01/05/2026
আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। শ্রী শ্রী গন্ধেশ্বরী মাতার বাৎসরিক পূজা। এই বিশেষ দিনে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন :-
**********************************************
দেবী গন্ধেশ্বরী আদিপরাশক্তি মা মহামায়া দুর্গার-ই এক রূপ বিশেষ। চতুর্ভূজা এই দেবী গন্ধেশ্বরীর ধ্যান মন্ত্রে বলা হয়েছে -
'দুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতু নঃ।'
অর্থাৎ , 'হে দেবী, আপনি আমাদের নিকট দুর্গতিহারিণী দুর্গাস্বরূপা। দুর্গতিহারিণী দুর্গা রূপে আপনি আমাদের দুঃখ বিনাশ করুন।'
দেবী দুর্গা ও গন্ধেশ্বরী উভয়েই সিংহবাহিনী ও অসুরমর্দিনী। দেবী গন্ধেশ্বরীর ধ্যানমন্ত্র অনুযায়ী তিনি সিংহারূঢ়া, ললাটে চন্দ্রকলাশোভিতা , মরকত মণিতুল্য প্রভাময়ী, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, ধনুর্বাণ ধারিনী, ত্রিনয়না, কেয়ূর- রত্নহার- বলয় – শব্দায়মান চন্দ্রহার ও নূপুর পরিহিতা। তিনি উজ্জ্বল কর্ণকুণ্ডল ধারিনী। এই দেবী আমাদের সমস্ত রকম দুর্গতি নাশ করেন।
মা গন্ধেশ্বরী মূলতঃ বৈশ্য বণিক শ্রেনীর দ্বারা আরাধিতা। গন্ধবণিকগণ এই দেবীর পূজা প্রচলন করেন। বৈশাখী পূর্ণিমাতে বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধির জন্য বৈশ্য বণিক সম্প্রদায় এই দেবীর আরাধনা করেন।গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা আজকের এই পুজোর দিনে তাঁদের হিসাব খাতা এবং ওজন পরিমাপের যন্ত্র দেবী গন্ধেশ্বরীর সামনে সাজিয়ে রাখেন। দেবী গন্ধেশ্বরীর আশীর্বাদ নিয়েই সারা বছরের ব্যবসার শ্রী ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয় এই দিনে।
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
গন্ধবণিক হল মূলত বাঙালি হিন্দু বণিক সম্প্রদায় যারা মূলত গন্ধ দ্রব্যের ব্যবসা করে থাকেন। গন্ধ দ্রব্য যেমন বিভিন্ন সুগন্ধি প্রসাধনী, সুগন্ধি ধূপ, চন্দন, সুগন্ধি মশলা ইত্যাদি। চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন গন্ধবণিক সম্প্রদায়কে হিন্দু বণিক সম্প্রদায় বলেই উল্লেখ করেন। এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের কূলদেবী হলেন দেবী গন্ধেশ্বরী। প্রতিবছর বৈশাখী পূর্ণিমাতে গন্ধবণিকেরা মা গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজো করেন। দেবী গন্ধেশ্বরী মাতৃশক্তির প্রতীক। গন্ধবণিকরা প্রথমে শৈবধর্মের উপাসক অর্থাৎ শিবের উপাসক হলেও পরবর্তী কালে তাঁরা শক্তির উপাসক হয়ে ওঠে।
প্রাচীনকালে এই বণিকরা ময়ূরপঙ্খী নৌকা ভাসিয়ে বাণিজ্যে যেতেন। পথে যেমন ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদির আশঙ্কা ছিল তেমনই ডাকাত ও বন্য জীবজন্তুর ভয়ও ছিল। এই সব রকমের বিপদ আপদ থেকে দেবী গন্ধেশ্বরী তাঁদের রক্ষা করবেন - তাঁদের এই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় মা গন্ধেশ্বরীর পুজো। সমস্ত ভয়, সমস্ত দুর্গতি থেকে রক্ষা করেন মা দুর্গতিনাশিণী, ভয়হারিনী অভয়া মা গন্ধেশ্বরী। তাই বণিক শ্রেনী এই দেবীর আরাধনা করেন। 'গন্ধাসুর' নামক এক ডাকাত এর হাতে বণিকেরা প্রায়শঃই তাঁদের ধন সম্পত্তি হারাতেন। পরবর্তী কালে বণিক শ্রেনীগন মা গন্ধেশ্বরীর পূজার প্রচলন করেন। মা গন্ধেশ্বরী এই ডাকাতকে বধ করেন, ফলে বণিকেরা নির্ভয়ে তাঁদের বাণিজ্য যাত্রা করতে পারতেন। মা গন্ধেশ্বরীর পূজা প্রচলনের পেছনে এমনই একটি লৌকিক কাহিনীর জনশ্রুতি আছে। দেবী নানান অলঙ্কার ধারন করেন- যা এই বাণিজ্য মারফৎ উৎকর্ষতা বা শ্রীবৃদ্ধির প্রতীক। দেবী মরকতবর্ণা। তপ্তকাঞ্চন ও মরকতের বর্ণ এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ বাণিজ্য দ্বারা বণিক শ্রেনীর উন্নতি তথা অর্থ-সম্পত্তি প্রাপ্তির প্রতীক। দেবী মহাশক্তিধারিণী তাই বলশালী সিংহ দেবীর বাহন।
🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤🌼❤
গন্ধকে বলা হয় পঞ্চভূতের ক্ষিতি তত্ত্বের সমষ্টিগত রূপ বা পৃথিবী। গন্ধেশ্বরী মাতা ও পৃথিবী মাতা একই। গন্ধের যিনি ঈশ্বরী তিনিই 'গন্ধেশ্বরী'। গন্ধ হল পৃথিবীর একটি গুণ।
১)ব্যোম তত্ত্বে হল শুধু শব্দ।
২) মরুৎ তত্ত্বে হল শব্দ+স্পর্শ।
৩) তেজঃতত্ত্বে হল শব্দ+ স্পর্শ +রূপ।
৪) অপঃতত্ত্বে হল শব্দ+স্পর্শ +রূপ+রস।
৫) ক্ষিতিতত্ত্বে হল শব্দ+স্পর্শ +রূপ+রস+গন্ধ।
অর্থাৎ,পঞ্চভূতের পূজা করাই হল দেবী গন্ধেশ্বরীর আরাধনা।
পৃথিবীতে বণিক সমাজ এই পঞ্চভূতের পণ্যরূপ নিয়েই ব্যবসা বাণিজ্য করেন। এই বাণিজ্য করার সময় ভুল বশত যদি কোনো পাপ কর্ম করে ফেলা হয়, তবে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা হয়ে যায় এই গন্ধেশ্বরী পূজার মাধ্যমে। গন্ধবণিক সমাজে অনেক সেবামূলক কর্মযজ্ঞ আছে।
🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸🌸
শ্রী শ্রী চণ্ডী তে আদিশক্তি পরমেশ্বরী দেবীগনে পরিবৃত হয়ে যখন শুম্ভ-নিশুম্ভ অসুরের সাথে যুদ্ধ করছিলেন,তখন শুম্ভ দেবীকে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে,
"হে অহঙ্কারী ! তুমি অন্য দেবীদের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ করে চলেছ। অতি মানিনী হয়ো না।"
তা শুনে মা মহাশক্তি বললেন,
"একৈ বাহং জগত অত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা।" -
আমি ছাড়া এ জগতে দ্বিতীয় কে আছে ? দেখো এরা সবাই আমার শক্তিমাত্র। তাই এরা সবাই আমার মধ্যে লীন হচ্ছে। এরপর সকল দেবী মূল আদি শক্তির মধ্যে বিলীন হলেন।
শাক্তমতে এর তাৎপর্য হল এই যে , ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতীয় মান হলেও তত্ত্বতঃ সব কিছুই মহাশক্তির বহিঃপ্রকাশ। আরও একটি তথ্য পাই যে, সকল দেবীই এক ও অভিন্ন মা মহাশক্তি হতে সৃষ্ট, নির্গত হয়েছেন।
মনসা, চণ্ডী, ষষ্ঠী, শীতলা , বনদুর্গা , বহুচেরা, মহগ্রতারা, প্রজ্ঞা পারমিতা সহ ভারত ও অভারতীয় পূজিত বা অধুনা বিস্মৃত দেবীকুল এক ও অভিন্ন আদিশক্তি থেকেই জাত হয়েছেন।
দেবী গন্ধেশ্বরীও তার ব্যতিক্রম নন। সিংহবাহিনী , ত্রিনয়নী, চতুর্ভুজা , শঙ্খ ,চক্র , ধনুর্বাণ ধারিণী - এই দেবী বণিক কুলের কুলদেবী।
হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে তাঁর পূজা এককালে বঙ্গীয় বণিক দের নানা শাখায় অনুষ্ঠিত হত বৈশাখ মাসের বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন। বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে অন্যান্য হিন্দু দেব দেবীর সাথে দেবী গন্ধেশ্বরীরও একটি মূর্তি আছে।
🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤🌸❤
🌼 মা গন্ধেশ্বরীর ধ্যানঃ-
"ওঁ সিংহস্থা শশিশেখরা মরকতপ্রেক্ষা চতুর্ভির্ভুজৈ।
শঙ্খং চক্র- ধনুঃশরাংশ্চ দধতী নেত্রৈস্ত্রিভিঃ শোভিতা ।।
আমুক্তাঙ্গদহার- কঙ্কণরণৎ- কাঞ্চীক্কণন্নূপুরা ।
দুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতু নো রত্নোল্লসৎকুন্ডলা ।।"
🌼 মন্ত্রঃ- ওঁ মায়া বীজ দুর্গাবীজ দুর্গায়ৈ নমঃ।
মা দুর্গারই ভিন্ন রূপের প্রকাশ করলেন এই দেবী গন্ধেশ্বরী। ইনি ধন-সম্পদ রক্ষা করেন। মা লক্ষ্মী আমাদের ধন- সম্পত্তি- ঐশ্বর্য প্রদান করেন। কিন্তু সেই ধন- ঐশ্বর্য রক্ষা করতে হবে। তাই মা মহামায়া দেবী গন্ধেশ্বরী রূপে প্রকট হয়েছেন। ধন যিনি প্রদান করেন, ধনের রক্ষাও তিনিই করেন। দেবী গন্ধেশ্বরী বৈশ্য বণিকদের পূজিতা। কারন বণিকরাই মূলত ব্যবসা বানিজ্য করেন।
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
🌼 পৌরাণিকী :-
"প্রতিবৎসর বৈশাখী পূর্ণিমাতে প্রত্যেক গন্ধবণিকের গৃহে শ্ৰীশ্ৰীগন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা হইয়া থাকে।
এই গন্ধেশ্বরী দেবী সাক্ষাৎ ভগবতী দুর্গা। চতুর্ভূজা, সিংহবাহিনী মূৰ্তিতে তিনি গন্ধেশ্বরী দেবী রূপে আবিভূর্তা হইয়া গন্ধাসুরকে বধ করেন। সেই কারণে এই দেবীর নাম গন্ধেশ্বরী হয়।
সুভূতির ঔরসে ও তপতী-নাম্নী রাক্ষসীর গর্ভে 'গন্ধাসুর' মহাদেবের বরে ত্রিভুবনবিজয়ী ও মহাবলশালী হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। সুভূতি বৈশ্যকন্যা সুরূপাকে হরণ করিতে গিয়া বৈশ্যগণ কর্তৃক অপমানিত, তিরস্কৃত ও হৃতসৰ্ব্বস্ব হয় । পিতার সেই অপমানের প্রতিশোধ লইবার জন্য গন্ধাসুর বৈশ্যবংশ ধ্বংস করিতে প্রবৃত্ত হয়। তাঁহার অনুচরগণ একদিন সুবর্ণবট নামক এক বৈশ্যকে বধ করিলে, তাঁহার পূর্ণগর্ভা পত্নী চন্দ্রাবতী গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত অরণ্যে প্রবেশ করেন। পথশ্রমে ক্লান্ত হইয়া তিনি অরণ্য-মধ্যে একটি কন্যা প্রসব করিয়া মৃত্যু মুখে পতিত হন। সৰ্ব্বজ্ঞ মহর্ষি কশ্যপ ধ্যানযোগে চন্দ্রাবতীর গর্ভে দেবী বসুন্ধরার অংশাবতার জন্মগ্রহণ করিয়াছেন অবগত হইয়া তাঁহাকে স্বকীয় আশ্রমে আনয়নপূর্ব্বক কন্যানিৰ্ব্বিশেষে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। গুণজ্ঞ মহর্ষি সেই দিব্য সৌরভময়ী কন্যার নাম রাখিলেন- "গন্ধবতী"।
“যৌবনোন্মুখী গন্ধবতী পিতার নিধন ও অরণ্য মধ্যে মাতার শোচনীয় মৃত্যুর কারণ অসুরগণের বিনাশকামনায় মহামায়ার তপস্যায় প্রবৃত্ত
হইলেন।”
গন্ধাসুর গন্ধবতীর অলৌকিক রূপ লাবণ্যের কথা জানিয়া গন্ধবতীকে লাভ করিবার নিমিত্ত সসৈন্যে তাঁহার আশ্রমে উপনীত হইল। কিন্তু অসুরের চাটুবাদ বা ভীতিপ্রদর্শনে সেই তপোনিমগ্না গন্ধবতীর ধ্যানভঙ্গ হইল না। তখন ক্রুদ্ধ অসুর সবলে গন্ধবতীর কেশাকর্ষণ করিল, কিন্তু অসুরতেজ পরাভূত হইল, গন্ধাসুর সেই তপ:কৃশা পঞ্চমবর্ষীয়া বালিকাকে যোগাসন হইতে বিচলিত করিতে পারিল না।
“গন্ধবতী বিচলিত হইলেন না বটে, কিন্তু তদীয় হোমকুণ্ডস্থ বহ্নিরাশি বিচলিত হইল। সহসা সেই বিচলিত বহ্নিরাশি হইতে এক দিব্য তেজ সমুত্থিত হইয়া সমস্ত তপোবনকে দুর্ণিরীক্ষ্য প্রতাপপুঞ্জে উদ্ভাসিত করিল। অসুরপতি বিস্মিত ভীত ও মুগ্ধপ্রায় হইয়া সভয়ে কেশমুষ্টি পরিত্যাগ করিয়া বিদ্যুৎবেগে সুদূরে গিয়া দণ্ডায়মান হইল :
অত্যুৎকট জ্যোতির প্রভাবে সসৈন্যে অসুররাজ ক্ষণকালের জন্য অন্ধীভূত হইলেন। অনন্তর দৃষ্টি প্রসন্ন হইলে দেখিলেন বিদ্যুৎ-তুল্য প্রতাপময়ী সিংহবাহিনী চতুর্ভূজা এক নারীমূৰ্তি হোমকুণ্ড-সমীপে গন্ধবতীর পুরোভাগে দন্ডায়মান রহিয়াছেন। আর গন্ধবতী স্বকীয় গলদেশে উত্তরীয়-বল্কল অৰ্পণ করিয়া আনতনয়নে সেই দেবদুর্লভ শ্রীপাদপদ্মের অপূৰ্ব্ব সৌন্দৰ্য্যরাশি দর্শন করিতেছেন।”
অসুর তৎক্ষণাৎ দেবীর সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। ঘোরতর যুদ্ধের পর দেবী শূলাঘাতে অসুরের প্রাণ বিনাশ করিলেন ও তাহার প্রকাণ্ড দেহ সমুদ্ৰ-মধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। দেবীর ইচ্ছায় সেই দেহ গন্ধদ্রব্যের আকর-ভূমি গন্ধদ্বীপরূপে পরিণত
হইল।
অনন্তর ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবগণের সহিত মিলিত হইয়া দেবীর যথাবিধি পূজা করিলেন। গন্ধাসুর-নাশিনী দেবী "গন্ধেশ্বরী" নামে ত্রিভুবনে বিখ্যাত হইলেন। বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে ভগবতী গন্ধেশ্বরী মূৰ্তিতে প্রকাশিত হইয়া গন্ধাসুরকে বিনাশ করিয়াছিলেন। সেই হেতু গন্ধবণিকগণ অদ্যপি বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে দেবী গন্ধেশ্বরীর পূজা করিয়া থাকেন।"
– ( মহানন্দীশ্বর পুরাণ )
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
গন্ধেশ্বরী দেবীর আরোও একটি উপাখ্যান আছে, তাঁহা ভবপুরাণে দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহাতে গন্ধবতীর কোনোও উল্লেখ নাই এবং গন্ধাসুরের বধের কারণও অন্যরূপে বর্ণিত আছে। সেই উপাখ্যান-ভাগ এইরূপ :-
“গন্ধাসুর নারদের মুখে দেবীর অলৌকিক রূপ লাবণ্যের কথা শ্রবণ করিয়া মোহিত হয়ে পড়েন এবং উহাকে পত্নীরূপে লাভের আশা করিয়া আশুতোষের কৃপাপ্রার্থী হইয়া কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। ভগবান প্রসন্ন হইলে, গন্ধাসুর শিবস্বারূপ্য-বর প্রার্থনা করে। আশুতোষ অসুর-রাজের অভিলষিত বরই অর্পণ করিলেন । অসুর বরপ্রাপ্তিমাত্র রজতগিরিনিভ চারুচন্দ্রাবতংশ দিব্য শৈব মূৰ্তি পরিগ্রহ করিলেন। কিন্তু প্রকৃতিতে সেই অসুর-ভাবই অক্ষুণ্ণ রহিল। তখন অসুর মহাদেবের পরোক্ষে কৈলাসে গমন পূৰ্ব্বক দাক্ষায়ণীকে প্রার্থনা করিল। দেবী অসুরের দুরাশা দেখিয়া মনে মনে হাস্য করিয়া যুদ্ধে তাঁহার প্রাণ বিনাশ করিলেন। দেবীর ইচ্ছায় গন্ধাসুরের দেহ গন্ধমাদন পৰ্বতরূপে পরিণত হইল। দানবের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ হইতে ভিন্ন ভিন্ন গন্ধদ্রব্যের উৎপত্তি হইয়াছিল। অনন্তর দেবগণ কর্তৃক দেবী পূজিত হইয়া "গন্ধেশ্বরী" নামে বিখ্যাত হইলেন।”
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
অপর একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তারকাসুরের বধের নিমিত্ত হরগৌরীর বিবাহের প্রয়োজন হইলে, তারকাসুর মায়াবলে সমস্ত গন্ধ-দ্রব্য অপহরণ করেন । ভগবান শিব তখন দেশদাস, শঙ্খভূতি ও বিষটগুপ্ত - এই গন্ধবণিক সহোদর ভ্রাতাদিগকে গন্ধদ্রব্য-সংগ্রহের জন্য আদেশ করেন। সত্ৰীশ আশ্রমের আদিপুরুষ বিষটগুপ্ত পরম শিবভক্ত ছিলেন। নারদের উপদেশে তিনি ভগবতী গন্ধেশ্বরীর পূজা করিলে, দেবী তাঁহার প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন পূর্বক তাহাকে দর্শন দেন ও অপহৃত গন্ধদ্রব্যগুলি দেখাইয়া দেন । বিষটগুপ্ত দেবী গন্ধেশ্বরীর দর্শন লাভ করিয়া তাঁহার স্তোত্র পাঠ করেন।"
-----(গন্ধবণিক, বৈশাখ,সংখ্যা তৃতীয়, কষ্টিপাথর)
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
বর্তমানে এই গন্ধেশ্বরী মাতার পূজা হয় ভক্তের মনে শক্তি জোগানোর জন্য যাতে বাণিজ্য বুদ্ধি বৃদ্ধি পায়, প্রধানত ক্রয়-বিক্রয় বাড়ে এবং আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পায়, তার সাথে চাহিদা ও সরবরাহের সামঞ্জস্যও ঠিকঠাক থাকে। সঞ্চয় এবং ব্যয়- এর সামঞ্জস্য যাতে বজায় থাকে এবং
ব্যবসায়িক শুভবুদ্ধির যেন উদয় হয়।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
🌼 দেবী গন্ধেশ্বরীর মন্দির,গন্ধেশ্বরী ঘাট, বাঁশবেড়িয়া, হুগলি,পশ্চিমবঙ্গ:-
গঙ্গার পাড়ে কয়েকশো বছরের পুরনো এই শহরের প্রাচীন নাম অবশ্য বংশবাটী। খামারপাড়া, শিবপুর, বাঁশবেড়িয়া এবং ত্রিবেণি এই চার অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে এই শহর। চুঁচুড়া, চন্দননগর, বলাগড়, গুপ্তিপাড়া, পাণ্ডুয়া, পোলবা ছাড়াও বর্ধমান এবং গঙ্গার উল্টোদিকে নদিয়া, কল্যাণী, কাঁচরাপাড়া এবং হালিশহর থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন এই দেবী গন্ধেশ্বরীর মন্দির দর্শনের জন্য। ব্যান্ডেল থেকে ৪ কিমি দূরের বাঁশবেড়িয়ায় আসা যায় ট্রেনে। হাওড়া থেকে সোজা ট্রেনে করেই আসা যায় বাঁশবেড়িয়ায়। ট্রেনে চুঁচুড়ায় এসে সেখান থেকেও বাসে বা মিনিবাসে আসা যায় এখানে। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে নৈহাটি এসে গঙ্গা পেরিয়ে চুঁচুড়া হয়েও আসা যায়। থাকার জন্য বাঁশবেড়িয়া পুরসভার অতিথিশালাও আছে।
দেবী গন্ধেশ্বরীর পূজার দ্রব্য – প্রতিমা, পুরোহিত বরণ ১, সিন্দুর, পঞ্চগুঁড়ি ,পঞ্চগব্য, পঞ্চশস্য, পঞ্চরত্ন, পঞ্চপল্লব, ঘট ১, কুন্ডহাঁড়ি ১,তেকাঠা ১, দর্পণ, অধিবাসের ডালা, তীর ৪, সশীষ ডাব ১, একসরা আতপ তন্ডুল, তিল, হরিতকী, পুষ্প ৮, কুচা নৈবেদ্য ১, পুষ্পমাল্য, বিল্ল্বপত্রমাল্য, গন্ধেশ্বরীর শাটী ১, শিবের ধুতি ১, নারায়ণের ধুতি ১,অসুরের ধুতি ১, জয়ার শাটী ১, চণ্ডীর শাটী ১, বিজয়ার শাটী ১, লক্ষীর শাটী ১, চাঁদমালা ১, উপকরণাদি, মিষ্টান্ন, ঘটি ১, শঙ্খ, সিন্দুরচুবড়ি ১, ভোগের দ্রব্যাদি, বালি, কাষ্ঠ, ঘৃত ১ পোয়া, হোমের বিল্ল্বপত্র ২৮, পানের মশলা, পূর্ণপাত্র ১, আরতি, দক্ষিণা।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"গন্ধেশ্বরী নমস্তুভ্যং ভক্তাভীষ্টপ্রদায়িনী ।
নমস্তুভ্যং জগন্মাতঃ ভোগাপবর্গসাধিকে ।।"
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
©® কপিরাইট :- টিম মাতৃশক্তি। MATRI SOKTI, পোস্ট টি গতবছর গন্ধেশ্বরী পুজো উপলক্ষে পেজে প্রকাশিত হয়েছিল। আজ গন্ধেশ্বরী পুজো উপলক্ষে পুনঃপ্রকাশিত হলো আরো একবার [ভাল লাগলে শেয়ার করুন, দয়া করে কপি পেস্ট করবেন না]
⚜️ চিত্রঋণ:- শ্রী কৌশিক বন্দোপাধ্যায় [ছবিতে দর্শন করুন উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া অঞ্চলের মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটে অবস্থিত গন্ধেশ্বরী মন্দির এর মা গন্ধেশ্বরী বিগ্রহকে। জয় মা গন্ধেশ্বরী]
⚜️ কপিরাইট ✍️ :- টিম মাতৃশক্তি। MATRI SOKTI