিছুতেই পার হতো না ! স্মৃতিশক্তিও জেনো অনেকটা লোপ পেয়ে গেছে আগে লাঠি হারিয়ে ছিলাম এখন মাথার টুপিটা হারিয়ে ফেলাম! কোনো রকম ব্যাগ কাধে নিয়ে শানের হাত ধরে উঠে দাড়ালাম! বেঁচেরা শানের অবস্থাও খারাপ ! তবুও শান আমার থেকে কিছুটা ভালো আছে ! দুই বন্ধু দুই জনকে সাহারা দিতে দিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেস ক্যাম্প পৌছে গেলাম! এখানে 300, 750 আর 1300 টাকার ঘর পাওয়া যায় ! আমরা 750 এর রুমটা নিলাম! এখানে চারটে ঘাট ! উপরে একজন আর নিচে একজন ! এর মধ্যে আবার ছাপিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েগেলে আমরা দৌড়ে রুমের ভিতরে ঢুকে গেলাম ! কিন্তু তাও নিজেদের পুরো বাঁচানো গেলো না! ওই দুই একফোঁটা জল গায়ে পরতেই শরীরটা জেনো পুরো ঝাকুনি দিয়ে উঠলো! ঠাণ্ডায় ঢকঢক করে কাপতে কাপতে কোনো রকম বিছানায় গিয়ে পরলাম ! ওদের দেবা কম্বল আর আমার স্লিপিং ব্যাগ দুটোই গায়ে চাপিয়ে দিলাম ! কিন্তু ঠাণ্ডা সে জেনো কিছুতেই আর কমতে চাই না! একটা জ্বরের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পরার চেষ্টা করলাম! কিন্তু না ঘুম কিছুতেই আসতে চাচ্ছে না ! ঘুমানোর চেষ্টা করতে গেলেই পুরো রুমটা জেনো চক্কর খাচ্ছিলো! এর মধ্যে রুমে আর দুই জন আসলে তাদের অবস্থাও দেখলাম আমাদের মতোই ! শানকে জ্বরের ঔষধ খেতে দেখে তারা তাদের অসুবিধার কথা বললে শান তাদেরকে একটা করে ঔষধ দেয়!
কিন্তু এই দিকে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না! শরীরের এমন পরিস্থিতি আগে কখনই অনুভব করে নি! মোবাইল খুলে নেটওয়ার্ক আছে দেখে বাড়িতে কিছুক্ষণ কথা বললাম ! এতে মনটা জেনো কিছুটা হালকা হলো ! জর পর্দাথের নেই পরে ছিলাম কিছুক্ষণ তারপর কখন যে ঘুমিয়ে যায় আর খেয়াল নেই ! ঘুম ভাঙ্গে দশটার দিকে শানের ডাকে ডিনারের জন্য! এখন নিজেকে অনেকটা ভালো মনে হলো! ঔষধ খেতে হবে কিছু না খেয়ে ঔষুধ খাওয়া যাবে না তাই ইচ্ছা না হলেও উঠতে হলো!এর মধ্যে ঘরে আরও দুইজন এসেছে তারা শুয়ে আছে! বাইরে এসে বুঝলাম বৃষ্টি ভালোই হয়েছে আর তার জন্য ঠাণ্ডার প্রোকপ অনেক বেশি ! চারিদিকে নিঝুম দূর থেকে কেবল মন্দাকিনীর গর্জন শোনা যাচ্ছে ! লোকজন সেই রকম কোথাও নেই ! অবশ্য এই ঠাণ্ডায় বাইরে থাকারও না!
ক্যান্টিনে এসে একটা থালাতেই দুইজন খেয়ে আবার রুমে চলে আসলাম!
ঔষধ খেতে গিয়ে দেখি জ্বরের ঔষধ আর দুটো আছে ! শানকে জিজ্ঞাসা করলে মহাশয় বললো পরে যে দুইজন এসেছে তাদের কেউ সে দুটি দিয়েছে ! তাদের অবস্থাও নাকি আমাদের মতোই ছিলো! মনে মনে তাকে সাধুবাদ দিলাম ! বেশি থাকলে দেওয়া আর নিজেদের অসুবিধা হবে জেনেও অন্য কে সাহায্য করা অতো সহজ না ! এর জন্য অনেক বড়ো মনের দরকার !
তবে একটা প্রশ্ন জাগছিলো মনে; সবারই কেনো এই একইরকম, একধরনের সমস্যা হচ্ছে ! রুমে সবাই কে একবার দেখলাম সবাই যুবক এবং আমারও যোগা করার জন্য যথেষ্ট ফিট এই রকম অসুবিধা হবার কারণ কি?তখন এর কোনো উত্তর ছিলো না; তবে পরে গুগল সার্চ করে জানতে পেরেছি এর মূল কারণ অক্সিজেনর অভাব!যাদের অভ্যাস নেই তাদের এমন হওয়া স্বাভাবিক !শান লাইট অফ করলে আজকে পুরো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আমিও ঘুমের জগতে চলে গেলাম !
চারটতে ত্রলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলে ইশ্বর প্রার্থনা করে বাইরে বেড়িয়ে আসলাম!
দরজা খুলতেই মুক্ত হিমবাতাস শরিরকে ছুয়ে বেরিয়ে গেলো!নিজকে এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে! সামনে আকাশের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে তুষারআবৃত কেদারনাথ শৃঙ্গ।
হাত জোর করে প্রণাম জানিয়ে যোগা শুরু করলাম! এই রকম জায়গায় এসে যে কখনও যোগা করতে পারবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি! এই তো জ্ঞান আর যোগের পিঠস্থল! কথিত আছে হাজারো বছর আগে মহাদেব সপ্ত ঋষিকে যোগের দান এইখানেই দিয়েছিলো গান্ধী সরবরের কাছে!
ফিরে এসে শানকে তুলে দিলাম ! তারাতাড়ি মন্দিরে না পৌঁছাতে পারলে ভিড় অনেক বেড়ে যেতে পারে!
ক্যাম্প থেকে মন্দিরের দূরত্ব এক কিলোমিটার ! তবে সমতল রাস্তা ! ক্যাম্প থেকে বেড়িয়ে একটু আসার পরেই দর্শন হলো সেই মন্দিরের যাকে ছোটে বেলা থেকে ক্যালেন্ডার, কাগজে, পত্রিকায় দেখা আসছি! শ্রদ্ধা আর অপার ভালোবাসা সহিত তাকে নমন করলাম ! পিতা সূরিয়া নারয়ন তখনও প্রকট হয়নি! আমরা ধিরে ধিরে আগিয়ে চলছি মন্দিরে নিকট !বা দিকে মন্দাকিনী, দুই দিকে পাহাড় সবুজে ঘেরা আর তার মাঝে বরফে ঢাকা তুষাআবৃত কেদারশৃঙ্গ এবং তারই সামনে হাজারো বছরের পুরোনো এই কেদারনাথ মন্দির ! প্রকৃতির এই সুন্দর মুগ্ধকরা বৈচিত্র্যময় রুপ আগে কখন দেখেনি! সময় জেনো ধমকে গিয়েছে !
সাকল ছয়টা হওয়া তে লোক তেমন নেই ! 100 টাকার দুটো প্রসাদ পেকেট নিয়ে ব্রাক্ষনের সাথে মন্দিরের প্রবেশদ্বারের এসে দাড়ালাম ! যেখানে নন্দী বসে আছে ! তাকে নমন করে প্রবেশদ্বারের ভিতর ঢুকলাম! এখানে পাঁচ পান্ডব,মাতা দ্রপদি আর প্রভু শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি রাখা আছে! হাজারো বছর ধরে কতো মহাপুরুষ,কতো মহত্মা এই জায়গায় এসে নিজেদের আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ ঘটিছে! মনের ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা টের পেলাম! সত্যিই তাহলে আমরা শেষ পযর্ন্ত পৌঁছাতে পেরেছি শক্তির এই মহাপিঠে?
চারদিকে ধূপধুনর গন্ধ আর সামনে প্রস্তরময় জ্যোতির্লিঙ্গ! ব্রাক্ষন ঠাকুরের অনুমতি নিয়ে তাকে স্পর্শ করলাম ! ও সাথে সাথে শরীরের ভিতরে কি জেনো একটা খেলে গেলো ! অনেকটা বিদ্যুৎ শখের মতো! ব্রাক্ষন ঠাকুর বিধিনিয়ম মেনে মন্ত্র পরা শুরু করলো!
"ওম। ত্রম্বকাম যজমাহে, সুগন্ধিম পুষ্টি-বর্ধানাম, উরুভারুকম্ভিয়া বান্ধানাম, মৃত্যুয়র মুখশিয়া মামরিতাত।"
ভিড় না থাকাতে উনি বেশ সময় নিয়ে পূজা করলো !
আমরা জ্যোতির্লিঙ্গের গায়ে ঘি মাখিয়ে, স্নান করিয়ে, তাঁকে মালা পরালাম । পূজা শেষে কেদারনাথকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে বেরিয়ে আসলাম। এই রকম সুন্দর ভাবে পূজা সত্যিই আগে কখনও দেইনি! মহাদেবকে এমন ভাবে জড়িয়েও ধরেনি! আনন্দে চোখের ধারায় জল নেমে আসলো! আজকে জীবন ধন্য!
মন্দিরের পিছনে গেলাম ভীমশিলা নামে পরিচিত সেই প্রস্তরখণ্ডটি কাছে ! 2013 বন্যায় এই প্রস্তরখণ্ডটিই জলকে দুই দিকে ভাগ করে দিয়ে মন্দিরকে রক্ষা করেছিলো! সবাই একে ভক্তি সহকারে প্রণাম করে! আমরাও করলাম! কেউ কেউ একে অন্ধবিশ্বাস বলতে পারে কিন্তু সংসারে কোন বিশ্বাসটাই অন্ধ না হয়?এই সংসার তো বিশ্বাসের এই মূল সরুপ! জন্মের সময় ডাক্তার বললো এটা তোমার মা বিশ্বাস করে নিলাম,মা বললো এটা তোমার বাবা বিশ্বাস করে নিলাম,বাবা বললো এটা তোমার পরিবার বিশ্বাস করে নিলাম ! এই ভাবেই তো চলে সংসার ! কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর! বিশ্বাস থেকেই জ্ঞানের