কালীকথা। KALI KATHA

কালীকথা। KALI KATHA Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from কালীকথা। KALI KATHA, Hindu temple, chinsurah hooghly, Chinsurah.

'কালীকথা' পেজে সবাইকে স্বাগত। কলকাতা এবং জেলার বিভিন্ন প্রান্তের কালীক্ষেত্র, বিভিন্ন কালীমন্দির, তার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আমাদের পেজ লাইক, ফলো এবং সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের এই প্রয়াস ভাল লাগলে আমাদের পোস্টগুলো শেয়ার করে আরো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিন।

শান্তিপুরের পটেশ্বরী কালী :-*************************রাস পূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে শ্রীশ্রী পটেশ্বরী মাতা পূজিত হন বহু প্রা...
30/08/2026

শান্তিপুরের পটেশ্বরী কালী :-
*************************

রাস পূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে শ্রীশ্রী পটেশ্বরী মাতা পূজিত হন বহু প্রাচীনকাল থেকেই। ফটো চিত্রের মধ্যে কালি মায়ের ছবি এঁকেই পুজো হয়ে আসছে শতাধিক বছর ধরে। এই নিয়ে জনশ্রুতি আছে, পাঁচশো বছর আগে তৎকালীন সময়ে ছিল মুঘল শাসন। বক্তিয়ার খিলজি যখন নদিয়ায় এসেছিলেন সেই সময় শান্তিপুরের তীরবর্তী এলাকায় তাঁর সৈন্য সামন্তদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। মুঘল শাসকরা তখন পুজো করতে দিত না। সেই সময় তিন সন্ন্যাসী মিলে পটচিত্রের মধ্যে মায়ের ছবি এঁকে পুজো শুরু করেন। পুজো সম্পন্ন হয়ে গেলে সেই ছবি পুনরায় গুটিয়ে সযত্নে লুকিয়ে রাখা হত। পরের বছর ঠিক একইভাবে সেই পটচিত্র বের করে করা হত মায়ের পুজো।

এইভাবেই বছরের পর বছর ধরে পটচিত্রের উপরে ছবি এঁকেই মায়ের পুজো হয়ে আসছে। যদিও সেই আমলের পটচিত্র এখন আর পাওয়া যায় না। তবে আজও সেই একইভাবে, একই প্রথায় পটচিত্রের উপরে মায়ের ছবি এঁকে প্রতিবছর করা হয় এই পুজো। সঙ্গে ওই তিন সন্ন্যাসীকেও করা হয় পুজো, মাটি দিয়ে তাঁদের মূর্তি তৈরি করা হয়। মাটি দিয়েই মা কালীর পটচিত্র প্রতিবছর আঁকেন শিল্পী গোরাচাঁদ পাল।

এই পুজোর রয়েছে বেশ কিছু পৌরাণিক রীতি এবং নিয়ম। বিভিন্ন জায়গায় ছাগবলি প্রথা বন্ধ হয়ে গেলেও আজও এই পুজোয় প্রথা হিসেবে হয়ে আসছে ছাগবলি। যদিও বারোয়ারির পক্ষে বাতিল করা হয়েছে অনেক আগেই। সেই আখ কুমড়ো ইত্যাদি বলে দেওয়া হয়। তবে পুজো যেই পরিবার সূচনা করে সেই পরিবারের পক্ষ থেকে আজও নিয়ে আসা হয় ছাগ।

আজও মায়ের ভোগ রান্না করা হয় কাঠের জালে এবং জল হিসেবে শুধুমাত্র ব্যবহার করা হয় গঙ্গাজল। পুজোর দ্বিতীয় দিনে মাকে ভোগ হিসেবে দুটি চারা পোনা ভাজা মাছ দেওয়া হয়। সবশেষে ভাঙা রাসের দিন সন্ধেবেলায় শান্তিপুরের রাজপথ পরিক্রমায় সকল বিগ্রহ বাড়ি এবং বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে সঙ্গে এই মা’ও অংশগ্রহণ করেন। বিসর্জনের সময় কাঠামো থেকে সেই চিত্র খুলে মায়ের ছবি নিরঞ্জন করা হয়। কাঠামটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয় আগামী বছরের পুজোর জন্য। এইভাবেই আজও পৌরাণিক নিয়ম ও রীতি অনুযায়ী হয়ে আসছে শান্তিপুরের পটেশ্বরী মাতার পুজো।

💫 চিত্র এবং তথ্য-কৃতজ্ঞতা :- শ্রী সম্রাট দাস।

💫 টিম কালীকথা। KALI KATHA

 #আবেগ_ভক্তির_অন্য_নাম  #বড়মা :-*********************************নৈহাটির অরবিন্দ রোডে কালীপুজো মানেই শুধু আলোর উৎসব নয়,...
29/08/2026

#আবেগ_ভক্তির_অন্য_নাম #বড়মা :-

*********************************

নৈহাটির অরবিন্দ রোডে কালীপুজো মানেই শুধু আলোর উৎসব নয়, এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এক ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো। আজ যাঁকে অসংখ্য ভক্ত ‘বড় মা’ নামে চেনেন, তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ১৯২৩ সালে। নৈহাটির বাসিন্দা ভবেশ চক্রবর্তী নবদ্বীপের রাস উৎসবে বিশাল প্রতিমা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় নৈহাটিতে বিশালাকার কালীপ্রতিমার পুজো।

প্রথমে দেবীর নাম ছিল ‘ভবেশ কালী’। সময়ের সঙ্গে বিশাল আকৃতির জন্য তিনি পরিচিত হন ‘বড় কালী’ নামে, আর পরে হয়ে ওঠেন সকলের ‘বড় মা’। প্রায় ২১ থেকে ২২ ফুট উঁচু প্রতিমা, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো থেকে শুরু হওয়া প্রস্তুতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ভক্তি—সব মিলিয়ে বড় মা আজ নৈহাটির অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক পরিচয়।

----

নৈহাটির অরবিন্দ রোডে কালীপুজোর রাত নামলেই যে নামটি শুধু শহর নয়, সমগ্র বাংলার অসংখ্য মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তিনি নৈহাটির বড় মা। বিশালাকার কালীপ্রতিমা, শতবর্ষ পেরোনো ঐতিহ্য এবং ভক্তির এক অনন্য ইতিহাসের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে এই পরিচয়। কিন্তু আজ যাঁকে সবাই বড় মা নামে চেনে, তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারে অন্য নামে।

ইতিহাসের সূত্র ধরে ফিরে যেতে হয় প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯২৩ সালে। নৈহাটির বাসিন্দা ভবেশ চক্রবর্তী কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে নবদ্বীপের ভাঙা রাস দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে বিশাল আকৃতির প্রতিমা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নৈহাটিতে ফিরে এসে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন ভাবনা—ছোট আকারের রক্ষাকালীর পরিবর্তে তৈরি হবে এক বিশালাকার কালীপ্রতিমা।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি প্রচলিত বিশ্বাসও। কথিত আছে, নবদ্বীপ থেকে ফিরে ভবেশ চক্রবর্তী স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পান, নৈহাটিতে বড় আকারে তাঁর প্রতিমা নির্মাণের জন্য। ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের এই দুই ধারাকে সঙ্গে নিয়েই শুরু হয় পুজো। প্রথম দিকে দেবীর নাম ছিল ভবেশ কালী—প্রতিষ্ঠাতা ভবেশ চক্রবর্তীর নাম অনুসারেই।

সময়ের সঙ্গে প্রতিমার বিশাল আকৃতি নৈহাটির মানুষের কাছে তাঁকে আলাদা পরিচয় দেয়। ভবেশ কালী ধীরে ধীরে পরিচিত হন বড় কালী নামে। পরে সেই নামই বদলে যায় বড় মায়। পরিবারের পুজো হিসেবে শুরু হলেও ক্রমে তা হয়ে ওঠে সকলের পুজো। বড় মা যেন আর একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেন না; নৈহাটির মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন সবার মা।

বড় মার বার্ষিক মৃন্ময়ী প্রতিমার উচ্চতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২১ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার প্রতিমার কথাই সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়। এই বিশাল আকারই তাঁর পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কালীপুজোর সময় নতুন করে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়, আর সারা বছর নৈহাটির স্থায়ী মন্দিরে দেবীর নিত্যপুজো চলে।

পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় বহু আগে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে কাঠামোপুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। এই পুজোর আর একটি বিশেষ দিক হল, বড় আয়োজন সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক চাঁদা তোলার প্রথা নেই। ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রণামী, অলংকার, ভোগ এবং অন্যান্য নিবেদনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে পুজোর আয়োজন।

এক সময় এত বড় প্রতিমাকে বিসর্জনের জন্য মানুষের কাঁধে করেই গঙ্গার দিকে নিয়ে যাওয়া হত। পরে ১৯৭০ সালের পর চাকার গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। আর ২০২৩ সালে, পুজোর শতবর্ষ ঘিরে নৈহাটির বড় মা আবারও হয়ে ওঠেন বিপুল জনসমাগমের কেন্দ্র। একটি পরিবারের ছোট্ট রক্ষাকালীর পুজো থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাই আজ এক শতবর্ষের বেশি সময় ধরে নৈহাটির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়গুলির অন্যতম।

#সংগৃহীত

💫 টিম কালীকথা। KALI KATHA 💫

 #দক্ষিনেশ্বরের_অধিষ্ঠাত্রী_মা_ভবতারিণীর_কথা দক্ষিণেশ্বরের প্রাণ "মা ভবতারিণী", যার প্রকৃত নাম 'জগদীশ্বরী'    (রাণী রাসম...
29/08/2026

#দক্ষিনেশ্বরের_অধিষ্ঠাত্রী_মা_ভবতারিণীর_কথা

দক্ষিণেশ্বরের প্রাণ "মা ভবতারিণী", যার প্রকৃত নাম 'জগদীশ্বরী' (রাণী রাসমণির গুরুদেব শ্রীযুক্ত উমাচরণ ভট্টাচার্য মহাশয় নামটি রেখেছিলেন), হওয়া সত্ত্বেও, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কৃত মা ভবতারিণী নাম টি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। অবশ্য কেউ কেউ এমনও বলেন এই নাম স্বয়ং নবীন ভাস্কর এর দেওয়া, আসুন এক নজরে জেনে নেওয়া যাক কলকাতার প্রাণ মা ভবতারিণীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :-

▪️সেকালে কাশী যাওয়া যেমন ছিল কষ্টসাধ্য তেমনি ছিল ব্যয়বহুল। তখনকার দিনে কাশীতীর্থে গেলে সাধারণত কেউ আর বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করতেন না। বিধবারা তো নয়ই। তাই জমিদারীর সমস্ত কাজ ম্যানেজার সেরেস্তাদারদের বোঝাতে গিয়ে জানবাজারের রাণীমা রাণী রাসমণির অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল।

▪️কাশীযাত্রার আগের দিন ভোর রাত্রে রাণীমা এক স্বপ্নে দেখেন, মা জগদম্বা বলছেন, “তোর কাশী যাবার দরকার নেই। গঙ্গার পূর্বতীরে একটি সুন্দর জায়গায় মন্দির নির্মাণ করে আমায় প্রতিষ্ঠা কর। আমি নিত্য তোর পূজো গ্রহণ করব।” ঘুম ভেঙে আকুল হয়ে ‘মা’ ‘মা’ বলে কেঁদে উঠলেন রাণীমা। দাস-দাসী সকলেই রাণীমায়ের আকুল কান্নায় শয্যা প্রান্তে এসে হাজির। ছোট বড় সকলের মা, রাণী রাসমণি অশ্রু মুছতে মুছতে জানিয়ে দিলেন তিনি আর কাশী যাবেন না। দেবী জগদম্বার ইচ্ছে অনুযায়ী তিনি পরদিন থেকেই গঙ্গাতীরে মন্দির ও বিগ্রহ স্থাপনে আন্তরিক ভাবে উদ্যোগী হলেন। এ যে তাঁর বহুদিনের একান্ত সাধ। শ্রীশ্রী মা ভবতারিণীকে উপোসী থেকে নিজের হাতে পূজার্ঘ্য নিবেদন করবেন। কিন্তু বাধ সাধলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণেরা। তাঁর এই একান্ত ইচ্ছা নস্যাৎ করে দিলেন সমাজপতি ও উচ্চবর্গের জমিদাররা। তাঁরা কিছুতেই এই অনাসৃষ্টি হতে দেবেন না। জেলের মেয়ের (জাতিতে মাহিষ্য) আবার মাতৃপূজার শখ। সত্যিই তিনি জেলের মেয়ে, তাই বলে কি তিনি ভবতারিণীকে পূজা করতে পারবেন না, গড়তে পারবেন না দেবীমন্দির? কুমারহট্ট-হালিশহর বাংলার প্রসিদ্ধ শাক্তভূমি। সেই সময়কার ব্রাহ্মণ প্রধান কুমারহট্ট-হালিশহরের সমাজপতিরা রাণীর অনুরোধের প্রত্যুত্তরে জানান, “টাকার জোরে মন্দির গড়লেও কোন ব্রাহ্মণ সেখানে ঢুকবে না, পূজাও করবে না।” আড়ালে আবডালে বলতে শোনা যেত “কৈবর্ত হরেকৃষ্ণ দাসের মেয়ের স্পর্ধা তো কম নয়। টাকার দেমাক ! —ধ্বংস হবে।”

▪️এই সময়ে ভাগীরথীতে তরী নিয়ে রাণীর লোকজন দিবারাত্র অন্বেষণ করতেন দেবীমন্দিরের জন্য উপযুক্ত জমির। পছন্দ হলে লোভনীয় অর্থ দেবার কথাও ঘোষণা করতেন। কিন্তু রাণীকে কেউ জমি দিতে রাজী হলো না।
কিন্তু স্বয়ং জগজ্জননী মা ভবতারিণীর যখন ইচ্ছা রাণীর হাতে পূজা নেবেন তখন কি আর তাঁর মনোবাঞ্ছা অপূর্ণ থাকতে পারে? তাই মায়ের ইচ্ছাতেই মন্দির গড়ার জন্য ১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণেশ্বর গ্রামের ভাগীরথী তীরে ৬০ বিঘা জমি প্রায় ৬০ হাজার টাকার (মতান্তরে নগদ ৫৫০০০ টাকা) বিনিময়ে সুপ্রীম কোর্টের এটর্ণী (জেমস হেস্টি) এক ইংরেজের কাছ থেকে ক্রয় করলেন। অতীতে জায়গাটিতে ছিল ইংরেজদের এক পরিত্যক্ত কুঠি এবং মুসলমানদের কবরস্থান। এখানেই ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দের ৩১শে মে স্নানযাত্রার (বাংলা ১২৫৯) দিন রাণীমা গড়ে তুললেন সাদা রঙের নবরত্ন মন্দির, প্রতিষ্ঠিত হল সুন্দর কষ্ঠিপাথরের কালিকা দেবী। রাসমণি সাধ করে নাম রাখলেন মা ভবতারিণী। মন্দিরের মেঝে শ্বেত কৃষ্ণ প্রস্তরাকৃত ও সোপানযুক্ত উঁচু বেদী। বেদীর উপর সহস্রদল রৌপ্যপদ্ম, তার ওপর মাথা ও উত্তরে শয়ান শ্বেতপ্রস্তরে নির্মিত শিব। মহাদেবের বক্ষোপরি দণ্ডায়মানা ত্রিনয়নী নয়নাভিরাম মা ভবতারিণী। রঙিন বারাণসী চেলী পরিহিতা এবং বিবিধ রত্নালঙ্কারে ভূষিতা।

▪️টালিগঞ্জের রামনাথ মণ্ডলের নবরত্ন মন্দিরের অনুকরণে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। মন্দিরের নীচের থাকে চারটি চূড়া, মধ্যের থাকে চারটি এবং সর্বোচ্চে একটি চূড়া দৃশ্যমান। নাটমন্দিরটি নির্মাণে বিদেশী প্রভাব লক্ষ্যণীয়। এই মন্দিরের উপরে মহাদেব, নন্দী ও ভৃঙ্গীর মূর্তি স্থাপিত আছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ ভবতারিণীর পূজা করার জন্য মন্দিরে প্রবেশ করার সময় সর্বদা নাটমন্দিরের উপর স্থাপিত মহাদেব, নন্দী ও ভৃঙ্গীর মূর্তির উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে প্রণাম জানাতেন। মন্দির প্রাঙ্গণ লাল রঙের টালীতে আবৃত। কালীমন্দিরের পশ্চিমদিকে ভাগীরথীর তীরে দ্বাদশ শিবমন্দির সারিবদ্ধ ভাবে নির্মিত। মন্দির প্রাঙ্গণের ঠিক উত্তর-পশ্চিম দিকের ঘরে থাকতেন দক্ষিণেশ্বরের সিদ্ধপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ঠাকুরের ব্যবহৃত শয্যা ও অন্যান্য দ্রব্য এখনও সুন্দর করে সাজান আছে, এখানে প্রত্যহ ফুল দিয়ে ভক্তরা তাঁদের আত্মিক কামনা জানান।

▪️১লা জানুয়ারী, দিনটিতে ঠাকুর কল্পতরু হয়েছিলেন। শত শত ভক্তের মত আমিও এসেছি আজ দেবীমন্দিরে। পায়ে পায়ে চলে যাই গঙ্গার ঘাটে। সে এক নয়নাভিরাম স্বর্গীয় দৃশ্য। গঙ্গার উপর রচিত হয়েছে সেতুবন্ধ। হাজার হাজার ভক্ত এই সিদ্ধপীঠে এসে আত্মতৃপ্ত হন। এখানে গঙ্গায় বাঁধাঘাটে স্নান করে সিক্ত বসনে সোপানশ্রেণী অতিক্রম করে। চাঁদনীর পাশে দ্বাদশ শিব-দেউলের মধ্যবর্তী দ্বার দিয়ে ডালি হাতে নিয়ে লাল রঙের টালী বাঁধানো প্রাঙ্গণে প্রবেশ করি। এই প্রাঙ্গণের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পাশাপাশি দুটি মন্দির। উত্তরে শ্রীশ্রীরাধাকান্তের মন্দির ও তার ঠিক দক্ষিণে নবরত্ন মন্দিরে শ্রীশ্রীভবতারিণী প্রতিষ্ঠিত যিনি, রামকৃষ্ণেদেবের কাছে শুধুই 'মা চিন্ময়ী'। এখানে নেই কোন পাণ্ডার ঝামেলা। তাই নিরুপদ্রবে ডালি হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলি মন্দির দ্বারে। ভক্তগণের লক্ষ লক্ষ প্রার্থনা-মালার মধ্যে কামনাও জমা পড়ে। এবার দ্বাদশ শিবমন্দির দর্শন করতে এগিয়ে যাই। সিঁড়ি দিয়ে প্রথম শিবমন্দিরের দ্বারে উপস্থিত হই। সব শিবমন্দিরগুলিই একই রঙের এবং একই গড়নের। বাংলার অন্যান্য শিবমন্দিরগুলিতে যেমন দেখা যায়। তবে এখানের প্রতিটি শিবমন্দিরেই তিনটি করে প্রবেশ দ্বার আছে। পূর্বদিকে, দক্ষিণে এবং একটি করে গঙ্গার দিকে। প্রতিটি শিবলিঙ্গই কালো কষ্টি পাথরের এবং প্রায় চার ফুটের মত উচ্চতা বিশিষ্ট। মধ্য স্থলে যোনীপট্ট, সুদৃশ্য তেল চক্‌চকে মসৃণ। মাথার উপরে একটি পিতলের ঝুলন্ত ঘন্টা। কোন কোন লিঙ্গের মাথায় আবার রৌপ্য সর্পের মেখলা দেখতে পাই। আগেই গঙ্গা থেকে কমণ্ডুল করে গঙ্গা জল নিয়ে এসেছি। এবার প্রথম শিবলিঙ্গ নির্জড়েশ্বরকে কমণ্ডুলু থেকে একটু একটু করে জল ঢালি আর মুখে উচ্চারণ করি---
""ওঁ নমস্তভ্য বিরূপাক্ষ! নমস্তে দিব্যচক্ষুষে। নমঃ পিনাকহস্তায় বজ্রহস্তায় বৈ নমঃ।।

নমস্ত্রিশূল হস্তায় দণ্ডপাশাসি পাণয়ে ।

নমস্ত্রৈলোক্যনাথায় ভুতানাং পতয়ে নমঃ।।""

জল ঢালা শেষ করে লিঙ্গ স্পর্শ করে প্রণাম করি। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পূজা শেষ হয়ে যায়। মাথার উপর ঘন্টা বাজিয়ে মন্দির থেকে বের হই। এবার দ্বিতীয় মন্দিরে প্রবেশ করি। এই মন্দিরে স্থাপিত আছেন শ্রী নাগেশ্বর শিবলিঙ্গ। তাঁকেও সেই একই মন্ত্রে পূজা প্রার্থনা ও প্রণাম করি। শেষে ঘন্টা বাজিয়ে মন্দির থেকে বের হয়ে পরবর্তী মন্দিরে প্রবেশ করি। তৃতীয় মন্দিরে স্থাপিত আছেন নকুলেশ্বর শিবলিঙ্গ। এখানেও একই প্রথায় ভক্তিতে পূজা করি তারপর পরের মন্দিরের দিকে অগ্রসর হই। দেখি শিবমন্দিরের পুরোহিত মন্দিরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভক্তদের চরণামৃত দিচ্ছেন এবং বাবার আশীর্বাদ স্বরূপ একটি করে ফুল দিচ্ছেন। আমি এগিয়ে তাঁকে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করি আপনি কত বছর ধরে এখানে পূজা করছেন? তিনি আমার উত্তরে স্মিত হেসে একজনকে চরণামৃত দিতে দিতে জানালেন, তা বাবা প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর হবে। একটু দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করি আপনার নামটা যদি দয়া করে বলেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন কি ব্যাপার, নাম দিয়ে কি করবেন? আমি বলি, দেখুন সবাইতো মন্দিরের বিগ্রহ দেখে প্রণাম করে চলে যায়। তাদের খুব বড় তাড়া থাকে। আমার কোন তাড়াহুড়ো নেই, তাই বাবার মন্দিরে বাবার প্রতিভূ শিবলিঙ্গ দর্শন করার সাথে সাথে তাঁর ভাগ্যবান পূজারী সম্বন্ধে কৌতূহল হয়। তাই আপনার দেখা পেয়ে একটু আলাপ করলাম। তিনি হেসে বললেন, দেখুন কাগজ ওয়ালাদের সাথে কথা বলতে আমার বড় ভয় হয়। কারণ কী লিখতে কী লিখে দেবে কে জানে। তারপর আমার তিনপুরুষের জজমানগিরিটাও যাবে। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালাম, আপনি কাগজওয়ালা বলতে যা বোঝেন আমি সেই দলে নেই। আমি তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াই আর সুযোগ পেলে সেই তীর্থের বন্দনা করি। তিনি তখন বললেন, বাঃ সে তো খুব ভাল কাজ। তোমার এই বয়সে ভগবদ প্রেম দেখে একটু খুশীই হলাম। এবার স্বাভাবিক হয়ে বললেন, 'আমার নাম শ্রীঅনিল ভট্টাচার্য। আর কি জানতে চান বলুন আমি সাধ্যমত বলব।' আপনি এখনকার কটি মন্দিরে পূজা করেন, তিনটি শিবমন্দিরে পূজা করি। তবে প্রয়োজন বোধে চার-পাঁচটি মন্দিরের পূজাও করতে হয়।

▪️এই দ্বাদশ শিবমন্দিরে আর কোন কোন পুরোহিত পূজা করেন- রেবর্তী চক্রবর্তী, রবি মুখোপাধ্যায়, রঘুনাথ ভট্টাচার্য, ধর্মচাদ চ্যাটার্জী এবং দেবু চ্যাটার্জী। এই নামগুলি বলেই তিনি বলে ওঠেন একটু ভুল হয়ে গেল। ধর্মচাদ চ্যাটার্জী এবং দেবু চ্যাটার্জী মায়ের মন্দিরে পূজা করেন। আমার যা জানার তা হয়ে গেছে। এবার আমি তাঁকে পুনরায় প্রণাম জানিয়ে চতুর্থ শিবের মাথায় জল ঢালতে চলি ।

▪️চতুর্থ মন্দিরে স্থাপিত আছেন জটিলেশ্বর শিবলিঙ্গ। এখানেও সেই একই ব্যবস্থা। কোন মতে ভীড় ঠেলে বাবার নাম স্মরণ করে এগিয়ে যাই শিবলিঙ্গের কাছে। সেখানে দাঁড়িয়েই বাবার মাথায় জল ঢেলে পূজা করে পরের মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাই।

▪️পঞ্চম মন্দিরে প্রবেশ করি। সেখানে স্থাপিত আছেন রত্নেশ্বর শিব লিঙ্গ। প্রতিটি শিবলিঙ্গের মধ্যবর্তী অঞ্চলে উত্তরদিকে মুখ করা পাথরের যোনী পীঠ থাকলেও মেঝেতেও মাঝের যোনীপীঠের অনুরূপ একটু বড় সিমেন্ট দিয়ে। স্বয়ংভূ লিঙ্গের মত যোনীপট্ট করা হয়েছে। মনে হয় এগুলি শিবলিঙ্গের মাথায় ভক্তদের ঢালা দুধ-জল যাতে কোন মতেই বাইরে বেরিয়ে কারোর পায়ে না লাগে সেজন্যই হয়তো পরবর্তীকালে গড়া হয়েছে। এবার বাবা রত্নেশ্বরশিব লিঙ্গকে সেই একই মন্ত্রে পূজা প্রার্থনা ও প্রণাম নিবেদন করি। শেষে ঘন্টা বাজিয়ে মন্দির থেকে বের হয়ে পরবর্তী মন্দিরে প্রবেশ করি।

▪️এবার প্রবেশ করি প্রথম পর্বের শেষ মন্দিরে। এই ষষ্ঠ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছেন যোগেশ্বর শিবলিঙ্গ। প্রতিটি শিবমন্দিরে পূজা দেবার পর মন্দির প্রদক্ষিণ করার জন্য দুটি মন্দিরের মাঝে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রাখা আছে। অনেক ভক্তকেই দেখলাম আমার মত পূজা করে মন্দির প্রদক্ষিণ করছেন। যার জন্য ভক্তদের ভীড়ের জন্য প্রদক্ষিণ করতে অপেক্ষা করতে হয়। তবে সেজন্য কোন কষ্ট নেই। এখান থেকে শিবপুত্রী মা গঙ্গার অবর্ণনীয় শোভা দর্শন করি। জোয়ারের জল কানায় কানায় পূর্ণ। মা-ও যেন আজ নবসাজে নিজেকে সাজিয়ে রেখেছেন। নানা ফুল ও মালার সাথে ভেসে যাচ্ছে নানা অপার্থিব বস্তু। মনে হচ্ছে যেন মা গঙ্গার গলায় দুলছে ফুলমালার সাথে নানা অঙ্গ অলঙ্কার। গরমেও ভক্তদের জন্য বিশেষ বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন। তাই পূজা করার ফাঁকে ফাঁকে অলিন্দে দাঁড়িয়ে অনেকেই যেন সেই সৌন্দর্য উপভোগ করছেন আর মায়ের দেওয়া মমতা মাখানো মিঠে ঠাণ্ডা বাতাসের পরশ নিচ্ছেন। পূজা শেষ করে এবার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসি। এবার দ্বিতীয় পর্বের শিবমন্দিরগুলি দর্শন করতে যাব। দুই পর্বের শিবমন্দির গুলির মাঝখানটি গঙ্গায় আসা যাওয়ার পথ। তারপরেই আবার পরের ছটি শিবমন্দিরে পূজা করতে যাওয়ার সিঁড়িপথ। সেই সিঁড়িপথ দিয়ে উঠে সপ্তম শিব মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাই।

▪️সপ্তম মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছেন নরেশ্বর শিবলিঙ্গ। এই মন্দিরেও আগের মতই মুখে শিবের স্তব উচ্চারণ করে লিঙ্গের মাথায় জল দিয়ে প্রণাম করি। তারপর প্রদক্ষিণ করে অষ্টম মন্দিরের দিকে যাই। অষ্টম মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছেন নদীশ্বর শিবলিঙ্গ। এই ভাবে নবম মন্দিরে নাদেশ্বর, দশম মন্দিরে জগদীশ্বর, একাদশ শিবমন্দিরে জলেশ্বর শিবলিঙ্গ দর্শন করে পূজা করে জল ঢালি। তারপর এগিয়ে যাই দ্বাদশ শিবমন্দিরের দিকে।

▪️এবার উপস্থিত হই শেষ শিবমন্দিরের দ্বারে। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছেন যজ্ঞেশ্বর। এই মন্দিরের শেষ প্রান্তে একটু বেশী ভিড় দেখে উৎসাহিত হয়ে কাছে গিয়ে দেখি সেখানে মানত করার জন্য ঢিল বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ টাকার বিনিময়ে সেই ঢিল একটি লাল বা হলুদ কাপড়ে জড়িয়ে বেঁধে রাখছেন। সেখান থেকে মন্দিরে গিয়ে ঢুকি। প্রাণের আকুতি দিয়েই বাবা যজ্ঞেশ্বরকে পূজা করে লিঙ্গের মাথায় জল ঢালি। সাথে সাথে সম্পন্ন হয় দ্বাদশ শিবলিঙ্গের পূজা সঙ্গে মা ভবতারিণীর দর্শন। প্রশান্ত চিত্তে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের শয়ন কক্ষে প্রবেশ করি। পরিপাটি করে ধবধবে সাদা চাদরে মোড়া বিছানা। তার উপরে ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের একটি ফটো। ঘরটি বেশ ঠাণ্ডা। কয়েকজন ভক্তকে দেখলাম একধারে বসে চোখ বুজে ঠাকুরের চিন্তায় তন্ময় হয়ে আছেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ এবং সারদা মায়ের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে গঙ্গার দিকে যাই। শত শত ভক্তর সাথে আমিও বসে থাকি শান্ত নির্জন নবনির্মিত পঞ্চবটী তলে। পরিবেশের সাথে সঙ্গতি রেখে জায়গাটিকে বেশ সুন্দর আধুনিকরণ করা হয়েছে। মন চলে যায় এই মন্দিরের জন্মলগ্নে।

▪️ব্রাহ্মণদের পরশ্রীকাতর আন্দোলনের জন্য কোন পুরোহিত ঠাকুরই এই মন্দিরের জন্মলগ্নে পূজকের ভার নিতে সাহস দেখাননি। বাধ্য হয়ে নবদ্বীপ থেকে কাশী সর্বত্রই রাণী লোক পাঠালেন পুরোহিতের জন্য এবং পূজার বিধান নেবার জন্য। সকল লোকই হতাশ হয়ে ফিরে এল। সেদিন কোন ছিজই সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে এগিয়ে আসেন নি। রাণী রাসমণি এবার আর নিজেকে সংযমে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হাপুস্ নয়নে কেঁদে বলে উঠলেন, “মা, তুমি আর কত আমায় ঘোরাবে, তুমি কিছু একটা ব্যবস্থা কর।”

▪️এই সময় হুগলী জেলার কামারপুকুরের সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ খুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামকুমার চট্টোপাধ্যায় ঝামাপুকুরে একটি টোলে শিক্ষকতা করতেন। ঈশ্বরের দৈববাণীর মতই পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায় বিধান দিলেন, “রাণী যদি সমগ্র মন্দিরটি তাঁর কুলদেবতা অথবা কুলগুরুর নামে উৎসর্গ করেন তাহলে অন্নভোগের আর কোন বাধা থাকবে না।” এই খবরে রাণীর আর আনন্দের সীমা রইলো না। মন্দির যাঁর সেই অভয়প্রদায়িনীই সন্তানের বিপদকালে এগিয়ে এলেন। রাণীমা তখন রামকুমারকেই পূজকের পদ গ্রহণের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন। যিনি ব্রাহ্মণদের গোঁড়ামি ও অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্নের বিরুদ্ধে বিধান দিয়েছিলেন সেই পণ্ডিত চট্টোপাধ্যায় প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাণীর অসহায়তার কথা বিবেচনা করে আর অস্বীকার করতে পারেননি। পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণ (গদাধর) বালক বয়সেই দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই মন্দিরে প্রবেশ করেন। প্রথমে ভবতারিণীর জন্য পুষ্প চয়ন করার দায়িত্ব নিয়ে দাদার সাথে কাজ শুরু করেন। তারপর ১৮৫৭-৫৮ খ্রীষ্টাব্দে পূজকের দায়িত্ব পান। এই ভবতারিণীর মন্দিরই হল যুগবতার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের সাধনপীঠ। এখানেই তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর সাধনবেদী ও পঞ্চবেদীকে গঙ্গার সুরক্ষিত করে তাকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলা হয়েছে। এই অসীম শক্তিধর পরমহংসদেব তাঁর অপার মহিমা প্রকাশ করে বাংলা ১২৯৩ সালের ৩১ শে শ্রাবণ, ইংরাজী ১৮৮৬ সালের ১৬ই আগষ্ট রবিবার প্রতিপদ তিথিতে রাত্রি ১টা ৬ মিনিটে ভবলীলা সাঙ্গ করে পরলোকে গমন করেন। তিরোধাণের আগে তাঁর বিভিন্ন ভাব দেখে সিদ্ধ পুরুষগণ মুগ্ধ হয়ে একবাক্যে স্বীকার করেন যে পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব একজন উঁচু দরের সাধক। তাঁর গুণমুগ্ধ শিষ্যভক্তেরা দেখেছেন কখনো রামকৃষ্ণর শরীরে বাল্য ভাব, কখনও স্ত্রী ভাব, কখনও উন্মাদ ভাব, কখনও পিশাচ ভাব আবার কখনো অবতার ভাব দেখা দেয়। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লক্ষ লক্ষ নারীপুরুষের হৃদয়ে ধর্মভাব জাগরিত করে পাপীগণকে পরিত্রাণ করেছেন। সহজ সরল ভাষায় ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব বুঝিয়ে সাধারণকে করেছেন অসাধারণ। তাঁর এই পুণ্যময় সাধনপীঠে লক্ষ লক্ষ ভক্ত আসেন আশীর্বাদ নিতে। তাঁদের বিশ্বাস ঠাকুর এখনও এখানে কল্পতরু হয়ে ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন। একবার এক ভক্তের প্রশ্নের উত্তরে ঠাকুর কত সহজভাবে বুঝিয়েছিলেন—বলেছিলেন, “রাত্রে আকাশে কত তারা দেখ, সূর্য উঠলে দেখতে পাও না ব'লে কি বলবে দিনের বেলায় আকাশে তারা নেই। সেই রকম অজ্ঞান অবস্থায় ঈশ্বরকে দেখতে পাও না ব'লে কি ব'লবে ঈশ্বর নাই।”

⚜️ তথ্য ঋণ :- পরিব্রাজক গৌতম বিশ্বাস

⚜️ গ্রন্থঋণ :- "পশ্চিমবঙ্গের কালী ও শক্তিসাধনা" ।।
পরিব্রাজক গৌতম বিশ্বাস ।। প্রকাশক : তথাগত, কোলকাতা

⚜️ চিত্র সৌজন্যে :- পিন্টারেস্ট

⚜️ টিম কালীকথা। KALI KATHA

🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸

রানাঘাটের রণা ডাকাত ও সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির এর গল্প :-----------------------------------------------------------------...
29/08/2026

রানাঘাটের রণা ডাকাত ও সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির এর গল্প :-
-----------------------------------------------------------------------------------

▪️আজ থেকে পাঁচশো কি ছ'শো বছর আগেকার কথা। আজ বাংলার নদীয়ার যে অঞ্চলটাকে সবাই রানাঘাট বলে চেনে, সেই সময় এই জায়গার নাম ছিলো ব্রহ্মডাঙা।
তবে সেই ব্রহ্মডাঙার নাম কিকরে রানাঘাট হল, তা জানতে নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে। বলছি সে গল্প। তখনকার ব্রহ্মডাঙা ছিলো বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ এক এলাকা৷ লোকবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। আর এই ব্রহ্মডাঙ্গার পশ্চিম দিক দিয়ে আজও বয়ে চলেছে চূর্নি নদী।

▪️বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়া জেলায় পদ্মা নদী থেকে মাথাভাঙা নদী উৎপন্ন হয়ে নদীয়া জেলার মাজদিয়াতে এসে দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটি শাখার নাম হয়েছে ইচ্ছামতী নদী। আরেকটি শাখা চূর্নী নদী নাম নিয়ে হাঁসখালি, বীরনগর, আড়ংঘাটা, রানাঘাট হয়ে ভাগীরথী নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই নদীর মাধ্যমে কলকাতা থেকে নদীয়া জেলার বিভিন্ন জায়গা ছাড়াও বাংলাদেশের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিলো। ফলে এই নদী দিয়ে বড়ো পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকো চলাচল করতো, কিন্তু দলবেঁধে। কারণ ডাকাত ও জলদস্যুদের ভয়ে। সেইসময় এই ব্রহ্মডাঙ্গায় ছিলো এক ভয়ংকর ডাকাতের ডেরা। নাম তার রণা বা রাণা ডাকাত।
ভালো নাম ছিলো রণজিৎ বিশ্বাস। চাষীর ছেলে। অভাবের সংসারে দুবেলা আহার জুটতো না। দিন কাটতো খুব কষ্টে। তাই বড়লোকদের বিলাসবহুল জীবন যাপন দেখে তার খুব রাগ হতো। মনে মনে তাদের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা, ঘৃণা জন্মায়। তার মনে হয় গরীবের টাকাতেই তারা বড়লোকগিরি করে। তাই এই তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ থেকে পরবর্তী কালে সে হয়ে উঠেছিলো এক দুর্ধর্ষ ডাকাত। তার ভয়ে তখনকার নদীয়া ও তার পার্শ্ববর্তী বিশাল এলাকার মানুষজন ভয়ে কাঁপতো। রণ ছিলো সুদখোর মহাজন ও অত্যাচারী জমিদারদের কাছে আতঙ্কস্বরূপ। শোনা যায় বীরনগরের জমিদার হরিনারায়ণের সাথে ছিলো তার চরম শত্রুতা। একবার রণা ডাকাত নাকি দুর্গাপুজোর সময় তার দলবল নিয়ে গিয়ে তার দুর্গামূর্তি তুলে নিয়ে এসেছিলো। এমনই ছিলো তার প্রতাপ।

▪️এছাড়া চূর্নী নদী দিয়ে পণ্যবাহী বা যাত্রীবাহী নৌকোতে ডাকাতি করা বা আশেপাশের বিত্তবান মানুষের বাড়িতে ডাকাতি করাই ছিলো তার কাজ। জঙ্গলের মধ্যে গাছের ওপর মাচা বেঁধে রণা ডাকাতের লোকজন সেখান থেকে নজরদারি চালাতো চূর্নী নদীর ওপর। তাছাড়া রণপার সাহায্যেই রণা বা রাণার ডাকাতদল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় খুব দ্রুত চলাফেরা করতে পারতো। কারো কারো মতে রণপা চড়ে ডাকাতি করতে যেতো বলেই নাকি তার নাম রণা বা রাণা ডাকাত হয়েছিলো। এসবই শোনা কথা। রণা ডাকাতকে নিয়ে এইরকম অনেক কথা রানাঘাট তথা নদীয়ার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
তবে রণা বা রাণা ডাকাত এমনিতে ভয়ংকর হলে কি হবে সে ছিলো ধনীর শত্রু আর গরীবের বন্ধু। তার প্রাণে দয়া মায়ার অভাব ছিলো না। সে যে কত গরীব মানুষের উপকার করেছে তার ইয়ত্তা নেই। গরীব মানুষের কাছে সে ছিলো ভগবান তুল্য।

▪️কারো কারো মতে এই রণা বা রাণা ডাকাতের নামেই এই জায়গার নাম হয় রণার ঘাট, রানার ঘাট, পরবর্তীতে রানাঘাট। এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি,
কারো মতে নদীয়ার রাজবাড়ীর কোনো রানীর বাপের বাড়ী ছিলো এই রানাঘাটের নোকারিতে। তো রানী যখন বাপের বাড়িতে আসতেন তখন চূর্নী নদীর এই অঞ্চলের কোনো ঘাটে স্নান করতেন। সেই থেকে রানীর স্নানের ঘাট যা ক্রমশ পরবর্তীতে রাণির ঘাট, অপভ্রংশ হয়ে রানাঘাট নামে পরিচিতি লাভ করে।

▪️যাইহোক আমরা ফিরে যাই রণা বা রাণা ডাকাতের কথায়। বাংলার আরও অন্যান্য ডাকাতদের মতন সেও ছিলো কালীভক্ত। ওই ব্রহ্মডাঙ্গা জঙ্গলে তার ডেরার মধ্যে সে পর্নকুটিরে মা কালীর পুজো করতো। এবং আমরা যেরকম গল্প ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, যে, ডাকাতি করতে যাবার আগে সব ডাকাতরাই যেমন মায়ের পুজো করে তবে ডাকাতি করতে যেতো। রণা বা রাণা ডাকাতও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। পুজোতে পশুবলি থেকে নরবলি পর্যন্ত দিতো।
মন্দিরের বর্তমান পূজারী পলিন গাঙ্গুলী মহাশয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। তাঁর কাছ থেকেই অনেক তথ্য পেলাম। রণা বা রাণা ডাকাতের পর থেকেই এই গাঙ্গুলী পরিবারই বংশ পরম্পরায় মায়ের পুজো করে আসছেন। তাঁকে তাঁর বয়স জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, আমার বয়স ৬২ বছর, এবার বুঝে নিন। আলাদা করে বোঝার কিছু ছিলো না। ওনার বক্তব্যেই বুঝে গেলাম যা বোঝার।

▪️ওনার মুখ থেকে শুনলাম ওনাদের পূর্বপুরুষ কোনো এক মহিলা এই রণা বা রাণা ডাকাতের মন্দিরে পুজো দিতে আসতেন, তাঁর মায়ের প্রতি ভক্তি দেখে রণা ডাকাতের ভালো লেগে যায় তখন রণা ডাকাত তাদের পরিবারের হাতে পুজোর ভার সমর্পণ করে এই স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। ( যদি পলিনবাবুর কথা সত্যি বলে ধরে নিই, তাহলে এমনও হতে পারে তখন রণা ডাকাত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে, ডাকাতি করার মতন মন বা শরীর তখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই সে তাঁর পরম আপন মায়ের পুজোর ভার তার মতে যোগ্য লোকের হাতে তুলে দিতে পেরে নিশ্চিন্ত মনে ডাকাতি ছেড়ে, এই স্থান ছেড়ে চলে গেছে অন্য জায়গায়। যেখানে সে অন্য মানুষ হিসেবে বাঁঁচবে। অন্য পরিচয়ে বাঁঁচবে। তবে এটা আমার কল্পনা মাত্র। )

▪️অন্য একটা মতে, রণা ডাকাত তার ছোটো বোন নয়নতারার কাছে ভাইফোঁটার দিন ফোঁটা নিতে গিয়েছিলো কুমুলিয়া গ্রামে। রণা ডাকাতের শত্রুর অভাব ছিলো না। তার শত্রুপক্ষের কাছে সে খবর পৌঁছে যায়। তারা ঘিরে ধরে তার বোনের বাড়ি। তাদের গুলিতেই মারা যায় রণা ডাকাত।
পূজারী পলিন বাবু বলছিলেন তাঁর হিসেব অনুযায়ী এই পুজো তাদের হাতেই আছে ৪৯৫ বছর৷ এই সিদ্ধেশ্বরী মা এতটাই জাগ্রত এতোই তার মহিমা যে শুধুমাত্র স্থানীয় মানুষজন নন, বহু দূরদূরান্ত থেকে মানুষেরা আসেন পুজো দিতে, কেউ সাধারণ পুজো দিতে,কেউ মানত করতে আবার কেউবা মানত পূরণ হলে পুজো দিতে আসেন।
আমি যখন পলিন বাবুর সাথে কথা বলছিলাম, তখন এক অল্পবয়সী মহিলা, বছর ত্রিশের নীচেই হবে তার বয়স, তিনি মন্দিরে পুজো দিতে এসে মাকে সোনার চেন দিলেন।
কারণ জিজ্ঞাসা করায় বললেন, না আমার কোনো মানত ছিলো না। আমার বিয়ে হয়েছে, সন্তানের মা হয়েছি, সম্প্রতি আমরা একটা জমি কিনেছি, কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির কাজ শুরু করার ইচ্ছে আছে, তাই মাকে দিলাম৷ মা আমাদের এত মনোবাঞ্ছা পূরণ করেছেন, এই ইচ্ছেটাও মা নিশ্চয়ই আমাদের পূরণ করবেন৷ বুঝতে পারলাম, এনাদের মায়ের প্রতি কতটা ভক্তি, কতটা বিশ্বাস আর কতটা আস্থা আছে। ইনি তো একটা উদাহরণ মাত্র। এইরকম কতশত মানুষজন আছেন৷

▪️পলিন বাবু বলছিলেন, আগে এই মূর্তি ছিলো মাটির। পরবর্তী কালে তাদের এক পূর্বপুরুষের গুরুদেব বালানন্দ ব্রহ্মচারীর পরামর্শে কাশী থেকে কষ্টিপাথরের এই মূর্তি তৈরি করে আনা হয়। তারপর থেকে এই মূর্তিতেই পুজো হচ্ছে।
আগে মায়ের পুজোতে বলি হতো। প্রায় পঞ্চাশ, ষাটটার মতো পাঁঠা বলি হতো। প্রতি অমাবস্যায় তো বলি হতোই এমনকি শনি, মঙ্গলবারেও বলি হতো তাও পাঁচ সাতটা করে । কিন্তু একটা ঘটনার পর বলি বন্ধ হয়ে গেছে।

▪️পলিনবাবু বলছিলেন, এই মন্দিরে প্রতি বছর বাসন্তি পুজো হয়। সেই বাসন্তী পুজোতে আখ, চালকুমড়ো ইত্যাদি বলি হতো। ১৯৯৭ সালে পুজোর দিন বলি দিতে গিয়ে দেখা যায়, যে, বলির জন্য যে যে ফল আলাদা করে রাখা হয়েছিলো সব কালো হয়ে গেছে, অর্থাৎ সব ফল পচে গেছে। পচা ফল তো আর বলি দেওয়া যায় না। ধরে নেওয়া হলো যে, মা বলি চাইছেন না। নাহলে টাটকা ফল এভাবে হঠাৎ করে সব পচে যাবে। একটা অশুভ ঈঙ্গিত পাওয়া গেলো। সবার মনেই কু গাইতে লাগলো। মা নিজেই যখন আর বলি চাইছেন না, তখন আর কেন বলিপ্রথা থাকবে। তাই সেই বছর থেকেই সমস্তরকম বলি বন্ধ হয়ে গেলো।
রণা ডাকাতের পূজিতা মা কালীই এখন মা সিদ্ধেশ্বরী রূপে পূজিতা হচ্ছেন। তবে সে মূর্তি দিয়ে পুজো করতো নাকি মা'কে অন্য কোনো রূপে পুজো করতো তাই নিয়ে বিতর্ক আছে।

▪️আর এই মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ যেটা জানালেন পলিনবাবু, তা হলো, ১৩ ই ফেব্রুয়ারী, মাঘ মাসের সংক্রান্তির দিন। ওই দিন বিশেষ পুজো হয়। এছাড়া নিত্যপুজো ছাড়াও শনি ও মঙ্গলবারে এবং প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয়। বর্তমানে শ্বেতপাথরের দুই ধাপ বিশিষ্ট, পাঁচ কোণযুক্ত পঞ্চমুণ্ডীর আসনের ওপর দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিতা। মায়ের মূর্তি কষ্টিপাথরের হলেও, মহাদেবের মূর্তি শ্বেতপাথরের। প্রতি বছর দেবীর অঙ্গরাগ হয়। দেবীর নাম সিদ্ধেশ্বরী হলেও দেবী এখানে দক্ষিণাকালী রূপে পূজিত হন। দেবী মুণ্ডমালিনী। দেবীর বাঁহাতে ইস্পাতের খড়গ, নীচের হাতে নরমুণ্ড। ডান হাতে বরাভয়ের মুদ্রা, নীচের হাতে রক্তপদ্ম। মূর্তির উচ্চতা প্রায় তিন ফুটের মতো হবে। দেবী এখানে যেমন একদিকে শান্ত আবার অন্যদিকে ভয়ংকরী।

▪️মাকে ফলমূল দিয়ে তো পুজো দেওয়া হয়ই তার সাথে দুবেলা ভোগ দেওয়া হয় সাধারণ দিনে। বিশেষ বিশেষ দিনে, তিন বার ভোগ দেওয়া হয়। মা'কে আমিষ ভোগও দেওয়া হয়ে থাকে। এই যেমন আমি যেদিন গিয়েছিলাম কালীপুজোর দিন, সেদিন মা'কে তিনবার ভোগ দেওয়া হবে।
একটা মতে, বোনের বাড়িতে রণা ডাকাতের মৃত্যুর পর তার ডাকাতদল ভেঙে যায়, এবং তার পূজিতা মায়ের মূর্তি অনাদরে অবহেলায় এই জঙ্গলের মধ্যেই পড়ে থাকে। পরবর্তী কালে কোনো এক সময়ে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পান যে, রানাঘাটের এই অঞ্চলে, জঙ্গলের মধ্যে মা অনাদৃত, অবহেলিত হয়ে পড়ে রয়েছেন। তিনি যেনো তাকে উদ্ধার করে তার পুজোর ব্যবস্থা করেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে কৃষ্ণচন্দ্র এখানে এসে মা'কে উদ্ধার করে, আজ যেখানে মায়ের মন্দির, সেই জায়গাটাকে পরিষ্কার করে, সেখানেই মাটির ঘরে মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এবং স্বপ্নাদেশ পেয়ে কৃষ্ণনগর থেকে এক ব্রাহ্মণ পরিবারকে নিয়ে এসে মায়ের পুজোয় নিয়োজিত করেন। এবং মায়ের নিত্যপুজোর জন্য বেশ কিছু জমি দেবোত্তর সম্পত্তি করে দেন।
পলিন বাবু বলছিলেন, মায়ের মূর্তি এক সময়ে মাটির ছিলো, পরবর্তীতে মূর্তি জীর্ণ হয়ে পড়ায় মূর্তি বদলাতে হয়েছিলো। সে গল্প আগে বলেছি।

▪️তবে আর একটি মতে ব্রিটিশ শাসনকালে এক সাহেব রাত্রিকালে প্রাণভয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে নিজেকে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি মা'কে স্পর্শ করে ফেলায় মূর্তি অশুচি বা অশুদ্ধ হয়ে যায়। তখন পূজারীগণ মায়ের ওই মূর্তিকে শুধু পুজো করতে অসম্মত হন তাই নয়, তারা মায়ের মূর্তিকে চূর্নী নদীর জলে বিসর্জন দেন, এবং মাটির মন্দিরটিও ভেঙে ফেলেন।

▪️এরপরে পূজারীদের চেষ্টায় স্থানীয় জমিদার পাল চৌধুরী বংশের এক কর্তা এবং স্থানীয় আরও দু একজন সম্ভ্রান্ত মানুষের সহযোগিতায় কাশী থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি ( যে মূর্তি এখন মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত) এনে, আজ যেখানে সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দির রয়েছে ঠিক সেখানেই চাঁদনি আকৃতির মন্দির নির্মান করে দেন। সেই থেকে মা যেহেতু সিদ্ধিদাত্রী তাই মায়ের নাম সিদ্ধেশ্বরী হয়ে যায়। এছাড়া মায়ের মন্দিরের ভেতরে তারের জালিতে প্রচুর প্ল্যাস্টিকের টুকরো সুতো দিয়ে বাঁধা রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে মায়ের কাছে মনস্কামনা করেই এই সুতো বাঁধা রয়েছে।

▪️পরবর্তী কালে মায়ের মন্দিরের গায়েই মহাদেবের মন্দির এবং মায়ের গর্ভগৃহের সামনে নাটমন্দির নির্মিত হয়। শোনা যায় নাটমন্দির তৈরির সময় ওখানে একটি বিশাল বট গাছ ছিলো। কারো মতে ওই বটগাছের তলাতেই রণা ডাকাত মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতো। তাই ভয়ে কেই ওই গাছ কাটতে সাহস পাচ্ছিলো না। আবার গাছটি না কাটলে নাটমন্দিরও তৈরি করা যাচ্ছে না। উভয়সংকট। সে সময় স্থানীয় একব্যক্তি সাহস করে গাছটি কাটতে এগিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন নিঃ সন্তান এবং খুব সাধারণ ঘরের মানুষ। তিনি গাছটি কাটার পরে তৈরি হয় নাটমন্দির। এবং কি আশ্চর্য এরপরই মানুষটির ভাগ্য খুলে যায়। প্রচুর ধন সম্পত্তির মালিক হন। এবং একাধিক পুত্র সন্তানের জনক হন। এইরকমই সব নানা কিংবদন্তী জড়িয়ে আছে এই মন্দিরের সাথে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে সিদ্ধেশ্বরী মা অত্যন্ত জাগ্রত।। মায়ের মহিমা অপার।

▪️মানুষের দানে মন্দিরের পুজোর কাজ অতিবাহিত হলেও সরকার থেকে কিছু সাহায্য করা হয়ে থাকে।
মায়ের মন্দির একেবারে সাদামাটা। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে রানাঘাটের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী বিরাজমান। বর্তমানে মায়ের মন্দিরের সামনে অর্থাৎ দক্ষিন দিক এবং পূর্ব দিকে রাস্তা থাকলেও মায়ের মন্দিরের তিনদিকেই রয়েছে বাড়িঘর, একেবারে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। যা খুব বিসদৃশ লাগে৷ মন্দিরের চারপাশটা খোলামেলা হলে ভালো লাগতো। বাইরের দিকে রাস্তার ধারে একটা পুজোর উপকরণের দোকান আছে। একমাত্র ওই দোকানটা দেখলেই বোঝা যায় ভেতরে কোনো মন্দির আছে। রণা ডাকাতের নাম এবং সিদ্ধেশ্বরী মায়ের এতই মাহাত্ম্য যে, আজও রণা ডাকাত, সিদ্ধেশ্বরী মাতা এবং রানাঘাটের নাম একসাথে পাশাপাশি লোকের মুখে মুখে ফেরে।

🔸🔸 ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং ঋণ স্বীকার :- শ্রী সমীরণ চন্দ্র বণিক মহাশয়।

💫 টিম কালীকথা। KALI KATHA 💫

আমরা আন্তরিক ভাবে লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। বাস্তবিক মূল চিত্র এবং অঙ্গরাগ কালীন এই চিত্র এভাবে জনসমক্ষে অনা আমাদের সত্য...
28/08/2026

আমরা আন্তরিক ভাবে লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। বাস্তবিক মূল চিত্র এবং অঙ্গরাগ কালীন এই চিত্র এভাবে জনসমক্ষে অনা আমাদের সত্যি অনুচিত হয়েছে।

আশা রাখি জগৎ জননী মা আমাদের এই অন্যয় আচরণ এবং আস্পর্ধা নিজগুনে মার্জনা করবেন।।আমরা চিত্রটি বদলে নিলাম।।

আশ্রমের পরিচালক মন্ডলীর কাছেও আমরা করজোড়ে মার্জনা চাইছি, সেই সাথে মাননীয়। অনিশ বাবু এবং উজ্জ্বল বাবুর কাছে আমরা করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। জগৎজননী নিজের অবুঝ সন্তান এর এই অন্যয় কে ক্ষমা করবেন কিনা জানিনা, তবে আমরা আন্তরিক ভাবে লজ্জিত এবং ভবিষ্যতে এভাবে অঙ্গরাগরত অবস্থায় বা দেবদেবীর নিরাভরণ চিত্র যাতে জনসমক্ষে না আসে, সেই বিষয়ে আমরা অবশ্যই সচেতন থাকবো।।

মা সবার মঙ্গল করুন 🙏 জয়তু মা মহামায়া 🙏

মায়ের চরণ কমলে আভূমি প্রণাম

টিম কালীকথা। KALI KATHA র পক্ষ থেকে অ্যাডমিন প্যানেল....

বহরমপুর এর অন্তর্গত বিষ্ণুপুরের "করুণাময়ী কালী", যেখানে ভক্তি, নিষ্ঠা এবং বিশ্বাস এক হয়ে যায় :-*************************...
28/08/2026

বহরমপুর এর অন্তর্গত বিষ্ণুপুরের "করুণাময়ী কালী", যেখানে ভক্তি, নিষ্ঠা এবং বিশ্বাস এক হয়ে যায় :-
******************************************

"কালী-নামের এত গুণ কেবা জান্তে পারে তায়।
দেবাদিদেব মহাদেব যাঁর পঞ্চমুখে গুণ গায়॥"

মদন মাস্টারের সেই কালজয়ী গানের কলি গুনগুন করতে করতে আজ আমরা এসে পৌঁছেছি মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক শহর বহরমপুরের এক জাগ্রত তীর্থক্ষেত্রে—বিষ্ণুপুর কালী মন্দির। লোকমুখে এই মন্দির করুণাময়ী মায়ের মন্দির নামেই অধিক পরিচিত। এখানে দেবী পূজিতা হন করুণাময়ী রূপে, ভক্তের সমস্ত আর্তি তিনি দুহাত ভরে পূর্ণ করেন।

বহরমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২.৫ কিমি দূরে অবস্থিত মায়ের এই মন্দির। আর যদি আপনারা ট্রেন পথে আসেন, তবে বহরমপুর কোর্ট স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো ধরে মাত্র ৩.৫ কিমি পথ অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাবেন বিষ্ণুপুর করুণাময়ী মায়ের মন্দিরে।

মন্দিরে প্রতিদিন চলে মায়ের নিত্যপূজা এবং সন্ধ্যারতি। বিশেষ করে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ভক্তদের ভিড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ গমগম করে। পৌষ মাসে মায়ের আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে প্রতিবছর এখানে বসে বিশাল মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অগণিত ভক্তের সমাগমে মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে মুখরিত। ভক্তদের বিশ্বাস, মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না।
মায়ের মহিমা ও ভক্তের বিশ্বাসের এক অনন্য নিদর্শন আজও লোকমুখে শোনা যায়। একসময় মন্দিরের পাশ দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় ট্রেনের চালকরাও নাকি গতি কমিয়ে মাকে প্রণাম জানিয়ে তবেই যাত্রা শুরু করতেন, যাতে যাত্রাপথ নিষ্কণ্টক হয়। বহরমপুরবাসী তো বটেই, আশেপাশের জেলার মানুষের কাছেও মা করুণাময়ী এক পরম আশ্রয়ের নাম।

ইতিহাস ও অলৌকিক উপাখ্যান:
মুর্শিদাবাদের ইতিহাস গবেষক বিজয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শহর বহরমপুর’ গ্রন্থ এবং স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে জানা যায় এই মন্দিরের এক রোমাঞ্চকর ইতিবৃত্ত।
নবাব সরফরাজ খানের আমলে কাজের সন্ধানে সুদূর মহারাষ্ট্র থেকে বাংলায় আসেন কৃষ্ণচন্দ্র শর্মা (হোতা) নামক এক ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ। কাশিমবাজারের নবাবের অধীনে তিনি কাজ শুরু করেন। দীর্ঘকাল নিঃসন্তান থাকার পর, প্রায় ৬০ বছর বয়সে তিনি যখন উপার্জিত অর্থ নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, ঠিক তখনই এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ পান— "তুই এখানেই থাক, আমি তোর কাছেই আসছি।"
এর ঠিক এক বছর পর তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। বাবা-মা নাম রাখেন ‘করুণাময়ী’। দিনে দিনে শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো বেড়ে উঠতে থাকে ছোট্ট করুণাময়ী। বাবার প্রাণের চেয়েও প্রিয় ছিল এই মেয়ে। কৃষ্ণ চন্দ্র হোতা তখন সৈয়দাবাদের বাসিন্দা। অফিস থেকে ফেরার পথে তিনি প্রতিদিন বিষ্ণুপুরের এই মহাশ্মশানের বটবৃক্ষের নিচে ধ্যানে বসতেন, আর ছোট্ট মেয়েটি তাঁর চারপাশে খেলে বেড়াত।
একদিন অফিস শেষে বিষ্ণুপুরে এসে তাঁর মনে পড়ল, জরুরি কাজ ফেলে এসেছেন। মেয়েকে নিয়ে আবার কাশিমবাজার ফেরা সম্ভব নয়, আবার মেয়েও বাড়ি ফিরতে নারাজ। অগত্যা রাস্তা দিয়ে পরিচিত এক শাঁখারিকে যেতে দেখে তিনি অনুরোধ করলেন মেয়েকে সৈয়দাবাদে পৌঁছে দিতে। শাঁখারির সাথে যেতে যেতে হঠাৎ পাড়াপার ঘাটের কাছে এসে করুণাময়ী জেদ ধরল, সে আর যাবে না। শাঁখারির কাছে একজোড়া শাঁখা পরার আবদার করে সে। শাঁখা পরার পর মেয়েটি শাঁখারিকে বলল, "আমি এখানেই থাকব। তুমি বাড়ি ফিরে আমার মাকে বোলো, লক্ষ্মী ঠাকুরের পাশে পাঁচটি মোহর আছে, তার থেকে একটি যেন তোমায় দিয়ে দেয়।"
এই বলে করুণাময়ী জলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। শাঁখারি ভীত হয়ে কৃষ্ণচন্দ্রকে খবর দিলে, তিনি ছুটে আসেন। বিলের জলের দিকে তাকাতেই তিনি দেখতে পান, শাঁখা পরা দুটি হাত জলের ওপর ভেসে উঠেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। শোকে বিহ্বল কৃষ্ণচন্দ্র চাকরি ছেড়ে সেই মহাশ্মশানেই সাধনায় মগ্ন হন। পরবর্তীকালে তিনি এক গাছের কোঠরে দেবীর দর্শন পান এবং সেখানেই মায়ের প্রতিষ্ঠা হয়। শোনা যায়, লালগোলার রাজা যোগেন্দ্র নারায়ণ রায় পরবর্তীকালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন।

সময়ের স্রোতে বিষ্ণুপুরের সেই মহাশ্মশান আজ আর নেই। জঙ্গল সরে গিয়ে এসেছে ঝকঝকে আলো, বদলেছে রাস্তাঘাট। কিন্তু যা বদলায়নি, তা হলো মায়ের প্রতি ভক্তদের অফুরন্ত ভালোবাসা ও বিশ্বাস।
মন্দির থেকে ফেরার পথে মনে বেজে উঠল কবি নজরুলের সেই অমর পংক্তি—
"শ্যামা নামের লাগল আগুন
আমার দেহ ধূপকাঠিতে,
যত জ্বালি সুবাস তত
ছড়িয়ে পড়ে চারভিতে..."

উৎস - আনন্দবাজার পত্রিকা News18 Bangla
জাগো বাংলা অন্যান্য পত্রিকা (সংগৃহীত)

✍️ Ritwik Raj এর wall থেকে...

©® কপিরাইট :- টিম কালীকথা। KALI KATHA

🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸

Address

Chinsurah Hooghly
Chinsurah
KK2022

Telephone

+919163890526

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when কালীকথা। KALI KATHA posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category